• নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ২২:১২:৩৩
  • ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ২২:১২:৩৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

নদী দিবস এখন সবার : শেখ রোকন

ছবি : সংগৃহীত

লেখক ও গবেষক শেখ রোকন নদী বিষয়ক নাগরিক সংগঠন রিভারাইন পিপলের প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব। এই সংগঠন ২০১০ সালে বাংলাদেশে নদী দিবস পালনের সূচনা করেছিল। এখন সরকারি-বেসরকারি বিভন্ন সংগঠন ও সংস্থা দিবসটি পালন করে বিভন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে। সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ রবিবার বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে শেখ রোকনের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান।

বাংলা : আজ বিশ্ব নদী দিবস। ২০১০ সাল থেকে আপনারা বাংলাদেশে এই দিবস পালন করে আসছেন।

শেখ রোকন : হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। আমরা প্রথম বছর বাংলাদেশে নদী দিবস পালনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে একত্র হয়েছিলাম। ঢাকার বাইরেও রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন বিশ্ববদ্যালয়ে রিভারাইন পিপলের কমরেডরা দিবসটি পালন করেছিলেন। ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা দিবসটি পালন শুরু করে। পরবর্তীতে দিবসটি পালনে যোগ দিতে থাকে আরও সংগঠন।

বাংলা : কী উদ্দেশ্য নিয়ে দিবসটি পালন শুরু করেছিলেন?

শেখ রোকন : যে কোনও দিবস পালনের উদ্দেশ্য হলো ওই বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো, অঙ্গীকার শানিত করা। আমরা যেহেতু নদী নিয়ে কাজ করি, আমরা চেয়েছি নদীর ব্যাপারে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এবং নদীর প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার শানিত করতে। সেই লক্ষ্য থেকেই আমরা খুঁজছিলাম যে নদীবিষয়ক কোনও দিবস আছে কি-না। তখন আমরা এই বিশ্ব নদী দিবসের খোঁজ পাই এবং এর মূল আয়োজকদের সঙ্গে যোগাযোগ করি।

বাংলা : এই দিবসের প্রতিষ্ঠাতা তো কানাডিয়ান রিভার হিরো মার্ক অ্যাঞ্জেলো?

শেখ রোকন : হ্যাঁ আমি তার সঙ্গেই যোগাযোগ করেছিলাম ২০০৯ সালের শেষ দিকে। তিনি কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া রাজ্যে এর সূচনা করেন এবং পরবর্তীতে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৫ সালে জাতিসংঘ দিবসটি অনুসমর্থন করে। তো বিশ্বের একেবারে বিপরীত প্রান্ত থেকে সাড়া পেয়ে তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন। আমার মনে আছে, ফিরতি মেইলে বলেছিলেন, বাংলাদেশে নদী দিবসের কর্মসূচির প্রতি তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিশেষ মনোযোগ রাখবেন। পরের বছর সেপ্টেম্বর মাসের আগে এ ব্যাপারে যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখন প্রশ্ন জাগলো দিবসটির প্রতিপাদ্য কী? আবার যোগাযোগ করলে মার্ক অ্যাঞ্জেলো আমাকে জানালেন বিশ্ব নদী দিবসের কোনও বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য নেই। অঞ্চল বা দেশভেদে আলাদা প্রতিপাদ্য হতে পারে।

বাংলা : আপনার কোনও একটি লেখায় পড়েছিলাম দিবসটির বাংলাদেশ প্রতিপাদ্যও আপনারা নির্ধারণ করেন।

শেখ রোকন : এখন আর এককভাবে করি না। প্রথম কয়েক বছর এককভাবে করেছি। মার্ক অ্যাঞ্জেলো আমাদের, রিভারাইন পিপলকে নদী দিবসের বাংলাদেশ প্রতিপাদ্য নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়ে বলেছিলেন, আমরা যেন দেশীয় প্রেক্ষিতে একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে তাকে জানিয়ে দেই। আমরা প্রথম প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছিলাম 'নদীরা ডাকছে, আমরা সাড়া দেব না?'। সেই ২০১০ সালে। এখন আমরা সহযোগী সব সংগঠনকে নিয়ে একত্রে বসে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করি।

বাংলা : রিভারাইন পিপল ছাড়া আর কোন কোন সংগঠন?

শেখ রোকন : অনেক। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা, হাওরাঞ্চলবাসী, বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন, জলপরিবেশ ইনস্টিটিউট, নোঙর, নদী পরিব্রাজক দল, ওয়াটারকিপারর্স বাংলাদেশ, সবুজ পাতা, ওয়াটার কমনস ফোরাম, অঙ্গীকার বাংলাদেশ প্রভৃতি সংগঠনের নাম বিশেষভাবে বলতে হবে। নদী দিবসে এসব সংগঠন মিলে আমরা একটি যৌথ কর্মসূচিও গ্রহণ করি। নদীর জন্য পদযাত্রা, ২০১৪ সাল থেকে। এর পাশাপাশি সংগঠনগুলোর নিজস্ব কর্মসূচি থাকে। পরবর্তীতে নদীর জন্য পদযাত্রায় আরও অনেক সংগঠন যুক্ত হলে আমরা গঠন করি 'বিশ্ব নদী দিবস উদযাপন পরিষদ, বাংলাদেশ। এই পরিষদই এখন নদী দিবসের বাংলাদেশ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে এবং নদীর জন্য পদযাত্রা আয়োজন করে।

বাংলা : আপনি কি এই পরিষদে আছেন?

শেখ রোকন : অবশ্যই। কেন নয়! পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে আছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল মতিন। আর আমি সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছি। এছাড়া প্রথম থেকে দিবসটি যৌথভাবে পালন করে আসা সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ আছেন স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য হিসেবে।

বাংলা : এই পরিষদকে শুধু নদী দিবস উদযাপনে সীমিত না রেখে সামগ্রিক নদী বিষয়ক জোট কেন নয়?

শেখ রোকন : দেখুন, সবাই সিদ্ধান্ত নিলে সেটা হতেই পারে। আমরাও হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠের মত মেনে নেব। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি সবসময়ই যেকোনও ইস্যু বা লক্ষ্য পিনপয়েন্ট করার পক্ষে। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য খুব বেশি ছড়িয়ে দেওয়ার বিপক্ষে। রিভারাইন পিপল সাংগঠনিকভাবে মনে করে, এই পরিষদ শুধু নদী দিবসই পালন করার জন্য গঠিত। এর একটি ইতিহাস আছে, ধারাবাহিকতা আছে। আরও লক্ষ্য সামনে আনলে মূল লক্ষ্য হারিয়ে যাবে। এছাড়া মনে রাখতে হবে, নদীবিষয়ক একাধিক জোট রয়েছে। আরও গঠিত হতে পারে। সবাই স্বাধীন ও স্বতন্ত্র। নতুন সংগঠন বা জোট করার স্বাধীনতা সবারই আছে। আমরাও সেখানে যোগ দিতে পারি কিংবা নাও পারি। সেটা আমাদের স্বাধীনতা। কিন্তু নদী দিবস উদযাপন পরিষদ সম্পর্কে আপনি যদি আমার মত জানতে চান, তাহলে বলব এই পরিষদ শুধু নদী দিবস পালনেই সীমিত থাকা ভালো।

বাংলা : নদী দিবস পালনে সরকারের সাড়া পাচ্ছেন কেমন?

শেখ রোকন : প্রথম দিকে ছিল না। বরং একজন পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেছিলেন, রিভারাইন পিপল না আসলে আমরা নদী দিবস সম্পর্কে জানবো কীভাবে? এখন বেশ সাড়া পাচ্ছি। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন হওয়ার পর এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। কমিশন বেসরকারি সংগঠনগুলোর সঙ্গে যৌথ অনুষ্ঠান করছে। গত দুই বছর ধরে নদীর জন্য পদযাত্রায় যৌথ আয়োজক হচ্ছে।

বাংলা : পরিবেশবিষয়ক এত দিবস থাকতে নদীবিষয়ক আলাদা দিবস কেন?

শেখ রোকন : বাংলাদেশে তখন পর্যন্ত মার্চ মাসে পানি দিবস পালন করা হতো। কিন্তু আমরা মনে করেছি, বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশের জন্য নদীবিষয়ক আলাদা একটি দিবস জরুরি। কারণ বাংলাদেশের সবকিছু নদী নির্ভর। সভ্যতা বলেন, সংস্কৃতি বলেন, প্রতিবেশ ব্যবস্থা বলেন, উৎপাদন ব্যবস্থা ও যোগাগোগ ব্যবস্থা বলেন। আমি অনেক সময় মজা করে বলি, প্রকৃতি থেকে প্রতিরক্ষা, সবকিছু। তো নদী নিয়ে আলাদা একটি দিবস থাকবে না?

বাংলা : নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী বিষয়ক দিবসও বিদেশ থেকে আনতে হলো কেন?

শেখ রোকন : ভালো প্রশ্ন। এর একটি সুবিধা হলো নদীবিষয়ক একটি বৈশ্বিক সংহতি প্রতিষ্ঠা হয়। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় হয়। আর বাংলাদেশে নদী আন্দোলন মানে আপনি কেবল বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সীমানা মধ্যে ভাবলে হবে না। কারণ আমাদের প্রায় সব নদীই কোনও না কোনোভাবে আন্তঃসীমান্ত বা অভিন্ন নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশর নদী অধিকার যদি প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে আমাকে অন্তত দক্ষিণ এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ভাবতে হবে। ভারত, ভুটান, নেপালের নদী নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ সেখানে নদীবিষয়ক যে কোনও সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ আমাদের নদীগুলোতেও প্রভাব ফেলে। দেশের বৃহত্তম নদী ব্রহ্মপুত্র বা যমুনার কথা ভাবলে আপনাকে চীনের অবস্থান নিয়েও ভাবতে হবে।

বাংলা : তবু জাতীয়ভাবে নদী দিবস থাকতে পারতো না? যেমন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় শিক্ষক দিবস বা শিশু দিবস ভিন্ন ভিন্ন।

শেখ রোকন : আপনি জেনে আনন্দিত হবেন, রিভারাইন পিপল ইতিমধ্যে 'নদী অধিকার দিবস' পালন করে আসছে। ২০১৫ সাল থেকে। আমরা বিশ্বাস করি এই দিবস একসময় বিশ্বব্যাপী পালিত হবে। সেটা হবে নদী দিবসে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবদান।

বাংলা : ওই দিবসের প্রেক্ষাপট কী?

শেখ রোকন : আপনি হয়তো জানেন, পানিপ্রবাহ সদন ১৯৯৭ নামে জাতিসংঘের একটি দলিল রয়েছে। বিশেষত আন্তঃসীমান্ত নদীর ক্ষেত্রে এই দলিল ভাটির দেশর জন্য অনন্য রক্ষাকবচ। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো দলিলটি সংসদে রেটিফাই বা অনুস্বাক্ষর করেনি কেন, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। আইনটি কার্যকর হতে অন্তত ৩৫টি দেশে অনুস্বাক্ষর লাগে। আমরা অনেকদিন ধরে বাংলাদেশকে সেই ৩৫ নম্বর দেশ হওয়ার জন্য দাবি জানিয়ে আসছিলাম। এর মধ্য ২০১৪ সালে ভিয়েতনাম সেই প্রয়োজনী সংখ্যা পূরণ করে। ফলে ওই বছরের ১৭ আগস্ট থেকে আইনটি কার্যকর হয়েছে। ভাটির দেশ বাংলাদেশের অধিকার রক্ষায় এই দলিলের কার্যকারিতটার কথা চিন্তা করে আমরা ১৭ আগস্ট নদী অধকার দিবসটি ঘোষণা ও পালন করে আসছি তার পরেরর বছর থেকে। অর্থাৎ ২০১৫ সাল থেকে।

বাংলা : দিবস পালন করে কি নদী রক্ষা হয়?

শেখ রোকন : নদী দিবস পালন না করলে কি নদী রক্ষা হবে? আগেই বলেছি, আর কিছু না হোক নদীর প্রতি অঙ্গীকার শানিত করার সুযোগ তৈরি হয়। আর আমরা যারা নদী আন্দোলন করি, তারা এক ধরনের বার্ষিক হিসাব-নিকাশ করার সুযোগ পাই। দিবস পালনের বড় কার্যকারিতা হচ্ছে নদী বিষয়ক অংশীজনের মধ্যে যোগােযোগ নবায়ণ হয়। আপনি দেখবেন, নদী দিবস উপলক্ষে সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি, আলোচনা হচ্ছে, প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে নদীর চিত্র উঠে আসছে। আপনি আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। নীতিনির্ধারকরা সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হচ্ছেন। নদী রক্ষায় এসবের তাৎপর্য নিশ্চয়ই রয়েছে।

বাংলা : ঠিকই বলেছেন। আপনি বাংলাদেশ নদী দিবস পালন শুরু করেছিলেন। এখন সবাই পালন করছে। নিজেকে সার্থক মনে করেন?

শেখ রোকন : আনন্দ নিশ্চয়ই হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে নদী দিবস এখন সবার। রিভারাইন পিপলের একার নয়। আর দিবস পালনের পক্ষে যতই বলি, একটি সফল দিবস পালন করে নদী আন্দোলনে নিজেকে সার্থক মনে করার কোনও কারণ নেই। বরং নদীগুলো যদি প্রাণ ফিরে পায়, তাহলেই সার্থক মনে হবে। আমার সামান্য জীবন যদি একটি নদী রক্ষায় কাজে লাগাতে পারি, তাহলে সার্থক মনে হবে।

বাংলা : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।

শেখ রোকন : আপনাকেও ধন্যবাদ। নদীময় শুভেচ্ছা।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

নদী দিবস শেখ রোকন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0739 seconds.