• বাংলা ডেস্ক
  • ০২ অক্টোবর ২০১৯ ১০:১৫:১৯
  • ০২ অক্টোবর ২০১৯ ১৪:১৭:০৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

৬ হাজার থেকে বেড়ে বালিশের দাম ২৭ হাজার টাকা

প্রতীকী ছবি

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পর এবার একটি বালিশের দাম বেড়ে ২৭ হাজার টাকা হয়েছে। এছাড়াও বালিশের একটি কভারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮ হাজার টাকা। চট্টগ্রামে নতুন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রকল্প প্রস্তাবনায় দুর্নীতির এমন চিত্র ধরা পড়ে। রূপপুরে একটি বালিশের দাম ৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

দেশের দ্বিতীয় এই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) দেখা যায়, ৭৫০ টাকার বালিশ ক্রয়ে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ২৭ হাজার ৭২০ টাকা, আর বালিশের কাভারের দাম ধরা হয়েছে ২৮ হাজার টাকা, যার বাজার মূল্য ৫০০ টাকা। এমন আরো অনেক অসঙ্গতি রয়েছে ডিপিপিতে। এর মধ্যে মাত্র ২০ টাকার হ্যান্ড গ্লাভসের দাম ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা, আর ১৫ টাকার টেস্ট টিউবের দাম ধরা হয়েছে ৫৬ হাজার টাকা। যাচাই করা হয়নি প্রকল্পের সম্ভাব্যতাও। দেশ রুপান্তর’র এক বিশেষ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে আসে।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে এ প্রকল্পের মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এসব অস্বাভাবিক ব্যয় প্রস্তাব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে। এছাড়া পরিকল্পনা কমিশন ডিপিপি প্রস্তুতকারীদের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশও করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, জড়িত মন্ত্রণালয়গুলো প্রকল্পের ব্যয় অহেতুক বাড়ানোর পাঁয়তারায় লিপ্ত হয়েছে। কোনোভাবেই তাদের আটকানো যাচ্ছে না। এছাড়া, এই প্রবণতাকে উন্নয়নের নামে লুটপাটের প্রাথমিক পদক্ষেপ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

ডিপিপি’র তথ্য মতে, দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক মানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করতে যাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এজন্য ২২ তলাবিশিষ্ট এক হাজার বেডের দুটি হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ২০ তলাবিশিষ্ট দুই বেজমেন্টের প্রশাসনিক ভবন করা হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রাম বন্দর বাইপাস সড়কের পাশে ২৮ দশমিক ৪২ একর জায়গা জুড়ে হবে বিশ্ববিদ্যালয়টি। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০২২ সালের জুন মাসের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়ার কথা।

ডিপিপির কার্যপত্র থেকে জানা যায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পের ১২টি আইটেমের যে দাম ধরা হয়েছে তা বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। অনেকটা পর্বতসম।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য মতে, এই ১২ আইটেমের মধ্যে প্রস্তাবনায় বালিশ ক্রয়ে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে প্রতিটির ২৭ হাজার ৭২০ টাকা, যার (সরবরাহকারীর লাভ, ভ্যাট, ট্যাক্সসহ) বাজারমূল্য ৭৫০-২০০০ টাকা আর বালিশের কাভারের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ২৮ হাজার টাকা, যার বাজার মূল্য ৫০০-১৫০০ টাকা। এমন আরো অনেক অসঙ্গতি রয়েছে পণ্যগুলোর ক্রয় প্রস্তাবে। এর মধ্যে অপারেশনের সময় ডাক্তারদের হাতে পরার স্টেরাইল হ্যান্ড গ্লাভসের দাম ধরা হয়েছে প্রতিটির ৩৫ হাজার টাকা, যার বাজার মূল্য মাত্র ২০-৫০ টাকা। আর ১৫-৫০ টাকার টেস্ট টিউবের দাম ধরা হয়েছে ৫৬ হাজার টাকা।

একই সঙ্গে বিল্ডিং নির্মাণে মাল্টিপ্লাগের দাম ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৩০০ টাকা, যার বাজার মূল্য মাত্র ২৫০-৫০০ টাকা। অপারেশন থিয়েটারের রাবার ক্লথের বাজার মূল্য ৫০০-৭০০ টাকা হলেও প্রকল্প প্রস্তাবে দাম ধরা হয়েছে ১০ হাজার টাকা, রেক্সিনের বাজার মূল্য ৩-৫শ টাকা হলেও প্রতিটি ৮৪ হাজার টাকায় কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সুতি তোয়ালে বাজারে ১০০-১০০০ টাকায় পাওয়া গেলেও প্রস্তাবনায় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৮৮০ টাকা। ডাক্তারদের সাদা গাউনের বাজার মূল্য ১০০-২০০০ টাকা হলেও প্রকল্পে প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৯ হাজার টাকা। সার্জিক্যাল ক্যাপ ও মাস্কের দাম ধরা হয়েছে ৮৪ হাজার টাকা, যার বাজার মূল্য মাত্র ১০০-২০০ টাকা। বাজারে সু-কাভার প্রতিটির দাম ২০-৫০ টাকা, এখানে প্রস্তাব করা হয়েছে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা।

পরিকল্পনা কমিশন থেকে আরো বলা হয়, প্রস্তাবিত প্রকল্পের সরঞ্জামাদি ক্রয়ের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করলে আরো অনেক অসামঞ্জস্যতা পাওয়া যাবে। এ ধরনের প্রাক্কলন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রকল্প প্রস্তাবের অনেক ক্ষেত্রে একই চিকিৎসা সরঞ্জামাদির ভিন্ন ভিন্ন ব্যয় প্রাক্কলনও করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘প্রকল্পটিতে অনেক অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেডিকেল সরঞ্জামাদির ক্রয় মূল্য মাত্রাতিরিক্ত ধরা হয়েছে। দু-এক ক্ষেত্রে বাজারের চেয়ে কমও ধরা হয়েছে। বিষয়টি একেবারে অগ্রহণযোগ্য।’

তিনি আরো বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিকে বলে দেয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে কোনো প্রকল্প প্রস্তাব পাঠালে তা যেন মন্ত্রণালয় কর্তৃক যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নির্ভুল করা হয়। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত প্রকল্পের ডিপিপি প্রস্তুতে সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থার কারা কারা জড়িত ছিল তা তদন্ত করে মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।’

পিইসির কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের ডিপিপি পর্যালোচনা করে আরো অনিয়ম অসঙ্গতির তথ্য জানা গেছে। আসবাবপত্রের ব্যয় প্রাক্কলনেরও অসামঞ্জস্যতা ও অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়েছে। একই ধরনের ফার্নিচারের মূল্য একেক জায়গায় একেক রকম। একই ফার্নিচার একাধিকবার কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। যেমন রিসার্চ ল্যাবের যন্ত্রপাতির তালিকায় যেসব আসবাবপত্র কেনার কথা বলা হয়েছে, একই ধরনের ফার্নিচার অন্যত্র কেনারও প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

এক্ষেত্রে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৭৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। হাসপাতালের বইপত্র কেনার জন্য ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। বইয়ের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখো যায়, সব বইয়েই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ক্লিনিক্যাল হেমাটোলজির ৩ কপি বইয়ের সেটের দাম ধরা হয়েছে ৬০ হাজার টাকা করে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। যার বাজার মূল্য কমিশন বাদে ২২ হাজার ৫২৫ টাকা। রেসপিরেটরি মেডিকেলের দুই খণ্ডের দাম ধরা হয়েছে ৮৬ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। কিন্তু অনলাইনে এর বাজার মূল্য কমিশন বাদে ২৭ হাজার ৭৯ টাকা।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায় ডিপিপিতে ইউরোপ-আমেরিকার মুদ্রিত বইয়ের তালিকা করে ভারত থেকে ওই বই আনা হয়। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।’

ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘সাধারণত ২৫ কোটি টাকার উপরের কোনো প্রকল্প নেয়া হলেই সম্ভাব্যতা যাচাই করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে পূর্বে কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। করলে ডিপিপির অবস্থা এমন হতো না।’ 

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো যদি মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় সংবলিত প্রকল্প প্রস্তাব পাঠায়, তবে তা দুঃখজনক। কারণ এই টাকা জনগণের। ডিপিপি যেন ভুল না হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্টদের আরো সতর্ক থাকতে হবে।’

মন্ত্রী আরো বলেন, ‘পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্প পাসের আগে যাচাইবাছাই করে থাকে। যদি ধরা পড়ে তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হয়। আমরা আস্তে আস্তে এ বিষয়ে নিজেদের সক্ষমতা আরো বাড়াচ্ছি, যেন কোনোভাবে অস্বাভাবিক ব্যয়ের প্রকল্প অনুমোদন না পায়।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, প্রকল্পের আওতায় ১৫ তলাবিশিষ্ট আড়াই হাজার বর্গফুট ও ৮০০ বর্গফুটের মোট ৫৬টি রেসিডেন্স ইউনিট নির্মাণ করা হবে। ১৩০ জন নারী ও ১৩০ জন পুরুষ ডাক্তারের জন্য ১৫ তলাবিশিষ্ট পৃথক পৃথক আবাসন হোস্টেল নির্মাণ করা হবে। ২৫০ ছাত্র ও ২৫০ ছাত্রীর জন্য ১৫ তলা হোস্টেল নির্মাণ করা হবে। দোতলা উপাচার্য ভবন, চারতলা গেস্ট হাউজ ও চারতলা একটি মসজিদ নির্মাণ করা হবে। এছাড়া একটি স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থাকবে ক্যাম্পাসে।

পরিকল্পনা কমিশন জানায়, নির্মাণ সংক্রান্ত কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা, যার যৌক্তিকতা নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। নির্মাণ ও পূর্ত খাতে ব্যয় যৌক্তিকীকরণ করার স্বার্থে কতটি ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন, বেজমেন্টসহ প্রতিটি ফ্লোরের স্পেস ইউটিলাইজেশন প্ল্যান কী, প্রতিটি ভবনের স্ট্যান্ডার্ড কী হবে এসব বিষয় সংযুক্ত করে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। 

এ বিষয়ে আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের যুগ্ম প্রধান (স্বাস্থ্য উইং) সাজিদা খাতুন বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন হবে। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইনানুযায়ী ২৬টি ইনস্টিটিউশন এর আওতায় থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে ছয়টি সরকারি, ১০টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, দুটি ডেন্টাল কলেজসহ নার্সিং, টেকনোলজি, আয়ুর্বেদিক ও অপটিমেট্রিক টেকনোলজিস্ট চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত ও সনদ প্রদান করা হবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে।’

তবে, এ বিষয়ে কথা বলার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বাংলা/এনএস

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0805 seconds.