• ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১২:৪৮:১১
  • ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১২:৪৯:১৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ফাগুন চলে যাবার ছয় মাস, বেঁচে আছি, বেঁচে থাকতে হয় বলে

ফাগুন রেজা। ছবি : সংগৃহীত

শুভ্রের রূপালি দ্বীপে যাওয়া নিয়ে রাহেলা বেগমের অস্থিরতাকে অনেকেই পাগলামো ভেবে বসেন। শুভ্র বাড়ি থেকে বেরুনোর তিন ঘণ্টার মধ্যেই প্রেশার বেড়ে মাথা ঘুরে গিয়েছে রাহেলা বেগমের। ব্লাড প্রেশারের অষুধ খেয়েছেন কিনা মনে করতে পারছেন না। ট্রেনে উঠার সময় শুভ্রের চোখে চশমা ছিলো না শুনে দোতলার সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতেই তার দম আটকে আসতে লাগলো। যাদের সন্তান অথবা বোধ দুটোর কোনটাই নেই তাদের এমনটা পাগলামো মনে হতে পারে। কিন্তু এটা নির্ভেজাল সত্যি। হুমায়ূন আহমেদ এতটুকুও মিথ্যে লিখেননি। তিনি তার নিজের সন্তানস্নেহ আর জীবনবোধ থেকেই লিখেছেন শুভ্রের ‘রূপালী দ্বীপ’।

তবে শুধু মা’দের বেলাতেই নয়, বাবারাও অস্থির হন। যেমন আমি হয়েছিলাম। যেদিন ফাগুন বন্ধুদের সাথে সাজেক গিয়েছিলো। মাইক্রোবাসে করে কয়েক বন্ধু মিলে তারা সাজেক যাবার প্ল্যান করছিলো। আমি হাসিমুখে উৎসাহ দিয়েছিলাম। মুখে যতটা হাসি ছিলো বুকে তার থেকে অনেকগুণ বেশি ছিলো শংকা। জেনে নিয়েছিলাম গাড়ি কে চালাবে। ওর নাম লাদেন। না সেই খ্যাত বা কুখ্যাত বিন লাদেন নয়, ড্রাইভার লাদেন। তাকে গিয়ে চুপি চুপি ম্যানেজ করেছিলাম, বলেছিলাম, ওদের যাত্রার ধারাবর্ণনাটা যাতে দেয়। লাদেন আমাকে জানতো, তাই আপত্তি করেনি। আমি ফোন করলে যদি বিরক্ত হয় তাই ফাগুনকে ফোন না করে লাদেনের কাছ থেকে জেনে নিচ্ছিলাম খবরাখবর। লাদেনও ফাগুনকে বুঝতে দেয়নি। বলে দিয়েছিলাম, ‘ও লজ্জা পেতে পারে বন্ধুদের কাছে। বন্ধুরা ওকে খোকাবাবু বলে ঠাট্টা করতে পারে, সেজন্যেই এ গোপনীয়তা।’

সেই সাজেক অভিযান সেরে ফাগুন ঠিকই ফিরে এসেছিলো। আমাকে জানিয়েছিলো সেখানের অ্যাডেভেঞ্চারের কথা। কি যে উৎসাহ সে বর্ণনায়। এটা ওর উচ্চমাধ্যমিক শেষ হবার পর। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় ও সাথে চাকরিতে, তাও যে-সে চাকরি নয়, গণমাধ্যমের ইংরেজি বিভাগের সাব-এডিটর হয়েও ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরতে পারেনি ফাগুন। ইহসান ইবনে রেজা, যাকে চিনতো সবাই ফাগুন রেজা নামে। প্রতিভা আর প্রতিশ্রুতির এক অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে উঠা এক তরুণ গণমাধ্যমকর্মী। বাড়ি ফেরার পথে ছয় মাস আগে একুশে মে সে নিখোঁজ হলো। তাজা একুশের তরুণ, তার মৃতদেহ পাওয়া গেলো জামালপুরে, রেললাইনের ধারে। তাকে হত্যা করে ফেলে রাখা হয়েছিলো সেখানে। এত অল্প বয়সেই গণমাধ্যমে দৃষ্টি কাড়া এক নির্ভয়, প্রত্যয়ী গণমাধ্যমকর্মীর পথচলার সমাপ্তি ঘটেছিলো হন্তারকদের হাতে। 

ফাগুন রেজা হত্যাকাণ্ডের আজ ছয় মাস। আজও জানা যায়নি কেনো এবং কারা তাকে হত্যা করেছে। এখনো তদন্ত চলছে, এখনো ধরা পড়েনি সন্দেহভাজনদের প্রধান একজন। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, সেই প্রধান সন্দেহভাজন ধরা পড়ার পর হয়তো জানা যাবে হত্যার কারণ। আমরা আশায় বুক বেঁধে আছি। কিন্তু সে আশা পূরণ হচ্ছে কই?

দেশে একটার পর একটা হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া তার বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডেরই কোনো সুরাহা হয়নি। অসংখ্য অজ্ঞাত পরিচয় লাশের দাফন করেছে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম। কিন্তু সেসব লাশের বেশিরভাগের পরিচয় কিংবা হত্যার কারণ এখন পর্যন্ত জ্ঞাত হওয়া সম্ভব হয়নি। ফাগুন রেজাকেও একই ভাবে বেওয়ারিশ হিসাবে দাফনের প্রস্তুতি চলছিলো। ভাগ্য সহায় থাকায় আমরা জানতে পারি কবরে নামানোর ঠিক পূর্বমুহূর্তে। ফলে তাকে আর বেওয়ারিশ করা যায়নি। যদি করা সম্ভব হতো, তাহলে হয়তো আজকে আমাদেরও ফাগুনের ছবি হাতে ঘুরতে হতো দেশজুড়ে। নিখোঁজ হওয়া মানুষের স্বজনদের সাথে প্রেস ক্লাবে, রাজপথে কিংবা গুম দিবসের সেমিনারে কথা বলতে গিয়ে কান্নায় শ্বাস আটকে যেতো। অন্তত এটুকু থেকেতো বেঁচেছি, এটাই বা কম কিসে!

এ দেশে মৃত্যু একটা ছেলেখেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন কত বাবা-মা’র বুক খালি হচ্ছে তার ক’টার খবর জানে গণমাধ্যম। বিশেষ কিছু খবর প্রকাশ পায়। বিশেষ কিছু হত্যার ঘটনার প্রতিবাদ হয়। যেমন হয়েছিলো আবরার ফাহাদের। এরপরও কত ফাহাদ চলে গেছে, কোথাও কোনো টু শব্দটি হয়নি। এই তো সেদিন আমার জেলায় ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় দুজন তরুণ বিএসএফে’র গুলিতে প্রাণ হারালেন। তারমধ্যে একজন ছিলেন কলেজ পড়ুয়া। কি কান্না তার স্বজনদের, আহা! আমি বুঝি সে কান্নার কষ্ট। বুক ভেঙে বেড়িয়ে আসে সে জল। বলতে পারেন, কলজে নিংড়ে আসা স্রোত। যে স্রোত কখনো থামে না। বাবা-মা’র চোখের নদী ছুঁয়ে অনবরত বয়ে চলে। 

হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘রাহেলা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে বললেন, শুভ্রের জন্য আমার এই যে ভীতি, তোমার কাছে তা কি অস্বাভাবিক মনে হয়?’ এ প্রশ্নটা শুভ্রের বাবাকে করা। শুভ্রের বাবা’র হয়ে উত্তরটা আমিই দিয়ে দিই। ফাগুন যেদিন সাজেকে গিয়েছিলো, সেদিন আমারও প্রেশার বেড়ে গিয়েছিলো রাহেলা বেগমের মতো। সারারাত ঘুমাতে পারিনি। মনে হয়েছে এই বুঝি ছেলেটা কোনো বিপদে পড়লো। ঘরের মধ্যে রাতভর পায়চারি করেছি। এই ভীতি কি সত্যিই অস্বাভাবিক, না একদমই না। 

ফাগুনের শ্বাসের সমস্যা ছিলো। ওটা আমার দিক থেকেই পাওয়া। আমারও শ্বাসকষ্ট হয়। পাহাড়ের অতটা উপরে অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকে, ওর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় কিনা ভেবে আমারই শ্বাস আটকে আসছিলো বারবার। লাদেনকে বলেছিলাম ওকে জিজ্ঞেস করতে, ইনহেলারটা সাথে আছে কিনা। লাদেন জানিয়েছে, আছে। তারপরও আমার শ্বাসকষ্টটা কমেনি, সাথে অস্থিরতাও। মুশকিল হলো বাবাদের জন্য। মা’র কষ্টটা প্রকাশ করা খুব সহজ, কিন্তু বাবাদের মুখ শক্ত করে রাখতে হয়। ইচ্ছের বিরুদ্ধে হাসতে হয়, জোর করে হাসতে গিয়ে গালের পেশি ব্যথা হলেও। বাবাদের জন্য সব কিছু সহজ নয়, যতটা সহজ মা’দের জন্য। কষ্ট প্রকাশ না করার কষ্টটা যে কতটা কষ্টের, তা বাবা ছাড়া আর কারো বোঝার ক্ষমতা নেই। আহারে, বাবাগণ। 

মানুষ বলে, শোকের আয়ু নাকি ছয় মাস। কই, ফাগুন চলে যাবার ছয় মাস তো পুরা হলো। এই যে এখন, আজ রাতে লিখছি, মনে হচ্ছে পাশের রুম থেকে ও এখুনি মাথা বের করে বলবে, ‘আব্বুজি কি ঘুমিয়েছো?’ এখন রাত সোয়া একটা বাজে, বলবে, ‘চলো আব্বুজি চানাচুর বানাই। আমি পেঁয়াজ-মরিচ কাটছি, তুমি চানাচুর বের করো।’ তারপর সেই মাখানো চানাচুর খেতে খেতে নানা আলোচনা। কখনো দ্বিমত, আবার পরক্ষণেই মতৈক্য। কই ছয় মাসে তো কিছুই বদলালো না, বুকের ভেতর গুমোট বাঁধা কষ্টের দলাটি আকারে ক্রমেই বাড়ছে। কারা বলে শোকের আয়ু ছয় মাস! সন্তানহারা বাবা-মা’র শোকের কোনো আয়ু নেই। সেই শোক ক্রমেই পায় পরমায়ু। হয়তো বাবা-মা’র মৃত্যুর পর কবরেও ভর করে থাকে সেই শোক। হায়, শোক!

ফাগুন চলে যাবার আজ ছয় মাস পূর্ণ হলো। প্রতিটা দিন আমি গুণে রাখি। প্রতিটা দিন কেটে যায়, কথা বলি, কাজ করি হয়তো কখনো হাসিও। কিন্তু সে হাসি কতটা মেকি তা জানে শুধু অলখ নিরঞ্জন। যিনি সকলি জ্ঞাত, সে হোক গোপন বা প্রকাশ্য। তিনিই সর্বশক্তিমান। সকল ভরসার শেষ ভরসা। যে ভরসাতেই বেঁচে আছি এখনো, অন্তত এটা দেখে যেতে, যেনো ফাগুনের খুনিরা শাস্তি পায়। যাতে আর কোনো ফাগুনকে এভাবে চলে যেতে না হয়। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক, নিহত সাংবাদিক ফাগুন রেজার বাবা।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ফাগুন রেজা কাকন রেজা

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0763 seconds.