• ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ২০:২৭:২৫
  • ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ২০:২৭:২৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

পরিবহন আইন, সমস্যার মূলে যেতে হবে, নইলে সমাধান সম্ভব নয়

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


‘বেশি খেলে বদহজম হয়’, এটা প্রতিষ্ঠিত বিষয়। বেশি সব জিনিসই খারাপ, সেটা ভালো হলেও। সড়ক পরিবহন আইনটাও হয়েছে সে রকম। উন্নত বিশ্বে জরিমানা জাতীয় সব কিছু নির্ধারণ করা হয় মানুষের সঙ্গতির উপর ভিত্তি করে। আইন করা হয় আইনকে মানার মত করেই। বিশেষ করে লঘু কারণগুলোর ক্ষেত্রে।

একজন পথচারি, হয়তো সে ঢাকা বা শহরে প্রথম এসেছে। দরিদ্র একজন মানুষ, যে কিনা হতে পারেন মুদি দোকানদার, দোকান কর্মচারি কিংবা স্রেফ গৃহিনী অথবা কাজের বুয়া। রাস্তা পারাপারে অনিয়মের জন্য তাদের যদি ধরা হয় এবং জরিমানা করা হয়। আর সেটা যদি হয় সর্বোচ্চ বা তার কাছাকাছি তখন তার পক্ষে কি সেটা পরিশোধ সম্ভব? আর সম্ভব না হলে কারাদন্ডের বিধান তার জন্যে কি মানবিক বা নৈতিক ভাবে প্রযোজ্য?

সুতরাং এক্ষেত্রে সেই অভাগারা চেষ্টা করবে নিজেদের রক্ষা করতে। তারা খুঁজবে বিকল্প, আর সেটা নির্ঘাত অনৈতিক অর্থাৎ ঘুষ। সুতরাং সুচিন্তিত নয় এমন আইনও কখনো বেআইনি কাজে উৎসাহ দিতে পারে। 
একজন দোকান কর্মচারি, বেতন সাকুল্যে পনেরো হাজার টাকা। ষাট টাকা কেজি চাল, আর দেড়’শ টাকার পেঁয়াজের যুগে খুবই অপ্রতুল একটা অংক। হয়তো তিনি যাতায়াত সহজ করার জন্য কিস্তিতে কিংবা জমানো টাকা শেষ করে একটা মোটরসাইকেল কিনেছেন। মালিকের ধমকে তাড়াহুড়োয় বাড়ি থেকে বের হবার সময় হেলমেট পড়তে ভুলে গেলেন। রাস্তায় তাকে জরিমানা করা হলো, সেই সর্বোচ্চ বা তার কাছাকাছি, তখন সে কি করবে? সর্বসাকুল্যে পনেরো হাজারের চাকুরে, বিকল্প রাস্তা ছাড়া তার কি কোনো উপায় রয়েছে? ‘জীবী-বুদ্ধি’রা কি বলেন? 

একটা সত্য গল্প বলি, তাহলে এমন পরিস্থিতির একটা দিক কিছুটা খোলাসা হবে। এক বন্ধুজনের সাথে তার গাড়িতে যাচ্ছিলাম। কথা হচ্ছিল সড়কের বিষয় নিয়ে, সময়টা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরপরই। লাইসেন্স চেক করার বিষয়টি উঠতেই সেই বন্ধু বললেন, ‘দেখো আমি পিএইচডি করেছি, শিক্ষা-দীক্ষা কিছুটা হলেও তো রয়েছে। পিএইচডিতে উৎরে গেছি কিন্তু ড্রাইভিং পরীক্ষায় উৎরাতে পারিনি। অথচ আমার ড্রাইভারের লাইসেন্স রয়েছে। সে ঠিকই উৎরে গেছে মৌখিক সাথে লিখিত পরীক্ষাতেও। অথচ মজার ব্যাপার সে হলো টিপছাপ। তাহলে এই পরীক্ষা বা আমার পড়াশোনার মূল্য কী?’ আমার মুখের কথা থমকে গিয়েছিলো। কোনো জবাবই দিতে পারিনি সে বন্ধুকে।

যখন বলা হয়, রাস্তায় গরু ছাগল চিনলেই সে লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য, এমন কথা, তখন বলার আর কিছু থাকে না। সে অনুযায়ী লাইসেন্স চেক করার চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় সড়কে শৃংখলা ফিরিয়ে আনা। মহাসড়কে ব্যাটারি ও সিএনজি চালিত অটোরিক্সা চলাচল বন্ধ করা জরুরি। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাবে এসব অটোরিক্সা হরহামেশাই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। চাপা পড়ছে বাস বা ট্রাকের চাকার নিচে। এসব রিক্সার গতি এবং কাঠামো কোনটাই মহাসড়কের উপযুক্ত নয়। স্থানীয় ভাবে তৈরি ‘ভটভটি-নসিমন-করিমন’ সবের ক্ষেত্রে একই কথা। আর যারা এসব চালায় তাদের কথা বলার কিছু নেই।

দশ বছরের বাচ্চাকেও দেখা গেছে এসব চালাতে। এরপর মহাসড়কে পণ্য পরিবহনে চলে পাওয়ার টিলার যার প্রচলিত নাম ‘ট্রলি’। রাতে তো মহাসড়ক চরম বিপজ্জনক হয়ে উঠে এসব যানের জন্য। সামনে টিমটিমে একটি হেডলাইট, আর পেছরে বিশাল শরীর। মনে হয় মোটরসাইকেল বা ছোট কোনো যান, কিন্তু পাশ কাটাতে গেলে ধাক্কা লাগে বিশাল শরীর তথা বডি’র সাথে। বিশেষ করে আমাদের ময়মনসিংহ অঞ্চলের মহাসড়কগুলোতে এসব ‘ট্রলি’র চলাচল বেশি। এখন পরিসংখ্যান ঘেটে দেখুন কতজন এসব ট্রলিজনিত দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। ট্রাক্টরও মহাসড়কে পণ্য পরিবহনের কাজ করছে এবং তা যথারীতি বিপজ্জনক। এসব ‘ট্রলি’ বা ট্রাক্টরের চালকদের লাইসেন্স দেবেন কিসের ভিত্তিতে! অথচ তারাই মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

লাইসেন্সধারী একজন টিপছাপ চালক আর শিক্ষিত একজন লাইসেন্সহীন চালকের মধ্যে ফারাকটা যতদিন বুঝতে না পারা যাবে ততদিন লাইসেন্সের অনিয়ম থাকবে সাথে সড়কে শৃংখলাও ফিরবে না। একজন চালক রাস্তার ‘সাইনে’র লেখা পড়তে পারবে না, সে স্কুলের সামনে, না হাসপাতালের সামনে, চিহ্ন দেখে বুঝতে পারবে না, আইন পড়তে গেলে অজ্ঞান হয়ে যাবে, এমন কারো কাছে লাইসেন্স থাকলেই কি না থাকলেই কী! লাইসেন্স পাবার পদ্ধতিতে যে গলদ রয়েছে তা দূর করতে হবে। না হলে এই লাইসেন্স ‘চেকিং’ বেকার।

আরেকজন চালকের কথা বলি। সেও ‘টিপছাপ’। তাকে জিজ্ঞেস করলাম লাইসেন্স পেলেন কি করে? উত্তর, ‘স্যার ত্রিশ হাজার টেকা নিছে। আমি খালি ফিঙ্গার দিছি।’ ফিঙ্গার মান ফিঙ্গারপ্রিন্ট। অতএব বোঝেন অবস্থা। আমরা পুলিশকে দোষ দেই। পুলিশ কি লাইসেন্স দেয়ার অথরিটি? এমন লোককে লাইসেন্স দেবেন, পুলিশ জানে সে টিপছাপ, তার চালানো সঠিক নয়। অথচ লাইসেন্সতো দিয়ে দিয়েছেন, সেই লাইসেন্স সে পুলিশের নাকের ডগায় ঝুলিয়ে দেবে। তখন পুলিশ নিরুপায়। পুলিশকে দোষ দেয়ার আগে, সেই জায়গাটা বন্ধ করতে হবে।

মোটরসাইকেলের কথায় আসি। যখনি সড়কে কড়াকড়ি হয় তার ধাক্কাটা যায় মোটরসাইকেল চালকদের উপর দিয়ে। ছোট শহরগুলিতে সামান্য একটু পথ হয়তো যাবেন অনেকে হেলমেট মাথায় না দিয়েই যান। অথচ মোড়ে অভিযানের সমুখে পড়ে গেলেন মানে আটকে গেলেন। পরিসংখ্যান দেখেন ছোট শহরের মাঝখানে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা অনেকটাই দুর্লভ। অথচ আঞ্চলিক সড়ক বা হাইওয়েতে বেশি। সুতরাং হাইওয়েতে মোটরসাইকেলের হেলমেট এবং অন্যান্য বিষয়গুলোতে কড়াকড়ি হওয়া উচিত বেশি। বড় দুর্ঘটনা যা ঘটেছে তার সিংহভাগই হাইওয়েতে। সুতরাং হাইওয়েতে নজরদারি থাকলে এই দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। আরেকটি কথা, যারা মোটরসাইকেল চালান তাদের বেশিরভাগেরই রাস্তার ‘সাইন’ ও আইনের লেখা পড়া ও বোঝার ক্ষমতা রয়েছে। 

বাংলাদেশে বাস-ট্রাক-লরিগুলো হচ্ছে শিকারি, শিকার হচ্ছে মোটরসাইকেল সহ ছোট যানগুলো। আবার পরিসংখ্যানের কথা বলি, দেখুনতো কোন যানটি চাপা দিয়েছে, মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে কোন গাড়ির সাথে। ভালো করে দেখলে দেখবেন এরজন্যে দায়ি বড় গাড়িগুলো। সেসব গাড়ির ফিটনেস রয়েছে কিনা, সে গাড়ির চালক সত্যিই অষ্টম শ্রেণি পাশ কিনা, সে ‘সাইন’ বা আইন পড়তে বা বুঝতে পারে কিনা সেটা জানা জরুরি। সমস্যা সমাধান করতে হলে সমস্যার গোড়া থেকে ধরা উচিত, মধ্যভাগে ধরলে কাজের কাজ কোনটাই হয় না, উল্টো দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ে। 

আমাদের সড়কে শৃংখলা ফেরাতে হলে প্রথমে ভারী যানবাহনের চালকদের যোগ্যতার পরিমাপটা নিতে হবে। অযোগ্য কাউকে লাইসেন্স দিলে শাস্তি বা জরিমানা বৃদ্ধি তার উপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। সে চালানোর সঠিক কৌশল না জানায় দুর্ঘটনা ঘটাবেই। সুতরাং লাইসেন্স চেক করার চেয়ে কাদের লাইসেন্স দিয়েছেন সেটা দেখা উচিত। সে অনুযায়ী জরিমানা বা শাস্তি নির্ধারণের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় তাদের পুনর্বার পরীক্ষা নেয়া।

আর লাইসেন্স প্রাপ্তির বিড়ম্বনার জন্য ছোট গাড়ি বা নিজের গাড়ি যারা নিজে চালান তাদের অনেকেরই লাইসেন্স করার প্রতি একধরণের অনিহার সৃষ্টি হয়। এই অনিহার কারণগুলো দূর করতে হবে। কেনো অনিহা তার কারণ সবারই জানা। একজন পিএইচডি হোল্ডার পরীক্ষায় উৎরাতে পারেন না, একজন টিপছাপ যেখানে উৎরে যায়, সেই প্রক্রিয়ার অনিহার কারণ ব্যাখ্যা করে বলা লাগে না। সে কারণেই একজন চালক, সে লাইসেন্সধারী কিনা তারচেয়ে বেশি জরুরি সে ‘সাইন’ বা আইন পড়তে পারে কিনা। 

পরিসংখ্যান দেখে কোন চালকগণ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী, সেই চালকদের ত্রুটি কী সেটা বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোন ধরণের গাড়িগুলো দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে, কোন রাস্তাতে বেশি ঘটছে, হাইওয়ে না আঞ্চলিক সড়কগুলোতে, না শহরের মাঝের রাস্তায়, এসব বিবেচনায় প্রথমে সমস্যা নির্ধারণ করতে হবে, তারপর খুঁজতে হবে সমাধান। আবার বলছি, সমস্যা না বুঝে সমাধান বের করতে যাওয়া হবে দরকাঁচা কাজ। না হলে জরিমানা বা শাস্তি বাড়িয়েও কাজের কাজ কিছু হবে না। বরং জরিমানা দিতে অক্ষমরা খুঁজবে বিকল্প রাস্তা। আর সে বিকল্প অবশ্যই নৈতিক হবে না। 

পুনশ্চ : ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবিতে যারা জুতার মালা পড়াচ্ছেন, তাদের বলি, আপনারা আসলেই লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য নন। মানে, আপনাদের পেটে বিদ্যা বলতে কিছু নেই। ইলিয়াস কাঞ্চন সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বারবার চেষ্টা করছেন যেনো সঠিক মানুষের হাতে লাইসেন্স যায়। সঠিক গাড়িগুলো রাস্তায় নামে। সড়কের শৃংখলা নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। তিনি কাউকে ফাঁসিতে চড়াবার জন্য এগুলো করছেন না। মানুষ যাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে এটাই তার আন্দোলনের লক্ষ্য। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনও সেই লক্ষ্যেই। আপনি গাড়ির চালক, আপনার সাথে ইলিয়াস কাঞ্চন বা নিরাপদ সড়ক আন্দোলন করা বাচ্চাদের কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। 

যে দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। তাদের একজন ‘দিয়া’ ছিলেন, গাড়িচালক পিতারই সন্তান। সুতরাং চালক হলেই আপনার সন্তানটি সড়কে নিরাপদ সেই কথাটি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না। আপনার ভুলের জন্য যেমন অন্যের সন্তান বা প্রিয়জনের জীবন যেতে পারে, তেমনি আরেক চালকের ভুলের জন্য আপনার সন্তান বা প্রিয়জনের জীবনাবসান ঘটতে পারে।

ইলিয়াস কাঞ্চন যা করেছেন বা করে চলেছেন তা ইতিহাস একদিন মূল্যায়ন করবে। তিনি এসব করতে গিয়ে সবারই রোষাণলে পড়েছেন। কিন্তু দমে যাননি। ইলিয়াস কাঞ্চন সমস্যাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছেন, অন্তত এটুকু বলছেন, এ দেশের সড়ক নিরাপদ করতে হবে। এজন্যে অবশ্যই তিনি স্যালুট পাবার যোগ্য।

বিপরীতে যারা চিন্তার সঠিক ব্যবহার ছাড়া আইনের প্রণয়ন বা প্রয়োগের কথা ভাবছেন, তাদের চিন্তার পরিধিটি আরো বাড়াতে হবে। বেশি খেলে বদহজম নিশ্চিত, এটা মনে রেখেই অতিরিক্ত কিছু করা থেকে বিরত থাকাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। মূল সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে এবং তার ভিত্তিতেই ভাবতে হবে সমাধান। করে ভেবে লাভ নেই, ভেবে করতে হবে, এটাই মোদ্দাকথা।

ফুটনোট : ও আরেকটি বিষয় বাদ পড়ে গেছে, নগর-পরিকল্পনার কথা। শহরে যানজট কমাতে প্রয়োজন সঠিক নগর-পরিকল্পনার। যার একটি বড় অধ্যায় হলো শহরের রাস্তা অনুযায়ী গণপরিবহন বা পরিবহন চলাচলের ব্যবস্থা করা। কতটুকু রাস্তায় কতগুলো যানবাহণ চলতে পারে তা নির্ধারণ নগর-পরিকল্পনার বড় অংশ। আর সে অংশে ব্যর্থ হলে যানজট কমানো সম্ভব নয়। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাকন রেজা পরিবহন আইন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1572 seconds.