• বিদেশ ডেস্ক
  • ২৯ নভেম্বর ২০১৯ ১৫:৪৬:৩৯
  • ২৯ নভেম্বর ২০১৯ ১৫:৪৬:৩৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আরব বসন্ত কি ফিরে এসেছে?

ছবি : সংগৃহীত

লেবানন অভূতপূর্ব বিক্ষোভ প্রত্যক্ষ করছে, মনে হচ্ছে দেশটির প্রবাদতুল্য সাম্প্রদায়িকতা হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে। একই ধরণের বিক্ষোভের খবর জানা যাচ্ছে ইরাক, মিশর, সুদান, আলজেরিয়া, মরক্কো এবং তিউনিসিয়া থেকেও। এসব উত্থানের পেছনে একটা কমন যোগসূত্র লক্ষ্য করা যায়- ভঙ্গুর অর্থনীতি, সামাজিক-রাজনৈতিক দুর্দশা, সহিংসতা, নিপীড়ন এবং অযোগ্য সরকারগুলোর দুর্নীতি।

তো, আরব বিশ্ব এবং এর প্রতিবেশী অঞ্চলে হওয়া উত্থানগুলো কি ফিরে আসছে? অথবা আরো নির্দিষ্ট করে বললে এগুলো কি নতুন করে ফিরে আসার জন্যই কোথাও চলে গিয়েছিল? আপাতদৃষ্টিতে দেখতে তাহরির স্কয়ারের বৃহত্তর বিক্ষোভের গৌরবময় দিন-রাতগুলোর অনুরূপ এই উত্থানগুলোকে আমরা কিভাবে পাঠ করব?

অতীত ফিরে দেখা

আল জাজিরার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারাকে আমি তার অগ্রগণ্য বই 'দ্য ইনভিসিবল আরব: দ্য প্রমিজ এন্ড পেরিল অব দ্য আরব রেভ্যুলিউশনস ইন ২০১২' প্রকাশের পর জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে এমনটা মনে করে কিনা যে আরব বিশ্ব এমন এক জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যেখান থেকে তার আর পেছনে ফিরে আসার সুযোগ নেই? তার প্রতিক্রিয়া ছিল স্পষ্টভাবে হ্যাঁ বোধক।

এরপর আরব দুনিয়া এবং এর বাইরে অনেক কিছুই ঘটে গেছে। দুটি  প্রতিবিপ্লবী শক্তি আরব বসন্তকে লাইনচ্যুত করার চেষ্টা করেছে: একদিকে ছিল আমেরিকা ও ইসরায়েলের মদদপুষ্ট আঞ্চলিক স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলো, অন্যদিকে তাদের ভূরাজনৈতিক কৌশলের সন্তান ইসলামিক স্টেট (আইসিস)। এই দুটি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি আরব বিদ্রোহের চেতনাকে দমিয়ে রাখতে সর্বনাশ ঘটিয়েছে।

গত কয়েক বছরে দৃশ্যত তারা সফল হয়েছে হেডলাইনগুলো এবং মানুষের দেখার দৃষ্টিকে পাল্টে দিতে-লক্ষ লক্ষ মানুষের রাস্তায় এবং স্কয়ারগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করা থেকে সহিংস দলগুলোর সামরিক দুর্গের দখল নেয়ার দিকে।

তারা গণজাগরণগুলোকে সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে ঢেকে দিয়েছে। তারা বিদ্রোহী জাতিগুলোর উত্থানের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টি করেছে তাদের বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরার মাধ্যমে। রক্তক্ষয়ী অভিযানগুলোকে বৈধতা দেয়ার জন্য তারা 'অভিবাসন' ও 'সন্ত্রাসবাদ'র মত ভীতিপ্রদ শব্দ দিয়ে পুরো বিশ্বকে ব্লাকমেইল করেছে। তারা এটা প্রতিষ্ঠা করেছে যে স্থিতিশীলতা অর্জন হতে পারে কেবল কঠোরভাবে দমনের মধ্য দিয়ে।

কিন্তু নৈতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তব পরিস্থিতি এ জাতীয় সকল ষড়যন্ত্রকে নস্যাত করে দিয়েছে। বেশিদিন হয়নি এ অঞ্চলের জনতা মিশর বিপ্লবের স্লোগান - 'রুটি, স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার'- নিয়ে রাস্তায় ফিরে এসেছিল।

এখানে আরো বড় কোন প্যাটার্ন কাজ করছে কি?

যখন থেকে আন্দোলনের এই নতুন ঢেউগুলো জেগে উঠেছে তখন থেকেই এগুলোকে স্থানীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অথবা স্থানীয় প্রবণতা অনুসারে ব্যাখ্যা করার বহু ধরণের প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে।

একইধরনের আন্দোলন পৃথিবীর বহু জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং অপদার্থ সরকারগুলোর কঠোর পদক্ষেপের মুখোমুখি হয়েছে। চিলি, ইকুয়েডর, আর্জেন্টিনা এবং ল্যাটিন আমেরিকার অন্যান্য জায়াগায় অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা জনগনকে রাস্তায় নামিয়ে এনেছে।

নিউইয়র্ক টাইমসে ডেকলান ওয়ালশ এবং ম্যাক্স ফিশার দেখান, চিলি থেকে লেবানন সবজায়গায়ই জনক্ষোভের পিছনে রয়েছে অর্থনৈতিক সংকট। তারা ধারণা দেন, পকেটবুক আইটেমগুলোই সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সারাবিশ্বে জনরোষের অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

কিন্তু এসব বিপ্লবী উত্থানের সাথে এমন সহজসরল যোগসূত্র দেখানো এগুলোকে ভুলভাবে পাঠ করার ঝুঁকি তৈরী করে। ব্যাখ্যা প্রদানের বৈশ্বিক প্রবণতার দিকে ঝুঁকে পড়ার আগে আঞ্চলিক ইতিহাসকে আমাদের আরো বেশি বিবেচনায় নেয়া উচিত।

এখানে সাংবাদিক ইসমাইল কুশকুশ ও প্রখ্যাত আরব বসন্ত বিশ্লেষক গিলবার্ট আচকারদের মত ব্যক্তিদের অন্তর্দৃষ্টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যারা আরব বসন্তের গতিধারা নিবিড়ভাবে অনুসরণ করেছেন। এখনো তাদের প্রয়োজনীয় ও সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ অপর্যাপ্ত।

উন্মুক্ত বিপ্লব

আরব বসন্তের উপর ২০১১ সালে আমার লেখা একটি বইতে আমি এসব উত্থানকে পাঠ করতে দুটি আন্তঃসম্পর্কিত আইডিয়াকে পথনির্দেশক নীতি হিসেবে নিতে প্রস্তাব করেছি: উন্মুক্ত (সর্বাত্মকের বিপরীতে) বিপ্লব, এবং বিলম্বিত (নিঃশেষিত হওয়ার বিপরীতে) বিদ্রোহ।

ইতিহাসবিদরা যেটাকে রেফারেন্সের দীর্ঘমেয়াদী কাঠামো হিসেবে অভিহিত করেন, এসব উত্থানকে লাইনচ্যুত করতে প্রতিবিপ্লবী শক্তির সফলতা কেবল একটা ক্ষণস্থায়ী আঘাত মাত্র।

আরব (এবং অন্যান্য বিশ্বের) বিপ্লবের মৌলিক ও কাঠামোগত কারণগুলো একই রয়ে গেছে এবং এগুলো ব্যাহত করার জন্য তৈরি ক্ষণস্থায়ী প্রতিক্রিয়াশীল স্ট্র্যাটেজিকে ছাড়িয়ে যাবে।

মুক্ত-বিপ্লবের ধারণা নিজেই উত্তর উপনিবেশী রাষ্ট্র গঠনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিকে অতিক্রম করে গেছে।
এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার সমস্ত দিক এবং আরব ও মুসলিম বিশ্বের এসব উপনিবেশ উত্তর রাষ্ট্রগুলো তাদের অস্তিত্বের যৌক্তিকতা ও বৈধতা হারিয়েছে।

১৯৬৩ সালে আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লবের তুলনা করে রাজনৈতিক দার্শনিক হান্না অ্যারেন্ড 'অন রেভ্যুলেশন' নামে একটি বই লিখেন। এতে তিনি বিপ্লবগুলোর ব্যাপারে একটা স্থায়ী অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছিলেনঃ এসব উত্থান জনসাধারণের সুখের কারণ। আমি বিশ্বাস করি আমরা আজ আরব বিশ্বজুড়ে অবাধ্য বিপ্লবীদের যে হাসি মুখগুলো দেখছি সেটা এই অন্তর্দৃষ্টির স্থায়ীত্বকেই দেখায়।

উন্মুক্ত-বিপ্লব এবং সর্বজনের সুখের ধারণা আমাদের নিয়ে যায় বিলম্বিত বিদ্রোহের ধারণার দিকে। নিপীড়ক রাষ্ট্র এবং তাদের বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের বিরোধিতা --মিশরে সামরিক জান্তা এবং তাদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলী সমর্থক অথবা বাশার আল আসাদ এবং তার রাশিয়ান ও ইরানি সমর্থকদের কথা ভাবুন-- আরেকটি নিপীড়ক রাষ্ট্র দিয়ে দমিয়ে দেয়া যায় না।

পুরনো ধাঁচের বিপ্লবের কেন্দ্রে থাকা শক্তিশালী রাষ্ট্রের হাতে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পনার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রাখার নীতির প্রাসঙ্গিকতা এবং বৈধতা বহু আগেই হারিয়ে গেছে। আমরা এখন যা প্রত্যক্ষ করছি তা হলো বিলম্বিত বিদ্রোহ অব্যাহত রাখার ধারাবাহিক সমন্বয়, উন্মুক্ত বিপ্লব, এবং জনসাধারণের সুখ যেটার বৈপ্লবিক সম্ভাবনা একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির চেয়ে অনেক বেশি স্থায়িত্বশীল।

২০১২ সালে মারওয়ান বিশারা ও আমার কাছে যা পরিস্কার ছিল পরবর্তীকালের ঘটনাগুলো সেটাকে নিশ্চিত প্রমাণ করেছে। বহুজাতিক উত্থানগুলো দমাতে রাষ্ট্র শক্তিগুলো যেভাবে নগ্ন বর্বরতা চালিয়েছে তাতেই পরিষ্কার হয়ে গেছে যে তারা চূড়ান্তভাবে টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।

আরব ও মুসলিম বিশ্ব আজ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার নতুন পরীক্ষা চালানোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যাকে আর কোনো রাষ্ট্রযন্ত্রের নকল নির্বাচনের নাটক মঞ্চস্থ করে বোকা বানানো যায় না। বৈশ্বিক অবয়বে গণতান্ত্রিক প্রদর্শনী ভারতে (পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র) হাজির করেছে রক্তপিপাসু হিন্দু ধর্মান্ধতা এবং আমেরিকায় (পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো গণতন্ত্র) ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুর্নীতিগ্রস্ত ও হাস্যোদ্দীপক রিয়ালিটি শো অথবা ব্রিটেনে বিরক্তিকর ও বস্তাপচা ব্রেক্সিট।

গণতন্ত্রের এসব ঐতিহাসিক ব্যর্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে পৃথিবীর শেখার কিছুই নেই। বিশ্ব অবশ্যই -এবং বিস্তৃত হওয়া আরব বিপ্লবগুলোতে- জাতিগুলোর সম্পূর্ণ আলাদা গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার চর্চা প্রত্যক্ষ করবে। বিলম্বিত বিদ্রোহ পদ্ধতিগত ও ধারাবাহিকভাবে এই জাতীয় আকাঙ্খাকে সার্বভৌমত্বের জন্য শক্তিশালী করবে এবং সমান পদক্ষেপে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রগুলোকে দুর্বল করবে যা এখন কেবল হত্যার মেশিন হিসেবে কাজ করছে।

হামিদ দাবাশি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইরানিয়ান স্টাডিজ ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক।

মূল লেখক : হামিদ দাবাশি। আল-জাজিরা থেকে ভাষান্তর করেছেন হাসান আল মাহমুদ।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

আরব বসন্ত

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1780 seconds.