• ০১ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৫:৩৭:২৬
  • ০২ ডিসেম্বর ২০১৯ ১১:৫৩:১৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

হায় গণমাধ্যমকর্মী, হেনস্থা থেকে হত্যার শিকার যারা

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


গণমাধ্যমকর্মীদের অবস্থা কী তা আমার থেকে ভালো আর কেউ বোঝে না। পিতা হিসেবে সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়েছি আমি। নিজে গণমাধ্যমকর্মী হয়ে গুপ্তহত্যার শিকার আমার নিজ সন্তান, যে কিনা ছিলো নিজেও গণমাধ্যমকর্মী, তাকে নিয়ে অনেকবার লিখতে হয়েছে। একজন পিতা ও একজন সাংবাদিক হিসেবে এরচেয়ে বড় যাতনার আর বোধহয় কিছু নেই। এই যাতনাবোধ থেকেই গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি যখন অন্যায় হয়, তখনই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে মন ও মনন। যে কারণে অতি পরিচিত আরেক তরুণ গণমাধ্যমকর্মীর হেনস্থা দেখে না লিখে থাকতে পারলাম না।

জাকির হোসেন তমাল। পরিচয় এনটিভি অনলাইন থেকে। এখন তিনি কাজ করছেন দৈনিক আমাদের সময়ে। যথারীতি ভালো করছেন যিনি গণমাধ্যমে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। নভেম্বর শেষ দিনটিতে ছিলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাদশ সমাবর্তন। সুভিনিয়রে নাম ও ছবি ছাপা হয়েছিলো যথারীতি তমালের। তারপরেও তার সমাবর্তনে অংশ নেয়া হয়নি।

সুভিনিয়রের নাম ও ছবি দেখে নিশ্চিত হয়ে গাউন ও সার্টিফিকেট আনতে যান জাকির হোসেন তমাল। গন্ডগোলটা বাধে সেখানেই। সেখানে গিয়ে দেখেন তালিকায় তার নাম নেই। রেজিস্টার, প্রক্টর অফিস ঘুরেও কারো কাছ থেকে নাম না থাকার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি তিনি।

তবে, কারণ যে নেই তাও নয়। তমাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য এর ফোনালাপসহ কয়েকটি অনিয়মের বিষয় নিয়ে লিখেছিলেন। যা প্রকাশ হয়েছিলো যথারীতি। এটাই ছিলো তার প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কারো উষ্মার কারণ। তার খবরগুলো যথার্থ ছিলো বলেই সে খবরের মুখোমুখি হতে সাহস পায়নি প্রশাসনের সে বা সেসব ব্যক্তিরা। পেছনের দরোজার ব্যবহার করেছেন তারা। আর পেছনের দরোজার ব্যবহার সৎ মানুষের জন্য নয়।

একজন সৎ গণমাধ্যমকর্মীকে যখন খবরে মোকাবেলা করা যায় না, তখন তাকে থামিয়ে দিতে কিংবা তার উপর শোধ নিতে পেছনের রাস্তার ব্যবহার করে অসৎ মানুষগুলো। যেমন আমার ক্ষেত্রে এবং আমার সন্তানের ক্ষেত্রে হয়েছে। কদিন আগে প্রদীপ দাস নামে তরুণ আরেক গণমাধ্যমকর্মী আক্রান্ত হয়েছিলেন। এমনসব আক্রান্ত হবার কাহিনি বলতে গেলে দিন ফুরিয়ে যাবে। অথচ এসবের কোনো প্রতিকার নেই। 

গণমাধ্যমকর্মীদের হত্যা, আহত করার বেশ কিছু ঘটনা রয়েছে সাম্প্রতিককালেই। লাঞ্ছিত বা প্রতিশোধ প্রবণতার ঘটনাও রয়েছে গণমাধ্যমকর্মীদের বিপরীতে। জাকির হোসেন তমাল তার সাম্প্রতিক উদাহরণ। উদাহরণের এই ঘনঘটা থামার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই। কেনো নেই এ প্রশ্ন্ট সঙ্গতই এসে যায়। সাগর-রুনির কথাই বলি, ঊনসত্তর বার পিছিয়েছে সেই হত্যা মামলার প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি। এখনো জানা যায়নি, কেনো তাদের হত্যা করা হয়েছে। যেমন গুপ্তহত্যার ছয় মাস পেড়িয়ে গেলেও তরুণ গণমাধ্যমকর্মী ইহসান ইবনে রেজা ফাগুনের হত্যাকান্ডের কারণ উদঘাটন সম্ভব হয়নি। ফাগুনের হতভাগ্য পিতা আমিই। একজন গণমাধ্যমকর্মীর সন্তান, যে কিনা নিজেও গণমাধ্যমকর্মী ছিলো, সে গুপ্তহত্যার শিকার হবার পরও গণমাধ্যমের আত্মস্বীকৃত অনেক মাথাকেই নড়তে দেখা যায়নি। এসব মাথা নিজ স্বার্থের বিপরীতে কোনো হত্যা, আহত আর লাঞ্ছিত হবার ঘটনায় মাথা নাড়ায়নি। কেন নাড়ায়নি, সে প্রশ্নটা করছি না। উত্তর জানা বিষয়ে প্রশ্ন করতে নেই। 

জানি, জাকির হোসেন তমালের এমন হেনস্থাতেও তেমন মাথা নাড়াবে না কেউ। অনেকেই সাগর-রুনি কিংবা ফাগুনের উদাহরণ টেনে বলবে, ‘যেখানে হত্যার বিচারই অধরা, সেখানে আপনার এই সামান্য হেনস্থা, এ আর এমন কী!’ অথচ এমন সামান্য ঘটনাগুলো সামাল না দিতে পারার পরিণতিই আহত ও নিহত হবার পর্যায়টি। হেনস্থা বা লাঞ্ছনাকে ‘টেস্ট কেইস’ হিসাবে শুরু করেছিলো অসৎ মানুষগুলো, সেগুলোর জোরালো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ না হওয়ায় তা আজ আহত-নিহতের পর্যায়ে এসেছে। 

কথা হচ্ছিল গণমাধ্যমের একজন সম্পাদকের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘এখন আর কেউ ভয়ে খবর করতে চায় না।’ আরেকজন সম্পাদক বললেন, ‘ভাই আমরাতো এখন মূলত প্রেসনোট ধাঁচের খবর দিচ্ছি। গণমাধ্যমকর্মীরা খবর করতে চায় না। নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব হয় না বলে, আমরাও চাপ দিতে পারি না।’ উদাহরণ স্বরূপ তিনি বেশ কটি ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন সেদিনের আলাপচারিতায়। 

বিবিসি বাংলাও কদিন আগে এ ধরণেরই একটি প্রতিবেদন করেছে। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামও অকপট স্বীকারোক্তি করেছেন ‘সাংবাদিকতা এখন বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি’, এমনটা বলে।  বিশ্বের অনেক দেশেই সাংবাদিকদের কাজ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি এনআরসি বিষয়ে আসামে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষেধ করেছে সেখানের রাজ্য সরকার। দক্ষিণ এশিয়াতে গণমাধ্যমকর্মীদের কাজ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

মূলধারার গণমাধ্যমের স্বাধীন প্রকাশের জায়গা সংকুচিত হওয়ায় ‘নাগরিক সাংবাদিকতা’র আধিক্য বেড়েছে। মানুষ গণমাধ্যম ছেড়ে ঝুঁকে পড়েছে সামাজিকমাধ্যমের প্রতি। নাগরিক সাংবাদিকতার সুফল আর কুফল দুটোই রয়েছে। মূলধারার গণমাধ্যম খবরের ক্ষতিকর অংশটি বাদ দিয়ে প্রকৃত ঘটনাটি পৌঁছে দেয় মানুষের কাছে। অর্থাৎ একটি সম্পাদিত খবর পায় মানুষ। অথচ নাগরিক সাংবাদিকতায় এই সম্পাদনার বিষয়টি নেই। ফলে সেই সামাজিকমাধ্যমের তথ্যে ভালো ও খারাপ দুটোই প্রচারিত হয় এবং দুটোরই প্রভাব পড়ে। অথচ মূলধারার গণমাধ্যম নির্ভয় হলে খারাপ দিকটা ছেটে দেয়া সম্ভব হতো।

সহজ উদাহরণ দিই। আমরা যারা গণমাধ্যমে সম্পাদনার কাজ করি, তারা সাধারণত ধর্ষণের খবরের ধর্ষিতার নাম এবং তার স্বজনদের নাম উল্লেখ করি না। এর কারণ তাকে যেনো সামাজিক ভাবে অসম্মানের সম্মুখিন না হতে হয়। কিন্তু নাগরিক সাংবাদিকতায় এর বালাই নেই। সেখানে ধর্ষিতার নাম এমনকি ছবিও প্রকাশিত হচ্ছে। কখনো বা ধর্ষণচিত্রও এসে যাচ্ছে সামাজিকমাধ্যমগুলোতে। যার ফলে ধর্ষণের খবরটির সাথে ধর্ষিতাও সামাজিকভাবে আরেকবার ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। অথচ মূলধারার গণমাধ্যম সেটি করতো না। তারা জানে কতটা দেয়া উচিত, কতটা না।

সুতরাং নির্ভয় গণমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে। এই যে, এত দুর্নীতির চিত্র এখন সহসাই বেরুচ্ছে, এটা কি আগে জানতো না গণমাধ্যমকর্মীরা, জানতো। কিন্তু ওই যে ভয়, তা তাদের এসব ঘটনা প্রকাশ করতে দেয়নি। আর কেউ কেউ ‘ঝাঁকের কই’ ঝঁকে মিশে গিয়েছেন। অর্থাৎ অন্যায়ের সাথে আপোষ করেছেন। যারা আপোষ করেননি, তাদেরই সইতে হয়েছে লাঞ্ছনা। হতে হয়েছে হেনস্থার শিকার। কেউ আহত হয়ে হাসপাতালে গেছেন। কেউ নিহত হয়ে কবরস্থানে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0223 seconds.