• ০১ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৭:৪৬:১৮
  • ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৫:০৩:২২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

প্রথম পর্ব

‘চীন-ভারতের ঠাণ্ডা লড়াইয়ে বাংলাদেশ দুদেশেরই সঙ্গী-সাথী’

ফাইল ছবি

এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের প্রায় ৭০টি দেশের সাথে জলে-স্থলে সড়ক, রেল ও নৌ পথ তৈরি করার পরিকল্পনা করছে চীন। যাকে ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ (ওবর) বলা হয়। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন ২০১৩ সালে ওবর’র উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যদিও যুক্তরাষ্ট ও ভারত ওবর’র তীব্র বিরোধীতা করছে।

এদিকে চীনের ওবর’কে স্বাগত জানিয়ে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। ধারণা করা হচ্ছে ওবর বাস্তবায়িত হলে বদলে যেতে পারে বিশ্ব ব্যবস্থার গতিপথ। তাই চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ (ওবর) নিয়ে বাংলা’র সাথে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। তিন পর্বের এই সাক্ষাৎকারের আজ প্রকাশ হলো প্রথম পর্ব। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বাংলা’র নিজস্ব প্রতিবেদক নূর সুমন

বাংলা : চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ (ওবর) পরিকল্পনাকে আপনি কিভাবে দেখছেন? 

ড. তানজীমউদ্দিন খান: চীনের এই পরিকল্পনাকে দুই ভাবে দেখতে হবে। একটা হলো তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতা আর অন্যটি তাদের বৈশ্বিক আকাঙ্ক্ষা।

চীনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রপ্তানি আয় মূল ভূমিকা পালন করেছে। এই দুই স্তম্ভের উপর ভিত্তি করেই তারা এখন উদ্বৃত্ত মূলধনের রাষ্ট্র। অন্যদিকে চীন ১৯৯০ এর দশক পর্যন্ত যে সব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে, তা মূলত উপকূলীয় অঞ্চলকেন্দ্রিক। ফলে চীনের উপকূলীয় অঞ্চলের তুলনায় চীনের অ-উপকূলীয় অভ্যন্তরীণ পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৯ সালে চীন ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে এই অঞ্চলগুলোর অবকাঠামোগত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যা গ্রেট ওয়েস্টার্ন ডেভাল্পমেন্ট স্ট্যাটেজি নামে পরিচিত।

ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’র মাধ্যমে এই অঞ্চল যোগাযোগ অবকাঠামোতে সংযুক্ত হবে, এশিয়া, আফ্রিকা আর ইউরোপের সাথে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য। আর যেহেতু চীনের বাড়তি মূলধন রয়েছে, তা বিনিয়োগ করতে পারবে অবকাঠামো নির্মাণে। এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী এশিয়াতে বর্তমানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার জন্যে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বছরে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। যেটার ক্ষমতা আসলে এখন চীনেরই আছে।

আগে অবকাঠামোগত উন্নয়ন অর্থায়নে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বিশ্ব ব্যাংক। এখন কিন্তু অবকাঠামো উন্নয়নে তাদের বিনিয়োগ অনেক কমে এসেছে। এডিবি’র ক্ষেত্রে সম্ভবত আমি যদি ভুল না করি, সেটা এক সময় ৭০ ভাগ ছিলো, যেটা এখন ১০ ভাগে নেমে এসেছে। তাই ওবর চীনের জন্যে বাড়তি মূলধন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে। উপরন্তু অর্থনৈতিকভাবে বিকাশমান অঞ্চল হিসেবে এশিয়া এখন সবচাইতে বেশি সম্ভাবনাময় এবং আকর্ষণীয়।

আর একটা দিক হচ্ছে, ২০১৫ সালের দিকে যদি খেয়াল করি, তাহলে দেখবো যে, সেই সময় ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করার সময় চাইনিজ প্রিমিয়ার লি কে কুয়ান নিশ্চিত করেন - চীনের লক্ষ্য হচ্ছে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মতৎপরতায় ‘বৈশ্বিক হবে’। তার মানে হলো, চীন তার সনাতনী খোলস ছেড়ে প্রভাব বলয়ের দিক থেকে বৈশ্বিক হয়ে উঠবে অদূর ভবিষ্যতে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই চীনের ব্যবসা, নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো বাইরের দেশগুলোতে অবকাঠামো নির্মাণে বিদেশি কম্পানিগুলোর সাথে অংশীদারিত্বে লিপ্ত হচ্ছে। ওবর এদিক থেকে চীনের জন্য কৌশলগত সুবিধাও নিশ্চিত করছে।

একইভাবে চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং ওবর নিয়ে বিভিন্ন কনফারেন্সে আলোচনার কিংবা তার উপস্থিতির মধ্য দিয়ে একটা বিষয় নিশ্চিত করতে চাচ্ছেন, ‘এশিয়া ফর দ্য এশিয়ানস্’। অর্থাৎ, চীন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সাথে এশিয়া অঞ্চলে তার সামরিক ও কৌশলগত আধিপত্য নিশ্চিত এবং একটা প্রভাব বলয় তৈরি করতে চাইছে। যার ফলে ওবর’কে বুঝতে গেলে যেমন চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিতে হয়, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে চীনের ‘গ্লোবাল’ হওয়ার লক্ষ্য এবং এশিয়াতে সামরিক-কৌশলগত প্রভাব বলয় তৈরি করার প্রচেষ্টা।

বস্তুত ওবর’র চারটা অবকাঠামোগত স্তম্ভের মধ্যে একটি হলো জ্বালানি-পরিবহন অবকাঠামো। জ্বালানি-পরিবহন অবকাঠামো ওবর’কে একটা ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে যা এর সামরিক কৌশলগত গুরুত্বও নিশ্চিত করেছে। অন্য স্তম্ভগুলো হলো সমুদ্র পথ, সড়ক পথ আর আকাশপথে অবকাঠামোগতভাবে যোগাযোগ সংযুক্তি।

বাংলা : এই সময়ে এসে চীন কেন এই ধরণের একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করলো বা এর পিছনে কি কারণ থাকতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

ড. তানজীমউদ্দিন খান: উচ্চাভিলাষীতো নিশ্চয়ই। তবে এটা হলো চীনের বাইরে আমাদের কাছে উচ্চাভিলাষী। সব কিছুর পরও ওবরের গুরুত্বকে খাটো করে দেখার অবকাশ নাই। কারণ চীনের যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে তাদের যে উদ্বৃত্ত মূলধন - যেটা আমি প্রথমেই বলেছিলাম - তা তো বিনিয়োগ করতে হবে। অবকাঠামোগত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আবার চীনের কিছু বৈশিষ্ঠ্য মনে রাখা প্রয়োজন। যে সব জায়গায় চীন অবকাঠামো উন্নয়নে সংম্পৃক্ত হচ্ছে, সেই দেশগুলোকে চীনের প্রযুক্তি যেমন ব্যবহার করতে হয়, তেমনি মোটাদাগে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, শ্রমিকও সেই দেশের। তাই এই ধরণের অবকাঠামো নির্মাণ শুধু তাদের বিনিয়োগের নতুন খাত নয়, বিদেশে তাদের শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের একটি বড় খাতও বটে।

উপরন্তু চীন তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দেশীয় উন্নয়নের এমন এক পর্যায়ে চলে এসেছে, তাতে তাদের উদ্বৃত্ত মূলধন বিনিয়োগে নতুন নতুন খাত অনুসন্ধান করা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে গত কয়েকবছর ধরে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি উত্তরণের জন্যে চীন অনেক বেশি তৎপর তাদের নেতৃত্বে অবকাঠমোগত উন্নয়নকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার জন্য। তাই চীন অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যেমন এশিয়ান ইনফ্রাষ্ট্রাকচার ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংক ও নিউ ডেভাল্পমেন্ট ব্যাংকও গড়ে তুলেছে।

এসবের মধ্য দিয়ে চীন যে বিনিয়োগটা করছে, তা তো হচ্ছে ঋণ। ওবর প্রকল্পের যারা আওতাভুক্ত হচ্ছে, তারা তো চীন থেকেই বাণিজ্যিক শর্তেই ঋণ নিচ্ছে বা নিবে। এই ঋণের মাধ্যমে চীন তো তার নিজের বিনিয়োগের লাভটা নিশ্চিত করতে পারছে। এর মধ্য দিয়ে চীন সামরিক কৌশলগত সুবিধাটাও তৈরি করছে। তাই চীন প্রকাশ্যে দাবি করুক বা না করুক, ওবরের সামরিক কৌশলগত গুরুত্বকে আলোচনার বাইরে রাখা যায় না। অন্য কথায়, অর্থনৈতিক স্বার্থকে নিরাপদ রাখতে হলে চীনের পক্ষ থেকে ওবরের সামরিকায়নের সম্ভাবনাকে একেবারে নাকচ করে দেয়া যায় না।

বাংলা : প্রতিবেশী দেশ ভারত শুরু থেকেই এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে আসছে- এর কি কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন?

ড. তানজীমউদ্দিন খান: এক কথায় বলতে গেলে চীনকে নিয়ে ভারতও খুব আশঙ্কাগ্রস্ত। এর যথেষ্ট কারণ আছে। কেননা চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বলয় মোটাদাগে এশিয়ামুখী। তার উপর দক্ষিণ এশিয়া হলো চীনের প্রতিবেশী অঞ্চল। চীনের সাথে সীমান্ত অঞ্চল রয়েছে ভারত, নেপাল, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের। বাংলাদেশও খুব দূরে নয়। তাই একদিকে চীনের যেমন অঞ্চলভিত্তিক প্রভাব বলয় তৈরির প্রচেষ্টা আছে, ঠিক একইভাবে চীনের একটি বিশ্বশক্তি হয়ে ওঠার প্রবণতাও রয়েছে। অন্যদিকে ভারতও আঞ্চলিক ও বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এই দুই দেশের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আকাঙ্ক্ষাগত দিক একই রকম হওয়ায় তারা একে অপরকে নিয়ে আশঙ্কাগ্রস্ত। তাই কোনো কোনো পর্যায়ে ভারত-চীনের মধ্যে যেমন তুমুল সহযোগিতা বিরাজ করলেও দেশ দুটি নিজেদের মধ্যে চরম প্রতিযোগিতাতেও লিপ্ত।

বিশেষ করে ওবর’র চারটি করিডোর নিয়েই ভারতের উদ্বেগটা অনেক বেশি। যদিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীনের এই প্রবণতাকে লক্ষ রেখে পররাষ্ট্রনীতিতে ‘প্রতিবেশীই প্রথম’ নীতি গ্রহণ করেছেন। আমরা অর্থনৈতিক বা অবকাঠামোর ক্ষেত্রে চীনের যে বিনিয়োগের বিস্তৃতি দেখছি, তার শুরুটাও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে ঘিরে। এই দু’দেশেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উপর তাদের নিজেদের প্রভাব বলয়টা নিশ্চিত করতে চাইছে। এই কারণেই ওবর’র চারটা করিডোর নিয়ে ভারত খুবই উদ্বিগ্ন। সেগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মায়ানমার ইকোনমিক করিডোর, চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর, ট্রান্সহিমালয়ান ইকোনমিক করিডোর যা শুরুতে ছিলো চীন-নেপালকে ঘিরে এবং মেরিটাইম সিল্ক রোড।

এর মধ্যে মেরিটাইম সিল্ক রোড ভারতের জন্যে বেশি স্পর্শকাতর। কেননা ভারত মহাসাগরের উপর     ভারতের নিয়ন্ত্রণ জরুরি তাদের আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য। আবার ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব চীনের কাছে, মালাক্কা প্রণালীর জন্যে। কেননা মালাক্কা প্রণালী চীনের বাণিজ্য ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান নৌপথ। চীনের ভয় ভারত বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরণের দ্বন্দ্বের আবির্ভাব হলে মালাক্কা প্রণালীকে ঘিরে সামরিক সংকট তৈরি হতে পারে। তাই অনেকে মনে করেন, এই সংকট যেন ভবিষ্যতে না দেখা দেয়, সেজন্য চীন এই মেরিটাইম সিল্ক রোডের ধারণাটা সামনে এনেছে। এর মাধ্যমেই ভারত মহাসাগরে তাদের আধিপত্য সম্ভব।

ঠিক একইভাবে সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে চীন যে অবকাঠামো গড়ে তুলছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘ষ্ট্রিং অব পার্লস’, সেটাকে কেন্দ্র করে ভারত উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আমরা যদি পাকিস্তানের গোয়াদারে, শ্রীলংকার হাম্বানটোটায়, মায়ানমারের কায়াকপুতে বন্দর নির্মাণের ধরনটা বুঝি। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের পায়রা বন্দর। ইতোমধ্যে হর্ন অব আফ্রিকা আর ভারত মহাসাগর সংলগ্ন জিবুতিতে চীন একটা সামরিক নৌঘাঁটি স্থাপন করেছে। চীনের অর্থায়নে আফ্রিকাতে নির্মিত বা নির্মিতব্য ৪৬টি বন্দরের মধ্যে ১১টি বন্দর তারা নিজেরাই পরিচালনা করছে বা করবে। ভারত মহাসাগরকে ঘিরে ভারতের চারদিক দিয়ে এভাবে বন্দর নির্মাণ দেশটিকে নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

আবার মেরিটাইম সিল্ক রোডের আওতায় চীন থাইল্যান্ডের ক্রা নামের একটা যোজকে (দুই ভূ-ভাগের মধ্যে সংযোগকারী স্থল) নৌপরিবহনের জন্য একটি খাল খননের পরিকল্পনা করেছে। এই খাল মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প হয়ে যাবে চীনের জন্য। কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে - এই খাল দিয়ে চীনের সাথে ভারতের নিকোবার ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের দূরত্ব কমে আসবে এবং সহজেই চীন সেখানে পৌঁছাতে পারবে।

এ সব কিছু বিবেচনায় ভারত চেষ্টা করছে চীনের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার। তাই তারাও ভারত মহাসাগর সংলগ্ন যে দেশগুলো রয়েছে, সেই সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। সেক্ষেত্রে ভারত সিংগাপুর, ওমান, সিসিলি, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, বাংলাদেশের সাথে যৌথভাবে উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সম্প্রতি ভারত সফরের সময় কোষ্টাল সারভেইলেন্স রাডার সিষ্টেম চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে। একই রকম চুক্তি সিসিলি, মরিশাস, মালদ্বীপ, শ্রীলংকার সাথেও করেছে। এ সব কিছুর বড় কারণটাই হচ্ছে ভারত মহাসাগরে চীনের আধিপত্য ঠেকানো। এজন্য ভারত একটা সার্বিক পরিকল্পনাই নিয়েছে। এটাকে তারা  বলছে, সিকিউরিটি এন্ড গ্রোথ অব অল ইন দ্যা রিজিয়ন বা সাগার/SAGAR। এই পরিকল্পনার আওতায় ২০৩৩ সাল নাগাদ ২৫টি দেশের ২১টিকে সংযুক্ত করতে চাইছে ভারত।

মোটা দাগে এসব কিছু এটা নির্দেশ করছে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় এক ভিন্ন ধরণের ঠাণ্ডা লড়াই শুরু হয়েছে ভারত ও চীনের মধ্যে, যদিও এটা কোনো মতাদর্শিক প্রতিযোগিতা বা লড়াই নয়। এটা পুরোপুরিভাবে অর্থনৈতিক আর ব্যবসায়িক স্বার্থকে ঘিরে সামরিক কৌশলগত প্রভাব বলয় বিস্তারের প্রতিযোগিতা। মুশকিল হলো, এই ঠাণ্ডা লড়াইয়ের আমরা (বাংলাদেশ) হচ্ছি দু দেশেরই সঙ্গী-সাথী। ভারতেরও, আবার চীনেরও।

ভারত দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও একটা প্রচেষ্টা করছে চীনকে মোকাবেলা করার জন্যে। এক্ষেত্রে অনেকের মধ্যে জাপানকে বেছে নিয়েছে। কেননা ভারত মহাসাগরকে ঘিরে জাপান এবং ভারতের নিরাপত্তাগত শঙ্কা একই রকম। দক্ষিণ চীন সাগর বাণিজ্যিক নৌপথ হিসেবে জাপানের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। আবার পূর্ব চীন সাগরে অবস্থিত সেনকাকু/দিয়ায়ু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে রয়েছে চীনের সাথে তাদের বিবাদ। তাই ভারত ও জাপানের মধ্যে ভারত মহাসাগরকে ঘিরে চীন-বিরোধী ঐক্য তাদের উৎসাহিত করেছিলো আফ্রিকা ও দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার ১৭টি দেশের মধ্যে সমুদ্র পথে যোগাযোগ সংযুক্তির জন্যে, ২০১৭ সালে এশিয়া-আফ্রিকা ইকোনমিক করিডোর গঠনের মাধ্যমে।যদিও এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। চীনের অর্থনৈতিক শক্তি ও প্রভাবের  কারণে এটা শেষ পর্যন্ত মেরিটাইম সিল্ক রোডের বিকল্প হতে পারবে কিনা তা সময় বলবে অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে। জাপানের ‘নিসিন’ নামের একটা বহুজাতিক খাদ্য-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে চীনের ‘কাগোমী কম্পানি’র সাথে যৌথভাবে ব্যবসা করছে। শুধু তাই নয়, জাপান সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সাথে ৩০ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময় চুক্তিও করেছে।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0247 seconds.