• ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৪:৫৯:৩৩
  • ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৭:০০:৩৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

শেষ পর্ব

‘চীন মতাদর্শিক নয়, চরিত্রগতভাবে ভীষণমাত্রায় বণিক-রাষ্ট্র’

ফাইল ছবি

চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রুট (ওবর)’র ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবসহ এর নানা বিষয় নিয়ে বাংলা’র কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ প্রকাশ করা হচ্ছে শেষ পর্ব।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বাংলা’র নিজস্ব প্রতিবেদক নূর সুমন

বাংলা : ওবর’কে কেন্দ্র করে যে উদ্ভূদ্ধ পরিস্থিতি- এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো বিষয়ে সতর্কতার প্রয়োজন আছে কি?

ড. তানজীমউদ্দিন খান : সতর্কতাটা আসলে নির্ভর করবে আমরা বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের স্বার্থকে কিভাবে রক্ষা করতে চাইছি। এখন কারা ক্ষমতায় আছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের স্বার্থ বা দেশের জনগণের স্বার্থকে আমরা রক্ষা করতে পারছি কিনা। আর এটা বাংলাদেশের জন্য খুব ঝুঁকিও তৈরি করছে।

এটা বুঝা জরুরি যে, দেশে যদি গণতন্ত্র অনুপস্থিত থাকে বা গণতন্ত্রের চর্চা যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পায় তাহলে কূটনৈতিক দরকষাকষিতে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো অনেক বেশি চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয় এবং তারা নিজেদের স্বার্থ খুব সহজে নিশ্চিত করতে পারে। যখন গণতন্ত্র অনুপস্থিত থাকে কিংবা গণতন্ত্র সংকটের মধ্যে থাকলে ক্ষমতাসীন সরকারি দল সবসময় এক ধরনের বৈধতার সংকটের ঝুঁকিতে থাকে-  অন্তত জনসমর্থনের প্রেক্ষাপটে। কোনো সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নিরিখে বৈধতার সংকট থাকলে,  তাদের একটা চেষ্টা থাকে বাইরের রাষ্ট্রের সমর্থন নিশ্চিত করা। এতে যেই সরকার ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তারা তাদের জাতীয় স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে ততটাই দুর্বল অবস্থানে থাকে।

এরকম পরিস্থিতিতে প্রভাবশালী বিদেশি রাষ্ট্রসমূহ ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন দেয়ার বিনিময়ে তাদের নিজেদের স্বার্থটা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিতে সমর্থ হয়। আর ওই জন্য বৈধতার সংকট কাটাতে জনমানুষের স্বার্থনির্ভর রাজনীতি না করলে আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতেও নিজেদের অবস্থানটা শক্তিশালী থাকে না। গণতন্ত্রের চর্চাটা যদি ওইভাবে শক্তিশালী হলে বা গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে জনমতের দোহাই দিয়ে নিজেদের স্বার্থ আদায়ের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকাটাও সহজ হয়ে যায় বহুলাংশে।

বাংলা : বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে চীন অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোকে তার ঋণের জালে বন্দি করেছে। এক্ষেত্রে তারা শ্রীলংকার উদাহারণ তুলে ধরছেন। এই বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

ড. তানজীমউদ্দিন খান : এই যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে এবং এই অবকাঠামোগত বিনিয়োগ হবে, সেই বিনিয়োগগুলো তো হবে ঋণ প্রদানের মাধ্যমেই। আমরা ইতোমধ্যেই দেখেছি, চীনের কাছ থেকে ঋণ নিলে সেই ঋণটা কি ধরণের যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দেয় কখনো কখনো কোনো রাষ্ট্রকে। এক ধরনের ঋণ-ফাঁদ তৈরি হয়। এটা আমরা সম্প্রতি শ্রীলংকার ক্ষেত্রে দেখলাম। ২০১৭ সালে ৯৯ বছরের জন্য তারা তাদের হাম্বানটোটা বন্দর চীনের কাছে লিজ দিয়ে দিতে বাধ্য হলো। ঠিক একই ঘটনা জাম্বিয়ার ক্ষেত্রেও ঘটেছে। চীনের এক্সিম ব্যাংক টুইট করে জানায় যে, কেনেথ কাউন্ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিজেদের আয়ত্বে নিয়েছে। বস্তুত ২০১২-২০১৮, এই সময়ের মধ্যে আফ্রিকাতে চীনের ঋণের পরিমাণ তিন গুণ বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ঋণ আর অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে চীন নিজেদের জন্য ২০২৫ সাল নাগাদ ৪৪০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব নিশ্চিত করতে পারবে।

চীন তো আসলে এখন আর কোনো মতাদর্শিক রাষ্ট্র না। চীন চরিত্র আর বৈশিষ্ট্যগতভাবে এখন ভীষণমাত্রায় বণিক-রাষ্ট্র। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘মার্কেন্টাইল স্টেট’। এই ধরণের রাষ্ট্রের যেহেতু কোনো মতাদর্শিক বাধ্য-বাধকতা নেই, তাই যে-কোনোভাবে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করাটাই তাদের আসল কাজ। মতাদর্শিক ঐক্যের ভিত্তিতে কোনো পরোপকারী বন্ধুত্ব ক্রিয়াশীল থাকে না বণিক-রাষ্ট্রের সাথে অন্য রাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে।

বাংলা : এতে করে ভারত-বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে কোনো প্রভাব পড়েছে কি বা আগামীতে কি কোনো প্রভাব পড়বে?

ড. তানজীমউদ্দিন খান : ওবরের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে অনেক আলোচনা করে ফেলেছি ইতোমধ্যে, তাই এটা নিয়ে আর মনোযোগী হতে চাই না। বরং নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশ-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বুঝা জরুরি।

আমরা যদি বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট দেখি, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু আর আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের রাজনীতির ক্ষেত্রে অনেক বেশি ভারতনির্ভর হয়ে উঠেছে। যার ফলে যে প্রভাবটা তাদের এক সময় দক্ষিণ এশিয়ায় ছিলো বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কার্ড হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যেভাবে ব্যবহার করা যেতো, এখন সেটা খুব ফলপ্রসূ নয় এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর জন্যে। সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে চীন অনেক প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।

এখন বাংলাদেশও অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রকে উপেক্ষা করতে পারে। এরকম অনেক উদাহরণ আছে। আগে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা আমাদের কোনো রাজনৈতিক নেতা, যারা ক্ষমতাসীন হতো, তারা খুব সহজভাবে করতো না। আর এখন সচরাচর দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে, আমাদের মন্ত্রীরা বাংলাদেশের সাথে সহজেই তুলনা করছি। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে আমরা যদি গত নির্বাচন দেখি এবং আমাদের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি, আমাদের শাসন ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে কখনো কখনো যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে কিছু মনোভাব প্রকাশ করার চেষ্টা করেছে।

কিন্তু মুশকিল হলো, যুক্তরাষ্ট্র যে নৈতিক অবস্থান নিতে চায়, সেই নৈতিক অবস্থানের সাথে তাদের নেতৃত্ব এবং তাদের (যুক্তরাষ্ট্র) যে দল ক্ষমতায় আছে, সেটার সাথে আসলে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কথা বললে, তাদের নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শের অনেক বিতর্কিত বিষয় যেমন ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’, সংখ্যালঘু বিরোধিতা ইত্যাদি সামনে চলে আসে। এখন আসলে তাদের রাজনৈতিক অনুশীলনের মধ্যে নৈতিকতার অবস্থান নেই, বরং আছে বর্ণবাদিতার প্রচার। এসব কিছু মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের ভাবমূর্তির সংকটও তৈরি হয়েছে। তাই অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবটাকে বাংলাদেশ এখন অতটা বিবেচনায় নিচ্ছে না কিংবা যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জন্য এখন অতোটা গুরুত্বপূর্ণ নয় আর অথবা বাংলাদেশ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উপেক্ষা করতে পারে।

বাংলা : এই বিষয়ে আপনার ব্যক্তিগত কোনো মতামত বা পরামর্শ আছে কি?

ড. তানজীমউদ্দিন খান : পরামর্শ দেয়ার চাইতে আমার অভিমতটা জানাতে চাই। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, ভারত এবং চীনের সম্পর্কের মধ্যে কিভাবে বাংলাদেশ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করবে, তার উপরেই আসলে নির্ভর করছে কে ক্ষমতায় থাকবে বা কারা ক্ষমতায় আসতে পারবে ভবিষ্যতে।  আর এই ভারসাম্যের নিশ্চিত করার দক্ষতাটা যে যত বেশি নিশ্চিত করতে পারবে, তার ততটা ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত হবে।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, দেশে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনায় চীন-ভারতের সাথে  ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

এজন্য আমার মনে হয়, গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগতভাবে শক্তিশালী করা খুব জরুরি। একই সাথে আমাদের আমলাতন্ত্র এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, সেখানে একমাত্র ব্যক্তিই সব কিছুর নিয়ন্ত্রক এবং নিয়ামক হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে মন্ত্রণালয়গুলো স্বাধীনভাবে, স্বকীয়তার সাথে কাজ করতে পারছে কিনা, তা এখন গবেষণার বিষয়।

এটা অনুধাবন করা প্রয়োজন- সবকিছু পুরোমাত্রায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়লে, কূটনৈতিক দরকষাকষিতে যে কোন রাষ্ট্রের অবস্থানই সাধারণত অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সামর্থ্যও স্বাভাবিকভাবে কমে যায়। স্বাধীনভাবে, স্বকীয়তার সাথে কাজ করতে সক্ষম না হলে, আমলাতন্ত্র তাদের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা বা নিপুণতার প্রমাণ রাখতে পারে না। অথচ এটাই সবচাইতে বেশি প্রয়োজন ভারত-চীনের সাথে দরকষাকষিতে আমাদের সুবিধাজনক অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য।

বাংলা : আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ স্যার।

ড. তানজীমউদ্দিন খান : আপনাকেও ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0224 seconds.