• ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৭:০৮:৪৮
  • ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৭:০৮:৪৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ভারতের নাগরিকত্ব বিল, দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে কালো মেঘ

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


ভারতের নাগরিকত্ব বিলে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যের বিষয়টি পরিষ্কার। এই বিলে ভারতের মুসলমানরা নাজেহাল হবেন, অনেকে রাষ্ট্রহীন হবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর রাষ্ট্রহীন এমন অনেকের দায় আমাদের নিতে হবে এতেও খুব বেশি চিন্তা-ভাবনার বিষয় নেই। ‘দলে দলে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে মানুষ’, বিবিসি’র এমন শিরোনাম সেই দায় নেয়ার কথাই বলে।

‘ডয়চে ভেলে’ তার শিরোনামে জানাচ্ছে, ‘বাংলাদেশের জন্য খারাপ সময়’। খারাপ সময়তো বটেই, তবে কেউ আবার বাঁকা ঠোঁটে ‘গত এক দশকে ভালো সময় কোনটা ছিলো’, এমন কথা বলে বসবেন না। গত এক দশকে আমাদের নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে এ কথা মিথ্যা নয়। তবে জাতি হিসাবে আমরা সহনশীল, সময় তার প্রমাণ করেছে। আমরা সবকিছুতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, মেনে নিয়েছি!

এক দশকের কথা থাক, বর্তমানের কথায় আসি। ভারতের নাগরিকত্ব বিল আমাদের কাছে বিষফোঁড়ার মতো হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বারো লাখ রোহিঙ্গার ভার বইতে আমরা এখন প্রায় অক্ষম। প্রথমে নিজেদের ভাত ভাগ করে খাওয়ানোর আবেগ দেখিয়েছি। সত্যিই যখন নিজের পেটে টান পড়েছে তখনই আবেগ উধাও। ভারতে যতজন মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়েছে তাদের ভার যদি বওয়ার মত পরিস্থিতি হয় তখনতো আবেগ বিবেক সবই উধাও হয়ে যাবে। যেহেতু ভারতের শাসকগোষ্ঠী বাদপড়া মানুষদের সরাসরি বাংলাদেশি বলে আখ্যায়িত করছেন। শত্রু রাষ্ট্র পাকিস্তানের নাম উচ্চারিত হবার বদলে নেয়া হচ্ছে বন্ধু বাংলাদেশের নাম। বলা হয় পরম বন্ধু, এমন পরম হলে আর কি চরম শত্রুর প্রয়োজন রয়েছে? 

রাষ্ট্রহীন মানুষের বিষয় ছাড়াও আরেকটি বিষয় আপাত ভাবনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। মুসলমানদের দুর্দশার চিত্র আঁকতে গিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে যে সাম্প্রদায়িকতার রঙ ছড়িয়ে পড়ছে তা চলে যাচ্ছে দৃষ্টির আড়ালে। কিভাবে বলছি। ভারতে মুসলমানরা নিগৃহিত হচ্ছে, বেঘর হচ্ছে, রাষ্ট্র্রহীন হয়ে পড়ছে, এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে দক্ষিণ এশিয়াসহ সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে। এরসাথে যোগ হয়েছে মুসলমানদের সরাসরি বৈরি হিসাবে চিহ্নিত করা। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালদ্বীপ কিংবা আফগানিস্তান থেকে যে মুসলমানরা ভারতে যাবেন তাদের ভিসার বাইরে একদিন থাকতে হলে অন্য ধর্মের মানুষদের চেয়ে বিশগুন বেশি জরিমানা গুনতে হবে। এই যে সাম্প্রদায়িক ভেদ-বিভাজন, এর রেশ ছড়িয়ে পড়বে সারা এশিয়ায়, এমন কী বিশ্বব্যাপী। আর ভারতের বাইরে এর দায় বইতে হবে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকেই। আর সেজন্যে পরিষ্কার ভাবে দায়ি ভারতের তথাকথিত নাগরিকত্ব বিল।

এর ফলে সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়বে সত্যিকার অর্থে অগ্রসর চিন্তার মানুষেরা। সে হোক ভারতে কিংবা ভারতের বাইরে। আমাদের মতন যারা মানুষের ‘মানুষ’ পরিচয়টাকেই গুরুত্ব দিই তারা হয়ে পড়বেন ‘না ঘরকা না ঘাটকা’। অনেক প্রশ্নের জবাবই তাদের কাছে থাকবে না। মজলুমকে জুলুম সহ্য করার মতন কথা বলাটাও হয়ে দাঁড়াবে আরেক জুলুমের সামিল। আর পরিস্থিতি সেদিকেই যাচ্ছে। কথিত ‘সেকুলার’ ভারতের প্রকৃত ‘পিকুলা’র রূপ ক্রমেই প্রকাশ্য হচ্ছে। এটা আজকের রূপ নয়, ‘শিবাজী স্তব’ এমন রূপেরই ছিলো অগ্রগামী পর্ব। এখনের রূপ তারই অগ্রসরমান ‘সিক্যুয়াল’। বর্গী আর দস্যুদের যেখানে বীর ভাবা হয়, সেখানে এমন সাম্প্রদায়িক রূপটাই স্বাভাবিক। বর্গী বা মারাঠা দস্যুদের হন্তারক রূপটা,‘নরভোজী’ প্রকৃতিটা বহুকাল আগেই তার জানান দিয়েছিলো। সেই রূপের প্রকৃতিকে উপেক্ষা করার পরিণাম হলো আজকের ভারত এবং তার চরম সাম্প্রদায়িক বর্গী রূপ।

কেনো আমরা ভাবতাম ভারত সেকুলার। ভারতের চতুর রাজনীতিকরা প্রচারণাটা বুঝতো। তারা জানতো তাদের নড়বড়ে ইউনিয়নকে টিকিয়ে রাখতে হলে বিশ্বের সমুখে একটি প্রগেসিভ চেহারা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যার ফলে সেকুলার অংশটার ভয়েজ তারা রেইজ করতে দিয়েছিলো। অরুন্ধতী রায় বলছেন, কবীর সুমন গাইছেন, অর্মত্য সেন বক্তৃতা দিচ্ছেন সুতরাং ভারত ইউনিয়নটির কোনো ধর্মীয় চরিত্র নেই। তারা উগ্রবাদী না, তারা গরুবাদী অর্থা‌ৎ নিরীহ! সুতরাং বর্তমান বিশ্বের বড় একটা বিসংবাদ কাটানো গেছে। এখানে ‘মুসলিম টেরোরিস্ট’ বিষয়ে ভাবনা নেই। এখানে মুসলমানদের রাখা হয়েছে নজরে বন্দী করে। সুতরাং বিশ্বের কাছে তারা সাধু। আর এই সুযোগটাই নিয়েছে সেকুলারিজমের নামাবলি গায়ে ভারতের চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি।

এসব ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়, এ নিয়ে ভাবনা কী! এমন বলেন অনেকে। এমনটা হলে ভালো ছিলো, ভারতের বাইরে অন্য দেশগুলির এ নিয়ে চিন্তা ছিলো না। কিন্তু সত্যিই কি বিষয়টি ভারতেন আভ্যন্তরীণ? পরিষ্কার জবাব, না। দক্ষিণ এশিয়াতো বটেই ভারতের এই বিল পুরো এশিয়ার ধর্মীয় সহাবস্থান নষ্ট করবে। মদদ জোগাবে উগ্র শক্তিগুলোকে। নির্যাতিত মানুষ ক্রমেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে, ঝুকে যাবে অশুভ শক্তির প্রতি। দক্ষিণ এশিয়াসহ সারা এশিয়াতেই অজুহাত পাবে অশুভ শক্তিগুলো। ব্যবসা বাড়বে অস্ত্র বেচিয়েদের। 
অতএব কোনভাবেই বিষয়টি ভারতের একার নয়। এমনকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবাই। বিশেষ করে সংখ্যায় কম মানুষেরা। বাড়তে থাকবে মজলুমের মিছিল। সাথে আহাজারি আর মৃত্যু। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0911 seconds.