• বিদেশ ডেস্ক
  • ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ ২১:২৬:২১
  • ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯ ১২:৪৭:৪৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ভারতে মুসলমানদের মধ্যে অবমাননাবোধ আর আতঙ্ক: ইরফান হাবিব

ছবি: সংগৃহীত

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ইরফান হাবিব বলেছেন, বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং দেশজুড়ে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) মুসলিমদের ‘আতঙ্কবোধে’ ছেয়ে ফেলেছে।

“হ্যা, ভয় ছাড়াও সেখানে অবমাননার একটি অনুভূতি রয়েছে, বিশেষ করে গরীবদের মধ্যে যারা বৈষম্য এবং নিপীড়নের শিকারে পরিণত হবে তাদের মধ্যে। কেননা যেকোন নাগরিক এই বিলের পরে নিবন্ধিত হলে তারা মুসলিমদের ওপর মনোযোগ ফেলবে এবং সম্ভবত নেপালি হিন্দু কিংবা শ্রীলঙ্কার তামিলদের ওপরও সেটা করবে; তবে মূলত এটা মুসলিমদের বিরুদ্ধেই।”

ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য হিন্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরফান হাবিব এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমার ধারণা, বিজেপি সরকার পরো দেশ জুড়ে একবারে এই নাগরিকপঞ্জি করবে না। তারা রাজ্য থেকে রাজ্যে যাবে এবং গিয়ে বলবে তারা মুসলিমদের স্থান করে দিচ্ছেন। মানে আমি বলতে চাইছি, সংবিধানের কোনো অনুমোদন ছাড়াই তারা একটি রাজ্যকে তার মর্যাদা কমিয়ে ইউনিয়ন টেরিটোরি বানিয়ে ফেলেছে, শুধু সেটি মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য বলে।”

‘‘এই বিষয়টি ব্রিটেনের সাম্প্রতিক নির্বাচনে পরিষ্কার হয়ে গেছে, যেখানে হিন্দুরা লেবার পার্টিকে ভোট দেয়নি। অথচ তারা ঐতিহ্যগতভাবে তাদের সমর্থন জানিয়ে আসছে। তারা লেবার পার্টিকে ভোট দেয়নি কেননা ৩৭০ অনুচ্ছেদের বিলোপ ইস্যুতে দলটি বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে আসছে। আমি একটা সংবাদপত্রের শিরোনাম দেখলাম যা বলছে ‘কাশ্মিরের জন্য ‍হিন্দুরা লেবার পার্টির পরাজয় ডেকে আনল’।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার বলছেন, ভারতীয় মুসলিমদের সিএএ এবং এনআরসি-কে ভয়ের কোনো কারণ নেই। অধ্যাপক হাবিব পাল্টা প্রশ্ন করেন: “কেন তাদের ভয় হবে না? তিনি তাদেরকে ‘উইপোকা’ বলেছেন। তারা কি গুজরাট দাঙ্গার কথা জানেন না যেখানে তিনি একজন অন্যতম অভিযুক্ত ব্যক্তি?”

ইরফান বলেন, নতুন আইনে ‘বাদ’ দেয়ার মাধ্যমে মুসলিমদের টার্গেট করা হয়েছে। তারা কীভাবে একজন বাংলাদেশী এবং পশ্চিম বঙ্গের মুসলিমকে পৃথক করবেন? তারা সবাইই তো বাংলা বলে। এর কি নিশ্চয়তা আছে যে তারা (কর্তৃপক্ষ) বলবে না, তুমি পূর্ব-পাকিস্তানে গিয়েছিলে এবং ফিরে এসেছিলে?

মুসলিমরা নতুন আইনের প্রতি ‘অতিমাত্রায় কঠোর প্রতিক্রিয়া’ দেখাচ্ছে বলে হিন্দুদের মধ্যে এক ধরনের ধারণা বিরাজমান। এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অধ্যাপক হাবিব বলেন, “অধিকাংশ লোকই জানেন না ‘বর্জন’ মানে কী। প্রতিবেশিত্বের বিচারে আফগানিস্তানের চেয়ে মিয়ানমার এগিয়ে কিন্তু ভারতীয় চেতনাবোধ বার্মায় রোহিঙ্গাদের ওপর কী ঘটছে তা দ্বারা উদ্বেলিত নয়। এটা কেবলি উদ্বেলিত হয়েছে একজন হিন্দু কিংবা একজন শিখ পরিবারে কি ঘটছে তালেবানদের হাতে- খুবই কম, হাতে গোণা। আবার আপনি যদি একজন উত্তর ভারতীয় হন, তবে আপনি শ্রীলঙ্কার তামিল কিংবা শ্রীলঙ্কার মুসলিম যারা তামিল ভাষায় কথা বলে তাদের ব্যাপারে কোন তোয়াক্কাই করছেন না। আপনি অন্যভাবে দেখছেন। এটা খুবই বৈষম্যমূলক সহানুভূতি।”

ইতিহাসের একটি বিকৃত ভার্সন শিক্ষার্থীদেরকে সরবরাহ করার বিষয়ে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক এমেরিটাস বলেন, “এটা ঠিক আছে যে অতীত সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা নেই, যেটা বিপদজনক সেটা হল- যদি আপনার হাতে অতীতের একটি ভুল ধারণা থাকে। এখন অশোককে নিয়ে কথা হচ্ছে কেননা তিনি ধর্মীয় সহনশীলতার ব্যাপারে বলেছিলেন। বর্তমানে তারা স্ক্যান্দাগুপ্তের ওপর গুণারোপ করছে যাতে স্ক্যান্দাগুপ্ত নিজেই অবাক হয়ে যেতেন।”

ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভাজনের জন্য কংগ্রেসকে দায়ী করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যে আপত্তিও জানিয়েছেন তিনি, “এটা এমন ধরণের ভাষা যা গডসে (নথুরাম) বলেছিলেন। তারা আমাদেরকে বলে না যে তারা ভারতের স্বাধীনতার জন্য কি করেছিলেন। আপনি যেমনটি জানেন যে ১৯৩৭ সালে সাবারকর দ্বি-জাতি তত্ত্ব দিয়েছিলেন এবং ১৯৩৮ সালে গোলওয়ালকার বলেন মুসলিমরা নাগরিক হতে পারে না। এটা ছিল দেশভাগের বহু আগে। গান্ধীজীকে যখন হত্যা করা হয় তখন আমি ছাত্র ছিলাম, এবং আরএসএস মিষ্টি বিতরণ করেছিল। যখন প্যাটেল (বল্লভভাই) তাদেরকে যা করতে বলেছেন, গোলওয়ালকার তা প্রত্যাখান করতে পারেননি।”

পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে অধ্যাপক হাবিব আরও ব্যাখ্যা করে বলেন কেন সাধারণ ভারতীয়রা ইতিহাসের একটি বিকৃত ভার্সনকে গিলছে। “এটা পাকিস্তানের ব্যাপারেও বলা যেতে পারে। যখন দেশভাগ হল, জিন্নাহ বললেন যে সেখানে মুসলিম, খ্রিস্টান এবং শিখদের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে না। ১৯৫০ এর দশকে ভয়ঙ্কর জাতিগত নিমূলের পর, পাকিস্তান মোটামুটিভাবে একটা আধুনিক রাষ্ট্র। তারপর, অবশ্যই, ধর্মীয় আবেদনের বিষয়টি চলে আসে এবং সবকিছুই ভুলে যাওয়া হয়... এবং, তারপর ধর্ম প্রবেশ করে (রাষ্ট্রীয় নীতিতে)। ঠিক একই জিনিস এখানে ঘটছে আরও অধিক দূরত্ব নিয়ে জাতীয়তাবাদী অতীতের কারণে।”

“আমি ভাবছি আমরাও একই পথে যাচ্ছি। বিগত ৪০-৫০ বছরে যা ঘটেনি এসব ব্যক্তি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পরে তা ঘটছে। অবশ্যই, দাঙ্গা হয়েছিল কিন্তু কেউই এটাকে নিত্যদিনে ভয় হিসেবে চিন্তা করে নি। এটা আদালতকেও প্রভাবিত করছে।”

বিচার বিভাগ ‘জাতীয় ইচ্ছা’য় নিমজ্জিত হল কিনা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “এটা বিচার বিভাগ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত আসামের নাগরিকত্বের আদমশুমারি দিয়ে শুরু হয়েছিল, চলমান ছিল অযোধ্যার রায়ে এবং ঠিক সেইভাবে যেভাবে (বিচার বিভাগ) কাশ্মীর নিয়ে তারা আচরণটা করছে।”

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0778 seconds.