• অর্থনীতি ডেস্ক
  • ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯ ১০:২৩:২৯
  • ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৫:০৬:৩৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

২০ বছর পরও কম ব্যবহৃত হবে পায়রা বন্দর

ছবি : সংগৃহীত

রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় করে পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ ছাড়াও অ্যাপ্রোচ চ্যানেলে বড় ধরনের ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন পড়বে। এছাড়াও চ্যানেলটি নিয়মিত ড্রেজিংও করতে হবে। এজন্য বছরে আরো ৩০-৫০ কোটি ডলার ব্যয় হবে বলে জানিয়েছে জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা)।

এর পরও খুবই সীমিত পরিসরে ব্যবহার হবে এই বন্দরটি। ২০৪১ সালে পায়রা বন্দর দিয়ে কনটেইনার পরিবহন হবে সাড়ে পাঁচ লাখ টিইইউএসেরও কম। অথচ চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানেই বার্ষিক ২৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার পরিবহন হয়। আর ২০৪১ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৬৯ লাখ টিইইউএস। বণিক বার্তা’র এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে আসে।

মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর চূড়ান্ত সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছে জাইকা। ওই প্রতিবেদনে পায়রাসহ মাতারবাড়ী ও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহনের তুলনামূলক প্রাক্কলন করেছে সংস্থাটি।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কনটেইনার পরিবহন হবে ৩৪ লাখ ৯ হাজার টিইইউএস। ঠিক একই সময়ে পায়রা বন্দরের মাধ্যমে পরিবহন হবে মাত্র ৪ লাখ ৮০ হাজার ৫২৬ টিইইউএস। এমনকি পায়রার চেয়ে বেশি কনটেইনার পরিবহন হবে মাতারবাড়ীতে, ৯ লাখ ৯৯ হাজার টিইইউএস। তিনটি আলাদা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েও সমীক্ষার তথ্যে সামগ্রিক চিত্রটি একই রকম দেখা যায়।

২০৪১ সাল পর্যন্ত এ পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকবে। সে পর্যন্ত তিনটি বন্দরে পণ্য পরিবহন বাড়লেও অবস্থানের পরিবর্তন হবে না বলে জাইকার সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে। ২০৪১ সালে ৬৮ লাখ ৯৭ হাজার ১৭৯ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করবে চট্টগ্রাম বন্দর। ওই সময় মাতারবাড়ীর মাধ্যমে ২৫ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৯ টিইইউএস ও পায়রার মাধ্যমে মাত্র ৫ লাখ ৪৬ হাজার ২২৮ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হবে।

দেশের বর্তমানে সমুদ্রপথে কনটেইনারে পণ্য আমদানি-রপ্তানির ৯৮ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিবহন করা হয়। বাকি ২ শতাংশ হয় মোংলা বন্দর দিয়ে। এ হিসাবে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে ব্যবসায়ীদের চট্টগ্রাম বন্দরের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। আগামীতেও এ নির্ভরতা থাকবে বলে মনে করছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।

ব্যবহারকারীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে তিনটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগের জন্য ইপিজেড প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এখানকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মূলত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই পরিচালিত হবে। এছাড়া ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোসহ নেপাল ও ভুটানের জন্যও চট্টগ্রাম বন্দর অবস্থানগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান বলেন, ‘চট্টগ্রামকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ইপিজেডের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই পরিচালিত হবে। তাই এ বন্দরের উন্নয়নে কার্পণ্য হলে দেশের অর্থনীতিতেই ক্ষতি ডেকে আনবে।’

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের রাবনাবাদ চ্যানেলে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের নভেম্বরে এর ভিত্তিফলকও উন্মোচন করা হয়। ২০১৩ সালের নভেম্বরে ১ হাজার ১২৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে তা শেষ হওয়ার কথা ছিল। গত বছরের মার্চে ওই টার্মিনাল নির্মাণের ব্যয় প্রায় দুই গুণ বাড়িয়ে ৩ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা ও সময় আরো দুই বছর বাড়ানো হয়। আগামী ৩৪ মাসে তা শেষ হবে।

গত জানুয়ারিতে পায়রা বন্দরের মূল খননকাজের জন্য বেলজিয়ামের জান ডে নুল ড্রেজিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী সমীক্ষার জন্য ১৪ মাস ও খননের জন্য ১৪ মাস সময় লাগবে। এরপর ছয় মাস প্রাথমিক রক্ষণাবেক্ষণ খনন চলবে ও পরবর্তী সময়ে ৯ বছর ২ মাস রক্ষণাবেক্ষণ খনন করা হবে। এতে ক্যাপিটাল ও রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিংয়ে মোট ব্যয় হবে ৮৬ কোটি ৪৩ লাখ ১৮ হাজার ৭৪৩ ইউরো বা আনুমানিক ৮ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় জানায়, প্রল্পটির আওতায় পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলে সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের ৪০ হাজার টন ধারণক্ষমতার বাল্ক ক্যারিয়ার চলাচলে সক্ষম চ্যানেল টার্নিং বেসিনসহ ডিজাইন ও ক্যাপিটাল ড্রেজিংসহ ১২ বছর পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ খনন করা হবে। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের ফলে ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ, ১০০-১২৫ মিটার প্রস্থ ও সর্বোচ্চ সাড়ে ১০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত চ্যানেল তৈরি হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের লক হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান বলেন, ‘খননের মাধ্যমে তলদেশ থেকে যে অংশটুকু তুলে আনা হবে, সেটির ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পায়রা বন্দরের স্থানটিতে প্রচুর তলানি জমে। ফলে বড় জাহাজ আনার জন্য গভীরতা ধরে রাখতে যে ড্রেজিং করতে হবে, তা বন্দরটির সম্ভাব্যতা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।’

এদিকে চলতি বছর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য প্রস্তাবনা দিয়েছে। বন্দরটি জাপানের ঋণে তৈরি করতে চায় বাংলাদেশ। মাতারবাড়ী বন্দর নির্মাণ প্রস্তাবে খরচ ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৫৮০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি ১৩ হাজার ২৫২ কোটি টাকা দেবে। বাকি ২ হাজার ৭৩৯ কোটি ৮৯ লাখ দেবে সরকার ও ২ হাজার ৫৮৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা দেবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

জাইকা’র সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে মাতারবাড়ী বন্দরও সাড়ে ২৫ লাখ টিইইউএসের মতো কনটেইনার পরিবহন করতে পারবে। এ হিসাবে ২০ বছর পরও পণ্য পরিবহনে পায়রা ও মাতারবাড়ীর চেয়ে চট্টগ্রাম বন্দরই এগিয়ে থাকবে। সে বিবেচনায় বন্দরটির সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে বলে জানায় চবক।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘সারা দেশের সিংহভাগ পণ্য পরিবহন হয় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে। ফলে এ বন্দরের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ কাজ করে যাচ্ছে। বন্দরের মূল অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও জোর গতিতে চলছে। প্রয়োজনীয় গ্যান্ট্রি ক্রেন এরই মধ্যে আনা হয়েছে। এছাড়া নতুন টার্মিনাল নির্মাণের কাজও চলছে।’

বাংলা/এনএস

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0206 seconds.