• অর্থনীতি ডেস্ক
  • ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ১০:৪৬:২২
  • ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ১০:৪৬:২২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

সম্পদ কেন্দ্রীভূত উপরে, বাড়ছে দারিদ্র্য ঝুঁকির হার

ছবি : সংগৃহীত

দেশে সম্পদ এখন অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে। বৈধ-অবৈধ সব সম্পদই সমাজের উপর স্তরে জমা হওয়ায় এর সুফল পাচ্ছে না নিম্নস্তরের মানুষ। সম্পদের এমন অসম বণ্টনের ফলে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের হার বৃদ্ধির পাচ্ছে। তাই এর বিরুদ্ধে কথা বলতে হচ্ছে নীতিনির্ধারকরাও। শুদ্ধি অভিযানের কথাও বলছেন তারা।

উন্নয়নের ‘ফিল্টার ডাউন’ বা চুইয়ে পড়া তত্ত্ব কাজে আসেনি বলেই এ অবস্থা। এ তত্ত্ব মতে, অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে পারলেই উৎপাদন বাড়বে। আর উৎপাদন বাড়লেই এর সুবিধাগুলো দরিদ্র শ্রেণির অনুকূলে প্রবাহিত হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে লক্ষণীয়। তবে এ উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ভঙ্গুর (দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা) মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। দেশের অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে এক পরিসংখ্যানে উঠে আসে। এমন খবর প্রকাশ করেছে বণিক বার্তা ।

বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুসারে, একজন মানুষের দৈনিক আয় ১ দশমিক ৯ ডলার হলেই তাকে দারিদ্র্যমুক্ত ধরা হয়। দারিদ্র্যমুক্তির পরও যাদের আয় ৩ দশমিক ৮ ডলার পর্যন্ত থাকে, তাদের রাখা হয় দারিদ্র্যঝুঁকির শ্রেণিতে। অসুস্থতা, আকস্মিক দুর্ঘটনা, সামাজিক ব্যয় বৃদ্ধি বা অপ্রত্যাশিত কোনো খরচের চাপ সামাল দেয়ার সামর্থ্য তাদের থাকে না। এতে করে তারা আবারো দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারেন। তাই এই শ্রেণির মানুষকে দারিদ্র্যঝুঁকিতে রাখা হয়।

কিন্তু দেশে এই শ্রেণিটির সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য মতে, ২০০০ সালেও দেশে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা মানুষ ছিল ৩৫ শতাংশের কাছাকাছি। পরের পাঁচ বছর তা বেড়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়। দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের হার বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে পরের ছয় বছরও। ২০১৬ সালে এ হার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। যদিও দেশের মাথাপিছু আয় বেড়েছে এবং দারিদ্র্যের হারও কমেছে।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, সাম্প্রতিক যে আয় বৃদ্ধি তা লক্ষণীয়। আয় বিবেচনায় উপরের দিকের মানুষের জীবনমানের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তবে নিচের দিকে অবস্থানকারী ৪০ শতাংশের ক্ষেত্রে আয় বৃদ্ধির ফল অতটা উচ্ছ্বসিত হওয়ার মতো নয়। তাদের দুর্দশা তেমন পাল্টায়নি। বরং দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা মানুষ আরো বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, দারিদ্র্য হ্রাসে সরকারের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি থাকলেও ঝুঁকিতে (দারিদ্র্য) থাকা মানুষকে বের করে আনার ক্ষেত্রে কার্যক্রমের অভাব রয়েছে।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা অভাবমুক্ত হয়েছি কিন্তু ঝুঁকিমুক্ত হতে পারিনি। দরিদ্রতা থেকে মানুষকে বের করে আনতে সরকারের বেশকয়েকটি টার্গেট ওরিয়েন্টেড কার্যক্রম রয়েছে। তবে ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে বের করে আনতে এ ধরনের কার্যক্রমের ঘাটতি রয়েছে। ফলে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের পরও মানুষ এক ধরনের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে। খুব দ্রুত তারা সচ্ছল পর্যায়ে পৌঁছতে না পারায় দারিদ্র্য ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা এসব মানুষের একমাত্র সম্বল তাদের শ্রম। সেটিকে কাজে লাগিয়েই তাদের ঝুঁকি থেকে বের করে আনতে হবে।’

দারিদ্র্য কমলে স্বাভাবিকভাবেই ভোগ ব্যয় বাড়ার কথা। দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে ঠিকই। কিন্তু বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে ভোগে। আয় বিভাজনে নিচের দিকে থাকা ৪০ শতাংশের ভোগ প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংক দেখিয়েছে, ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত নিচের ৪০ শতাংশ মানুষের ভোগ প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ। দেশের সামগ্রিক ভোগ প্রবৃদ্ধিও সে সময় একই হারে ছিল। তবে এর পরের

পাঁচ বছরে নিচের ৪০ শতাংশ মানুষের ভোগের প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ১ দশমিক ৮ শতাংশে। আর ২০১০-১৬ সাল পর্যন্ত ভোগ প্রবৃদ্ধিতে চরম অবনতি হয়। এ সময় নিচের ৪০ শতাংশ মানুষের ভোগ প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। যদিও দেশের সামগ্রিক ভোগ প্রবৃদ্ধি এ সময় আরো বেশি ছিল, ১ দশমিক ৬ শতাংশ।

এ বিষয়ে কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধিকালে আয় বা ভোগবৈষম্য কিছুটা বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। তবে ভোগ ব্যয়ের বৈষম্য খুব বেশি ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও আয়বৈষম্য প্রকট। সরকার নিচের ৪০ শতাংশ মানুষের আয় বৃদ্ধি কিংবা কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ভোগ বাড়ানোর কাজ করে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে প্রতি বছর সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। গ্রামীণ অবকাঠামো, বিশেষ করে সড়ক ও বিদ্যুতায়ন দ্রুত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অকৃষি আয় বৃদ্ধি পাবে। সম্পদ বৃদ্ধির সুযোগ দিতে হবে। তবে উপরের ১০ শতাংশ মানুষের আয় বৃদ্ধি অবশ্যই নিচের ৪০ শতাংশ মানুষের আয় বৃদ্ধির সমপর্যায়ে থাকতে হবে। সেটি করতে সরকারি পরিকল্পনায় জোর দেয়া হয়েছে।’

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে জোর দেয়ার কথা বলা হলেও এক্ষেত্রেও নিচের ৪০ শতাংশের অংশগ্রহণ কমে আসছে। ২০১০ সালে সামাজিক সুরক্ষায় এ শ্রেণীর পরিবারের অংশগ্রহণ ছিল ৩৩ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা নেমে আসে ২৯ শতাংশে। আবার রেমিট্যান্সেও তাদের সুবিধাপ্রাপ্তির হার কমছে। ২০১০ সালে বাংলাদেশে আসা আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্সের প্রায় ৪ দশমিক ১০ শতাংশের সুবিধাভোগী ছিল নিচের সারির ৪০ শতাংশ পরিবার। ২০১৬ সালে এ হিস্যা নেমে আসে মাত্র আড়াই শতাংশে। ফলে এ শ্রেণীর মানুষের মধ্যে দারিদ্র্যের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।

দারিদ্র্যতা থেকে কেউ একবার বেরিয়ে এলে তার দারিদ্র্যের মধ্যে প্রবেশের আর কোনো সুযোগ নেই দাবি করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘প্রবৃদ্ধি হচ্ছে দেশের দারিদ্র্য নিরসনের মূল চাবিকাঠি। দেশে টেকসই ও মানসম্পন্ন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, প্রত্যেক মানুষকে যা স্পর্শ করছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র্য কমাচ্ছে। এজন্য কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে, তাদের এ অবস্থা থেকে বের করে আনা হবে। দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাও আসবে।’

বাংলা/এনএস

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0205 seconds.