• বিদেশ ডেস্ক
  • ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৮:৫২:১৫
  • ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৮:৫৩:৫৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

কিশোরদের জলবায়ু আন্দোলনে সিস্টেম ভাঙার প্রত্যয়

ছবি: সংগৃহীত

গেল বছর যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে জলবায়ু আন্দোলন ছিল তুঙ্গে। লাখো লাখো স্কুল পড়ুয়া তরুণ কিশোর-কিশোরী এক্টিভিস্ট বিক্ষোভ প্রদর্শন করে ও অবরোধ করে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় জলদি কার্যকর ভূমিকা নিতে বয়স্কদের আহবান জানায় সে আন্দোলন। কীভাবে শুরু হল এই আন্দোলন, কীভাবে ধীরে ধীরে তা জোরালো হয়ে উঠল- সেসব ঘটনাবলীর আঁচ পাওয়া যায় কিশোর জলবায়ু যোদ্ধা গ্রিতা থুনবারির এক সাক্ষাৎকারে।

ষোল বছর বয়সী সুইডিশ জলবায়ু এক্টিভিস্ট গ্রিতা থুনবারি বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। গত বছর জলবায়ুর জন্য তিনি স্কুল ধর্মঘট শুরু করেন। মারাত্মক জলবায়ু পরিবর্তন রোধে অ্যাকশন দাবি করে তিনি প্রতি শুক্রবার স্কুল বাদ দিয়ে সুইডিশ সংসদের সামনে দাঁড়িয়ে গেছেন। তার প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুতই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক আন্দোলনে রুপ নেয়। বিশ্বজুড়ে লাখো লাখো স্কুল শিক্ষার্থী তাদের নিজ নিজ এলাকায় ধর্মঘট শুরু করেন। ২০১৮ সালে তার ধর্মঘট শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি ক্লাইমেট জাস্টিস আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। তিনি পোলান্ডে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনায় বক্তব্য দেন, বক্তব্য দেন ইউরোপিয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টেও। এমন কি তিনি পোপের সঙ্গেও দেখা করেন। ২০ সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে তিনি বৈশ্বিক জলবায়ু ধর্মঘটে যোগ দেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিটে বক্তব্য দেন।

ডেমোক্রেসি নাউকে দেয়া সেই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালে। বাংলা’র পাঠকদের জন্য সেটির ইষৎ সংক্ষেপিত অনুবাদ এখানে তুলে ধরা হল:

গ্রিতা থুনবারি: এই সমস্যাটি সম্পর্কে আমি জানতে পারি যখন আমার বয়স ৭,৮, কি ৯ বছর হবে। এরপর সময়ের সাথে সাথে আমি এ সম্পর্কে আরও বেশি বেশি পাঠ করি এবং বুঝতে পারি কতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটি; কতটা প্রকট এই সমস্যাটি। এভাবে ১০, ১১ কি ১২ বছর বয়সে দেখলাম যে আমি সত্যি সত্যি জলবায়ু আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়ি। এগার বা তের বছর বয়সে আমি একজন জলবায়ু এক্টিভিস্ট হয়ে উঠি। অবসর সময়ে বিক্ষোভ, সভা-সমাবেশে যাওয়া শুরু করি। বিভিন্ন সংগঠন এবং আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা করি। কিন্তু আমি ঠিকই চিন্তা করি যে সবকিছুই তখনো খুব ধীরে ধীরে চলছে; যথেষ্ট গতিশীল নয়। সুতরাং, সিদ্ধান্ত নেই আমি নিজে নিজে কিছু একটা করবো এবং তা কাজে নাও আসতে পারে, তবে সুযোগ আছে কাজে দেয়ার- এটার একটা ফল থাকবে। ভাবতে থাকি ‌'তবে চেষ্টা করা নয় কেন?' কাজেই এরপর আমি জলবায়ুর জন্য স্কুল-স্ট্রাইক করা শুরু করি।

গ্রিতাকে যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল-

বিষয়টা নিয়ে পড়াশুনার পর আমি মোটামুটি থমকে যাই। বুঝতে পারি এটা আমাকে খুবই হতাশ করে তুলেছে। যখন আপনি একা এই সমস্যা নিয়ে বলছেন এবং প্রত্যেকের কাছে সেটা মনে হয়েছে ‍‌'ওকে, ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তবে আমি আমার জীবন নিয়ে খুবই ব্যস্ত আছি'- তখন আমি ভাবলাম এটা খুবই অবাক করা বিষয় কেউ-ই আর যৌক্তিক আচরণ করছে না।

যৌক্তিক আচরণ সম্পর্কে গ্রিতার মত-

কিছু একটা করা, আরাম কেদারা থেকে বেরিয়ে পড়া এবং বুঝতে পারা যে 'ওকে, আমার যা করছি তা চলতে দিতে পারি না। ব্যাপকভাবে আমাদের কিছু একটা করা প্রয়োজন। সঠিক পথে নেয়ার জন্য আমি সবকিছুই করতে চেষ্টা করি।' তবে কাউকে এসব করতে দেখা যাচ্ছিল না। আমার মা-বাবা আগের মতোই চলছেন। আমার সহপাঠীরা, আমার স্বজনদের প্রত্যেকে, আমি যা বোঝাতে চাচ্ছি, কেউ না- কেউ-ই না; এসব বিষয় নিয়ে আমার মত যত্নশীল কেউ-ই নয়। সেটা এক আশ্চর্যজনক অভিজ্ঞতা।

ফলে হতাশাগ্রস্ত হয়েছেন কিনা-

হ্যা, অবশ্যই। অনেক কারণে এটা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণটি হল সবকিছুই ভ্রান্তি, সবকিছুই উদ্ভট, সবকিছুই করুণ এবং কেন আর কেউ এটা নিয়ে কিছু করছে না? এরপর আমি এক ধরনের হতাশায় পড়ে যাই। এই হতাশাটা সম্ভবত এক বছর বা তারও কিছু বেশি সময় ধরে ছিল।

এসব কথা বলতে গিয়ে তিনি থেমে যান-

হ্যা, আমি থেমেছি। থেমে গেছি কারণ আমার সিলেক্টিভ মিউটিজম আছে। তারা বলে- আমি শুধু কয়েকজন মানুষের সঙ্গে কথা বলি, আমার শিক্ষক, আমার মা-বাবা, আমার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলি। আমি খাওয়া-দাওয়া ছেড়েই দিয়েছিলাম। এটা ছিল বড় একটা সমস্যা। সে সময় আমি অনেক ওজন হারিয়েছি; কেননা আমি কেবলই হতাশাগ্রস্ত ছিলাম। কোন কিছুই আমার কাছে আর ব্যাপার মনে হত না।

তবে এরপর আমি ফিরতে শুরু করি একটু একটু করে, ঠিক হওয়ার জন্য, ভালো অনুভব করার জন্য। এর পেছনে একটি কারণ ছিল কেননা আমি দেখলাম সেখানে আসলে অনেক জিনিস-ই আছে যেগুলো আপনি করতে পারেন। আমার বোধদয় হল যে আমিও কিছু একটা করতে পারি। আমার এখানে চুপচাপ বসে থাকা উচিত নয়। এরপর আমি ভালো বোধ করা শুরু করি এবং একজন জলবায়ু এক্টিভিস্ট হয়ে উঠি। এটা অনেকটাই সাহায্য করেছে। ভাবি, আমি যতটা যুক্ত হই, যতটা জলবায়ু আন্দোলনে যুক্ত হই, ততটাই ভালো অনুভব করতে থাকি, ততটাই সুখী বোধ করতে থাকি। কারণ অনুভব করি, আমি গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা করছি, অর্থবোধক কিছু একটা করছি।

পনের বছর বয়সে যখন গ্রিতা থুনবারি সুইডিশ পার্লামেন্টের সামনে প্রতিদিন অবস্থান নেন তখনকার অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন-

প্রথমে, বলছি প্রত্যেক স্কুল-ডে, শুধু শনিবার কিংবা রবিবার নয়। এভাবে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত তিন সপ্তাহের জন্য। এরপর আমার পরিকল্পনা ছিল নির্বাচনের পর থেমে যাওয়া। কিন্তু এরপর, শুক্রবার, ৭ সেপ্টম্বর, ওটা ছিল যখন ফ্রাইডেস ফর ফিউচার শুরু হয়; কেননা ভেবেছিলাম 'কেন চালিয়ে যাওয়া না?' কেন এখনই থেমে যাওয়া, যখন আমরা একটা সতিকারের ফল পেতে যাচ্ছি?' সুতরা এরপর আমি এবং আরো অনেক স্কুল-স্ট্রাইকার ভাবলাম আমাদের চালিয়ে যাওয়া উচিত এবং আমাদের এটা বলা উচিত- ফ্রাইডেস ফর ফিউচার এবং এটা শুক্রবারেই হওয়া উচিত।

কাঠের তৈরি একটা বিশাল সাইন নিয়ে গ্রিতা সংসদের সামনে দাঁড়ালেও প্রথম প্রথম সংসদ সদস্যরা ভ্রুক্ষেপ করে নি, বলেন তিনি।

তিনি ‘স্কুল স্ট্রাইক ফর ক্লাইমেট’ লেখা একটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে সেখানে অবস্থান করেন-

এরপর কিছু প্রচারপত্র বিলি করি- যাতে বলি, 'তোমরা বড়রা যা করতে বলো আমরা আসলে শিশুরা তা করি না। তোমরা যেমনটা আমরাও তেমনটা। যেহেতু আপনি আমার ভবিষ্যত সম্পর্কে কোন কর্ণপাত করছেন না, আমিও তোমাদের কথা শুনছি না। সুতরাং, আমি জলবায়ুর জন্য স্কুল ধর্মঘট করছি।' এরপরে আমি তথ্য-উপাত্ত লিখে রাখি যেগুলো মানুষের জানা উচিত বলে ভাবি। এভাবে অনেক সময়ও ব্যয় করি। প্রচারপত্র বিলি করি।

তবে প্রথম দিকে কেউ আমাকে খেয়াল করে নি। প্রত্যেকেই পাশ দিয়ে হেঁটে চলে গেছেন। এমন কি লোকজন সেখানে জড়ো হতে শুরু করেছেন, রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, তারা আমাকে দেখেন নি। এরপর একটা পর্যায়ে ব্যাপারটা হাস্যকর হয়ে যায়; একভাবে, কেননা আমি প্রথমে প্রত্যেক দিন তাদের দেখেছি এবং এরপর শুধু শুক্রবার এবং তারা কখনোই ‘হাই’ পর্যন্ত বলেন নি। কিছু সময় পর তারা 'হাই, গুড মনিং' বলতে শুরু করেন এবং আমিও 'গুড মর্নিং' বলি। তবে তারা আসলে বিষয়টাকে হাইলাইট করেন নি। এরপর এটা বিখ্যাত হয়ে যায়, যখন এটা বড় আকার ধারণ করে, তখন অবশ্যই তারা এর সুবিধাটা নেয় এবং বলেন 'আমরা গ্রিতাকে এবং স্কুল স্ট্রাইকারদের সমর্থন করি'। আরও অনেক কিছু। কেননা তারা সবসময় আপনার পাশে ছবি তোলার জন্য পোজ দেবেন যদি তারা দেখেন ব্যাপারটিতে তাদের লাভ আছে।

যখন আমি কোন বিষয়ে আগ্রহী হই, তখন ওই বিষয়টার ওপর অধিক মনোযোগী হয়ে উঠি। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতে পারি, কোন ক্লান্তি ছাড়াই পাঠ করতে পারি এবং এখনো আরও অনেক কিছু শিখতে আমি আগ্রহী। এই বিষয়টা খুবই সাধারণ অটিজম স্পেক্ট্রামে থাকা লোকদের ব্যাপারে। আমি ভেবেছি এর পেছনে কারণ যে জলবায়ু সমস্যা নিয়ে কথা বলা কয়েকজনের মধ্যে আমি একজন, কেননা আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারি না কেন লোকজন আগের মতো এখনো বলছে, ‘হ্যা, জলবায়ু পরিবর্তন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।' আমি এই ধরণের দ্বৈত নৈতিকতা বুঝে উঠতে পারি না, পার্থক্য হল আপনি যা জানেন এবং আপনি যা বলছেন এবং আপনি যা করছেন, কিভাবে সক্রিয় হচ্ছেন- এসবের মধ্যে। আমার জন্য এটাকে বলে কগন্যাটিভ ডিসোন্যান্স। আমি চলতে থাকি। যদি আমি কিছু করার সিদ্ধান্ত নেই তবে সেটা আমি করি।

স্পেক্ট্রামে থাকাটা পরাশক্তির। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

কেননা এটা আমাকে এমন জিনিস দেখতে সাহায্য করে অন্যরা নাও দেখতে পারে এবং এটা আমাকে ভিন্ন হতে সাহায্য করেছে, যাকে আমি মনে করছি একটি সমাজের ভেতর একটি পরাশক্তি; যেখানে প্রত্যেকে একই, যেখানে প্রত্যকে একই চিন্তা করে, প্রত্যেকে একই বিষয় দেখে, প্রত্যেকে একই জিনিস করে। সুতরাং আমি ভাবছি এটা হল এমন একটা কিছু যাতে গর্ববোধ করা যায় যে আপনি ভিন্ন। এই ধরণের একটি সংকটে আমাদের উচিত গণ্ডির বাইরে ভাবা। আমাদের দরকার গণ্ডির বাইরের বিষয় নিয়ে ভাববার। আমাদের বর্তমান সিস্টেমে আমরা যা আজ চিন্তা করছি তা প্রতিদিন চলতে দিতে পারি না। আমাদের প্রয়োজন যারা বাক্সের বাইরে চিন্তা করে, যারা এটাতে ভুগছে, কেননা তারা সুসমন্বয় পায় না যা তাদের প্রয়োজন এবং তারা সঠিক পরিস্থিতিতে বাস করছে না, যা আমি করি নি অনেকটা সময়ের জন্য।

নিজের জীবন এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে তার বক্তব্য-

তিন চার বছর আগে আমি বিমানে যাতায়াত বন্ধ করি কেননা সেটা বিশাল ব্যাপার মনে হয়েছিল, কারণ প্রভাব। আমি মনে করি ব্যক্তিগতভাবে, এটা এমন একটা বড় বিষয়- বিমান চলাচলে একটি বিশাল মাত্রার কার্বন ফুটপ্রিন্ট আছে। সুতরাং আমি সিদ্ধান্ত নিই আর বিমানে চড়বো না। অবশ্যই সেটা আমার পরিবারের অনেক সমস্যা ডেকে এনেছিল কেননা তারা আমাদের ছুটিতে যাওয়ার জন্য বলত এবং আরও অনেক কিছুই করত। সুতরাং, আমি ছিলাম এক ধরণের উত্তেজনা সৃষ্টিকারী। তবে আমি আসলে বোঝাতে পেরেছি- আমিও তাদেরকে অভিযুক্ত করেছি, প্রথম আমার মা এবং এরপর আমার বাবা, বোন। আমি একজন নিরামিষভোজী। আমি কেনাকাটা বন্ধ করে দিয়েছি। এর অর্থ হল আপনি নতুন জিনিস কিনছেন না, নতুন জিনিস ভোগ করছেন না যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনাকে করতেই হচ্ছে। এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জিনিস আমি প্রতিদিন জীবনে করে থাকি, এক্টিভিজমের বাইরে এবং সমস্যাকে তুলে ধরার বাইরে।

নিরামিষ আহার ভোজন বিষয়ে তার ব্যাখ্যা-

যেমন ধরুন, আমি মাংস খাই না। কোন প্রাণীজাত পণ্য ব্যবহার করি না। এনিমেল প্রোডাক্ট ব্যবহার না করার পেছনে রয়েছে নৈতিক, পরিবেশগত এবং জলবায়ুগত কারণ।

পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে-

হয় আমি সেকেন্ড-হ্যান্ড পোশাক কিনি অথবা অন্য কারো কাছ থেকে নিই কিংবা আমি শুধু আমার পোশাকই রেখে দেই, হয়তো বোনের পোশাকও ব্যবহার করি কিংবা মায়ের বা বাবার পোশাক।

পোলান্ডে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে তার বক্তব্যের সেই ভিডিও ক্লিপ বিষয়ে বলেন,

আজ আমরা প্রতিদিন ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার করি। এটাকে পরিবর্তনের কোন রাজনীতি নাই। তেল মাটিতে রাখতে সেখানে কোন আইন নাই। সুতরাং আইনের চাল মেরে আমরা আর পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারছি না, কেননা স্বয়ং আইনকে পরিবর্তন করতে হবে। আমরা এখানে বিশ্ব নেতাদের কাছে আমাদের ভবিষ্যতের জন্য ভিক্ষা চাইতে আসি নি। তারা আমাদের অতীতে উপেক্ষা করেছে, তারা আবার আমাদের উপেক্ষা করবে। আমরা এখানে এসেছি তাদের জানিয়ে দিতে যে পরিবর্তন আসছে, তারা পছন্দ করুক আর নাই করুক। মোকাবিলা করতে মানুষ উঠে দাঁড়াবে। যেহেতু আমাদের নেতারা শিশুদের মত ব্যবহার করছে, আমাদের দায়িত্ব নিতে হবে যা তারা অনেক আগেই নিয়েছিল।

পনের বছর বয়সী গ্রিতার সেই বক্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন-

এটা সব সময় ফান। কেননা আমি জানি না যেভাবে আমি কথা বলেছি- এটা ছিল একটা দুর্দান্ত রেডিক্যাল জিনিস। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের সামনে এটা খুবই রেডিক্যাল জিনিস। আমি সেই বক্তব্য মনে করতে পারি। আগে আমি একটা বক্তব্য প্রস্তুত করেছিলাম এবং আমার বাবা এটা পড়েছে। তিনি ছিলেন অনেকটা এমন- ‘তুমি এটা বলতে পার না। এটা খুবই রেডিক্যাল। তুমি নিজেকে বিব্রত করবে এবং প্রত্যেককে বিব্রত করবে, সুতরাং তুমি এটা বলতে পার না।’ এরপর আমি শুধু বলেছি- 'ওকে'।

নিয়ম-কানুনের চাল দিয়ে আর আমরা পৃথিবীকে বাঁচাতে পারি না। আমি বোঝাতে চাই এভাবে- ‘কেন আমি ভবিষ্যতের জন্য পড়ালেখা করবো যে ভবিষ্যত সম্ভবত আর থাকছে না?’ লাইনটা অনেকটা এরকম ছিল। সুতরাং আমি এটা কেটে ফেলি যাতে তিনি (বাবা) এটা দেখেন এবং শান্ত হন, কেননা তিনি ছিলেন খুবই দুশ্চিন্ত। এরপর, অবশ্যই, আমি সে সব শব্দ-বাক্য আমি মুখস্ত করে ফেলি, যাতে বক্তব্য দেয়ার সময় এটা বলতে পারি।

পোলান্ড থেকে শুরু করে তিনি ইউরোপীয় পার্লামেন্টসহ আরও অনেক বৈশ্বিক সংস্থায় বক্তব্য দিয়েছেন-

আমি সেখানে ট্রেন করে গিয়েছিলাম। আমি মনে করতে পারি বক্তব্যটার কারণে, আগের রাতে বক্তব্যটা আমাকে পুনরায় লিখতে হয়েছিল, কেননা সন্ধ্যার আগে নটরডেমে আগুন ধরেছিল এবং আমি ভেবেছি আমাকে বিষয়টা বক্তব্যে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। আমাকে করতে হয়েছিল- এটা ছিল একটা স্ট্রেসফুল রাত। তবে এটা ছিল সেই বক্তব্য, যে বক্তব্যের মাঝে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম, কেননা এটা ছিল অনেক বেশি আবেগপ্রবণ। আমি কথা বলছিলাম জীব-বৈচিত্র্য এবং বনের হ্রাসপ্রাপ্ততা নিয়ে, সমুদ্রের অম্লীকরণ নিয়ে এবং আরও অনেক কিছু। তখন হঠাৎ আমি বিমর্ষ হয়ে পড়ি।

ওই ক্লিপ সম্পর্কে-

আমাদের মহান বন উজাড়করণ, বিষাক্ত বায়ু, পতঙ্গ এবং বন্যপ্রাণীর ক্ষয়, আমাদের সমুদ্রের অম্লীকরণ, এসব হল ধ্বংসাত্মক প্রবণতা, আমাদের জীবন পদ্ধতি দ্বারা ত্বরাণিত, বিশ্বের আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পৃথিবীর জীবন পদ্ধতি দ্বারা গতিবেগ প্রাপ্ত এবং এই-ই চালিয়ে যাওয়াটা আমাদের অধিকার হিসেবে দেখি।

এরপর তিনি রোম যান। পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইতালিয়ান সিনেটে যান। পরে লন্ডনে। পোপের সঙ্গে কথোপকথন নিয়ে তিনি বলছেন-

তিনি এ ব্যাপারে খুবই স্পষ্টভাষী। আমি ভাবি এটা ভাল যে তিনি এ নিয়ে কথা বলছেন। তিনি ছিলেন খুবই সহায়ক ব্যক্তি। তিনি বলেন আমার উচিত এটা চালিয়ে যাওয়া। হ্যা, খুবই দুর্দান্ত ছিল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। আমি খুবই সম্মানিত হয়েছি এটা করার সুযোগ পেয়ে এবং তার সঙ্গে কথা বলে।

গ্রিতা প্রায়শই বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের কাছে পরামর্শ চান। একটা বিষয় কীভাবে ব্যাখ্যা করবে সে বিষয়ে, জটিল বৈজ্ঞানিক বিষয়ে জানতে চান। কোন ভুল বোঝাবুঝি হবে কিনা সে সব বিষয়েও পরিস্কার থাকেন। বিজ্ঞানীরা তাকে সাহায্য করেন। তার বক্তব্য পড়েন। তথ্য-উপাত্ত ভুল হলে সমাধান করে নেন। সাক্ষাতে কথা বলা ছাড়াও ই-মেইল, সংক্ষিপ্ত মেসেজ সার্ভিসের আশ্রয় নেন এই জলবায়ু অ্যাক্টিভিস্ট।

ক্লাইমেট জাস্টিস বা জলবায়ু সংক্রান্ত ন্যায়বিচার সম্পর্কে গ্রিতার মতামত-

এটাকে আপনি বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। তবে অবিশ্বাস্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি হল যারা জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী তারা হলেন প্রায়শই সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত, অপরদিকে; যারা সংকটের পেছনে খুবই কম দায়ি তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে, অবশ্যই আমাদেরকে সেসব মানুষদেরকে সাহায্য করতে হবে।

গ্রিতা সারাবিশ্বে ঘটমান আন্দোলনটির প্রেরণাদায়ী একজন। ব্রিটেনের পার্লামেন্টে গ্রিতা বক্তব্য দেন। বক্তব্য দেন এক্সটিঙ্কশন রিবেলিয়ন প্রতিবাদে-

আমরা এখন বাঁচা-মরার সংকটের মুখোমুখি হয়েছি; জলবায়ু সংকট এবং পরিবেশগত সংকট। এ সংকট আগে কখনো সংকট হিসেবে দেখা হয় নি। তারা দশকের পর দশক ধরে আমাদের উপেক্ষা করে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতিবিদরা এবং ক্ষমতাসীনরা জলবায়ু সংকট এবং পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা করা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। তবে আমরা নিশ্চিত করবো তারা আর কখনো পার পেয়ে যেতে পারবে না। এক্সটিঙ্কশন রিবেলিয়নের সত্যিকারের একটা প্রভাব রয়েছে। আমি মনে করি, আমাদের আলোচনায়, বিশেষ করে ইউরোপে, তারা সিভিল ডিসোবিডিয়েন্স প্রয়োগ করছে, কেননা তারা বলছে, ‘এছাড়া আমরা আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারবো না।’ সেটা খুবই কার্যকর।

তারা কি করছে সেটা দেখাও একটা দুর্দান্ত ব্যাপার। এটাসহ ফ্রাইডেস ফর ফিউচার এবং আরো অনেক আন্দোলন, অন্য জলবায়ু এবং পরিবেশগত আন্দোলনগুলো- আমি মনে করি আমার একসঙ্গে খুবই ভালো কাজ করি। ভাবছি, আমরা একসঙ্গে এটাকে একটা অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। অনুভব হচ্ছে, মানুষ ধীরে ধীরে জেগে উঠছে এবং মানুষের কাছে এটা জরুরী হয়ে উঠছে। সুতরাং, আমি মনে করি এটা খুবই ভালো। অবশ্যই, এটাই যথেষ্ট নয়। অবশ্যই, এটা খুবই ধীর। তবুও এটা কিছু একটা।

গ্রিতা নৌকা করে নিউইয়র্কে পৌঁছেন জাতিসংঘ জলবায়ু অ্যাকশন সামিটে যোগ দেয়ার জন্য। দূষণমুক্ত পালতোলা নৌকা ছিল সেটি। কালো পাল তোলা নৌকায় তিনি লিখেন, ‘বিজ্ঞানের সঙ্গে সংযুক্ত হও’।

সিয়াটল ভিত্তিক আমাজন শ্রমিকদের নিয়ে তিনি একটি টুইট করেন যারা প্রথমবারের মতো ২০ সেপ্টেম্বর ধর্মঘট করেন। সে সম্পর্কে গ্রিতা জানাচ্ছেন-

আমার কাছে এবং আন্দোলনের কাছে এটা অবিশ্বাস্যভাবে অনেক কিছু; কেননা আমাদের অনেক ইউনিয়ন আছে যারা ধর্মঘটের পরিকল্পনা করছে। সুতরাং, আমি যা বোঝাতে চাই তা হল বয়স্করাও ধর্মঘট করছে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি শুধু শিশু বা কিশোরদের জন্য নয়। এটা সবার জন্য। আমরা যা করছি, বা করছি না, অবশ্যই- আমি বলতে চাই, আমরা ধর্মঘট করছি সিস্টেমকে তছনছ করে দিতে, মনোযোগ কাড়তে। আমি আশা করছি এটা ভালোভাবে হোক।

তরুণদের প্রতি গ্রিতা থুনবারির বার্তা হল-

সারাবিশ্বের তরুণদের প্রতি আমার বার্তা হল ঠিক এই মুহূর্তে আমরা একটি টিকে থাকা বা না থাকার হুমকির মধ্যে রয়েছি। মানে, জলবায়ু এবং পরিবেশগত সংকট ভবিষ্যতে আমাদের জীবনে ব্যাপক মাত্রায় প্রভাব বিস্তার করবে। তবে, এ প্রভাব এখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের মধ্যে ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। আমি ভাবছি, আমাদের জাগ্রত হওয়া জরুরী এবং আমাদের উচিত বয়স্কদেরও জাগানো; কেননা তারা হলেন তাদের মধ্যে অন্যতম যাদের প্রজন্ম এই সংকটের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ি এবং আমাদের প্রয়োজন তাদেরকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা।

আমাদের প্রয়োজন যারা ক্ষমতায় আছে তাদের জবাবদিহির মধ্যে রাখা। ক্ষমতায় যারা আছে তাদের জবাবদিহি করতে হবে তারা আমাদের প্রতি কি করছে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য কি করছে, পৃথিবীর প্রাণীকুলের জন্য কি করে যাচ্ছে। আমাদের প্রয়োজন বিক্ষুদ্ধ হওয়া। আমাদের প্রয়োজন আসল ঝুঁকিটা বুঝতে পারা। এরপর আমাদের প্রয়োজন সেই ক্ষুদ্ধতাকে অ্যাকশনে রুপান্তর করা। আমাদের প্রয়োজন যুথবদ্ধভাবে দাঁড়ানো এবং কখনোই ছেড়ে দেওয়া না।

বাংলা/এনএডি

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.2818 seconds.