• ০৪ জানুয়ারি ২০২০ ১৩:২১:১৫
  • ০৪ জানুয়ারি ২০২০ ১৩:২১:১৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

অস্ট্রেলিয়ার দাবানল ও আমাদের লাভ-লোভের অন্ধত্ব

ছবি : সংগৃহীত

হিল্লোল দত্ত :


দাবদাহে জ্বলছে অস্ট্রেলিয়া। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ছুঁয়েছে প্রায় হাফ সেঞ্চুরি। নাগরিকেরা অতিষ্ঠ। কাটা ঘায়ে এসিডের স্রোত হিসেবে এর বনাঞ্চলে দেখা দিয়েছে দাবানল।

এরই মধ্যে এই ভয়াবহ খাণ্ডবদাহনে পুড়েছে প্রায় ১.৫ কোটি একর। ২০১৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় যতটা জায়গায় দাবানল লেগেছে, এটা তার প্রায় তিনগুণ। ২০১৯-এ আমাজনে আগুন লেগে যতটা বন পুড়ে গেল, তার প্রায় ছয়গুণ এটা। 

ক্যানবেরা শহর নববর্ষের দিন বিশ্বের সবচাইতে দূষিত বায়ু ধারণ করেছিল কারণ আগুনের ধোঁয়া আকাশে প্রায় ইউরোপ মহাদেশের আয়তন নিয়ে ছড়িয়েছিল। আগুন লাফিয়ে উঠেছিল প্রায় কুড়ি তলা দালানের সমান উঁচু হয়ে, লেলিহজিহ্বা সে-আগুন গ্রাস করেছে এখনো অবদি ১৮ জন মানুষের প্রাণ, আশঙ্কা আরো অনেক মৃত্যুর।

ভিক্টোরিয়া আর নিউ সাউথ ওয়েলসের দক্ষিণভাগে ছড়ানো এই আগুনে গত সেপ্টেম্বর থেকে যতজন প্রাণী পুড়ে বা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বা অন্য কোনোভাবে মারা গেছে, ইউনিভার্সিটি অব সিডনির বাস্তুসংস্থানবিশারদদের মতে, তার সংখ্যা প্রায় ৪৮ কোটি। এর হাজার ভাগের এক ভাগ বা আরো অনেক মানুষ মরলেও সেটা গণহত্যা হয়।

এখানেও রাজনীতি আছে অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে। অস্ট্রেলিয়ার ক্ষমতাসীন নেতারা বরং বাঁচাতে চাইছেন তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক, কয়লা ও তেলব্যবসায়ীদের। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সেই ১৯৯৬ সাল থেকে তারা হাত মিলিয়ে লড়ছে, এবং জিতেছে, পরিবেশবাদীদের বিপক্ষে। সুফল ফলেছে। অস্ট্রেলিয়া এখন পৃথিবীর তেল ও কয়লার প্রধান রপ্তানিকারক। তাতে করে তারা জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে ব্যবস্থাগ্রহণকারী দেশের তালিকায় নেমে এসেছে ৫৭ নম্বরে, ৫৭টা দেশের ভেতরে। কিন্তু, গুরুজি বলেছেন, ‘টঙ্কাহি কেবলম বা অহম ব্রহ্মাস্মি’!

অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিবিদেরা এ ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলেছেন। গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি যখন বিস্ফোরিত হচ্ছে আগুন, তখন বিরোধী লেবার দলের নেতা কয়লাখনি ভ্রমণ করে কয়লা শিল্পের প্রতি তাঁদের কঠোর সমর্থন ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বেড়াতে গেছেন হাওয়াইতে। উপপ্রধানমন্ত্রী মাইকেল ম্যাককরমাক অবশ্য এই আগুনের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের বদলে দায়ী করছেন ঘোড়ার শুকনো বর্জ্যের বিস্ফোরণকে। ধারণা করা হচ্ছে, সারা অস্ট্রেলিয়ার এক-তৃতীয়াংশ এই দাবানলে আক্রান্ত।

লোকজন প্রশ্ন তুলছে প্রশাসনের অকর্মণ্যতা ও মূল সমস্যাকেন্দ্রের হাত থেকে দূরে-থাকার স্বেচ্ছাকৃত প্রবণতা নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী হাওয়াইয়ের অবকাশ থেকে দ্রুত ফিরে অগ্নিকাণ্ডে উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শনে গেলে একজন দমকল কর্মী তাঁর সাথে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানান এবং আরো ক’জন ঘৃণা ছুঁড়ে দেন তার দিকে।

জলবায়ু বদলে যাচ্ছে। প্রকৃতি আমরা কলুষিত করেছি। দায়ভার আমাদেরই চোকাতে হবে। ভারসাম্য রক্ষার বদলে আমরা প্রকৃতি নৃশংসভাবে নিংড়ে নিজের ও পরের প্রজন্মের জন্যে একটি ভয়ঙ্কর বোমা রেখে যাচ্ছি। আমাদের লোভ, আমাদের অপরাজনীতি, আমাদের লাভের অন্ধত্ব, আমাদের বিলাসিতার নির্লজ্জতা, আমাদের অপচয়ের পরিণাম আমাদের সামনে ফুটে উঠছে দগদগে ঘা হয়ে। ক্যালিফোর্নিয়ার বা অস্ট্রেলিয়ার দাবানল, পেইচিঙের বা ঢাকার বায়ুদূষণ, উড়িষ্যার বা লুইজিয়ানার ঘূর্ণিঝড় এসবেরই পরিণতি। তার ওপর বিশ্বনেতাদের গাঁড়লের মত আচরণ, যুদ্ধপ্রেমীদের উল্লাস, কমলা বেবুনটার ইরানের জেনারেল কাশেম সোলাইমানিকে হত্যার মূর্খতা শুধু মানুষের কষ্ট ও মৃত্যুই ত্বরান্বিত করবে।

পৃথিবীতে এর আগেও অনেকবার গণবিলুপ্তি ঘটেছে প্রাণীদের। এবার চলমান ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির পরেও আবারো প্রাণের বিস্তার ঘটবে। মানুষ না-থাকলেও পৃথিবী থাকবে। মানুষ না-থাকলেই পৃথিবী অনেক ভালো থাকবে!

[লেখাটির অনেক তথ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের ৩ জানুয়ারি, ২০২০-এর ঔপন্যাসিক রিচার্ড ফ্ল্যানাগানের লেখা থেকে নেওয়া।]

লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

বাংলা/এসএ

 

সংশ্লিষ্ট বিষয়

দাবানল লাভ লোভ অন্ধত্ব

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0195 seconds.