• ০৬ জানুয়ারি ২০২০ ১৫:০৮:১১
  • ০৬ জানুয়ারি ২০২০ ১৫:০৮:১১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ইসরায়েল যেভাবে খুন করে ইরানের বিজ্ঞানীদের

মানসুরেহ্ কারামি। ছবি : সংগৃহীত

উপরের ছবিটি ইরানের নিউক্লিয়ার সায়েন্টিস্ট মাসুদ আলী মোহাম্মদীর স্ত্রীর মানসুরেহ্ কারামির।
বিজ্ঞানী মোহাম্মদী হলেন ইসরায়েলের হাতে খুন হওয়া প্রথম ইরানি পরমানু বিজ্ঞানী। ইরানিদের প্রথম ‘পরমানু শহীদ।’

এই লেখা আগেও একবার লিখেছি। আবারও উল্লেখ করছি এ কারণে যে, ইসরায়েলের বাধার মুখে মুসলমানপ্রধান দেশগুলোতে সমরবিদ্যা আয়ত্ত করা কত দূরূহ হয়ে আছে। জেনারেল সোলাইমানির মৃত্যুর পর কাহিনীটি জানাবোঝা আবারও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

আমাদের এই গল্পের নায়ক মোহাম্মদী প্রকাশ্যে কোয়ান্ট্রাম ফিজিক্স পড়াতেন। কিন্তু গোপনে স্বদেশের পারমানবিক গবেষণাতেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর এই কর্মজীবনের হদিস জানতেন না এমনকি তাঁর মা-ও। শত্রুর দৃষ্টি এড়াতে ফিজিক্সের নানান বিষয়ে বহু পেপার দিতেন তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ক্ষমতাসীনদের বিরোধী রাজনীতিবিদরা যে বিষয়টি জেনে গেছে সেটা টের পেতেন তিনি। ২০০৯-এ হজ্বে যেয়ে আলী মোহাম্মদী বুঝতে পারেন তাঁকে অনুসরণ করা হচ্ছে এবং তাঁর ছবি তোলা হচ্ছে গোপনে। এরপর থেকে তিনি অপহরণের ভয় পাচ্ছিলেন।

স্ত্রী মানসুরেহ্’র ভাষ্য মতে, ২০১০ সালের সেদিনটিতে সকালে নাস্তা খেয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় তিনবার গুডবাই বলেছিলেন মোহাম্মদী। মোহাম্মদী গাড়িতে উঠছিলেন আর মানসুরেহ্ গেইট বন্ধ করছিলেন--এমন সময় গাড়িটি বিস্ফোরিত হলো।

গাড়ির পাশে ছিল একটি মোটরসাইকেল। তাতেই বাঁধা ছিল রিমোট কন্ট্রোল বোমাটি। একজন ইরানিই এ কাজটি করেছিলেন। ওই টিমেরই একজন ছিলেন মাজিদ জামালি ফাঁসি। যাকে কর্তৃপক্ষ আটক করতে সক্ষম হয়।

পরবর্তীকালে মাজিদের সাক্ষাতকার থেকে জানা যায়, প্রশিক্ষণকালে মোশাদ তেলআবিবের প্রশিক্ষণ সেন্টারে আলী মোহাম্মদীর বাড়ি ও রাস্তার হুবহু একটা সেট তৈরি করে দুটি ইরানি মোটরবাইক দিয়ে তাদের দিনের পর দিন প্রশিক্ষণ দিয়ে শিখিয়েছিল- কী করতে হবে।

২০১২-এর ১৬ মে মাজিদ ফাঁসির মৃত্যুদন্ড কার্যকরের আগে মোহাম্মদীর স্ত্রী কারামি স্বয়ং কারাগারে মাজিদের সঙ্গে দেখা করে পুরো বিবরণটি শুনছিলেন। যা ছিল এক বিরল ঘটনা। কারামির ভাষায়, ‘ঘটনার বিবরণ যখন শুনছিলাম তখন প্রতিশোধের নানান উপায়ের কথাই কেবল ভাবছিলাম আমি।’

বিখ্যাত ‌'টাইম' ম্যাগাজিন ২০১২-এ তাদের এক অনুসন্ধানে নিশ্চিত করে যে, মাজিদ ফাঁসির বিবরণ ‘অনেকাংশে সত্য।’ ফাঁসি ছিলেন তার মতো ১০ জনের টিমের একজন।

মোহাম্মদীর মৃত্যু তাৎক্ষণিকভাবে ইরানের বিজ্ঞানীসমাজে শোকের আবহ তৈরি করে। ছড়িয়ে দেয় ভীতিও। সেই ভীতি অমূলক ছিল না। মোহাম্মদীর মৃত্যুর পর কিছু ইজরায়েলী এজেন্ট ধরা পড়লেও ইরান তার বিজ্ঞানীদের খুন হয়ে যাওয়া থামাতে পারেনি। কারণ মাঠ পর্যায়ের ‘হিটম্যান’ হিসেবে অপারেটিভ মাজিদ ফাঁসির মতো কয়েকজন ধরা পড়লেও মূল পরিকল্পকরা রয়ে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

২০১০-এর পরবর্তী ৫ বছরে মোট চার জন বিজ্ঞানীকে হারায় তারা-- যারা ইরানের পারমানবিক স্থাপনাগুলোর সঙ্গে কোননাকোনভাবে যুক্ত।

মৃতদের মধ্যে ছিলেন দারিউশ রেজা এনিজাদ, মাজিদ শাহরিয়ারী, মোস্তফা আহমেদি রওশন প্রমুখ। এদের মধ্যে দারিউশকে মারা হয় গুলি করে। আর সবাই মোহাম্মদীর মতোই গাড়ি বোমায় মারা গেছেন। গাড়িগুলো যখনি জ্যামে আটক থাকতো তখন মটর সাইকেলে আসা ঘাতকরা সবার অলক্ষ্যে তাতে উচ্চপ্রযুক্তির রিমোট কন্ট্রোল বোমা বেঁধে দিত।

বর্তমানে এই বিজ্ঞানীরা সবাই ইরানে জাতীয় বীরের সম্মান পেয়ে থাকে। এদের প্রত্যেকের মৃত্যুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে থাকে ইরান।

বাস্তবে এটা ছিল এক কোবাট অপারেশন। খুন হলো এই গোপন অধ্যায়ের শেষ অস্ত্র। এর আগে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তথ্য পাচার, কম্পিউটারে Stuxnet ছড়িয়ে দেয়া, বিজ্ঞান চর্চা কেন্দ্রগুলোতে রহস্যময় বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো ইত্যাদি নানানভাবে ইরানকে থামাতে চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাইভেট ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি Stratfor এর এক কর্মকর্তা রেভা বাল্লার ভাষায় (দ্য টেলিগ্রাফ, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯), শেষ পদক্ষেপটির লক্ষ্য ছিল একটাই: ‘মূল লোকগুলোকে সরিয়ে ফেলা’। রেভা স্পষ্টতই ওই সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন, এ কাজে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পেয়েছিল ইজরায়েল। তবে ওবামার শেষ বছরগুলোতে সেই সহায়তায় টান পড়ে।

ইরান তার পারমানবিক কর্মসূচিতেযুক্ত বিজ্ঞানীদের নাম গোপন করার চেষ্টা করলেও ইসরায়েলের হাতে সেসব কীভাবে পৌঁছাতো সে নিয়েও আছে বিস্তর কাহিনী। খুন হয়ে যাওয়া বিজ্ঞানীদের অধিকাংশেরই নাম ইসরায়েলের হাতে যায় ইন্টারন্যাশনাল এটমকি এনার্জি এজেন্সির মাধ্যমে। ওই সংস্থার মনোনীতরা জাতিসংঘের সিদ্ধান্তমতো ইরানের পারমানবিক স্থাপনা পরিদর্শন করতো ও ইরানী বিজ্ঞানীদের সংগে কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতো। কিন্তু পরে এদের থেকে সিআইএ বিজ্ঞানীদের নামগুলো পেয়ে যেত। সিআইএ’র এরকম একজন অপারেটিভকে ইরান পরে শনাক্ত করতে সমর্থ হয়।
[এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন নীচের লিংকে]

উপরোক্ত কাজে ইসরায়েলকে পাকিস্তান-ইরান সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় সংগঠন ‘জুন্নদুল্লাহ’ও বিশেষ সহায়তা দিতো। নিহত ইরানী বিজ্ঞানীদের অন্তত একজন ওই দেশের সরকারকর্তৃকই নিহত- এমন দাবিও করেছে ইসরায়েলের গণমাধ্যম। তবে নিরপেক্ষ কোন সূত্র দ্বারা তা কখনোই সমর্থিত হয়নি।

ইরান পুরো বিষয়টি তথ্য-প্রমাণসহ জাতিসংঘকেও দিয়েছে। উপরন্তু শহীদদের তালিকা দীর্ঘতর হলেও এবং অর্থনৈতিক অবরোধের মাঝেও তারা ‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ’ চালিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়। দেশটি পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলছে এটাই ছিল ইসরায়েলের প্রচারণা ও ভয়। আর এই ভয় দেখিয়ে তারা কোবাট অপারেশনে যুক্তরাষ্ট্রকেও যুক্ত করতে ফেলেছিল।

অন্যদিকে, ইরান নিজেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একই স্টাইলে কিছু প্রতিশোধমূলক কার্যক্রমে নেমেছিল বলে অনুমান করা হয়। যেমন, ২০১২-এর ফেব্রুয়ারিতে দিল্লিতে ইসরায়েলের ডিফেন্স এটাচের বৌয়ের গাড়িতে এমন একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে যা ঠিক ইরানি বিজ্ঞানীদের হত্যার কাজে ব্যবহৃত বোমার মতোই ছিল। একই দিন জর্জিয়ার তিবলিশে ইজরায়েল এম্বেসির সামনের একটা গাড়িতেও অনুরূপ বোমা লাগানো ছিল- যদিও তা সময় মতো বিস্ফোরিত হয়নি।

[http://www.payvand.com/news/13/jan/1163.html]
[http://world.time.com/…/mossad-cutting-back-on-covert-oper…/]

লেখক : গবেষক ও সাংবাদিক।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ইসরায়েল ইরান বিজ্ঞানী

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0221 seconds.