• বিদেশ ডেস্ক
  • ০৬ জানুয়ারি ২০২০ ১৫:৩৮:৩৩
  • ০৬ জানুয়ারি ২০২০ ১৫:৪১:০৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মার্কিন জোটের ক্ষতি থামাতে অ্যাসাঞ্জকে মুক্তি দেয়ার পরামর্শ

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। ছবি : সংগৃহীত

কারারুদ্ধ উইকিলিস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে বহি:সমর্পন কার্যক্রম ত্যাগ করতে ট্রাম্প প্রশাসনকে চাপ দিতে অস্ট্রেলিয়া সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বব কার। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র মিলিটারি এবং গোয়েন্দা জোটের প্রতি জনতার সমর্থন আরও ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কার কথাও তিনি জানান।

৪ জানুয়ারি নাইন মিডিয়ায় (পূর্বে ফেয়ারফ্যাক্স) প্রকাশিত কার-এর এই আহ্বান শ্রদ্ধাবনত ভাষায় ব্যক্ত হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ক্যানবেরা হল ওয়াশিংটনের একটি ‘ভালো মিত্র’, পারস্য উপসাগরে যুদ্ধজাহাজ প্রেরণ, ইরানের সঙ্গে বিরোধের ঝুঁকি এবং যোগাযোগের দুটি ঘাঁটি যা অস্ট্রেলিয়ান অঞ্চলটিকে সম্ভবত পারমানবিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে...

“সবাই বলছে, আমরা অন্তত একটি বিনীত অনুরোধের অধিকারী: যে চেতনায় বারাক ওবামা চেলসি ম্যানিংকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং মরুভূমির বালুচরে 'অন্তহীন যুদ্ধের' ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজের আপত্তি জানিয়েছেন, সবচেয়ে ভাল হত যদি অ্যাসাঞ্জের হস্তান্তরের বিষয়টি চুপচাপভাবে বাদ দেয়া হয়।”

আর যাই হোক কার এর বক্তব্য হচ্ছে, অ্যাসাঞ্জের মুক্তির দাবি ক্রমেই জনপ্রিয় হওয়ার ব্যাপারে খোদ শাসক শ্রেণির মধ্যে একটি সতকর্তার সঙ্কেত। সেটা আন্তর্জাতিকভাবে এবং অস্ট্রেলিয়ার জন্যও।

যুক্তরাষ্ট্রের একজন জীবনব্যাপী মিত্র হয়ে তিনি বিশেষ করে সতর্ক করেন, অ্যাসাঞ্জের চিকিৎসার বিষয়টি বিপদজনকভাবে দেশটির প্রতি সমর্থন কমিয়ে দিচ্ছে। আমেরিকাপন্থী থিঙ্কট্যাঙ্ক লোয়ি ইনস্টিটউটের এক জরিপের উল্লেখ করেন তিনি। এতে জোটটির প্রতি সমর্থন '৭৮ শতাংশ থেকে কমে ৬৬ শতাংশ হয়েছে এবং কেবল ২৫ শতাংশ অস্ট্রেলিয়ানদের মধ্যে আস্থা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্টের প্রতি। আর ২৯ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ানদের মধ্যে সেটা একেবারেই নেই।'

বিশ্বের যে কোনও সাংবাদিককে হস্তান্তর করার অধিকার সম্পর্কে ওয়াশিটনের নগ্ন দাবি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কার। 'যদি আমেরিকান প্রস্তাব সফল হয়, এই বহিরাঞ্চলে পৌঁছানোর ব্যাপারটি ২০২০ সালের যেকোন সময়ে ঘরে টেনে আনা হবে যখন আমরা অ্যাসাঞ্জকে শেকলে বাঁধা দেখবো, ভাজিনিয়ায় উড়িয়ে নেয়ার জন্য ব্রিটিশ বিমানবন্দর পেরিয়ে একটি সিআইএ বিমানের দিকে নিতে দেখবো।

২০১২ সালের মার্চ থেকে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে লেবার পার্টির ধ্বস নামা পর্যন্ত কার ছিলেন গত লেবার সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিপদ হচ্ছে, অ্যাসাঞ্জকে একজন 'শহীদে' পরিণত করা হচ্ছে ঠিক ড্যানিয়েল এলসবারির মতো যিনি ১৯৭১ সালে পেন্টাগনের দলিলপত্র ফাঁস করে দিয়েছিলেন। ওইসব নথিপত্র ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরম্পরাগত যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের মিথ্যাচার এবং যুদ্ধাপরাধকে ফাঁস করে দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছিল যা প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল।

'আমেরিকান আদালতে একটি লড়াইয়ের পর, উদারবাদী মিডিয়া যেটাকে আরেকজন ড্যানিয়েল এলসবারিতে রূপান্তরিত করে একটি মুক্তির ইস্যু হিসেবে সংজ্ঞা দিয়েছিল, এরপর এই অসি বাউন্ডুলের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ আদালতে এক বছরের বিচার চলা জোটের সম্পর্কে ঝুঁকির বিষয়টি কতটা ভাল', কার লিখেছেন।

২০১২ সালে ইকুয়েডরে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে জামিন এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাসাঞ্জের সাজা শেষ হওয়া সত্ত্বেও, সুইডেনের প্রত্যর্পণ এবং সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরণ এড়াতে তিনি লন্ডনের বর্বর বেলমার্শ কারাগারে বন্দী রয়েছেন। তাঁকে নির্জন কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে। একটি মানসিক নির্যাতন এবং তার জীবনের প্রতি হুমকি হিসেবে বৈশ্বিকভাবে চিকিৎসকরা এবং জাতিসংঘের অত্যাচার বিষয়ক প্রতিনিধি নিলস মেলসার নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন।

এলসবারির মতো অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্র গুপ্তচরবৃত্তি আইনের অধীনে অভিযোগের মুখোমুখি করা হতে পারে যা তাকে সারাজীবনের জন্য বন্দী করে রাখবে যদি না তাকে ফাঁসির কাষ্টে ঝোলানো হয়। এলসবারি শেষে কারাবাস এড়াতে সক্ষম হন যখন নিক্সন প্রশাসন কর্তৃক তার মেডিকেল ফাইলপত্রের অবৈধ বাগিংয়ের কারণে ফেডারেল বিচারক একটি ভুল বিচার হিসেবে ঘোষণা করেন।

পেছনে রয়েছেন তরুণ মার্কিন সেনা চেলসি ম্যানিং, যিনি উইকিলিসকে হাজার হাজার মারাত্মক সব নথিপত্র দেয়ার অভিযোগে দণ্ডিত হন। এতে ছিল আফগানিস্তানে এবং ইরাকে মার্কিন যুদ্ধাপরাধের নথি এবং সারা বিশ্বে তাদের গণতন্ত্রবিরোধী হস্তক্ষেপের নথিপত্র। কার এর বক্তব্যের বিপরীতে, সাত বছর ধরে সামরিক কারাবাসের পরও ওবামা প্রশাসন তাকে ক্ষমা করে দেয় নি, কেবল তার সাজা প্রত্যাখান করেছিল। এই বিষয়টি তাকে ফের কারাবন্দী করার জন্য উন্মুক্তই থেকেছিল- এখন অনিশ্চিতভাবে- তাকে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করার চেষ্টার করা হতে পারে।

বিপরীতমুখী রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে কার এর মিডিয়া কলামটি আরো বেশি অসাধারণ। বিদেশমন্ত্রী থাকাকালীন কার বারবার অ্যাসাঞ্জকে রক্ষা করতে অস্বীকার করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, জুলিয়া গিলার্ডের গ্রিনস-সমর্থিত লেবার সরকার কর্তৃক অ্যাসাঞ্জের অত্যাচারে ওয়াশিংটনকে যে সহায়তা দেয়া হয়েছিল, তাতে তিনি মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন।

গত দশকে একজন অস্ট্রেলীয় নাগরিক হিসেবে অ্যাসাঞ্জের পক্ষে আইনী এবং কূটনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকারগুলোর ধারাবাহিক অস্বীকৃতিপবে গিলার্ড সরকার অগ্রগামী ভূমিকা নিয়েছিল। গিলার্ড প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, উইকিলিকসের উদঘাটনগুলো ছিল 'অবৈধ' এবং অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব কঠোর গুপ্তচরবৃত্তি এবং দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইনের অধীনে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের জন্য একটি ব্যর্থ তদন্ত শুরু করেছিল।

একটি ব্যাকরুম ক্যু'য়ের ফলে কেভিন রুডকে তাড়িয়ে ২০১০ সালের মাঝামাঝিতে গিলার্ড ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। লেবার পার্টি এবং ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা, যারা পরে চিহ্নিত হয়েছিলেন, উইকিলিকস প্রকাশিত নথিপত্রে, কেন্দ্রীয়ভাবে ক্যানবেরায় তারা ছিলেন মার্কিন দূতাবাসের 'সুরক্ষিত উৎস'। যুক্তরাষ্ট্র জোটে রুড কোন ভিন্ন ছিলেন না, তবে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন চীনের উত্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে কিছুটা জায়গা তৈরি করতে হবে।

অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি আইনের মামলা চালিয়ে নিতে ওবামা প্রশাসন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মার্কিন গ্রান্ড জুরি সম্পর্কে কোন প্রকার জ্ঞাতকরণের বিষয়টি অন্যান্য মন্ত্রীর মতো কারও মিথ্যাভাবে অস্বীকার করেছিলেন। বরং, তিনি মার্কিন এবং ব্রিটিশ সরকারগুলোর লাইন মেনে চলেন, যৌন নিপীড়নের ট্রাম্পড-আপ অভিযোগ যা অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল সেই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন করার জন্য অ্যাসাঞ্জকে কেবল সুইডেনে প্রত্যর্পণের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

'বিদেশমন্ত্রী হিসেবে আমি ব্যাখ্যা করেছি সুইডেন এবং অ্যাসাঞ্জের মধ্যে বিরোধ ছিল এমন একটি বিষয়, যাতে ক্যানবেরার কোন অবস্থান ছিল না', কার লেখেন লেবার পার্টির ন্যায্যতা দেয়ার প্রয়াসে। 'তার সমর্থকরা এই বিষয়টি নিতে পছন্দ করেন নি।'

গত এপ্রিলে অ্যাসাঞ্জকে একুয়াদরের লন্ডন দূতাবাসের ভেতরে তাঁর আশ্রয় থেকে টেনে নামার আগ পর্যন্ত প্রতিটি অস্ট্রেলিয়ান সরকার জোর দিয়ে বলেছিল অস্ট্রেলিয়ান নাগরিককে হস্তান্তর করার কোন মার্কিন প্রচেষ্টার 'প্রমাণ নেই'। বাস্তবে, ২০১২ সালের দিকে কার যখন দায়িত্বে ছিলেন- তথ্য স্বাধীনতা আইনের আওতায় প্রাপ্ত ডিক্লাসিফাইড ক্যাবল থেকে প্রকাশিত- তখন ওয়াশিংটনে অস্ট্রেলিয়ান দূতাবাসের কর্মকর্তারা অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার বিষয়ে বিস্তারিতভাবে গিলার্ড সরকারকে অবহিত করেছিল।

লেবার পার্টি যারা চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে 'এশিয়ায় প্রধান' বলে অস্ট্রেলিয়াকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং যারা গিলার্ডের অধীনে দেশজুড়ে মার্কিন মিলিটারির প্রবেশের বিস্তার ঘটিয়েছিল তারা কখনোই উইকিলিকসের প্রতি বৈরিতা থেকে সরে যায় নি।

তাইলে কার-এর বক্তব্য থেকে কি এল? এটি কেবল মার্কিন সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে গভীরতর আন্দোলনের প্রসঙ্গেই বোঝা যায় এবং পুঁজিবাদী প্রোফিট সিস্টেম কর্তৃক উদ্ভূত সামাজিক বৈষম্য, শ্রমিক শ্রেণির অবস্থানের উপর হামলা, কর্পোরেট দুর্নীতি, কর্তৃত্ববাদী সরকার এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে গণঅভ্যুত্থান সূচিত হচ্ছে সেই পরিপ্রেক্ষিতেই বোঝা যায়।

অ্যাসাঞ্জের জন্য ক্রমবর্ধমান সমর্থন এই টগবগে অসন্তুষ্টির একটি মূল দিক। ফেব্রুয়ারিতে তার বহি:সমর্পন বিচারের প্রেক্ষিতে অস্ট্রেলিয়ার বহু জায়গায় মুক্তির আন্দোলন দানা বাঁধছে। ওয়াল্ড সোসালিস্ট ওয়েব সাইট (ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অফ দি ফোর্থ ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত) দ্বারা ঘোষিত একটি ক্যাম্পেইনের প্রতি বিশ্বব্যাপী সমর্থন বাড়ছে।

ক্ষমতাসীন শ্রেণি-উদ্ভূত আরেকটি উদ্বেগ এল মেহিকোর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস মানুয়েল লোপেজ ওব্রাদরের কাছ থেকে। শুক্রবার তিনি আটক করে 'নির্যাতনের' সমাপ্তি টেনে অ্যাসাঞ্জকে মুক্তি দেয়ার আহবান জানিয়েছিলেন।

গত ১৮ মাস ধরে সমাবেশ ও জনসভায় সোসালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টি কূটনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে এবং আইনগতভাবে অ্যাসাঞ্জের মুক্তি নিশ্চিত করতে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ থেকে সুরক্ষার গ্যারান্টিসহ অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে আসার অধিকার নিশ্চিত করতে দাবি উত্থাপন করে আসছে।

যাহোক, সেখানে অবশ্যই এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ান রাজনৈতিক এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে কোন বিভ্রান্তি থাকা যাবে না। গিলার্ড সরকার থেকে শুরু করে মরিসনের বর্তমান লিবারেল-ন্যাশনাল কোয়ালিশন সরকার পর্যন্ত অ্যাসাঞ্জকে কারারুদ্ধ করার জন্য সরাসরিভাবে এটি দায়ী এবং দোষী।

এ কারণেই মুনাফা ব্যবস্থা এবং এর কঠোরতা, পুলিশ-রাষ্ট্রের নিপীড়ন এবং যুদ্ধ; সবকিছু পাল্টে দেয়ার লড়াইয়ের একটি অংশ হিসেবে শ্রমজীবী শ্রেণি এবং তরুণ সমাজের দিকে ফেরার উপর নির্ভর করছে। মুক্ত বাকস্বাধীনতা এবং সমস্ত মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতিরক্ষা পুরোপুরিভাবে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, অর্থাৎ, সমাজতন্ত্রের সঙ্গে আবদ্ধ।

(wsws.org -তে ৪ জানুয়ারি মাইক হেড-এর এই লেখাটি প্রকাশিত হয়। লেখাটি অনুবাদ করেছেন নুরে আলম দুর্জয়।)

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0354 seconds.