• ০৭ জানুয়ারি ২০২০ ২১:৪৯:২৩
  • ০৭ জানুয়ারি ২০২০ ২১:৪৯:২৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আপনার বই বেরোয় না? কুন্ঠিত প্রশ্নে বিব্রত উত্তর

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


ফেব্রুয়ারি সমাগত হলেই বিব্রতকর কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হই। এবারও হয়েছি, বেশ কয়েকবার। প্রশ্নের ধরণটা অনেকটা এরকম, ‘এবারের মেলায় আপনার কোনো বই আসছে কি না?’ বিব্রত অবস্থাটা সামলে রেখে আমারও সোজাসাপ্টা উত্তর, না। ‘আপনার কোনো বই বেরোয় না কেনো?’ আবারও সরাসরি, সাহস ও সঙ্গতি নেই বলে।

আবার বাবার বেশ কয়টি প্রকাশনা মানে বই রয়েছে। তারমধ্যে সিংহভাগই কবিতার বই। আমার জন্মের আগে-আগেই তার একটি উপন্যাস মোটামুটি বিক্রি হয়েছিল। স্বাধীনতা প্রাপ্তির আগের ঘটনা এটি। বইটি প্রকাশ হবার পরপরই আমার জন্ম হয়। বাবার ধারণা আমার কপালেই উপন্যাসটির কাটতি হয়েছে। তারপর আরেকটি উপন্যাস বের হয় তার। সেটাও মোটামুটি চলেছে। উপন্যাসের পর কবিতা ভর করলো বাবার উপর। কবিতার বই বের হলো, বিক্রি নেই। পরেরটিও কাব্যগ্রন্থ, যথারীতি বিক্রিবাট্টাও ফ্লপ। বাবা নেই, আলমারীতে তার কবিতার বইয়ের অনেকগুলো আনকোরা কপি রয়ে গেছে।  

কবি বন্ধুদেরও দেখেছি। দেখেছি, বই বের করার পর তাদের হা-হুতাশ লুকানোর চেষ্টা। নিজের গাঁটের টাকায় বই বের করার পর ‘পুশিং সেলে’র কসরত রীতিমত লজ্জাজনক ব্যাপার। দোকানে দোকানে কেউ নিজেই পৌঁছে দেন বই। আর সেই বই বিক্রির টাকা আনতে বা খবর জানতে গেলে দোকানির বিরক্তিমাখা কন্ঠস্বর লজ্জার পারদ আরো চড়িয়ে দেয়, সাথে হতাশাও। কন্ঠস্বরের সাথে দোকানীদের চোখ স্পষ্ট বলে দেয়, ‘পুরানো পাগলে ভাত পায় না নতুন পাগলের আমদানি’। কথা পরিষ্কার, কবিতার বইয়ের খাওয়া নেই। সত্যিই নেই। কবি বন্ধুদের চুপসানো মুখ, ঝুলে থাকা দৃষ্টি তারই প্রমান দেয়। এমন প্রমানের পর নিজে আর সাহস করে উঠতে পারিনি।

গল্পের কিছু কাটতি রয়েছে। কারণ, মানুষ গল্প করতে ভালোবাসে। এই ভালোবাসাই তাদের গল্প পড়তে উৎসাহিত করে। আর কবিতার প্রয়োজন শুধু তোয়াজের জন্য। প্রেমিকার স্তব কিংবা ক্ষমতাবানদের স্তুতির প্রয়োজনে কবিতার খোঁজ পড়ে। আমি গড়পড়তা পাঠকদের কথা বলছি। ক্লাসিক পাঠকরা আবার রেগে যাবেন না। ক্লাসিক পাঠক তথা ধ্রুপদি পড়ুয়া কারা। এনারা হলেন স্বরসতীর আর্শীবাদপুষ্ট স্বয়ং লেখকগণ। তারা এমন কথা শুনলে চটে যাবেন জানি। তবে কথা সত্য এই যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজের লেখা ছাড়া অন্য কারো লেখা পড়ে দেখার সময় জোটে না তাদের। একজন খ্যাত ও আলোচিত ‘স্যারে’র কথাই ধরুন। উনি পত্রিকা-টত্রিকা বা কারো লেখা-টেখা পড়েন না, এটা তিনি নিজেই ব্যক্ত করেছেন। এমন ক্লাসিকদের কথা না হয় থাক। সাধারণের কথা বলি।

গত বই মেলায় এক হাজারের উপর কবিতার বই প্রকাশ হয়েছে। আর এনাদের সবাই প্রায় নতুন কবি। এতে বোঝা যায়, পাঠক না থাকুক, আমাদের কবির কমতি নেই। ক্রেতা না থাকুক, কবিতার বইয়ের কমতি নেই। এটা যেন একেবারে জিডিপি’র ‘উগান্ডিয়’ হিসাব। পাঠক বাড়ুক আর না বাড়ুক কবি বেড়েছে, এটাই উন্নতি। বিক্রি হোক আর না হোক বই বেড়েছে, এটাই উন্নয়ন। আহারে উন্নতি, হায় উন্নয়ন।

গত বই মেলার প্রাক্কালে আমার একটি লেখায় এক কবির কথা উল্লেখ করেছিলাম। আমার জেলার কবি। সম্ভবত এবারও উনার বই বেরুবে। আমি ভয়ে আছি, বই দিতে এসে সেবারের মতন প্রশ্ন করেন কি না, ‘এবারও আপনার বই প্রকাশ হয়নি!’ বিস্মিত সেই প্রশ্নের মুখে আমি বড় কুন্ঠিত হয়ে পড়ি। উত্তর দিতে গেলে তিনি অপমানিত বোধ করবেন, আর তার প্রশ্নে আমি বিব্রত বোধ করবো। কি একটা সিচুয়েশন!

আমাদের মতন মানুষদের এমন সিচুয়েশনে প্রায়শই পড়তে হয়। আরেকজনের কথা বলি, তিনিও কবি সাথে প্রবন্ধও লিখেন। নিজ বয়ানে তিনি জানালেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তার লেখা প্রচুর। নেহাতই হতভাগা আমি, তার প্রচুর লেখার কোনটাই আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। হয়তো মাধ্যম সম্পর্কে নিজের জানার পরিধি কম বলে। অবশ্য দেশে গণমাধ্যমও প্রচুর। ‘কইয়া দিমু ডটকম’ ধরণের অসংখ্য গণমাধ্যম ছড়িয়ে আছে সারাদেশে। ছড়িয়ে আছে মানে ইন্টারনেট অর্থাৎ অন্তর্জালে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা! এটাও অবশ্য একধরণের উন্নয়ন। মাধ্যমের সংখ্যা বাড়ছে। তারা এসেই জানান দিচ্ছে ‘আমরাও কি কম ডটকম’- এমনটা। খবর এবং লেখায় তাদের একই আওয়াজ, ‘যায় যদি যাক প্রাণ----।’ উন্নয়ন সাংবাদিকতার সাথে উন্নতির লেখা-কবিতা। আহা গণমাধ্যম, হায় কবিগণ।

ফুটনোট : লেখক জাকির তালুকদার খ্যাত লেখক মঈনুল আহসান সাবের এর সামাজিকমাধ্যমে করা এক উক্তিতে মন্তব্য করেছিলেন, ‘এই দেশে লেখালেখি কোনো গুরুত্ব বহন করে না সাবের ভাই। লেখক বা কবিদের কেউ কেউ নানা পন্থায় পাতি-গুরুত্বপূর্ণ হয় মাত্র।’ তার এই মন্তব্যটি অনেক গূঢ় অর্থ বহন করে। বিপরীতে আমাদের লেখক-কবিগণ মন্তব্যটির চিন্তা বহন করেন না। যদি বহন করতেন তাহলে বইয়ের সংখ্যা এত বৃদ্ধি পেতো না। আর এসব বইয়ের ভিড়বাট্টায় প্রকৃত প্রকাশনা গুরুত্ব হারাতো না।

গুরুত্ব হারানোর এ ব্যাপারটি যে কতটা অভিমানের, কতটা মর্মপীড়ার, মঈনুল আহসান সাবের এর উক্তির শেষ কথাটুকুই তা ব্যক্ত করে। তিনি বলেছেন, ‘গত বইমেলার পর আমি রিটায়ার করেছি। সেটা জানাতে ইচ্ছে করেনি। কারণ, আমার লেখালেখিতে থাকা বা না-থাকায় কোথাও কিছু এসে যায় না, এই ধারণা যথেষ্ঠ শক্তপোক্ত হয়েছে।’ আসলেই কি লেখালেখিতে কিছু এসে যায়? 

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বইমেলা কাকন রেজা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0212 seconds.