• ০৯ জানুয়ারি ২০২০ ১৮:০৬:২৮
  • ০৯ জানুয়ারি ২০২০ ১৮:০৬:২৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ধর্ষণ, ধর্ষক, উদ্ভুত সংশয় এবং প্রশ্ন

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় দুটি বিষয় জানা গেছে। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় বাহিনী চাইলে ব্যতিক্রম বাদে খুব দ্রুতই অপরাধী সনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত হলো, সরকারি কর্মকান্ড এক লহমায় বিশ্বাস করার পরিস্থিতি আর নেই। 

প্রথমটা নিয়ে কথা বলি, আমাদের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে অন্তত আমার কোনো সংশয় নেই। তারা দক্ষ এবং যোগ্য। কিন্তু তাদের দক্ষতার প্রদর্শন নানা (যা মোটামুটি জানা) কারণে ব্যাহত হয়। যোগ্যতার প্রমাণ সে কারণেই সংশয়ের মধ্যে পরে। 

অপ্রাসঙ্গিক আরেকটা প্রসঙ্গ টানি। আমাদের ডাক্তারদের নিয়ে নানা কথা হয়। কাগজে খবর হয় ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু। এমন খবর যে মিথ্যা তা বলছি না। তবে এই খবরের আড়ালে আরেকটি সত্য অপ্রকাশ্য থেকে যায়। আমাদের ডাক্তারগণ সারাদেশে কতটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন, সেই সত্যটা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর কোনোটায় একটা এক্সরে মেশিন, সনোগ্রামের মেশিন নেই, ন্যূনতম সুবিধার প্যাথলজি ল্যাবও হয়তো নেই। তারপরেও শুধু ডায়াগনোসিসের উপর ডাক্তারদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। যা আমাদের ডাক্তারদের পক্ষেই সম্ভব। উন্নত দেশের কোনো ডাক্তার এক্সরে প্লেট না দেখে, সনোগ্রামের ছবি না দেখে চিকিৎসা দেবে এমনটা অসম্ভব। এমন অবস্থায় ডায়াগনোসিসের ক্ষমতা সেসব ডাক্তারদের নেই। কারণ তারা অভ্যস্ত যন্ত্রের উপর, আর আমাদের ডাক্তাররা পরিস্থিতির উপর। 
আমাদের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাই। তারাও পরিস্থিতির উপর কাজ করে। আর এই পরিস্থিতিই তাদের বাধ্য করে নিজেদের দক্ষতা আর যোগ্যতার অপব্যবহার করতে। পরিস্থিতি যদি ঠিক থাকে তারা সবক্ষেত্রেই দক্ষতা দেখাতে নিশ্চিত সক্ষম, যা অতীতেও প্রমাণ হয়েছে। 

এরপর হয়তো দ্বিতীয় বিষয়টির খুব একটা ব্যাখ্যা করতে হবে না। বিশ্বাসহীনতার কারণও পরিস্থিতি। 

দুই. 

অনেকে ধর্ষকের বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান হয়েছেন। এই চেহারার, নেশাসক্ত, যে নিজেই ওই দিন অসুস্থ ছিলো, চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলো হাসপাতালে! তারোপর একজন ভবঘুর! ঠিকমতো খাবার না পাওয়া, নেশাসক্ত এবং অসুস্থ শরীরের একটা লোক ধর্ষণের জন্য কতটা ফিট তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। একজন মেয়ের উপর অমন নির্মমতা, নৃশংসতা ওই শরীরে সম্ভব কিনা সেটাও সংশয়ের কারণ হতে পারে। প্রশ্নটা কোনো দোষের কিছু নয়। প্রশ্ন মানে দ্বন্দ্ব। দর্শন বলে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি না হলে প্রকৃত সত্যের উদ্ভাস ঘটতো না। আইনও তাই বলে। তাই আদালতে দুই আইনজীবী রীতিমত যুক্তি-তর্কের যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। সেই বিতর্কে বিচারক সত্যটা বুঝে নেন। প্রশ্ন করা ধর্মেও সমর্থন করে। এমনকি ইসলাম পবিত্র কোরআনকেও অন্ধ অনুসরণ করতে নিরুৎসাহিত করেছে। অর্থাৎ বুঝে অনুসরণ করতে বলেছে। প্রশ্ন সেই বোঝার বোধটাকেই জাগিয়ে তোলে। সুতরাং প্রশ্নে দোষের কিছু নেই। প্রশ্ন উঠাটাও দোষের কিছু নয়। 

বিপরীতে প্রশ্ন না করে জোর করে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টাটা বিব্রতকর। তাতে প্রশ্নটা আরো দ্বিগুন হয়ে উঠে। আর প্রশ্নটা দ্বিগুন করার সুযোগ দেয়াটা অবশ্যই অনুচিত। 

তিন. 

ধর্ষকের শাস্তি সবাই চায়। অথচ প্রমাণ হবার আগেই, সব জট খোলার আগেই, প্রশ্ন আর সংশয়ের শেষ হবার আগেই একজনকে লটকিয়ে দেয়ার চিন্তা লিঞ্চারদের, বিচারহীনতার। আইনের শাসনের উপর ভরসা থাকলে জবরদস্তির কোনো জায়গা নেই। তবে প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়াটাই উচিত। না হলে ভরসার জায়গাটা নষ্ট হয়।

এক্ষেত্রে কেউ হয়তো আইনের শাসন বিষয়েও তর্কে জড়াবেন। যতই জড়ান শেষ পর্যন্ত কিন্ত ভরসা রাখতে হবে আদালতের উপরই। জাগতিক বিষয়ে মানুষের শেষ ভরসা আদালতই। তাই ভরসা হারানোটা জ্ঞানত উচিত নয়। সব বিশ্বাস হারালে মানুষের আর কিছু থাকে না। বিশ্বাসহীনতার ভয়াবহ আছর বর্তায় সমাজের উপর, সমাজিক শৃংখলা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। যদিও শৃংখলা ভেঙে পড়ার লক্ষণই এমন নির্মমতা, ধর্ষণ আর হত্যার মতো ঘটনা। তারপরেও আমাদের ভরসা আর বিশ্বাব বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সাথে বিশ্বাস রাখতে হবে সৃষ্টিকর্তার উপর। তিনিই শেষ পর্যন্ত মজলুমদের রক্ষা করবেন, সত্যকে বিজয়ী করবেন। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাকন রেজা ধর্ষণ ধর্ষক

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0211 seconds.