• ০৯ জানুয়ারি ২০২০ ২১:৫৬:৩১
  • ০৯ জানুয়ারি ২০২০ ২২:০১:৪৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ধর্ষণ প্রসঙ্গে

ছবি : সংগৃহীত


রফিকুল রঞ্জু :


ধর্ষণের কথা উঠলেই মনে নানা প্রশ্ন জাগে! এমনকি ধর্ষণের ঘটনায় যেসব প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়, সেসবের মধ্যেও নারীর প্রতি অবমাননা দেখতে পাই! এ এক আজব সমস্যা। মানুষ ধর্ষণের বিচার চাইবে না নাকি?

মনে প্রশ্ন জাগে ধর্ষণ জিনিসটা নিয়েও। সমাজকর্মী, নারীবাদী, রাজনীতিক, অনারীবাদী নির্বশেষে সবার কথা শুনে মনে হয়, ধর্ষণ বিষয়টি শুধু জননাঙ্গে সংঘটিত হয়। সেজন্য অভিধান ঘাঁটি; বিভিন্ন জায়গায় দেওয়া সংজ্ঞা দেখি। সেসবের মূল কথাও এক- কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং জোর করে যৌনসম্ভোগ।

যৌনসম্ভোগ স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ক্রিয়া। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা ইচ্ছা এবং বলপ্রয়োগে। অনিচ্ছা এবং জোর খাটানো বিষয়টা যুক্ত হলেই তা ধর্ষণ হয়।

তাহলে অপরাধ কোনটা? ‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং জোরপূর্বক’ বিষয়টাই অপরাধ। ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং জোরপূর্বক কোনোকিছু করা হলে মানুষের অবমাননা হয়, মূলকথা সেটাই। মানুষের সম্মান জননাঙ্গে থাকে না। কিন্তু যখন সম্মানটা জননাঙ্গেই কেন্দ্রীভূত করা হয়; পুরো শরীরের মধ্যে জননাঙ্গকে পবিত্রতম অঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তখন মানুষকেই অবমাননা করা হয়। তখন নারীকেই অবমাননা করা হয়। কারণ, মানুষের পুরো শরীরই পবিত্র। তাই শরীরের ওপর যেকোনো ধরনের নিপীড়নই অপরাধ।

মিছিলে যাননি বলে; সালাম দেননি বলে; কথা মানেননি বলে রাজনীতি কিংবা অরাজনীতির লোকেরা যে চড়-থাপ্পর-মারধর করে সেসবও তাই অপরাধ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মারধর-লাঠিপেটাও একই কারণে অপরাধ।

আর হ্যা, অবশ্যই মানুষের ইচ্ছাও পবিত্র। তাই বলে যা মন চায় তা-ই চাওয়ার নাম ইচ্ছা নয়। একজনের ইচ্ছা যতক্ষণ অন্যজনের মানবিক পবিত্রতা লঙ্ঘন না করে ততক্ষণ তা ইচ্ছা। অন্যজনের মানবিক পবিত্রতা লঙ্ঘন না করা পর্যন্ত ইচ্ছার সীমা। এর পর তা কু-ইচ্ছা, এর পর তা অপরাধের গণ্ডিতে অনুপ্রবেশ করে।

ধর্ষণের প্রতিবাদ জানানোর সময় আমরা এই বিষয়গুলো সামনে আনছি না। এইসব নিয়ে ভাবি বলেও মনে হচ্ছে না। তাই বিয়ের পরও যে ধর্ষণ হতে পারে আমাদের সমাজ তা মনে করে না। বিয়ে মানেই হয়ে দাঁড়িয়েছে যাচ্ছেতাই যৌনসম্ভোগের সনদ। ইচ্ছা-অনিচ্ছা সেখানে কোনো বিবেচনার বিষয়ই নয়। আইনমতেও তখন ‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং জোর করে যৌনসম্ভোগ’ অপরাধ হয়ে দাঁড়ায় না। একই সঙ্গে বিয়ের বাইরে ইচ্ছাপূর্বক এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনসম্পর্ক দুটিই হয়ে দাঁড়ায় অপরাধ। অথচ ইচ্ছাপূর্বক সংঘটিত হওয়া ক্রিয়াটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবার কথা নয়।

‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে’ এবং ‘জোর করে’ -এই শব্দগুলোর দিকে আরও একটু খেয়াল করলে দেখতে পাবেন এর সঙ্গে ক্ষমতা সম্পর্কিত। ক্ষমতার প্রয়োগের মধ্য দিয়েই এই অপরাধ সংঘটন করা হয়। সেই ক্ষমতা রাষ্ট্রের বা রাজনীতির হতে পারে; হতে পারে সেই ক্ষমতা সমাজপ্রদত্ত। সেখানে লিঙ্গিয় নারী-পুরুষ বিষয় নয়। লিঙ্গিয় নারীও নিতে পারেন পুরুষের ভূমিকা। আমাদের দেশে তেমনটি অহরহই দেখা যায়। আবার এর বিপরীতটাও সম্ভব।

সমাজপ্রদত্ত কথাটা অস্পষ্ট লাগতে পারে। তবে খেয়াল করলেই দেখতে পাওয়া যাবে, আমাদের সমাজ নারীদের বিরুদ্ধে পুরুষদের বড় ধরনের ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে। আমাদের সমাজ পুরুষদের ক্ষমতা দিয়েছে নারীদের ওপর কর্তৃত্ব করার। এ কারণেই নারীর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও নারীরই পোশাক, চলাফেরা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তাই প্রতিবাদের ক্ষেত্রে ‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে’ এবং ‘জোর করে’ বিষয় দুটিই প্রধান হওয়া উচিত, জননাঙ্গ নয়। অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই চিহ্নিত করা উচিত, প্রতিরোধ করা উচিত। বিশেষ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে সমাজে ‘ভোগ্যবস্তু’ হিসেবে পরিচিত করে তুলছি কিনা; বা ‘নিষিদ্ধ কিছু’র আগ্রহ বাড়িয়ে তুলছি কিনা তা-ও ভেবে দেখতে হবে।

‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে’ এবং ‘জোর করে’ বিষয় দুটির গুরুত্ব যদি আমরা অনুধাবন করতে পারি, তবে সমাজ ও রাষ্ট্রে শুধু ধর্ষণই নয়, আরও অনেক অপরাধ-অনাচারের লাগাম টানা সম্ভব। সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়া সম্ভব।

লেখক : সাংবাদিক।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ধর্ষণ রফিকুল রঞ্জু

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0222 seconds.