• ১৫ জানুয়ারি ২০২০ ২০:৪১:০৭
  • ১৫ জানুয়ারি ২০২০ ২০:৪১:০৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

শরিয়ত সরকারের চ্যালেঞ্জ এবং চিন্তার দৈন্যতা

শরিয়ত সরকার। ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


প্রিয় একজন বললেন, ‘সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা মাইরা দেশ ছাইড়া গেলো হ্যাইডা নিয়া লেখলা না মিয়া, লেখলা কোনহানকার শরিয়ত বয়াতি লইয়া।’ কথাটা মিথ্যা না, অভিযোগটাও নয়। আমার একটা ছোট লেখা ছিলো শরিয়ত সরকারকে নিয়ে। তবে লেখাটির মূল ফোকাস ছিলো ‘সিলেক্টিভ জাস্টিস’ বিষয়ে।

যে ‘জাস্টিসে’র কারণে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে মানুষ। সাধারণ মানুষের ন্যায় পাওয়ার সর্বশেষ জায়গা হচ্ছে আদালত। সেই আদালত যদি ফেল করে তবে ফেল করবে রাষ্ট্রও। আর রাষ্ট্র ফেল করলেতো নাগরিক নিরাপত্তা এক কথায় অসম্ভব। সেজন্যেই আমি শরিয়ত সরকারের বিষয়টিকে ওই আঙ্গিকেই ফোকাস করেছি। মানুষের চিন্তার বদ্ধ দুয়ারটাতে আঘাত করতেই মূলত এই চেষ্টা।

সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টিতে প্রায়শ স্বঘোষিত মোল্লা-পুরুতদের সাথে কথিত মারফতি জানা বাউলরাও কম যান না। তারাও বিভিন্ন ওরস, পালাগানের নামে অসংখ্য ভুল ও বিকৃত তথ্য পরিবেশন করেন। এসব পালাগানে শ্লীল নয় এমন কথাও উঠে আসে। সে অনুযায়ী কথিত মোল্লা-পুরুত-বাউল কেউই দায় এড়াতে পারেন না সামাজিক কেওজ সৃষ্টিতে। শরিয়ত বাউলের চ্যালেঞ্জও সেই অকারণ কেওজ সৃষ্টির চেষ্টা। তার বিপরীতে যে ধর্মীয় জোশের প্রদর্শন সেটাও অকারণ।

আপনার মতটা প্রমাণের দায়িত্ব আপনারই। সেই মত প্রমাণের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়াটা এক ধরণের উস্কানি। তারোপর রয়েছে পুরস্কার ঘোষণার ব্যাপারটি। কথিত মোল্লা-পুরুতদেরও দেখবেন প্রায়শই এমনটা করতে। এটা মূলত নিজেকে প্রকাশের নিচতর প্রয়াস। চ্যালেঞ্জ নামের এমনসব অপরিনামদর্শিতার কারণেই বিভ্রান্তি ও বিভেদের সূত্রপাত ঘটে।

একজনকে দেখলাম লিখেছেন, ‘বাউল চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, আপনারা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে পঞ্চাশ লাখ টাকা জিতে নিতেন।’ বেদনার্ত হই চিন্তার এমন দৈন্যতা দেখে। একটা বিভেদ বিভাজনের বিষয়কে হাল্কা ভাবে নেয়ার কিছু নেই। মানুষের সবচেয়ে আবেগের জায়গা হলো ধর্ম। সেটা নিয়ে কথা বলতে গেলে যুক্তি দিয়ে বলতে হবে, বিনীত বোঝাতে হবে। না হলে তা সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যেমন ভারতে দাঁড়িয়েছে। সেখানে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যায় পশু রক্ষার নামে অমৃতের সন্তান মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। হুশ হারানো জোশে বলা হচ্ছে, গরুর শরীরে হাত রাখলে সব চিন্তা থেকে মুক্তি মেলে! গরুর মূত্র সর্বরোগের অষুধ!

আবারো বলছি, ধর্ম নিয়ে কথা বলতে গেলে অবশ্যই ভেবে-চিন্তে বলতে হবে। এখানে নিশ্চিত প্রশ্ন করতে পারেন, তবে কেন আমি শরিয়ত সরকারকে নিয়ে লিখলাম। কেন লিখলাম, শরিয়ত সরকারের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার উচিত হয়নি। কারণটা হলো, বানরের হাতে পিঠা ভাগের দায়িত্ব ছেড়ে দেয়াটা যে বোকামি, তা বোঝাতে। আরেকটু পরিষ্কার করে বলি। দেখুন, যে আইনে শরিয়ত সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেই আইনে কি কোন মাওলানাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি? হয়েছে। কদিন আগেই ‘নূরে বাংলা’ নামে এক মাওলানাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরেক মাওলানার বিরুদ্ধে কটুক্তি করার দায়ে। শরিয়ত বাউল আর নূরে বাংলার গ্রেপ্তারের কমন এবং লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে দুটি। এক হলো ‘কটুক্তি’, অন্যটা একই আইন। শরিয়ত এবং নূরে বাংলা’র কথার ধরণ দুটি। বিপরীতে গ্রেপ্তারের কারণ ও আইন এক। আমাদের দৃষ্টিটা নিবদ্ধ করতে হবে এই জায়গাতেই। পিঠা ভাগের বিষয়টিও এইখানেই। 

মানুষ কথা বলবেই। সেই কথা শুনেই লাফিয়ে উঠতে হবে তা নয়। কথার বিপরীতে কথা দিয়েই বোঝাতে হবে, প্রয়োগ করতে হবে যুক্তি। যেমন আদালতে দু’জন আইনজীবী যুক্তি তুলে ধরেন এবং তা থেকে বিচারক সত্যটা বুঝে নেন। বাউল শরিয়ত বা নূরে বাংলা’র বিপক্ষে যুক্তি দাঁড় করান। এখানে বিচারক হচ্ছে জনগণ, আপনার যুক্তি দিয়ে তাদের বোঝাতে চেষ্টা করুন। আপনার যুক্তিতে দম থাকলে আপনি পার পাবেন, না থাকলে নাই। কিন্তু পার পাবার আগেই শক্তিপ্রয়োগের শর্টকার্ট রাস্তা কেন! আপনি যখন শক্তি প্রয়োগ করতে চাইবেন, তখন পাল্টা শক্তি আপনার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নেবে। আজ হোক কাল হোক আপনাকে বাটে পড়তেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। দিন কারো সমান যায় না। 

দুই. 
এখন আসি প্রশান্ত কুমারের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা মেরে উধাও হওয়া প্রসঙ্গে। এটা মূলত দুর্নীতি, যার ফলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  তবে এরজন্যে সমাজে বড় মাপের কোনো বিভেদ সৃষ্টি হয় না। দাঙ্গা-হাঙ্গামার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় না। যেহেতু সব মানুষ এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত নয়। অথচ ধর্মের মতন অন্যান্য সামাজিক বিভেদে মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতের দিকে তাকিয়ে দেখুন, এক ধর্মের মানুষকে অন্য ধর্মের প্রতি একরকম লেলিয়ে দেয়া হয়েছে। ঘৃণার মতন একটি ভয়াবহ অস্ত্রের প্রয়োগে সফল হয়েছে সেখানের শাসক দল। বিপরীতে ক্ষতি কী হয়েছে, দেশের অর্থনীতি সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়। বেকারত্ব সবচেয়ে বেশি। শিল্পে প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে কম। আরও কত কী।

প্রশান্ত কুমারের টাকা মারার ক্ষতি হয়তো কষ্ট করে হলেও আমরা সামলাতে পারবো। উল্টো সমাজের বিভেদের মতন দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি মেনে নেয়া অনেকটাই অসম্ভব। এই যে দেশের লক্ষ-হাজার কোটি টাকা মেরে গত এক দশকে কানাডা-মালোয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সেকেন্ড হোম গড়ে উঠছে। খবরে দেখলাম, বেলায়েত না কি যেনো নাম তিন’শ কোটি টাকা মেরে কানাডায় ভেগেছে। যেখানে সে আগেই সেকেন্ডে হোমের ব্যবস্থা করে রেখেছিলো। এসব ক্ষতিও নয় আমাদের রাষ্ট্র সঠিক ব্যবস্থায় চললে পুষিয়ে নিতে পারবো। হয়তো দীর্ঘদিন মানুষকে কষ্ট করতে হবে, মরতে তো হবে না। প্রতিবেশির সাথেতো বিবাদ হবে না। সংখ্যায় অল্প অন্য ধর্মের মানুষরা তো ভয়ে থাকবে না। 

ভিলেজ পলিটিক্সের সবচেয়ে মোক্ষম কৌশল হচ্ছে দুই পক্ষের মধ্যে ঝগড়া লাগিয়ে দেয়া, তারপর মামলা করানো। এতে দুই পক্ষই ব্যস্ত থাকে নিজেদের ঘায়েল করতে, আর মাঝখান থেকে ‘নেপোয় মারে দই’। আমাদের সামগ্রিক জীবনে, সে হোক রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক সবখানেই এই গ্রাম্যতা ভর করেছে। এখানে ‘নেপো’রা বিভেদের দই খেয়ে যায়, বানরেরা খায় পিঠা। এ অবস্থার পরিত্রাণে চিন্তাটাকে প্রশ্বস্ত করতে হবে। যে কোন কিছুর আগে তার সম্ভাব্য পরিণতি বোঝার চেষ্টা করতে হবে। ঝগড়া-তর্ক না করে যুক্তির ব্যবহার করতে হবে। দ্বন্দ্বের সমাধান করতে হবে যুক্তির নিরিখে। ‘নেপো’দের সম্পর্কে সাবধান থাকতে হবে। শরিয়ত সরকারদের পক্ষালম্বনের সাথে তাদেরও বোঝাতে হবে অপরিণামদর্শী কার্যকলাপের বিষয়ে। তা না হলে শরিয়ত সরকাররা জেলে থাকবে, থাকবে নূরে-বাংলারাও। সাথে পরবর্তী জনের জন্য অপেক্ষায় থাকবে জেলের দুয়ার। 

পুনশ্চ : অনেকে বলবেন, ‘একটি কথায় যদি বিভেদ এবং তা থেকে সংঘাত-সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় তাহলে।’ আরে ভাই, এর নিরসনের জন্যই তো রয়েছে আইন রক্ষাকারী সরকারি বাহিনী, আদালত। তাদের কাজ তাদের করতে দিন, আপনি আগ বাড়িয়ে সংঘাতের আগেই সংঘর্ষে জড়াচ্ছেন কেন! কেন আগ বাড়িয়ে মামলার বাদি হচ্ছেন!

ফুটনোট : এক বিখ্যাত লেখিকা শরিয়ত সরকারকে ‘সুফি’ হিসাবে আখ্যায়িত করে সামাজিকমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন। ‘সুফি’র এমন সংজ্ঞায়ন সত্যিই বিস্ময়কর। দু’টা গান গাওয়া, চুল বড় রাখা, বোহেমিয়ান জীবনযাপন, গানের নামে ‘হাদিয়া’ নিয়ে মঞ্চে উঠে উল্টাপাল্টা কথা বলাই কি তবে সুফিবাদ! সুফিবাদের এক ‘বিস্ময়কর’ ধারণা এটি। ধন্যবাদ সেই লেখিকাকে, নিজ চিন্তায় নিজেকে উদ্ভাসিত করার জন্য। তার চিন্তাকে মানলে ইসলামি স্কলারদের বিপরীতে ‘কাঠমোল্লা’রাও নিজেদের ‘ইসলামিস্ট’ দাবি করতে পারেন! তখন আপত্তি করতে গেলে তারা সুফিবাদের সেই যুক্তিকে সামনে আনবেন। অতএব অহেতুক বাড়তি কথা নয়, শরিয়ত সরকার মানুষ, তার মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। সেই মত ভুল হলে তা খন্ডন করারও অধিকার রয়েছে। যুক্তি দিয়ে খন্ড না করে শক্তি প্রয়োগ বা প্রদর্শন কোনো কাজের কথা নয়। অতএব  শক্তি প্রয়োগ নয়, যুক্তি প্রয়োগে হোক সব বিভেদের সমাধান।

লেখক : কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

(বয়াতির গ্রেপ্তার বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত, আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। একটি মত আমরা প্রকাশ করলাম। ভিন্নমতগুলোকেও আমরা উৎসাহিত করবো।)

সংশ্লিষ্ট বিষয়

শরিয়ত সরকার গান

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0305 seconds.