• ২৩ জানুয়ারি ২০২০ ২১:৩১:২৪
  • ২৩ জানুয়ারি ২০২০ ২১:৩১:২৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আমাদের যত আতঙ্ক আর আত্মহনন

ফাইল ছবি


কাকন রেজা :


আমাদের কত আতঙ্ক। পোস্টারে পলিথিন আমাদের আতঙ্ক। খাদ্যে ভেজাল, ফলে-সবজিতে ফরমালিন আমাদের আতঙ্ক। আমরা আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছি এমন আতঙ্ক হতে বাঁচার জন্য। পরিবেশ নিয়ে আমরা চিন্তিত, আমাদের সুস্থ থাকা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। আমাদের আতঙ্ক আর শঙ্কার শেষ নেই। অথচ শঙ্কার মূল, আতঙ্কের জড় উপড়ে ফেলতে আমাদের বাধা। আমরা দ্বিধাগ্রস্ত।  নানা রঙের দ্বিধা। জানি, জড় কোথায়, জানি মূল কোনটা, তবুও দ্বিধা।

ঢাকার ভোটে লেমিনেটেড পোস্টার নিয়ে ভয়াবহ চিন্তিত পরিবেশবাদীরা। অথচ যে ভোট নিয়ে কথা সেটা নিয়ে তাদের অতটা চিন্তা আছে বলে মনে হয় না। হলে, ভোট রাতে না দিনে হবে, ইভিএমেও বুথ দখল করে ভোট দেয়া সম্ভব কিনা, এসব নিয়ে তাদের চিন্তা হতো। যেখানে স্বয়ং নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হচ্ছে, ইভিএমে ভোট হলে রাতে ভোট দেয়া সম্ভব হবে না। আবার বলা হচ্ছে বুথ দখল হলে এভিএমেও রিগিং সম্ভব। অর্থাৎ দুটি বিষয়ের সম্ভব ও সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে প্রকারান্তরে। সেটা নিয়ে আতঙ্ক নেই!

দৃশ্যত আমাদের একটা শ্রেণির মূল ছেড়ে কান্ড নিয়ে টানাটানি করাটা স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা ক্রমেই সিলেক্টিভ হয়ে পড়ছি। কতটুকু বলা গেলে নিজে নিরাপদ থাকবো এটাই আমাদের হিসাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা অঙ্ক কষতে বসে গেছি, কতটা বললে আমাদের বিপদ হবে না, মুফতে কিছু নামও কামাই হবে। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষিত হবে। আর কিছু মিডিয়াতো আছেই, যারা মূল জিনিস বাদ দিয়ে সিলেক্টিভ কর্মনামা নিয়ে আলোচনায় বসে যাবে। সুতরাং নিরাপদ সিলেক্টিভ বিষয় নিয়ে কথা বলাই ভালো। কে যায় বনের মোষ তাড়াতে।

এরা ভুলে যায়, নিজের খেয়ে বনের মোষই তাড়াতে হয়। না হলে মোষের পায়ের তলায় নিজেদেরই পিষে যেতে হয়। আমাদের অনেক বিজ্ঞজনেরা তা ক্রমেই বুঝতে শুরু করেছেন। তাদের বোধোদয়টা একটু দেরিতে হয়েছে এই যা। হয়েছে তো সহি। মিডিয়ার সব লোকজন এই উদয়ের আলোটা গায়ে মাখতে পারলে আরো ভালো হতো। আর সেই ভালোর অনেকটাই তাদের নিজেদের জন্যই। 

দুই. 
এগিয়ে যাবার পথযাত্রায় আমাদের ডাকাতির ধরণও এগিয়েছে। যা পৌঁচেছে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত। গণমাধ্যম এমন খবরের শিরোনাম করেছে, ‘লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে ডাকাতি, স্বর্ণ-টাকা লুট’। ঘটনাটি ফরিদপুর জেলার। আগে কিছু জায়গা ডাকাতদের চোখের আড়ালে ছিলো, কিংবা সে সব জায়গা এড়িয়ে চলতো। সে জায়গার একটি ছিল মৃতের বাড়ি বা বহনকারী গাড়ি। এখন অ্যাম্বুলেন্সও বাদ পড়ছে না। অর্থাৎ ডাকাতির পরিকল্পনা ও কৌশলের উন্নয়ন ঘটেছে। এখানেও তারা সাম্যবাদ প্র্রতিষ্ঠা করেছে। আর তাদের এই ‘বাদে’র ভাবনা হচ্ছে, ‘কাউকেই ছাড়া হবে না’। অনেকটা ‘কেউ খাবে তো কেউ খাবে না’র মতন। 

বৃটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র শিরোনাম ‘বিএসএফ-এর গুলিতে দুদিনে পাঁচ বাংলাদেশি নিহত’। এখানেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের কৌশলের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। তারাও সাম্যবাদ কায়েমের দিকে এগুচ্ছে। সীমান্ত যাকেই দেখা যাবে তাকেই গুলি করা হবে এবং গণমাধ্যমের খবর মতে গুলি হবে মাথা বরাবর। সেই ‘কেই পাবে তো কেউ পাবে না’র মতন, সবার ভাগেই গুলি বরাদ্দ হবে। বলবেন, এমন বিষয়েও সারকাজম, স্যাটায়ার? ভাই, সারকাজম আর স্যাটায়ারতো বেদনার অসহায় প্রকাশ। এটাও তাই। 

যাহোক, এমন সব পরিবর্তিত উন্নত কৌশলের বিপরীতে ডাকাতি ঠেকানোর কিংবা বিএসএফ প্রতিরোধে পরিকল্পনার উন্নয়ন কী? কেউ কি জানেন, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা কি বলেছেন, বলছেন? আমার চোখে পড়েনি। আর এ নিয়ে সামাজিকমাধ্যম ভেসে যাবার মতন আতঙ্কও দৃষ্টিগোচর হয়নি। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে ডাকাতি, সীমান্তের মানুষের পাখি বনে যাওয়া, ঢাকা থেকে তিন কিশোর-তরুণের নিখোঁজ হওয়া। এসব কোনো আতঙ্কের বিষয় নয়। আতঙ্কের বিষয় নির্বাচনী পোস্টারে পলিথিন। প্রতিদিন কী পরিমান পলিথিন ঢাকা শহরে কেনাকাটায় ব্যবহৃত হয় তা জানা আছে কারো? সেই পরিসংখ্যান যদি থাকতো তবে পোস্টারে পলিথিনের পরিমান অনুপাতে আসতো না। মুশকিল হলো অনুপাতের অঙ্কটাই আমরা ভুলতে বসেছি। 

অবশ্য ভুলে যাওয়া আমাদের স্বভাব। আমরা সহসাই সব ভুলে যাই। মাঝেমধ্যে নিজেদের অস্তিত্বেই ভুলে যাই। সীমান্ত গুলিবিদ্ধ মানুষগুলো যে বাংলাদেশের পরিচয় ধারণ করে আছে, সে কথা আমরা ভুলে যাই। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ‘গরু চোরাচালানের ব্যবসায়ের সাথে বিএসএফ জড়িত’। অথচ আমাদের যারা মারা যায়, উল্টো তাদের দোষ দিয়ে বলি, ‘ওরা গরু চোলাচালানের সাথে জড়িত বলেই মারা পড়েছে’! আমাদের গণমাধ্যমও সেভাবেই খবর প্রচার করে। অথচ ভারতীয় গণমাধ্যম জানায়, এরসাথে বিএসএফ জড়িত। বলিহারি, আমাদের ও আমাদের গণমাধ্যমের। 

তিন. 
ঢাকায় কর্মরত এক পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যা কোনো প্রচারের বিষয় নয়। তবে তিনি আত্মহত্যার আগে সামাজিকমাধ্যমে একটি নোট রেখে গেছেন। যাতে সবাইকে তিনি নোটিশ করেছেন। বলেছেন, ‘শাশুড়ি ভালো না হলে বউ ভালো হবে না’। আমাদের দেশে এই সামান্য কথাটি বোঝাতে বেচারাকে আত্মহত্যা করতে হয়েছে। বিপরীতে কত বড় বড় বিষয় রয়েছে আমাদের পারিবারিক জীবন ছাড়িয়ে জাতীয় জীবনে। ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে সমস্টিতে। সে সব বিষয়ে নোটিশ করতে হলে আর কী করতে হবে? আত্মহননের চেয়ে বড় কী আছে? 

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0234 seconds.