• ৩০ জানুয়ারি ২০২০ ২০:০০:৪২
  • ৩০ জানুয়ারি ২০২০ ২০:০০:৪২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

পরিবেশ, শব্দ নাকি জরুরি ভোট দূষণ

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


সামাজিকমাধ্যমে একজন লিখলেন, ‘কবরস্থানে পাহারাদার নিয়োগ দেয়া হোক, যাতে মৃতেরা এসে ভোট না দিয়ে যেতে পারে।’ সামনের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে এমন লেখা। এবারতো ভোট ইভিএমে, মৃতেরা ভোট দিবেন কী করে, প্রশ্নটা করলাম আমার রসিক বন্ধুর কাছে।

তিনি উত্তরে একটি গল্প শোনালেন, ‘একজন দুষ্টুমি করে সিটি কর্পোরেশনের সরবাহকৃত পানি নিয়ে গেলেন এক প্যাথলজি ল্যাবে। উদ্দেশ্য ল্যাবের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা। সেই পানিকে স্ত্রীর প্রস্রাব হিসাবে চালিয়ে দিয়ে বললেন প্রেগন্যান্সি টেস্ট করার জন্য। পরদিন রিপোর্ট আনতে গেলেন।

রিপোর্ট হাতে নিয়ে তো বেচারার আক্কেলগুরুম। টেস্ট পজিটিভ, অর্থাৎ গর্ভবতী। ল্যাব কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলেন, এটাতো ট্যাপের পানি, আমার ট্যাপ গর্ভবতী হলো কিভাবে! ল্যাব কর্তৃপক্ষের উত্তর- সেটা আপনার ব্যাপার। আপনার ট্যাপ কিভাবে গর্ভবতী হলো তা আমরা বলবো কিভাবে। তবে আমাদের রিপোর্ট বেঠিক হয় না।’

মৃতেরা কিভাবে ভোট দেবেন বা কারা ঠেকাবেন, তা দেখার বিষয় নির্বাচন কমিশনের নয়। তবে ভোট দেয়া হয়েছে সেটা সঠিক। চট্টগ্রামের উপনির্বাচনে প্রবাসী ও মৃতদের ভোট দেয়া বিষয়ে অভিযোগ তুলেছে বিএনপি, সেটা তাদের বিষয়। যে ভোট দেয়া হয়েছে সেটা সঠিক। তেমনি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইভিএমে ভোট হবে। কঠিন ব্যাপার, বুথ দখল ছাড়া ছাপ্পা ভোটের খাওয়া নেই। সুতরাং কে ভোট দিলো সেটা দেখার বিষয় নয় ভোট দেয়া হয়েছে সেটাই দেখার বিষয়। এতদিন ধরে তাই দেখে আসা হচ্ছে। সাথে নিজের পিঠ চাপড়ে নিজেই বলা হচ্ছে ‘গুড জব’। 

অনেকে সুশীল সমাজের কাছে আশা করেন এসব দেখা ও বলার ব্যাপারে। আরে ভাই, তাদের অত ঠেকা কী! উনারা আছেন পরিবেশ নিয়ে। ভোটের লেমনেটেড পোস্টারে ঢাকা শহর ঢেকে গিয়েছে। পলিথিনে পরিবেশ দূষণ ঘটছে, এই সর্বনাশের চিন্তাই তাদের মগজ নিতে পারছে না, আপনারা আছেন কে ভোট দিবে, না দিবে তা নিয়ে। আরে ভাই, ভোট হওয়ার দরকার হবে। উত্তর কোরিয়ায় দেখেন না, নির্বাচনে প্রার্থী থাকে একজন। মানুষের কাজ হলো ওই একজন লোকের ছবি ব্যালট বাক্সে ঢুকিয়ে দেয়া। তারপর কমিশনের ঘোষণা ‘হ্যাঁ জয়যুক্ত’ হয়েছে, এমনটা। এখানে তো এত প্রার্থী দিয়ে, হয়ে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। একজন প্রার্থী হলে পোস্টার কম লাগতো, পরিবেশটা বাঁচতো। সারা বিশ্ব রয়েছে পরিবেশ দূষণের চিন্তায়, গ্রিন হাউজ ইফেক্ট নিয়ে, আর আপনারা আছেন সামান্য ভোট নিয়ে। বলিহারি আপনাদের। 

অনেকে শব্দ দূষণের কথাও বলছেন। সারাদিন রাত ঢাকা শহর মাথায় তুলে রাখছে মাইকের প্রচারণা। মানুষের কানের সমস্যা হচ্ছে। সুশীলদের মস্তিষ্কের কোষ আক্রান্ত হচ্ছে, মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন না কোনো বিষয়ে। আমার এক সুশীল বন্ধুতো মহাবিরক্ত, সামনে বইমেলা তার বইয়ের প্রুফ দেখতে পারছেন না মাইকের চিল্লাচিল্লিতে। তারোপর আবার কবিতার বই। প্রকৃতি বিষয়ক কবিতা। ‘আকাশ কেনো কান্দে’ ধরণের কাব্যগ্রন্থ। তারা আশা, বিভিন্ন পুরস্কারের তালিকায় যাদের নাম সম্প্রতি দেখেছেন, তাদের অনেককে চেনাতো দূরের কথা নামও জানে না মানুষ। তিনি তো মোটামুটি খ্যাত, অতএব পুরস্কারে শিকে তার ভাগ্যেও ছিঁড়তে পারে। সুতরাং শব্দ দূষণে এমন মানুষেরা অতিষ্ঠ হতেই পারেন। তাদের মাথায় অবশ্য ঢাকা শহরে থাকা এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ব্যাপারটি নেই। এমন চিল্লাচিল্লিতে তাদের প্রস্তুতি কেমন চলছে সেই ধারনাও তাদের জ্ঞাত নয়। তারা ব্যস্ত আছেন বই মেলার প্রস্তুতিতে। পাঠকরা তাদের বই কিনবে বা পড়বে কিনা তাই নিয়ে। এসএসসি’র কাচ্চা-বাচ্চাদের পড়ার প্রস্তুতি নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কোথায়!

আসলে এসএসসি পরীক্ষা যে কোন ব্যাপারই নয় তা আপনি টেলিভিশনগুলোর আলাপেই বুঝতে পারবেন। সেখানে পরিবেশ আর শব্দ দূষণ নিয়ে যতটা কথা হয়েছে, তার সিঁকি ভাগও হয়নি পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগ নিয়ে। পত্র-পত্রিকাতেও তেমন রা নেই এ ব্যাপারে। প্রবন্ধ-নিবন্ধকারদের অবশ্য নিজেরা কবে এসএসসি পার হয়ে এসেছেন তা মনে থাকার কথা নয়। আর আবছা কোনো বিষয়ে ‘জ্ঞানী’দের লিখতে আপত্তি রয়েছে। পরিবেশ, শব্দ দূষণ সাম্প্রতিক সময়ে খাচ্ছে ভালো, তাই দৃষ্টিটা তার উপরই নিবদ্ধ রাখছেন তারা। 

সুশীল আর বুদ্ধি বেচিয়েরা সবসময় ‘অন’ আর ‘অফ’ টপিকের বিষয়টি মেনে চলেন। ‘অফ’ টপিক বা ‘অফ’ করে দেয়া টপিক নিয়ে সাধারণত তারা আলোচনায় যেতে চান না। মাধ্যমগুলোও টিআরপি’র কথা মাথায় রেখে সে দিকে পা বাড়ায় না। যার ফলেই কে ভোট দিলো সে বিষয়টি অফ হয়ে যায়। অফ হয়ে যায় কোমলমতি পরীক্ষার্থীদের বিড়ম্বনা। অন হয় পলিথিন আর মাইক। শেয়াল আর কুমিরের সেই গপ্পের মতো, পা ছেড়ে লাঠি কামড়ে ধরার বিষয়। পা বাদ দিয়ে লাঠি নিয়ে ব্যস্ত থাকে সবাই। অবশ্য লাঠিরও প্রয়োজন রয়েছে। ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করে দেয়ার প্রয়োজন। সব ঝামেলার এক অষুধ ডান্ডা। মানুষ মায়ের জঠর থেকে যে অনুভূতিটি নিয়ে আসে তা হলো ভয়। সেই ভয়কে জাগ্রত করার মহৌষধ হলো ডান্ডা। সুতরাং ডান্ডার কোন বিকল্প নেই। ডান্ডায় অন টপিকও অফ হয়ে যায়। শুরু হয় পরিবেশের গীত। 

ফুটনোট : মাথার উপর ভোট এসে গেছে। আর ভোট এলে নানা কথা শ্রুত হয়। সেই কথা বলার আগে সামাজিক মাধ্যমে একজনের নিরিহ একটি ‘স্ট্যাটাস’ উদ্ধৃত করি। তাতে বলা হয়েছে, ‘আমি সামান্য গাছের পাতাই তো খাই, নয় একটু শুকিয়ে খাই, তাই নিয়ে এতো কথা!’ তাকে সান্ত্বনা দেয়া যায় ভোটের আগের পরিস্থিতিতে। বলা যায়, ‘ভাইরে তুই তো শুকনা পাতা খেয়ে বলিস, এখন কেউ কেউ তো গন্ধ শুকেই বকা শুরু করেছে। তাদের কী বলবি!’

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0229 seconds.