• নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১১:০৮:৪৭
  • ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১১:০৮:৪৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

বাবা মুক্তিযোদ্ধা, স্বামী সাংবাদিক রিক্তার জীবন চলছে ভিক্ষা করে

ছবি : সংগৃহীত

রিক্তা আক্তার (৩০)। পিতা মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী আকন। বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ কাউয়াকুড়ি গ্রামে। স্বামী ফিরোজ মাহমুদ। কাজ করতেন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায়। ৩ অবুঝ শিশু সন্তান নিয়ে এক মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে এবং একজন সাংবাদিকের স্ত্রী রিক্তার জীবন চলে ভিক্ষা করে।

জানা যায়, ২০০৫ সালে ১৫ বছর বয়সে রিক্তার বিয়ে হয় গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলতলী গ্রামের আবদুল ওদুদ উকিলের বড় ছেলে ফিরোজ মাহমুদের সাথে। ফিরোজ মাহমুদ ছিলেন সাংবাদিক, কবি ও কলামিস্ট। চাকরি করতেন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায়। দাম্পত্য জীবনে তাদের ঘরে জন্ম নেয় ৩টি পুত্র সন্তান। বড় ছেলে যুবরাজ মাহমুদ নীরব। বয়স এখন ১২ বছর। মেঝ ছেলে নিলয়ের বয়স ৬ আর ছোট ছেলে উদয়ের বয়স ৪ বছর। টানাপোড়েনের সংসার হলেও মোটামুটি খেয়ে-পড়ে সুখ-দুঃখের মাঝে হাসিখুশিতেই কাটতো রিক্তার সুন্দর সময়। হঠাৎ ফিরোজের একটি কিডনি অকেজো হয়ে পড়ে। কাজকর্ম করতে পারছিলেন না। এ অবস্থায় তার চাকরিটা চলে যায়। বেকার হয়ে মানবেতর জীবনে ঘোর অন্ধকারে ছেয়ে যায় তার সুখের সংসার। স্বামীর চিকিৎসার জন্য দ্বারে-দ্বারে ধর্ণা দিতে হয় রিক্তাকে। এক বছরের মধ্যে ফিরোজের অন্য কিডনিটাও নষ্ট হয়ে যায়। শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন ফিরোজ। তখন দেশের দানশীল ব্যক্তিদের কাছে সাহায্য চেয়ে একাধিক পত্রিকায় চিকিৎসার আবেদন জানানো হয়। কিন্তু কেউ তার আবেদনে সাড়া দেয়নি।

সরকারিভাবে তিনবার দেড়লাখ টাকা পেয়েছিলেন। যা ছিলো এই ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য একেবারেই অপ্রতুল। টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় সাংবাদিক ও কবি ফিরোজ মাহমুদ ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে থাকে। অবশেষে ২০১৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। পেছনে রেখে গেলেন স্ত্রী-সন্তানদের জন্য অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। বাবার আদর স্নেহ-মমতা কাকে বলে তা এই অবুঝ শিশুরা জানে না।

আরো জানা যায়, স্বামী অকালে চলে যাওয়ায় রিক্তার জীবনে নেমে এলো গভীর অন্ধকার। ৩টি অবুঝ শিশু সন্তান নিয়ে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে এবং একজন সাংবাদিকের স্ত্রীর জীবন চলে ভিক্ষা করে। সেখানেও রয়েছে নানা বিড়ম্বনা। কারো কাছে সাহায্যের হাত পাতলে তিনি সুন্দরী হওয়ায় পিশাচেরা তার দিকে হাত বাড়াতে চায়। ভয়ে গুটিশুটি হয়ে নিজেকে আড়াল করে জীবিকার তাগিদে এই সভ্য সমাজের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি।

রিক্তা জানান, গোপালগঞ্জের বৌলতলী স্কুলের শিক্ষকদের দয়ায় বড় ছেলের লেখাপড়ার ব্যবস্থা হলেও টাকার অভাবে অন্য দুই ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করতে পারেননি। তার এক ছেলেকে মাদারীপুর সরকারি শিশু সদনে নিয়ে (এতিমখানা) এসেছিল। তখন দেখা হয় মাদারীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার এস এম হারুণ-উর রশীদের সাথে। তিনি তাকে ডেকে নিয়ে যান তার বাসায়। তাকে এক বস্তা চালের ব্যবস্থাও করে দেন। কিন্তু এটা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। 

তাই এস এম হারুণ-উর রশীদ সাংবাদিকদের জানান। সাংবাদিকদের কাছে রিক্তার জীবনের কথা বর্ণনা দিতে গিয়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছেন। রিক্তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী আকন ১৯৯৮ সালে মারা গেছেন। তার স্ত্রী বৃদ্ধা সাবেহা বেগম একমাত্র প্রতিবন্ধী ছেলে অলিকে নিয়ে থাকেন সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজের সামনে অন্যের বাসায়। স্বামীর মুক্তিযোদ্ধা ভাতায় চলে থাকা-খাওয়া, বাসা ভাড়া ও পঙ্গু ছেলের চিকিৎসা। রিক্তার শ্বশুড়বাড়ির অবস্থাও শোচনীয়। তাই ভিক্ষা করা ছাড়া তার আর কোনো পথ খোলা নেই।

ভেজা চোখে রিক্তা বলেন, ভিক্ষার জন্য হাত বাড়ালে অনেকেই কুনজরে দেখে, নানা জনে নানা ধরণের খারাপ মন্তব্য করে। অনেকে খারাপ প্রস্তাব দেয়। মাঝে মাঝে মনে হয় আত্মহত্যা করি। কিন্তু আমার শিশু সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে মরতেও পারছি না। আমি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিনীত নিবেদন করছি। তিনি যেন এই এতিম সন্তানদের দিকে একটু সুনজর দেন। তিনিই পারেন আমাকে ও আমার তিন ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে।

মুক্তিযোদ্ধা এস এম হারুণ-উর রশীদ বলেন, মানুষের ক্ষণিকের সাহায্য কোনো দিন স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। স্থায়ী সমাধান একমাত্র প্রধানমন্ত্রী পারেন অসহায় অবস্থা থেকে রিক্তাকে উদ্ধার করতে। 

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0770 seconds.