• ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৭:৩৫:৪২
  • ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৭:৩৫:৪২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞ সমাচার, বিশেষ-অজ্ঞ কথা

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


মিসির আলি’র মুখ দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বিশেষজ্ঞদের প্রতি তার বিরক্তির প্রকাশটা ঘটিয়েছেন। মিসির আলি বিশেষজ্ঞদের কথা কী বলছেন দেখুন। ‘বিশেষজ্ঞদের কিছু জিজ্ঞেস করলেই তারা এমন ভঙ্গিতে তাকান যেন প্রশ্নকর্তার অজ্ঞতায় খুব বিরক্ত হচ্ছেন। প্রশ্ন পুরোপুরি না শুনেই জবাব দিতে শুরু করেন। সেই জবাব বেদবাক্যের মতো গ্রহণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের জবাবের উপর প্রশ্ন করা যাবে না। বিনয় নামক সদগুনটি বিশেষজ্ঞদের নেই। দীর্ঘদিন পড়াশোনা করে তাঁরা যা শেখেন তার চেয়ে অনেক বেশি শেখেন- অহংকার প্রকাশের কায়দাকানুন।’

এমন প্রকাশের গুন এবং সাহস হুমায়ূনেরই ছিলো। আর কারো নেই। সেজন্যেই তিনি আমাদের সাহিত্যের সম্রাট হয়ে উঠেছিলেন এবং এখনো রয়েছেন। তাকে ছাড়িয়ে যাবার মতন নৃপতি সাহিত্যের ময়দানে এ পর্যন্ত নেই। যাক গে, হুমায়ূন আহমেদ কে নিয়ে বলতে গেলে কেনো মিসির আলি’র স্মরণাপন্ন হয়েছিলাম তা শিকেয় উঠবে। তারচেয়ে মিসির আলি’র স্মরণাপন্ন হবার কারণটা বলি। কিছুদিন আগে দেশের খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সাথে দেখা হয়েছিলো। সম্প্রতি অধ্যাপক তকমা লেগেছে তার নামের সাথে। সম্ভবত সেই তকমার ভারটা তিনি নিতে পারছিলেন না। সেই তকমার তকলিফ ঢাকার প্রচেষ্টা বড্ড নজর কাড়ছিলো। 

নমুনার কথা বলি। ডালিম কিনতে গেছি, যা আজকাল ‘আনার’ নামে বিক্রি হয়। অধ্যাপক সাহেব ডালিম হাতে নিয়ে আনমনা হয়ে গেলেন। বললেন, ডালিম দেখলেই জসিম উদ্দিনকে মনে পড়ে যায়। আহা, ডালিম গাছের তলের কবিতা। এখানেই শেষ নয়, অন্তত আরো দশ মিনিট জসিম উদ্দিন সম্পর্কে জ্ঞান দান শেষে থামলেন। চিন্তা করলাম ভাগ্যি ভালো তিনি বিজ্ঞানের নন। নাহলে পাশে আপেল ছিলো, নিউটনের মাধ্যাকর্ষণজনিত তত্ত্ব শুনতে জান বেড়াছেড়া হয়ে যেতো। 

মিসির আলি’র বিশারদ তথা বিশেষজ্ঞদের প্রতি এলার্জি ছিলো, আমারও রয়েছে। আমার এক আত্মীয় আছেন, হাফডান মানুষ। তারোপর পিএইচডি হোল্ডার এবং অধ্যাপক। তার অমুক নেতা, তমুক মন্ত্রীর সাথে কানেকশানও বিশাল। এককথায় ভয়াবহ কম্বিনেশন। বছর দুয়েক আগে দেখা হয়েছিলো। আধা ঘণ্টার সেই সেশন ছিলো আমার জন্য মর্মন্তুদ ঘটনা। আমি কেনো মানুষ হতে পারলাম না তার দীর্ঘ বয়ান। মুনকার নকিরও বোধহয় কবরে এতটা প্রশ্ন কিংবা ভৎসনা করবেন না। সইছিলো না। কোনরকমে কেটেমেরে বেড়িয়ে পড়লাম। বললাম, আর না। এরপর তার সমুখে পড়ার সাহস পাইনি। এখন দেখা হয় না, নিয়ত করাই রয়েছে হলেই সোজা উল্টোমুখো হাঁটা।

এর উল্টো চিত্র মানে কনট্রাস্টও রয়েছে। রয়েছেন আমার অনেক প্রিয় একজন মানুষ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, একজন সত্যিকারের অধ্যাপক, শিক্ষক। তিনিও আমার আত্মীয়, বড় ভাই। অহংকারের স্পর্ধা হয়নি আলোকিত এই মানুষটিকে স্পর্শ করার। উপরে বর্ণিত বিশেষজ্ঞদের সম্পর্কে তার একটি আলাপ আমার বড় পছন্দের। ইনফিরিয়র ও সুপিরিয়র বিষয়ে বলেছিলেন তিনি। বলেছিলেন আমাদের কয়েকজনের একান্ত আলাপচারিতায়। তার কথায়, যারা সবসময় নিজেদের সুপিরিয়র প্রমান করতে চায়, তারা মূলত ইনফিরিয়র। সুপিরিয়রদের নিজেকে প্রমান করার কিছু নেই। সুপিরিয়রিটি তাদের গায়ের চামড়ার মতন, শরীরের আচ্ছাদন, পাল্টানোর প্রয়োজন নেই। ইনফিরিয়রদের বিষয়টা পোশাকের মতন। বিল্ট ইন নয়। ময়লা হওয়ার ভয় থাকে। সংশয় থাকে ছিড়ে যাবার। প্রয়োজন হয় পাল্টানোর। তাই তারা সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে। ইনফিরিয়রিটি প্রকাশ হবার ভয়। 

হানিফ সংকেতের ইত্যাদি’র একটি পর্বে সম্ভবত বিশেষজ্ঞদের পরিচয় করানো হয়েছিলো ‘বিশেষ ভাবে অজ্ঞ’ বলে। বর্ণিত বিশেষজ্ঞদের সাথে বিষয়টি যায়। সেই ডালিম বিষয়ে ভাবাবিষ্ট বিশেষজ্ঞকে ডালিম নিয়ে বক্তৃতার পর বলেছিলাম, পদ্মপাতা নিয়ে জসিম উদ্দিনের একটি কবিতা ছিলো সেটা কি আপনার পড়া আছে।

আমারতো সেটা আরো চমৎকার মনে হয়েছে। উত্তরে তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন, ‘আপনারও তো দেখি কিছু পড়াশোনা রয়েছে। ওটাও আমার মুখস্ত, মুড থাকলে আরেকদিন আবৃতি শুনিয়ে দেবো।’ বুঝলেন তো, বিশেষজ্ঞ মহাশয়ের দৌড়ের সীমানা।  

কাহিনি এখানেই শেষ নয়। আরেক পিএইচডি সাহেবের কথা বলি। চায়না থেকে ডক্টরেট করা। চায়না বেশি দিন যায় না- এমন একটা কথা হালে খুব প্রচলিত। উনার সাথে পরিচিত হবার পর তার পিএইচডি’র বিষয় কী ছিলো সেটা জানা সম্ভব না হলেও চিনারা কী খায় না খায়, সাপ-ব্যাঙ রান্নার রেসিপি এসবই জেনেছি বেশি।

এসব ব্যাপারে তিনি রীতিমত বিশেষজ্ঞ। এছাড়া সেও যে ছুপা রুস্তম, চিনা ললনাদের সাথে তার অন্তরঙ্গতার কথাও আরেঠারে জানান দিয়েছেন। তারপরেও সেই মহাশয়ের পিএইচডি’র বিষয় জানতে পারিনি। জানতে পারিনি তিনি চায়নায় ড্রোন বিষয়েই ডক্টরেট ‘কম্ম’টি করেছেন কিনা। আমাদের দেশেতো আবার ‘ড্রোন’ বিজ্ঞানী হবার ফ্যাশন ও ফ্যাসিনেশন রয়েছে। 

বিশেষজ্ঞের কমতি অন্তত আমাদের নেই। আপনার কাশি হচ্ছে, কাশির শব্দটা বের হবার আগেই ডাক্তার বেরিয়ে যাবেন। বলবেন, তুসকা খান, নয় এলাট্রল। আরেকজন বলবেন, ওল্ড ইজ গোল্ড, সুতরাং হিস্টাসিন চলুক। রাজনীতির কথা বলবেন। মাগো বলে চিৎকার দিন। চারিদিকে গিজগিজ করছেন রাজনীতি বিশেষজ্ঞ। আর যারা রাজনীতির চালকের আসনে রয়েছেন, তাদের অনেকজনই হানিফ সংকেতের ‘বিশেষ-অজ্ঞ’। দেখলেন না, গেলো সিটি নির্বাচনের ভোটে ভোটাররা কেনো কেন্দ্রে এলো না, তা নিয়ে কীসব ব্যাখ্যা। মীরাক্কেলের মীর থাকলেও ভিরমি খেতেন। 

এমনসব বিশেষজ্ঞের পাল্লায় পড়ে আমরা প্রতিনিয়তই ভিরমি খাচ্ছি। আর সেই ভিরমি খেতে খেতে ক্রমেই ‘ওল্ড পেসেন্ট ইজ গুড ডক্টর’ হয়ে উঠছি। ঠেকায় পড়েই শিখতে হয়, শিখছি। কথিত বিশেষজ্ঞদের দেখে ক্রমাগত হয়ে উঠছি অবিশেষজ্ঞ নিরেট মাটির মানুষ। এক্বেবারে অকৃত্রিম। যা আমাদের রক্ত ভেজা মাটির জন্যে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। 

পুনশ্চ : বলবেন, বিশেষজ্ঞ নিয়ে মাতলাম কেনো। গত দুদিন বড় যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা গেছে। সরাসরি সেই অর্জিত অভিজ্ঞতার কথা বললে ‘চাকরি থাকবে না’। তাই ঘুরিয়ে বলা আর কী। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট। 

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিশেষজ্ঞ কাকন রেজা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0226 seconds.