• নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৭:৪১:০১
  • ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৭:৪১:০১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

'নদী দখলমুক্ত করার এখনই সবচেয়ে অনুকূল সময়'

শেখ রোকন। ছবি: সংগৃহীত

শেখ রোকন নদী বিষয়ক নাগরিক সংগঠন রিভারাইন পিপলের প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব। তিনি নদী নিয়ে লিখছেন, গবেষণা করছেন ও মানুষকে সংগঠিত করছেন। একটি দৈনিক সংবাদপত্রের সঙ্গেও জড়িত, খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করছেন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকার চারপাশের নদী নিয়ে কথা বলেছেন বাংলা'র সঙ্গে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন আসিফ আল আজাদ। 

বাংলা : সংবাদমাধ্যমে দেখছি, ঢাকার চারপাশের নদীতে দখল উচ্ছেদের একবছর পূর্তি হচ্ছে। এর আগে এ ধরনের অভিযান হয়নি?

শেখ রোকন : আগেও হয়েছে নিশ্চয়ই। কতবার কীভাবে নদীর দখল উচ্ছেদ অভিযান চলেছে এবং আবার কতবার দখল হয়েছে, সেটা নিয়ে বরং আলাদা গবেষণা হতে পারে। হ্যাঁ, আমিও দেখেছি, বর্ষপূর্তি নিয়ে আলোচনা। আমার মনে হয়, এটা তারা বলছেন আসলে গতবছর জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়ার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু নদীতে দখল উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে।

বাংলা : তাহলে গতবছর উচ্ছেদ অভিযানের বিশেষত্ব কী ছিল?

শেখ রোকন : অতীতে তুলনায় গতবছরের অভিযান নানা দিক থেকে ভিন্ন ছিল। আগে ধরেন কোনো একটি স্পট ঠিক করে সেখানে অভিযান চালানো হতো। অর্থ্যাৎ নদীতীরের বিশেষ বিশেষ এলাকায়। কিন্তু গতবছরের অভিযান চালানো হয়েছে নদীর সমান্তরালে। দুই তীরেই।  আগে কখনো এভাবে অভিযান চালানো হয়নি। আগে প্রভাবশালীদের স্থাপনা এড়িয়ে অভিযান চালানো হতো। গতবছর দেখা গেছে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক প্রভাবশালীদেরও অবৈধ স্থাপনা গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

বাংলা : তাতে ফলাফল কী?

শেখ রোকন : কয়েকদিন আগে আবারও অভিযান শুরু হয়েছে। এখনকার হিসেব জানি না। কিন্তু গতবছর বিআইডব্লিউটিএর ঢকা নদীবন্দরের আওতাধীন তিন নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালুতে ফেব্রুয়ারি থেকে মোট ৫০ কর্মদিন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। এই অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ঢাকা নদী বন্দরের প্রধান আরিফ হাসনাত। তার কাছে জেনেছিলাম যে, অভিযানে তিন নদীর দুই তীরের ১৫৭ কিলোমিটার এলাকায় চার হাজার ৪৭২টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। নদীর ভূমি দখলমুক্ত হয়েছে মোট ১২১ একর। এটা নিশ্চয়ই বড় সাফল্য। এ প্রসঙ্গে আরিফ হাসনাতের কথা আপনাকে বলতে চাই। যে কোনো পদে আসীন ব্যক্তির সদিচ্ছাও যে বড় ব্যাপার, সেটা আমরা এই ক্ষেত্রে দেখেছি। তিনি নানা হুমকি, প্রলোভন, সামাজিক চাপ উপেক্ষা করে অভিযান পরিচালনা করে গেছেন। কাউকে ছাড় দেননি। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি, তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টাও চলেছে। কিন্তু তিনি তাতে মাথা নত করেননি। নদী সুরক্ষা সংক্রান্ত সরকারি সংস্থাগুলোতে এমন আরও আরিফ হাসনাত প্রয়োজন।

বাংলা : নিশ্চয়ই এমন মানুষ রয়েছেন। কিন্তু সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যক্তিটি নেই।

শেখ রোকন : ঠিকই বলেছেন। এখন আসলে নদী সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে অনুকূল সময়। সরকার প্রধান স্বয়ং বারংবার নদী রক্ষায় জোর দিচ্ছেন। নদী বিষয়ক সংস্থাগুলোতে যারা আসলেই কাজ করতে চান, তাদের সক্রিয় হওয়ার এখনই সময়।

বাংলা :  ঢাকার চারপাশের নদী দখল উচ্ছেদ নিয়ে আর কী করণীয় আছে?

শেখ রোকন : দখলমুক্ত হওয়া নদীর এলাকায় পুর্নদখল ঠেকাতে হবে। ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এটা যথাসময়ে শেষ করতে হবে। নদীর সীমানা চিহ্নিত করার কাজটিও যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে হবে। এক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে ওয়াকওয়ে, সীমানা খুটি বা অন্যান্য বিনোদনমূলক স্থাপনা নির্মাণ করতে গিয়ে যেন নদীর প্রতিবেশ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বিশেষত জলাভূমি বা ওয়েটল্যান্ডের সঙ্গে নদীর যে সম্পর্ক, সেটাকে বিঘ্নিত করা যাবে না। নদী উদ্ধার করতে গিয়ে যেন নদীকে লেক বানানো না হয়। আমরা সেটা চাই না। আমরা চাই, নদী নদীর মতো থাকবে।

বাংলা : তার মানে, এখন পর্যন্ত যতটুকু উচ্ছেদ অভিযান চলেছে, তা নিয়ে আপনারা সন্তুষ্ট?

শেখ রোকন : আমার মতে নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করা আরও বড় কাজ। বলা হয়ে থাকে, দখলের ফলে নদী আহত হয় আর দূষণের ফলে হয় নিহত। কারণ, দখলের ফাঁক দিয়ে নদীর জীববৈচিত্র্য টিকে থাকে। কিন্তু দূষণের কারণে নদীটি জৈবিকভাবে মারা যায়। তাও না হয় হলো। নতুন করে দূষণ রোধ করা গেলে একপর্যায়ে নদীগুলো দূষণমুক্ত হবে। যেমন হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের পর বুড়িগঙ্গায় বহু বছর পর মৎস্যসম্পদ ফিরে এসেছে। যদিও ওই ট্যানারির কারণে ওদিকে ধলেশ্বরী দূষিত হচ্ছে। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর ক্ষেত্রে আরেকটি বিপদ বালু বাণিজ্য। এখানকার নদীগুলোর কোথাও কোথাও যতটা না বালু উত্তোলন হয়, তার চেয়ে বহুগুণে বেশি বালু এসে জমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। এসব বালুর আড়ত বা 'গদি' বসাতে গিয়ে দখল হয়ে যায় নদী।

বাংলা : কিছু সরকারি স্থাপনাও তো নদী দখল করে নির্মিত হয়েছে শুনেছিলাম।

শেখ রোকন : ঠিকই শুনেছিলেন। এখন যে বুড়িগঙ্গা আমরা দেখি, তারও একটি আদি চ্যানেল রয়েছে। আদি বুড়িগঙ্গা। লালবাগ ও কামরাঙ্গির চরের মাঝখানে এখনও যে ক্ষীণ ধারা রয়েছে, সেটি। ওই আদি বুড়িগঙ্গা প্রায় পুরোটা দখল হয়ে গেছে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায়। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর আরেকটি বিপদ অপরিকল্পিত, নিচু সেতু। সমন্বয়হীনভাবে বিভিন্ন সংস্থা নিচু সেতু তৈরি করায় শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেছে ঢাকা ঘিরে চক্রাকার নৌপথ বাস্তবায়ন। এগুলো বিদায় না করলে ঢাকার মতো ব্যস্ত নগরীতে নদীর যে মূল উপযোগিতা, সেই নৌ চলাচল কীভাবে সম্ভব হবে?

বাংলা : এখন এত জটিলতা। অথচ ঢাকার চারপাশের নদীগুলো একসময় খুবই সুন্দর ছিল।

শেখ রোকন : স্বাধীনতার সময়ও ঢাকার চারপাশের নদীগুলো খুবই সুন্দর ছিল। একটি আলোকচিত্রটি অনেকেই হয়তো অনলাইনে দেখেছেন। রঙিন পালতোলা বেশি কিছু নৌকা ছবির মতো আকাবাকা নদী দিয়ে চলছে। দুইপাশে সবুজ নিচু মাঠ। অনেকেই হয়তো জানেন না, এটা ঢাকার পাশ দিয়ে প্রবাহিত তুরাগ নদের ছবি। ছবিটি তুলেছিলেন খ্যাতিমান আলোকচিত্রী ডিক ডুরেন্স। দেখে মনে হয়, এর আঁকাবাঁকা প্রবাহপথ যেন শিল্পীর তুলি থেকে উৎসারিত। ডুরেন্স ছবিটি তুলেছিলেন ১৯৭২ সালে, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে এসে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকাশ হয়েছিল অভিজাত ম্যাগাজিন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে।

বাংলা : নদীগুলোর অর্থনৈতিক উপযোগিতাও নিশ্চয়ই তখন বেশি ছিল।

শেখ রোকন : রাজধানীর ঢাকার কথাই যদি ধরি, এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব তৈরি হয়েছিল ভৌগোলিকভাবে নদীবহুল হওয়ার কারণে। মোগল আমলে ঢাকা সুবে বাংলার রাজধানী ঘোষিত হয়েছিল বুড়িগঙ্গার চার অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে। এখান থেকে নদীপথে বঙ্গের যে কোনো এলাকায় যাওয়া সম্ভব, নদীটিতে বন্যা নেই, গড় অঞ্চলীয় মাটির গঠনের কারণে ভাঙন নেই। জোয়ার-ভাটার প্রভাব ধর্তব্য নয়। বারো ভূঁইয়ার অন্যতম ঈশা খাঁ তার শাসনাধীন এলাকা বহিঃশত্রুর কাছে দুর্ভেদ্য করে তুলতে পেরেছিলেন মূলত নদীর আঁকিবুঁকির কারণে।

বাংলা : ঢাকার চারপাশের নদীর সৌন্দর্য নিয়েও তো পুরানো সাহিত্যে অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়।

শেখ রোকন : শোনেন, আজকের দখল-দূষণ লাঞ্ছিত বুড়িগঙ্গা কতটা সুন্দর ছিল, তা ধরা পড়ে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চোখে। তিনি বুড়িগঙ্গাতীরের ফজিলাতুন্নেছার প্রেমে পড়েছিলেন। ১৯২৮ সালে বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনের কাছে লেখা চিঠিতে প্রিয় নারীকে তুলনা করেছিলেন নদীটির সঙ্গে, 'আমার চোখ-মুখে তারই জ্যোতি, সুন্দরের জ্যোতি ফুটে উঠেছে- দোলপূর্ণিমার রাতে বুড়িগঙ্গায় যেমন করে জোয়ার এসেছিল তেমনি করে।' অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও তার শৈশবে বুড়িগঙ্গার যে রূপ দেখেছেন, তা আমার সম্পাদিত 'নদী প্রসঙ্গ' সংকলনে লিখেছিলেন। আমি উদ্ধৃত করতে পারি_ 'আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ হচ্ছে বুড়িগঙ্গার মৃতপায় অবস্থা। আমাদের সময় বুড়িগঙ্গা বুড়ি ছিল না, অর্ধমৃতও না। বুড়িগঙ্গা ছিল প্রাণবন্ত। সেই প্রাণবন্ত নদীটা আমাদের চোখের সামনেই প্রাণহীন হয়ে গেল! কৈশোরের অন্য নদীগুলোর সঙ্গে আমার আর দেখা হয় না। বুড়িগঙ্গাকে দেখতে পাই। দেখে আমার খুব কান্না পায়।'

বাংলা : ঢাকার চারপাশে কি কেবলই চারটি নদী? না আরও ছিল?

শেখ রোকন : আরও বেশকিছু নদী ছিল। এ অঞ্চলের অনেক নদীই হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। দোলাই নদী ক্রমে 'ধোলাইখাল' হয়ে হারিয়ে যাওয়া তো সেদিনের ঘটনা। অনেকে হয়তো নড়াই নদীর নামও জানেন না। অথচ মোগল আমলেও পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা-তুরাগ থেকে পূর্বে বালু নদীতে প্রবাহিত হতো নড়াই নদী। আজকের ধানমণ্ডি লেকের পশ্চিমমুখী দুই বাহু আসলে নড়াই নদীর দুই ধারা। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, পিলখানা হয়ে বুড়িগঙ্গায় মিশে যাওয়া ধারাটি ছিল আদতে পাণ্ডু নদী। আর এখনকার মোহাম্মদপুর হয়ে তুরাগে মেশা ধারাটি ছিল নড়াই। আজকের রামচন্দ্রপুর খাল সম্ভবত নড়াই নদীরই ছায়া। ভাটির অংশ ধানমণ্ডি লেক থেকে পান্থপথ হয়ে হাতিরঝিলে মিশত। রামপুরা ব্রিজের পূর্ব দিকে এখনও এর নাম নড়াই বা নাড়াই নদী। ঢাকায় আরেকটি নদীর নাম ছিল 'সোনাভান'। নামটা পরিচিত লাগছে? 'কহর দরিয়া' তথা তুরাগ নদ ও টঙ্গী শহরের পটভূমিতে মধ্যযুগে রচিত হয়েছিল 'সহি জঙ্গনামা' পুঁথি। সেখানে রয়েছে সোনাভান বিবি চরিত্র। বাস্তবের 'সোনাভান নদী' তুরাগ থেকে মিরপুর এলাকার মধ্য দিয়ে টঙ্গীর কাছে তুরাগের সঙ্গে মিলিত হতো।

বাংলা : আপনি একবার ঢাকা অঞ্চলে গঙ্গা নদীর কথা লিখেছিলেন কোথাও।

শেখ রোকন : হ্যাঁ, বুড়িগঙ্গা ছাড়াও আরও দুটি গঙ্গা এই অঞ্চলে প্রবাহিত হতো। ১৯১২ সালে প্রকাশিত যতীন্দ্রমোহন রায়ের 'ঢাকার ইতিহাস' গ্রন্থে পাওয়া যায়- রামগঙ্গা ও নারায়ণীগঙ্গা নামে দুটি নদী 'ঢাকা জেলার বক্ষদেশে উপবীতবৎ শোভা পাইতেছে'।

বাংলা : হারানো নদীগুলো ফেরানো সম্ভব?

শেখ রোকন: যেগুলো একবারে হারিয়ে গেছে, ফেরানো যাবে না। কিন্ত এখনো বক্সকালভার্টের নিচে হাসফাঁস করতে থাকা নড়াই বা দোলাই ফেরানো সম্ভব। তার চেয়েও বেশি জরুরি চারপাশে প্রবাহিত নদীগুলোর সুরক্ষা। আর এক ইঞ্চি নদীও দখল হতে না দেওয়া। আর আক ফোটা দূষণও নদীতে যেতে না দেওয়া।

বাংলা : সেই কাজ কারা করবে?

শেখ রোকন : গত দুই দশকে দেশে নদীবিষয়ক তৎপরতা বেড়েছে, স্বীকার করতে হবে। সরকারের দিক থেকেও উদ্যোগ বেড়েছে। পানি আইন হয়েছে, নদী কমিশন হয়েছে, সংবিধানে পানি ও পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার যুক্ত হয়েছে। নদ-নদীকে যে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করা হয়েছে, সেটা ঢাকা অঞ্চলেরই তুরাগকে কেন্দ্র করে। আমাদের উচ্চ আদালতের মতো এত নদীবান্ধব আদালত বিশ্বের আর কোথাও আছে কি-না সন্দেহ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বিশ্বের সব দেশেই নাগরিকরাই নদী রক্ষার উত্তম প্রহরী।

বাংলা : সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

শেখ রোকন : বাংলাকে নদীময় শুভেচ্ছা।

বাংলা/এএএ 

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.1597 seconds.