• ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ২১:৪০:৫৫
  • ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ২১:৪০:৫৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

জীবন সীমার উপকথা

ফাইল ছবি



জীবন সীমার উপকথা



সকালে ঘুম থেকে উঠার পর থেকেই মাথাটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করছে, এর মাঝে বাইরে কাউয়ার কা কা আর কুত্তার ঘেউ ঘেউ মাথা ব্যথাটা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ইসহাকের। পাশের বেডে অমি ঘুমাচ্ছে বেঘোরে। শালা, সারারাত তাস খেলবে আর সারাদিন কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাবে! বাইরে ছাত্রদের সরব চলাচল হাঁটার শব্দেই টের পাওয়া যাচ্ছে। ইসহাক জানালাটা খুলে দিলো, গতরাতে অর্ধেক খাওয়া সিগারেটটা ধরানোর জন্য হাতে নিয়েছে, কিন্তু দেশলাই খুঁজে পাচ্ছে না। নিশ্চয়ই মোতালেব নিয়ে গ্যাছে, শালা এতো বড় বড় কথা বলবে আর একটা দেশলাই কেনার কথা ওর মনে থাকে না!অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা অব্যবহৃত কাঠি পাওয়া গেল। সিগারেট ধরিয়ে ইসহাক হাঁক ছাড়লো, ‘ওই জুনায়েদ, একটা রুটি, কলা আর লাড্ডু নিয়া আয়। আজকে আর বের হতে ইচ্ছে করছে না, একবারে দুপুরে খাবার সময়ই বের হবো।’ জুনায়েদের দোকান ইসহাকের রুম থেকে আট দশ হাত দূরে, জানালা খুললেই ওর দোকান দেখা যায়। কত দিন হলো, জুনায়েদ এখানে এসেছে? কে জানে! আমিই তো এসেছি চার বছর হলো। তখন থেকেই ওকে দেখছি, একই রুটিন; সকালে ঘুম থেকে উঠবে আটটার দিকে, দোকান খুলতে খুলতে বাজাবে সাড়ে আটটা, তারপর বিকেল চারটা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখবে, এরপর আবার সন্ধ্যায় দোকান খুলবে সাতটার দিকে। ওর ব্যবসা হলো ঢিমেতালে চালানোর ব্যবসা! একদিন জিজ্ঞেস করেই বসলাম জুনায়েদকে, ‘কিরে জুনায়েদ! এমনে ব্যবসা কইরা তোর দিন চলে ক্যামনে? ব্যবসা বড় করবি না?’ উত্তরে বললো, ‘ভাই, ব্যবসা বড় কইরা কি করবো? আপনার বন্ধু-বান্ধব,ভাই-বেরাদার নেতাগো মাগনা খাওয়ানোর লাইগা! এইটুকু দোকান তাই খাইয়া উজার কইরা দিতাছে, আর বড় করলে না জানি পুরা দোকানটাই বাপের সম্পত্তি মনে কইরা খায়া ফ্যালায়! শালারা! বাকী খাবি খা, টাকাটা দিবি না, ভালো কথা; টাকা চাইতে গেলে বাপ-মা তুলে গালি দ্যাস ক্যান? ভাই আপনাকে বলা যায়, মাঝে মাঝে শূয়োরের বাচ্চাগুলার হোগায় লাথি মারতে ইচ্ছে করে, মনে হয় কষায় ধোনের গোড়ায় লাথি মাইরা বিচি বাইর কইরা দেই।’ এরপর জুনায়েদকে আর কোনোদিন দোকান বড় করতে বলার সাহস হয় নাই!

‘অমি, এই অমি! উঠবি না; উঠ, ক্লাসে যাবি না?’- ইসহাকের ডাকে কোনো সাড়া নেই অমির। সে তার মতো নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু কীভাবে এতো নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে মানুষ? বিশেষ করে অমির মতো ছেলেরা? বেচারা! সারাজীবন এতো কষ্ট করে, এতো পরিশ্রম করে, মানুষের দ্বারে খেটে খেটে পড়ালেখা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই ওর পড়ালেখা লাটে উঠেছে! এই নিয়ে মনে হয় সেকেণ্ড ইয়ারেই দুইবার রিএডমিশন নিলো অমি; ওর ছাত্রত্ব থাকবে কিনা সে বিষয়ে আমি সন্দিহান। অথচ শালার কোনো টেনশন নাই! এতো নিশ্চিন্তে থাকে ও কীভাবে? অথচ আমার কতো টেনশন, বাড়িতে সবাই হাঁ করে বসে আছে; কবে পাশ করবো, একটা ভালো চাকরি পাবো, আমার নিজেরও কিছু পরিকল্পনা আছে, বন্দনার পরিবারের সামনে গিয়ে কীভাবে দাঁড়াবো; এইসব প্রেসারে আমার প্রায়ই ঘুম হয় না ভালো মতো। অথচ অমির দিকে তাকাও, কোনো চিন্তা নাই! শালা সাংঘাতিক নির্লিপ্ত! আমার মতো অ্যাভারেজ মাথার ছেলের পক্ষে ওকে বোঝা, মাঝ নদীতে ডুবে সাঁতার কেটে তীরে ওঠার মতো কঠিন ব্যাপার! গভীর রাতে মাঝে মাঝে ওর টেবিল ল্যাম্পের আলোয় কিংবা খুটখাট শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়; আমার সকালে ক্লাস থাকে, স্বভাবতই ঘুমের ডিস্টার্ব হলে মেজাজ বিগড়ে যায়। দুই একদিন যে ঝগড়া বা মন কালাকালি হয় না, এমন না! এক সাথে থাকলে এসব একটু আধটু হয়ই আরকি! কিন্তু যখন দেখি ও রাত জেগে টেবিলে বসে কিছু একটা লিখছে, কিংবা গভীর মনোযোগ দিয়ে কোনো কিছু একটা পড়ছে, তখন আশ্চর্য হয়ে যাই! যে ছেলে ডিপার্টমেন্টের কোনো পড়া পড়ে না, কোনো পরীক্ষায় এটেণ্ড করে না বা করলেও লাগাতার একাডেমিকভাবে ব্যর্থ হয়েই যাচ্ছে; সে সারারাত ধরে এতো মনোযোগ দিয়ে কী এমন পড়ে? কৌতূহল হলেও কখনো ঘাটাই নি। ওর ইচ্ছা, ওর নিজের জীবন কীভাবে কাটাবে, এটা ওই ঠিক করবে! সবাই আমার মতো করে বিরক্তিকর রুটিনের জীবন কেন কাটাবে?

এখন বাজে সাড়ে বারোটা, আজকে আর ক্লাসে যাওয়া লাগবে না! গেলেই গোলামের ক্লাস, আহা ক্লাস! ক্লাসে যাই, এটেন্ডেন্সে মার্ক আছে, আর এটেন্ডেন্স না থাকলে তো পরীক্ষাই দিতে দিবে না। নিজের ঢোল নিজে পেটানো ছাড়া; কে কয়টা প্রজেক্টে কাজ করে, কে কত টাকা পায় বাইরে পড়িয়ে, কার পাব্লিসিটি কতটা, কার গাড়ি কত দামী, কে ছাত্র জীবনে কত বড় সন্ত্রাসী ছিল, কে ডিন এর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে শিক্ষক হয়েছে- এইসব বক্তব্য এখন পুনরাবৃত্তির মতোন মাথায় গেঁথে গেছে, মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরেও এইসব বক্তব্য শুনি। তবে দুই চারজন এখনো আছেন, যাদের ক্লাসে যাওয়ার জন্য সারা সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করে থাকি। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এত দিনের অভিজ্ঞতায় যা দেখেছি তা হল, আমরা অবদমনের দ্বার খুলে দেয়ার অপেক্ষায় থাকি আর সুযোগ পেলে বানের জলের মতো সে অবদমন ভেসে আসতেই থাকে।

ইসহাকের মুখে হঠাৎ হাসির রেখা ফুটে উঠে। তার মনে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনের ক্লাসের কথা। কত উত্তেজনা, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলো সে। প্রথম দিন ক্লাস ছিল খুরশীদা জাহানের; ক্লাসে এসে ম্যাডামের কত সুন্দর সুন্দর কথার ফুলঝুরি! ‘তোমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছো, মনে রাখবা, এইটা স্কুল বা কলেজ না। শুধু মুখস্থ করবা, সেইটা এইখানে হবে না; এইখানে তোমরা জুনিয়র স্কলার আর আমরা সিনিয়র স্কলার, আমাদের মাঝে সম্পর্কটা ঠিক ছাত্র-শিক্ষকের না, তার থেকেও বেশি কিছুর অর্থাৎ বন্ধুত্বের। এইখানে জ্ঞান যেমন বিতরণ করা হবে, তেমনি জ্ঞান তৈরিও হবে। তোমরা আমাদের কাছে যেমন শিখবা, আমরাও শিখবো তোমাদের কাছে। চুপচাপ বসে শুধু ক্লাস করবা না, প্রশ্ন করবা যেকোনো সময়; এমন না যে, তোমাদের সব প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারবো, বাট প্রশ্ন করতে হবে। তোমাদের যেকোনো ব্যক্তিগত সমস্যায় আমার সঙ্গে মন খুলে আলাপ করবা, আমার রুমে আসবা, আমি যখন ফ্রি থাকি।’- মুগ্ধ হয়ে শুনেছিল পুরো ক্লাস, আমি তো ম্যাডামের ভক্তই হয়ে গিয়েছিলাম। অবশ্য এই মুগ্ধতা কাটতে বেশি সময় লাগে নি আমার কিংবা আমার মতো আরো অনেকেরই। কেন সকলের মুগ্ধতা কাটলো? ঘটনা হলো, ম্যাডামের তৃতীয় কিংবা চতুর্থ ক্লাসে আমি ও আকিব ম্যাডামের লেকচারের মাঝে একই বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, লেকচারের কোনো একটা অংশ যা সম্ভবত ওইদিন ক্লাসের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বুঝে নাই; কিন্তু আমরা দুইজন সাহস করে দাঁড়িয়েছিলাম, প্রশ্ন করেছিলাম। ম্যাডামের রেসপন্সটা ছিল দেখার মতো। প্রায় মিনিট খানেক ধরে ম্যাডাম আমাদের দিকে তাকিয়ে জবাব দিলেন,‘এইটা স্কুল না, কথায় কথায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করবা না; এই ছেলে তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভদ্রতা শিখো নাই, আমি ১৫ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই, কারও তো কখনো সাহস হলো না এভাবে প্রশ্ন করার! তোমাদের সাহস হলো কীভাবে? তোমরা দু’জন পুরো ক্লাস দাঁড়িয়ে থাকবে আর তোমাদের দুই দিনের এটেন্ডেন্স কাটা।’-পুরো ক্লাস ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে ছিল। এবং সম্ভবত ওই দিনই প্রশ্ন করার, ক্লাসে শেখার যে সুপ্ত ইচ্ছাটা ছিলো শিক্ষার্থীদের, সেটা উধাও হয়ে গিয়েছিলো। কেননা এরপর থেকে ম্যাডামের ক্লাসে আর কেউ কখনো প্রশ্ন করে নি, বস্তুত আর কারো ক্লাসে উৎসাহের সাথে কেউ প্রশ্ন করে নি, শুধু মাছি মারা কেরানির মতো লেকচার তুলে গেছে। আর কারও খবর জানি না, কিন্তু আমার প্রশ্ন করার আগ্রহ ওই দিনই শেষ হয়েছে।

দরজায় খটখট শব্দে ইসহাকের সম্বিৎ ফেরে, দরজা খুলে দেয় ইসহাক।

-কিরে সোহেল? তুই এই সময়? পড়তে এসেছিস? এই দুপুরবেলা, কাজের সময়, ক্যান্টিনের কাজ ছেড়ে তোরে আসতে দিলো?

 -হ ভাই, অমি ভাই আসতে কইছিলো। বেশিক্ষণ থাকুম না ভাই, পনের বিশ মিনিট ভাইকে খালি পড়াগুলা দেখায়া চইলা যামু। নাইলে জাফর হালায় প্যাদাইবে।

-জাফর কি তোদের মারে নাকি রে? দেখে তো ওরে ভদ্র মনে হয়, মনে হয় তোদের জন্য কত দরদ!

-আরে ভাই বইলেন না, হালায় খুব খারাপ আছে। নিজে কিছু কয় না, তয় রবিরে দিয়া ক্যান্টিনের বাকি কাজের লোকগুলারে ও ওর মতো করে শাসনে রাখে।

-তাই নাকি! রবি ওর লোক!

-হ, হালায় সেয়ানা আছে, দেখায় আমাগো লোক, কিন্তু হালায় আসলে জাফরের লোক।

-আচ্ছা, আয় বস, অমি তো ঘুমায়? এক কাজ কর তাহলে, তুই পড়াগুলান বের কর, আজকে আমিই দেখায়া দেই, অমি মনে হয় না আজকে উঠবে।

বাইরে প্রচণ্ড রোদ, মনে হয় য্যানো আগুন জ্বলছে; উত্তাপটা টের পাওয়া যাচ্ছে বারান্দা থেকেই। হলের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটা অংশের সকাল শুরু হচ্ছে মাত্র; যারা রাতে ছাদে গিয়েছিল কিংবা কার্জনের চিপায়, হলের ছাদে অথবা নিজের রুমেই গাঁজার আসর বসিয়েছিল যারা, অথবা যারা রাত জুড়ে খেলা দেখেছে রিয়াল ও বার্সার কিংবা যারা পুকুর পাড়ে বা রুমে বসে নির্জনে ফোনালাপ করেছে প্রেমিকার সাথে রাতভর; হেসেছে, কেঁদেছে, চুমিয়েছে, ভালোবাসতে বাসতে ঘুমিয়েছে, স্বপ্ন দেখেছে; মদ খেয়ে মাতলামো করেছে যারা কিংবা ডাইল খেয়ে ঝিম ধরে বসে থেকেছে যারা সারারাত, তাস পিটিয়েছে যারা সারা রাত, রিডিং রুমে পড়েছে যারা সারা রাত, তা চাকরির পড়াই হোক কিংবা আসন্ন ফাইনাল পরীক্ষার পড়াই হোক, রাত জুড়ে হেঁটে বেড়িয়েছে পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে সারারাত; কিংবা ভাইয়ের রুমে সারা রাত ভাইয়ের সেবা করেছে যারা; একে একে জেগে উঠছে তারা সবাই। বের হয়ে আসছে, নিশ্চুপ-নিস্তব্ধ পরিবেশে প্রাণের সঞ্চার করবে এখন এরা! হল জেগে উঠছে এখন দুপুরের প্রাণ চঞ্চলতায়! তবে সকালের প্রাণ সঞ্চারীরা এখন ক্লাসে একাডেমিক কাজে ব্যস্ত! দুপুরে যাদের সকাল হয়, তারা এক অদ্ভূত রুটিনে চলে!  

এই ঝিম লাগা দুপুরে কোথাও কি করুণ সুর বেজে ওঠে! কিংবা থেকে থেকে মনে হয় একটা চাপা কিন্তু মায়াবী মুখের হাসি ভেসে বেড়ায়, যেনবা বাতাসে ভেসে আসা সেই স্পর্শের ছোঁয়া পায় ইসহাক। বন্দনার ছোঁয়া ভেবে ইসহাকের শরীরে একটা পুলক খেলে যায়। দ্রুত শ্যাম্পু আর সাবান নিয়ে বাথরুমে যায় গোসল করতে। পাশের বাথরুম থেকে ভেসে আসছে হেড়ে গলার গান, ‘তুমি এসেছিলে পরশু, কাল কেন আসো নি!’-এই মুহূর্তে প্রাণের সাথে সাথে শরীরও জেগে উঠেছে ইসহাকের। পানির ট্যাপ ছেড়ে দেয় ইসহাক, হাতে শ্যাম্পু নিয়ে আস্তে আস্তে ঘষতে থাকে, তারপর সেই ফেনিল হাতের মুঠোয় নিজের উত্থিত ধোন নিয়ে খেলতে থাকে বন্দনার স্পর্শের কথা ভেবে। যে শহরে পাশাপাশি হাত ধরে হাঁটার জায়গা নাই, উপায় নেই চোখে চোখ রেখে নীরবে তাকিয়ে থাকার, একসাথে বসে গল্প করার, জড়িয়ে ধরার, ঘনিষ্ঠ হয়ে ভালোবাসার উপায় নেই, সেই শহরে যৌনাকাঙ্ক্ষা মেটানোর এর থেকে নিরাপদ আর কার্যকরী উপায় তো নেই! কিছুক্ষণ পরেই ইসহাকের শরীর নেতিয়ে পড়ে। একটা মিশ্র অনুভূতির স্তরে আছে সে এখন। এই অনুভূতি ভয়, শিহরণ, অপরাধবোধ, পুলক ও স্বস্তির এক মিশ্রণ!

শেষ বিকেলে ছাদে ওঠে সজীব! হলের ছাদ থেকে একটা স্বাভাবিক সৌন্দর্যের আবেশে ঘিরে থাকা এক শহরকে দেখে সজীব। সামনে পুকুরের টলটলে স্থির পানি, দুইপাশে দুটো বাঁধানো ঘাট, পুকুরের চারিধারে সারি সারি নারিকেল গাছ, জোড়ায় জোড়ায় প্রেমিক প্রেমিকারা বসে মগ্ন হয়ে আছে এক অন্য দুনিয়ায়, অবশ্য একটু দূরত্ব রেখেই বসেছে তারা, দূরত্ব বজায় রেখেই বসতে হয় অবশ্য, না হলে মোরাল পুলিশরা এসে প্রেম করা শিখিয়ে দিবে; অবশ্য চারপাশে কী হচ্ছে সে দিকে নজর না দিলেও আপাতত চলছে তাদের, ভালোবাসার এই প্লাবন দেখতে ভালোই লাগে সজীবের। পশ্চিমে সূর্যটা রক্তিম হতে হতে ধীরে ধীরে আকাশে মিলিয়ে যেতে থাকে। ঠিক এই সময়েই ঢাকা শহরের সব টিয়া পাখি একসাথে ঝাঁকে ঝাঁকে দলবেঁধে কিচির মিচির করতে করতে উড়ে যায় ছাদের ওপর দিয়ে, ছাদের রেলিং এর কাছে বাঁক নিয়ে আবার উড়ে গিয়ে বাইরে প্রকাণ্ড দু’টো রেইন ট্রি গাছে রাতের জন্য আস্তানা বাঁধে তারা। পাখিদের ফিরে এসে আস্তানা গড়ার এই খেলা অনবরত চলতে থাকে পনের-বিশ মিনিট ধরে। এই সময়টা অদ্ভূত ভালো লাগে সজীবের, এই বিল্ডিংয়ে আসার পর থেকেই সে নিয়ম করে এই সময়টায় আসে ছাদে। বলতে থাকে একা একা, ‘আহা! জীবন কী সুন্দর! জীবন বড় সুন্দর! এইসব দৃশ্য দেখার জন্য হলেও কয়েক বার জন্ম গ্রহণ করা যায়!’  

বোশেখ মাসের ঠাডা গরমে বিলে ছিপ ফেলে হা করে ঠায় বসে থাকে ওসমান; কখন মাছ ঠোকর দেবে আধারে (মাছের জন্য বর্শীতে গাঁথা খাবার), তারই অপেক্ষা। য্যানো পাকা মাছুয়া! এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, মাছ আর ওঠে না তার ছিপে। এই রকম ভ্যাপসা গরমে কাজ ছাড়া একটানা একনাগাড়ে এতক্ষণ কীভাবে বসে থাকে মানুষটা! -ভেবে কুল কিনারা করতে পারে না রুবীনা। মানুষটার কী হুশজ্ঞান নাই নাকি! তাও যদি দুই চারটা মাছ পেতো। অথচ, রাতে বিছানায় উঠলেই মানুষটার ঘুমের তাড়া শুরু হয়ে যায়, যেন ঘুমের থেকে বড় জিনিস আর নাই ওসমানের জীবনে! রুবীনার গা জ্বলে, ওসমানের কী রাগ-জ্বালা-কাম নাই! এই রকম ভরা যৌবনে তার শরীরের দিকে কি লোকটার চোখও পড়ে না! অথচ তার শরীরের দিকে অনেকেরই কামুক চাহনি সে টের পায়। এইতো সেদিন আনিস, ওসমানের খালাতো ভাই, ক্যামন হাঁ করে তাকাচ্ছিলো রুবীনার দিকে। রুবীনা তাকাতেই চোখটা সরিয়ে নিয়ে এমন একটা ভান করলো যেনবা সুবোধ বালক! তাকানোর ভেতরে কোনো রুচিবোধ নাই, ভালোবাসা বলতে কিছু নাই, তাকানো দেখলেই গা ঘিন ঘিন করে। দেখারও তো সৌন্দর্য বলে একটা ব্যাপার আছে! এইটা এই পুরুষগুলারে কে বুঝাবে! পুরুষ মাইনষের এই এক সমস্যা, ওরা ভাবে, মাইয়া মাইনষের বুঝি খালি শরীরই আছে, বুদ্ধি-রুচিবোধ বলে কোনো জিনিস মেয়েদের নাই!

‘ও রুবীনা,কী করিস রই’-জাহানারা ভাবীর ডাকে রুবীনার সম্বিত ফেরে।

‘কিছু করম না গো ভাবী, এমনি বসি আছম’- জবাব দেয় রুবীনা।

‘হ, তুই এমনি বসি থাকার নোক! ও, বুচ্চোম, চুরি করি ওসমানক দেখিস; তা চুরি করি দেখার কী আছে? আইতত তো দেখিসই...নাকি আইতত দেখার সময় পাস না।’ -ভাবীর চোখে রহস্য।

লজ্জা পেয়ে রুবীনা অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নেয়।

‘টংগত যায়া বসি, আয়’- জাহানারা ভাবী জিগায় রুবীনাকে।

‘ও ভাবী, কাম নাই, কাম শ্যাষ হচে সোগ’- রুবীনা জিগায়।

‘এত কাম করি কী হোবে রে চেংড়ি! সারা জীবন ধরি তো কামই কোন্নো রে চেংড়ি, বিয়ের আগত বাপের বাড়ীত, বিয়ের পর ভাতারের বাড়ীত আর বুড়া বয়সোত কি হোবে, কেটা জানে। হামরা কী মানুষ নোয়াই!’-আপন মনে বলতে বলতে হাঁটতে থাকে জাহানারা ভাবী।

বাড়ির পেছনে বড় পাকুড় গাছটার নিচে যে টং বাঁধা, ওইখানে গিয়ে শরীর ছেড়ে  বসে তারা দু’জন। রুবীনা তাকায় জাহানারা ভাবীর মুখের দিকে, অদ্ভূত এক বিষণ্নতায় ভরা মুখটা, কিন্তু চোখ দুইটা ভীষণ উজ্জ্বল, মনে হয় য্যানো তারুণ্যের সেই কৌতূহলী সময়ে এখনো স্থির হয়ে আছে চোখ দু’টা। নিশ্চয়ই এই দু’চোখেও একদিন সীমানা অতিক্রমের স্বপ্ন ছিল, কে জানে এখনো আছে হয়তোবা! অথচ ভাবীর শরীরের দিকে তাকালে কি মনে হয়, ভাবী আমাদের প্রায় সমবয়সী? না, মনে হয় না, মনে হয় জীবনের প্রতি সকল দাবী দাওয়া শেষ করে কেবলই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এর থেকে নিস্তার নেই, আমারও কি নিস্তার আছে? রুবীনা মনে মনে আওড়ায়।

ভাবী দূরে স্থির দৃষ্টিতে তাকায়-কী দ্যাখে ওই চোখ? দূরে বড় রাস্তায় মানুষজন হেটে বাজারে যাচ্ছে; ভাবীরও কি ওদের মতো হাঁটতে ইচ্ছে করে না, ইচ্ছে করে না বাজারে গিয়ে দু’কাপ চা খেয়ে আড্ডা দিয়ে তারপর বাড়িতে ফিরে। কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো জবাবদিহিতা নেই। হয়তোবা ইচ্ছে করে, আমার তো করে!

নাকি ওই যে দেখা যাচ্ছে, দূরে জমিতে হাল দিচ্ছে সাজু ভাইজান-সমানে গরু দু’টারে পিটাচ্ছে, ওইখানে গিয়া বসতে চায় ভাবী। ভাইজানের সাথে দু’টা ভালোবাসার আলাপ জুড়ে-হাল চাষে কিছুক্ষণ সাহায্য করে, তারপর বাসায় একসাথে ফিরতে চায় ভাবী। নাকি এই যে তাকিয়ে থাকা তা কী শুধুই তাকিয়ে থাকা! নিজের জীবনটাকে একটু নিজের আয়নায় দেখা, এই পাকুড় গাছটার মতো! নীরবেই বেড়ে উঠলো, কেউ জানলোও না, শুধু বড় হয়ে অবাধে ছায়া বিলিয়েই যাচ্ছে! আমরাও কি ওই গাছটার মতো!

‘কিরে চেংড়ি! কি চিন্তা ক্যরানাচ্ছিস?’- ভাবী বলে ওঠে।

 ‘কিছু না ভাবী, হাটো আজকে যাই এলা, ঘর মোছা নাগবে’- কিছুটা হকচকিয়ে জবাব দেয় রুবীনা।

 ‘হ, যাই চল, হামার কী আর এতক্ষণ বসি থাকার কপাল আছে’- বলেই হাঁটা ধরে জাহানারা ভাবী।   

বিকালবেলা রোদ যখন একটু পড়ে যায়, তখন গরু দু’টারে পিটাতে পিটাতে  লাঙ্গল-মই সহ জমি থেকে ফেরত আসে সাজু। বাড়ির বাইরে পানি খাওয়ানোর জন্য চাড়ীর পাশে গরু দু’টারে বেঁধে দেয় সে। নাক ডুবিয়ে সমানে পানি খেতে থাকে নিরীহ প্রাণি দু’টো, মাঝে মাঝে পুরো মুখ ডুবিয়ে পানির নিচ থেকে ভূষি তুলে নিয়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকে গরু দু’টো। পাশে একটা কুকুর অনবরত ঘেউ ঘেউ করে যাচ্ছে; ওটা কি কিছু বলতে চায়?

‘আজকে খুব কষ্ট পালু রে, তাই না!’-গরু দুটার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে স্বগোক্তির মতো বলতে থাকে সাজু-‘কী করবু রে বাবা, কাম তো আজকেই শ্যাষ করা নাগবে, নাহলে কি আর ট্যাকা দিবে, তোমাক দুইটাক না পিটাইলে কী আর ভাত জুটিবে মোর কপালে?’-গরুগুলো চোখ বুজে থাকে-আরামে, ক্লান্তিতে নাকি ভালোবাসায়-কে জানে! পশুরা নাকি ভালোবাসা বুঝে!

লাঙ্গল, মই আর কাদায় ভেজা দড়িগুলো ভেতর বাড়িতে রেখে হাঁক ছাড়ে সাজু, ‘কী গো, আতুলের মাও, খাবার দ্যাও, খিদ্যায় প্যাট চো চো করবা নাচ্চে।’

রাতুল ফিরে আসে স্কুল থেকে, বই-খাতা ঘরের মেঝেতে রেখেই দেয় এক ভোঁ দৌড়। দাড়িয়াবান্ধা খেলতে যায় সে।

সারা দিন ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে অনবরত, পুকুরের স্থির টলটলে পানিতে ঝিরঝিরে বৃষ্টির শব্দে এক অন্য রকম সুরের আমেজ পাওয়া যায়; যে মানুষ এই পরিবেশে পুকুরে ডুব দিয়ে মিনিট খানেক শোনার চেষ্টা করে নাই সেই সুর, তার পক্ষে অবশ্য এটা অনুভব করা সম্ভব নয়। যেমন অনুভব করা সম্ভব নয়, রাতুল কেন দুই মিনিট পর পর পানিতে ডুব দিয়ে মিনিট খানেক পানিতে ডুবে থেকে মাথা ভাসিয়ে দিয়ে আবার ডুব দিচ্ছে! সেকি জল-বৃষ্টির মিলিত প্রচেষ্টায় সৃষ্ট এই অন্য রকম মিউজিকের আকর্ষণের টানেই নাকি অন্য কিছু? মাঝ পুকুরে ঘন্টা দুয়েক ধরে নির্বিকারভাবে ভাসতে থাকা সাদা-কালো হাঁস জোড়ার অবশ্য রাতুলের এই ভাসা ডোবার খেলায় কিছু যায় আসে না। তারা তাদের মতো বয়ে যাচ্ছে জল-বৃষ্টির এই যৌথ অবগাহনে, মাঝে মাঝে পুরুষ হাঁসটি উঠে পড়ছে নারী হাঁসটির উপরে, ভালোবেসে ঠোঁট দিয়ে পুরুষ হাঁসটির পালক আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে নারী হাঁসটি! কী এক অসাধারণ খেলায় মত্ত দু’জন! কেউ কারেও ছেড়ে উঠতে চায় না! জানালা দিয়ে পুকুরের দিকে তাকিয়ে এইসব দৃশ্য দেখতে থাকে ওসমান।

এটাই ভালোবাসা প্রকাশের জগতের সবচেয়ে আদিম ও অকৃত্রিম উপায় কিনা, এটা ভাবতে ভাবতেই ওসমানের পাশে এসে গা ঘেঁষে বসে রুবীনা। রুবীনার শরীরের ভেজা গন্ধে ওসমানের শরীর ও মনে আনচান এক অনুভূতি দোলা দিয়ে যায়! হঠাৎ ওসমান আলতো করে ছুঁয়ে দেয় রুবীনার ঠোঁট। একটা ভেজা স্নিগ্ধ অনুভূতির মতোন রুবীনার শরীর ভিজে যাচ্ছে ওসমানের ভেজা ঠোঁটের স্পর্শে! সেই আনন্দে ওসমানের শুকনো দরিয়ায় নানান ভঙ্গিমায় আনন্দযাত্রার ঢেউ তুলে যাচ্ছে রুবীনা! এই মুহূর্তে জগতে আর কিছু নেই, কথা নেই, নেই অভাব-অভিযোগ-অনুযোগ-রাগ-ক্ষোভ-দুঃখ-কাজকর্ম-সংসার বলে কোনো জিনিসের অস্তিত্ব; আছে শুধু শরীরের সাথে শরীরের বোঝাপড়ার এক অনবরত খেলা, আছে শরীরের সাথে শরীরের সংসার আর আছে অনবদ্য শীৎকার! কেউ কোনো কথা কয় না, কথা কয় শুধু জ্যান্ত দু’টি শরীর! এই সময়ে শিরশিরে ভেজা বাতাসে শব্দেরা কবিতার রুহ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় হয়তো; কেউ তারে ধরতে পারে, কেউ পারে না! কোথাও হয়তো কোনো কবি লিখছেন এইসব দৃশ্য কল্পনা করেইঃ

“শুনো মেঘ,জলের কথা শুইনো!

জেনে রেখো,

শব্দের সামর্থ্য নেই-

শীৎকারকে ধারণ করে-অবিরাম জলের বর্ষণে!” 

কথার কোনো দরকার আছে কি? ভাষা কি শুধু বাগযন্ত্রের শব্দেই নাকি শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও থাকে? এসব কথা আপাতত না জানলেও চলবে ওসমান ও রুবীনার! তারা বরং শরীরের সাথে শরীরের ভালোবাসার শব্দের চাষ করুক, কামের ভাষায় ফুল চাষ করুক শরীরের শব্দে, দুই শ্রমিক শরীর মিলে চাষ করুক রাজ্যজোড়া নানান ফুল ও ফসলের!

আমরা বরং ফিরে যাই, কাদেরের কাছে। কাদের কোথায়? কাদের এখন মেথর পট্টিতে, ভরপুর চোয়ানি গিলছে আর সাথে দুই একটা করে চুটকি শোনাচ্ছে আর মদন লাল হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছে। এই যেমন এই মুহূর্তে একটা চুটকি বললো কাদের, ‘চোদনে চোদন, নাম তার মদন!’ ‘ক্যায়া বাত বলতা হ্যায় কাদের মিয়া, হামরা নাম মদন হ্যায়, হামরা কাম হোগা চোদন! কিউ বলতা অ্যায়সে! হামি ক্যাসে চুদেগা, জিন্দেগি হামকো চুদে। জিন্দেগির মায়রে চুদি!’- বলতে বলতে অদ্ভূত এক ভঙ্গিতে হাসে মদন লাল। এ সময় মদন লালের বউ ফুলমনি আরও দুই গ্লাস চোয়ানি দিয়ে যায়। কাদের লাল লাল চোখে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে ফুলমনির আতিথিয়তা; মূলত আড়চোখে কাদের চেখে নেয় ফুলমনির শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। মদন লালের চোখ এড়ায় না ব্যাপারটা! কিন্তু কাদেরকে কিছু বলে না। কাদেরের মত নিয়মিত কাস্টমার হাতছাড়া করতে চায় না সে। এই চোয়ানি বেচেই সংসার চলে মদন লালের, কাস্টমারের একটু খায়েশ যদি পূরণ হয় ফুলমনিকে দেখে, তাতে পেটে দানা দু’টো কম পড়বে না বৈকি! এটা যে তার মনের ভাব নয়, এটা যে বাধ্যবাধকতা, সেটা বোঝে বলে চরম যন্ত্রণা সহ্য করেও মদন লাল প্রতিদিন এই দৃশ্য হজম করে। প্রায়ই এমন কাস্টমার আসে, যারা কামুক দৃষ্টি নিয়ে তাকানোর সাথে সাথে ফুলমনির শরীরও ছুঁয়ে দ্যায় নানান উছিলায়, অবশ্য ফুলমনি খুবই কৌশলে এড়িয়ে যায় এই সব হাতের খায়েশ আর চোখের লোভী চাহনি! তখন মদন লালের ইচ্ছে করে শূয়োরের বাচ্চাগুলোর অণ্ডকোষে লাত্থি মেরে এই চুতিয়া চোয়ানির ব্যবসা বন্ধ করে অন্য কোথাও চলে যায়! কিন্তু যাবে কোথায়? এই জগতে মেথুরপট্টির এই খুপড়ি ছাড়া ওদের আর আশ্রয় কোথায়? কোন সমাজ ওদেরকে মানুষ মনে করে; কিন্তু নারীর শরীর পেলে কোনো সমাজই তখন আর জাত-পাত দেখে না!

মাঝে মাঝে দুই একরাত ভরপুর চোয়ানি গিলে জীবনের প্রতি এক বুক অভিমান নিয়ে মদন লাল বিছানায় উঠে ডুকরে কেঁদে ওঠে। গলা ফেড়ে চিল্লায়, ‘জিন্দেগির মায়রে চুদি! ক্ষুধার মায়রে চুদি! শালা, এ কৌন জীবন হ্যায়, হাম উচকো চুদতা হ্যায়।’ একেবারে শিশুদের মতো সরল চাহনি নিয়ে জীবনের প্রতি তার খেদ, বেঁচে থাকার প্রতি ক্ষোভ আর ক্ষুধার প্রতি অভিমান জানিয়ে হাউমাউ করে ডুকরে কেঁদে ওঠে। ফুলমনি এগিয়ে এসে মদন লালের মুখটা তার বুকে চেপে ধরে। ফুলমনির বুকে, স্তনের গন্ধে ও আলতো ছোঁয়ায় কয়েক মিনিট ফোঁপায় মদন লাল; এরপর জীবনের নতুন যে ভাষাটা, ভালোবাসার যে মুহূর্তের সূচনা হয়; ক্ষণিকের জন্য দু’জনেরই মনে হয় এই ভাষা যদি অনন্তকাল ধরে চলতে থাকতো! জীবন যদি এখানেই আজীবন আটকে থাকতো! মাঝে মাঝে শুধু মদন লাল গোঙায় আর বলতে থাকে, ‘তোর মায়রে...।’ ফুলমনি ওর মুখ চেপে ধরে আস্তে আস্তে বলতে থাকে, ‘এ বাবুয়া, তু কিউ রাগ করতা হ্যায়; হামরা এ জীবন তোর লাগি। চোদ হামকো, তোর লাগি হামার সব... লেকিন চোয়ানি নেহি বেচেগা তো পেট ক্যাসে ভরেগা। ভুখের চি বড়া অর কোন দানব হ্যায় জিন্দেগি মে, তু বোল হামকো, এ বাবুয়া বোল না। হামি শুধুই তোর! শুধুই তোর!’

মদন লাল আর ফুলমনির এই মান অভিমানের খেলা, জগতের সবচেয়ে আদিম ভাষার চর্চা হতেই থাকে; ওদিকে শ্মশানের পেঁচাটা ভয়মিশ্রিত এক করুণ সুরে ডাকতে থাকে বটগাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে থেকে। আর ভরপুর চোয়ানি গিলে, ইচ্ছে মতোন গাঞ্জার কল্কি টেনে চিতায় শুয়ে শুয়ে পাতার সাথে চাঁদের লুকোচুরি খেলা দেখতে দেখতে হয়তো জীবনকে চুদে দেয়ার কথা ভাবতে ভাবতে হো হো করে হেসে ওঠে ঝন্টু, হয়তোবা কিছু না ভেবেই এমনি এমনিই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায় চিতার ওপর শুয়ে। এসময় অদ্ভূত এক শব্দে সহসাই শিরশিরে বাতাস বইতে শুরু করে। সেই বাতাসের শব্দে কান পেতে ঝন্টু বাতাসের শিহরণে আরও জোরে জোরে হাসতে থাকে, এ হাসি আর থামে না, আদৌ থামবে কিনা বোঝা যায় না! দূর থেকে-অনেক দূর থেকে এই বাতাস, চাঁদ ও জোছনার মিলিত খেলা, পেঁচার ভয়ার্ত করুণ সুরের ডাক আর ঝন্টুর অদ্ভূত স্বরে ও সুরে হাসির এই মিলিত পরিবেশের মিউজিক কিংবা ভাষা এক অন্য দুনিয়ার কথা কয়ে যায়! পরিচিত কোলাহলের জগতে এই সুর পাওয়া যায় না!

জগতের কোনো না কোনো জায়গায় কোনো না কোনো সময় এইসব খেলা চলতে থাকে, শুধু নাম আর জায়গার বদল হয়। ফাঁকা ধু ধু রাস্তায় চেহারা বদল হয় শুধু, রাস্তা সেই একই থাকে এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত। এই রাস্তা বদল হয় কি কখনো? কেউ কি রাস্তার বাঁকে নতুন করে নতুন কোনো রাস্তা রচনা করার খুঁটি গাড়ে কোথাও? নাকি জগত এরকম বিরানই পড়ে থাকে, সেই একই গল্প ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন ভিন্ন নামে!

(চলবে...) 



সাঈদ বিলাস

কবি ও গল্পকার

প্রকাশিত বইঃ শ্রমদাস (কবিতার বই) 

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0838 seconds.