• বিদেশ ডেস্ক
  • ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ২১:৪১:৪৮
  • ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ২১:৪৮:৩৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

স্কুলগুলো শিশুদের কৌতুহলকে হত্যা করছে

ছবি : দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেয়া

ছোট শিশুরা পা গুটিয়ে মাদুরের ওপর বসে আছে। আর শিক্ষক মেঘের ছবিসহ উপকরণ নিয়ে তাদের আবহাওয়া সম্পর্কে পড়ানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শ্রেণি কক্ষের বাহিরে, অন্ধকার আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি এবং মেঘের গর্জন। কৌতুহলী শিশুরা সেখানে মনোনিবেশ করে, কথা বলে। কিন্তু শিক্ষক তাদের মনোযোগ শ্রেণি কক্ষে ফিরিয়ে নেয়- শিক্ষার উদ্দেশ্যটি কি বলে না যে, তারা আবহাওয়া সম্পর্কে শিখছে?

এই দৃশ্য অধিকাংশ বিদ্যালেয়ের। শিশুদের আগ্রহের বিষয়ে তাদের মনে অনেক প্রশ্ন থাকে, কিন্তু তারা স্কুলে প্রশ্ন না করার বিষয়টি শিখছে। পরীক্ষা এবং শিক্ষার উদ্দেশ্যগুলো এ পটভূমির বিপরীত, অলিখিত এই প্রশ্নগুলোর প্রধানত উত্তরই দেয়া হয় না এবং এতে করে শেখার সুযোগটি হাতছাড়া হয়।

অথচ আমেরিকার নতুন গবেষণা বলেছে, আমাদের প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে উৎসাহ দেয়া, কারণ কৌতুহলী শিশুরা এতে ভালো করে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘আরলি চাইল্ডহুড লনজিটিউডেনাল স্ট্যাডি’র অংশ হিসেবে ৬ হাজার ২০০ শিশুর কৌতুহল পরীক্ষা করা হয়। ইউনিভারসিটি অব মিশিগান সিএস মট চিলড্রেন হসপিটাল এবং সেন্টার ফর হিউম্যান গ্রোথ এন্ড ডেভলপমেন্ট এই গবেষণা পরিচালনা করে। জুডিথ জুথ ও আমার নতুন বই ‘হাউ টু সাকসিড এট স্কুল’এ  গবেষণাটি তুলে ধরা হয়েছে। প্রত্যেক পিতামাতার এটা জানা উচিত।

যখন শিশুরা বাচ্চা (এখনো হাটতে বা কথা বলতে শেখেনি), সবেমাত্র হাটতে শিখেছে এবং স্কুলে ভর্তি উপযোগী হয়নি- এই তিন ভাগে ভাগ করে গবেষকরা শিশুদের কৌতুহলের স্তর নির্ধারণ করেন এবং পিতা-মাতাদের পরিদর্শন ও প্রশ্নমালা তৈরি করেন। এরপর কিন্ডারগার্টেনে (স্কুলের প্রথম বর্ষ) পড়া, গনিত এবং ব্যবহার পরীক্ষা করা হয়েছিলো। সেখানে তারা অধিকাংশ কৌতুহলী শিশুদের কার্যকর ভূমিকাই পেয়েছিলো। এমন একটি বিষয় বেরিয়ে এসেছে বা দেখা গেছে, গরীব ও ধনী শিশুদের মধ্যে পার্থক্য। যা শিক্ষা অর্জনের বিষয়টিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। অনগ্রসর শিশুদের কৌতুহল ও কর্মসম্পাদনের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক ছিলো।

গবেষণায় আরো পাওয়া গেছে, যখন স্কুলে ভালো বিষয় আসে, তখন মনযোগ কেন্দ্রভূত হয়। উদাহারণ স্বরূপ- একটি বজ্রপাতে তাদের বিভ্রান্ত করে না, সেখানে কৌতুহলের থেকেও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিলো- সেই ঝড় সম্পর্কে শিশুদের প্রশ্ন থাকতে পারে।

প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভালো ফলাফলের জন্য একজন শিক্ষক মনযোগ এবং ভালো ব্যবহারের উপর বেশি গুরুত্বারোপ করেন। এখন বোর্ডে দিকে তাকানোটা কৌতুহল তৈরি করার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ড. প্রাচী শাহ মোট’র উন্নয়নমূলক ও আচরণ বিষয়ক শিশুবিশেষজ্ঞ এবং মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী গবেষক বিজ্ঞানী বলেন, ‘শিশুদের কৌতুহলকে উৎসাহ দেয়া, বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর পরিবেশ থেকে আসা। অর্জনের ব্যবধান চিহ্নিত করতে স্বীকৃত পথ অনুসরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কৌতুহলকে উন্নত করাই হলো শিক্ষার ভিত্তি, এটাতে আমরা আরো বেশি জোর দিতে হবে যখন আমরা একাডেমিক অর্জন দেখবো।’

শিশুরা জন্মগতভাবেই কৌতুহলী। মাত্র হাঁটতে শেখা শিশুর প্রশ্নগুলো সীমাহীন মনে হতে পারে- শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে মানব জাতির এটা একটি জটিল পদ্ধতি। ২০০৭ সালে গবেষকরা ১৪ মাস হতে ৫ বছরের শিশুদের জিজ্ঞাসা করা প্রশ্নগুলো নিবন্ধন করেছিলো, সেখানে দেখা গেছে তারা ১ ঘণ্টায় গড়ে ১০৭টি প্রশ্ন করেছিলো। একটি শিশু এক মিনিটে সর্বোচ্চ তিনটি প্রশ্ন করেছিলো।     

‘দ্য হাঙ্গরি মাইন্ড’র লেখক সুসান এনঙ্গেল এবং শিশুদের কৌতুহল নিয়ে কাজ করা একটি আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, একজন শিশু স্কুল শুরু করার পর পাথরের মত প্রশ্ন খোঁজা বন্ধ করে দেয়। যখন তার দল শ্রেণিকক্ষে প্রশ্নগুলো নিবন্ধন করেছিলো, তিনি আমেরিকার একটি প্রাথমকি বিদ্যালয়ে ছোট্ট শিশুদের দুই ঘণ্টার মধ্যে দুই থেকে তিনটা প্রশ্ন করতে দেখেন। আরো খারাপ, শিশুরা বড় হওয়ার সাথে সাথে প্রশ্ন করা পুরোপুরি ছেড়ে দেয়। পঞ্চম গ্রেড (ষষ্ঠ বর্ষ) সেখানে ১০ থেকে ১১ বছরের শিশুরা দুই ঘণ্টা সময়ের মধ্যে তাদের শিক্ষককে একটি মাত্র প্রশ্ন করতেও ব্যর্থ হয়েছিলো।

এক্ষেত্রে তিনি একটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করেছেন, নবম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করার জন্য হাত তুলে- যদি পৃথিবীতে এমন কোনো স্থান থাকে যেখানে কেউ শিল্প তৈরি করে না। কিন্তু শিক্ষক তাকে মাঝ পথেই থামিয়ে বলে, ‘জিও, এখন কোনো প্রশ্ন নয়, এটা হলো শেখার সময়।’

ম্যাসাচুসেটসের উইলিয়ামস্টাউনের উইলিয়ামস কলেজের উন্নয়ন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এঙ্গেল বলেন, ‘আপনি যখন বিশ্বের বিভিন্ন স্কুলে দেখতে যাবেন এটা মনে রাখা কঠিন হতে পারে যে তারা পূর্ণরূপে সক্রিয়, বুদ্ধিমান শিশুরা। কারণ কেউ তাদের অভ্যন্তরীণ মানসিক জীবন নিয়ে কথা বলে না। অধিকাংশ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে মনে হয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ পায়- শিশুরা কতটা ভালো আচরণ করে এবং কিভাবে তারা কার্য সম্পাদন করে। প্রায়ই শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা কৌতুহলকে দূরে সরিয়ে রাখে।’    

শিক্ষকরা যখন পাঠদান করেন ছোট্ট শিশুরা তখন প্রশ্ন করতে পারবে না, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ২০১৩ সালে আমেরিকার গবেষকরা উচ্চ- কার্যসম্পাদন সমীক্ষায় শিক্ষার্থীদের কম কৌতুহলী পাওয়া গেছে। কারণ তারা দেখেছে কৌতুহল তাদের ফলাফলের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করে। কিন্তু ফল ভালো করার জন্যই তারা প্রশ্নগুলো করে। মূলত বিষয়বস্তুকে গভীরভাবে বোঝার জন্যই কৌতুহলী শিক্ষার্থীরা প্রশ্নগুলো করে থাকে।

ব্রিস্টলের ইলমিনস্টার অ্যাভিনিউ নার্সারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ম্যাট কল্ডওয়েল বলেন, ‘স্কুল কৌতুহলকে হত্যা করে। শিশুরা যখন তাদের আগ্রহের বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন করে? প্রাইমারি স্কুলে যাওয়ার সাথে সাথে তাদের চুপ করে থাকতে হবে এবং শিখতে হবে। এটা শিক্ষকদের দোষ নয়। পূরণ করার জন্য তাদের অনেকগুলো লক্ষ্য রয়েছে।’

ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞান এবং শিক্ষার অধ্যাপক পল হাওয়ার্ড-জোনস বলেন, ‘মানুষ অভিনব পরিস্থিতিতে শেখে এবং কৌতুহল সেই প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের অবশ্যই প্রশ্ন করার জন্য উৎসাহ দিতে হবে, যদিওবা শিক্ষকদের জন্য এটা চেলেঞ্জিং।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রশ্ন খোঁজার জন্য আমাদের কিছু সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু সৃজনশীলতা ও কৌতুহলকে অনুসরণ করার মতো পর্যাপ্ত সময় স্কুলগুলোতে নেই।’

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান         

বাংলা/এনএস

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1135 seconds.