• ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৯:০০:৩৬
  • ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৯:০০:৩৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

কোন পথে হাঁটছে- রাষ্ট্রভাষা?

ছবি : সংগৃহীত


দিল্লুর রহমান :


১.
একটি রাষ্ট্রের বিকাশ ও সংহত হওয়ার প্রশ্নে ভাষা সমস্যার সমাধান হওয়া খুবই জরুরি। প্রশ্ন, আমাদের রাষ্ট্রে কি ভাষা সমস্যা আছে? হ্যাঁ আছে- আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলেও আনঅফিসিয়ালি এখানে ইংরেজির কর্তৃত্বই চলে। আমাদের ভাষা সমস্যার রূপটা এরকমই- কর্তৃত্বমূলক। বিষয়টি আরো পরিষ্কার হওয়ার দাবি রাখে।

আমাদের ভাষা আন্দোলন কেন হয়েছিল? আমরা জানি সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্থান রাষ্ট্র তার বিকাশ ও সংহত হওয়ার তাগিদেই এই ভাষা প্রশ্নটিকে ব্যাপক গুরুত্ব দেয়। আমরা জানি যে, গোটা পাকিস্তান জুড়ে শুধু এক উর্দূ ভাষার লোকই ছিল না বরং বাংলা, সিন্ধি, বেলুচি, পশতু ছাড়াও পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষজনও ছিল- যাদের নিজ নিজ ভাষার বর্ণমালা তো আছেই সাহিত্য পর্যন্ত আছে। এই প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব বাসভূমি, আলাদা অর্থনৈতিক জীবন এবং ভিন্ন মানসিক গঠনও রয়েছে তাদের নিজ নিজ ভাষাকে কেন্দ্র করে। সুতরাং প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়ন ও বিকাশই হতো পাকিস্তান রাষ্ট্রের সত্যিকারের বিকাশ। এ বিকাশের অপরিহার্য শর্ত হলো প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকার, সেই ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, রাষ্ট্র ও বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করবার অধিকার। কিন্তু শেষ বিচারে তা হয়নি। কেন হলো না?

২.
মোটাদাগে, এক রাষ্ট্রে অনেক ভাষা প্রচলিত থাকলে সেই রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না- এমন একটি খোঁড়া যুক্তির উপর ভর করেই তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। আমাদের ভাষা আন্দোলনের শুরু সেখান থেকেই। আমাদের অন্তত এটা স্বীকার করার সৎ সাহস থাকা উচিত যে, উর্দূকে কেবল বাংলা ভাষার উপরেই চাপিয়ে দেওয়া হয়নি বরং এখানকার অন্যান্য ভাষা-ভাষীদের উপরও চাপানো হয়েছিল। কাজেই বাংলাভাষীর উপরে যে আঘাত এসেছে তা অন্যান্য ভাষার উপরও এসেছে। ফলে এই উর্দূ আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য একটা সম্মিলিত সংগ্রামের আবশ্যকতা ছিল। তবে সে প্রসঙ্গ এখানকার আলোচ্য বিষয় নয়। বরং পূর্বপাকিস্তানের বাংলাভাষীরা বাংলার উপর উর্দূর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলেছে তার রূপরেখা তুলে ধরাই এখানকার আলোচ্য বিষয়।

৩.
আমাদের ভাষা আন্দোলনের দাবি ছিল- রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। মাতৃভাষার প্রতি এমন দরদ ও তার অপমানে এমন সংগ্রামী কোন জাতি না হয়? বাঙালিও তার ব্যতিক্রম নয়। আমরা জানি পূর্বপাকিস্তানে শুধু সমতলে বসবাস করা বাঙালি জাতিই নয় বরং এ ভূখণ্ডে প্রায় ৪৭ টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ রয়েছে। এদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজ নিজ মাতৃভাষা এবং কৃষ্টি। আমরা যখন স্লোগান তুলেছিলাম রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই তখন জেনে বা না জেনেই আমরা ক্ষুন্ন করেছি এই ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষদের মাতৃভাষার অধিকারকে। কিভাবে?

রাষ্ট্রধর্মের সাপেক্ষে বিষয়টি বোঝা সহজ হয়। রাষ্ট্রের যেমন কোন নির্দিষ্ট ধর্ম থাকতে পারে না তেমনি রাষ্ট্রের কোন নির্দিষ্ট ভাষাও থাকতে পারে না। একটি রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্মের লোকজন বাস করেন এবং সেই রাষ্ট্রে সবারই সমান অংশীদারিত্ব থাকে। তাই কোন নির্দিষ্ট ধর্মকে যখন রাষ্ট্রের ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই অন্য ধর্মগুলোর মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এবং অন্য ধর্মাবলম্বীরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হন। কারণ তখন বাকি ধর্মগুলোর উপর একটি মাত্র ধর্মের কর্তৃত্ব চলে আসে। ভাষার ক্ষেত্রেও তাই। নির্দিষ্ট একটি ভাষাকে- তা বাংলা, উর্দূ বা ইংরেজিই হোক- যখন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয় তখন সেই রাষ্ট্রে বাসরত অন্য ভাষা-ভাষী মানুষেরাও তাদের মাতৃভাষার অধিকার ও স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হন। চূড়ান্তভাবে যা রাষ্ট্রের মধ্যে বিভেদ ছাড়া আর কিছুই উৎপাদন করে না এবং এটি মানবতার চূড়ান্ত অপমান। তৎকালীন প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তান সরকার সর্বস্তরের জনসাধারণের মধ্যে এই বিভেদটাই তৈরি করেছিল এবং আমরা বাঙালি হিসেবে তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেরাই সেই বিভেদকে এখনও জিইয়ে রেখেছি- জেনে বা না জেনে। একটা লড়াকু জাতি হিসেবে এটা স্বীকার করার সৎ সাহস আমাদের থাকা উচিৎ। রাষ্ট্রধর্ম যে অর্থে গণতন্ত্র বিরোধী, রাষ্ট্রভাষা শব্দবন্ধটিও সেই অর্থেই গণতন্ত্র বিরোধী নয় কি?

৪.
একটি রাষ্ট্রে কি রাষ্ট্রভাষা থাকাটা খুব জরুরি? ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, নির্দিষ্ট করে রাষ্ট্রধর্ম বা রাষ্ট্রভাষা ভিন্নদের জন্য অপমানজনক এবং সমান অধিকারের প্রতিবন্ধক। তাই আধুনিক অনেক রাষ্ট্রেই রাষ্ট্রভাষার বদলে ‘অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ বা ‘দাপ্তরিক ভাষা’ ব্যাবহার করা হয়। সিঙ্গাপুরের অফিসিয়াল ভাষা ৩ টি, ফিনল্যান্ডের ৩ টি, যুক্তরাষ্ট্রের ৭ টি, সুইজারল্যান্ডের ৩ টি- জার্মান, ফরাসী, ইতালীয়। সাবেক বিপ্লবী রাষ্ট্র রাশিয়াতেও অফিসিয়াল ভাষা ছিল ১৬ টি এবং সেখানকার সরকারি দলিলপত্র ১৬ টি ভাষায় প্রকাশিত হত। আরশি নগর আরও কাছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও কোন নির্দিষ্ট রাষ্ট্রভাষা নেই। বরং সেখানে ২২ টি অফিসিয়াল ভাষা সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত। এই দেশগুলো বরং আমাদের চেয়ে এগিয়ে বৈ পিছিয়ে নেই। সুতরাং রাষ্ট্রধর্মের মতো রাষ্ট্রভাষা শব্দবন্ধটিকেও প্রশ্ন করার সুযোগ থেকে যায়।

নির্মম সত্য হলো- এই দেশের নাগরিকগণ দু-দুবার স্বাধীনতা অর্জন করেছে বটে কিন্তু এখনও নিজেদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ এখানে বিভাজনের কোন শেষ নেই। এখানে বিভাজনের মাত্রটা সবচেয়ে বেশি হয়েছে রাষ্ট্রধর্মকে কেন্দ্র করে। আরেকটা হয়েছে এই রাষ্ট্রভাষা কেন্দ্রিক। বাঙালি নিজেদের মধ্যেই যেমন বহুভাগে বিভক্ত তেমনি মিলন হয়নি পাহাড়ি ও সমতলীদের মধ্যেও- অথচ এরা চিরকালের পড়শি। পাহাড় আর সমতলের যে দ্বন্দ্ব তার উৎসও পাওয়া যাবে এই ভাষার প্রশ্নেই। সুতরাং আমাদের রাষ্ট্রভাষা শব্দবন্ধটিকে নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত।

৫.
আমাদের এটা মাথায় রাখা উচিত যে, একটি রাষ্ট্রে অনেকগুলো ভাষা চালু থাকা মোটেও ভয়ংকর ব্যাপার না। বরং অর্থনৈতিক আদান-প্রদানের স্বার্থেই আপনা থেকেই নির্ধারিত হবে কোন বিশেষ ভাষাটি বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য বেশিরভাগের পক্ষে সুবিধাজনক। এই নির্ধারণ হবে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক এবং সুদৃঢ়। কেননা বিভিন্নজাতির লোকেরা স্বেচ্ছায় সেই ভাষাকে গ্রহণ করবে। এখানে ভাষার কর্তৃত্ব, অর্থাৎ- এক ভাষার উপর আরেক ভাষাকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার কোন ব্যাপার নেই- যেমন কর্তৃত্ব দেখা গেছে পাকিস্থান পর্বে। নিশ্চয়ই স্বাধীন বাংলাদেশেরও সেই পথে হাঁটা উচিত হবে না!

লেখক : সদস্য, রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি
 

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0207 seconds.