• ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৫:১১:৩৮
  • ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৫:১১:৩৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

পাপিয়া টু সম্রাট, আমাদের দৌড় এ পর্যন্তই

ফাইল ছবি


কাকন রেজা :


সাম্প্রতিক অতীতের একটি ছবি সবার দৃষ্টি কেড়েছিলো। ‘I don’t need sex. My government fucks me everyday’ ক্যাপশানের ছবিতে মূলত এই লেখা সম্বলিত একটি টি-শার্ট প্রদর্শিত হয়েছে। একজন প্রতিবাদী মানুষ টি-শার্টটি পড়ে আছেন। প্রতিবাদ ও টি-শার্টটি’র বিষয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে বিশদ না বলি।

তারচেয়ে কথা হোক দেশের ‘পাপিয়া’ বিষয়ক ইস্যুটির সাথে ছবিটির অন্তর্নিহিত মিলটি নিয়ে। আমাদের সাধারণের এখন চলছে, ‘ভিক্ষা চাই না, কুত্তা সামলাও অবস্থা’। চারিদিকের চাপে দমবন্ধ অবস্থা। কথা বলা থেকে শুরু কোথাও কোনো স্পেস নেই।

এমন অবস্থায় ‘সেক্স’ অনেকটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেক্স বলতে যাপিত জীবনের স্বাভাবিক যৌনতা। এখন অস্বাভাবিকতার উত্থান ঘটেছে সবখানে, এমনকি যৌনতাতেও। অসাধারণ শ্রেণির মানুষেরা, যারা লুটেপুটে খাচ্ছেন তাদের যৌনতার সামগ্রী তথা ‘সেক্স মেটারিয়ালস’ হচ্ছেন পাপিয়া’রা। আরেক শ্রেণির যৌনতা হচ্ছে ‘রেপ’। এখানেও ‘পাপিয়া’দের লীলাযজ্ঞের সাথে রেপে’র একটা সাদৃশ্য রয়েছে।

অপরাধী চিত্তের অসাধারণদের ফ্যান্টাসির জন্য প্রয়োজন হয় পাপিয়া’দের। সাধ্য আছে বলেই ছিনিয়ে আনতে হয় না, জোর করতে হয় না, টাকার জোরেই পারেন। আর যাদের মনে অপরাধ রয়েছে কিন্তু ট্যাঁকে টাকা নেই, তাদের ফ্যান্টাসি রেপে। ধনীরা টাকার বদৌলতে এবং ধনহীনরা জোর করে তাদের ধর্ষকামের ইচ্ছা পূরণ করে। দুটো শ্রেণিই ধর্ষকামী।

দুই. 
এক প্রভাবশালী মন্ত্রী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই পাপিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এমনটাই জানিয়েছে গণমাধ্যম। পাপিয়া তাহলে মিথ্যা বলেনি যে, সে প্রচন্ড ক্ষমতাধর। র‌্যাবের লোকজন যখন তাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়েছে, তখন তাদের যা-তা বলেছে সে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী তুইতোকারিও করেছে। বলেছে, ‘জানিস আমি কে!’ এই চোটপাট অস্বাভাবিক নয়। যাকে গ্রেপ্তার করতে সরকার প্রধানের নির্দেশ লাগে সেতো এমন চোটপাট করবেই। 

প্রধানমন্ত্রী নারী বলেই বিবেচনা প্রসূত হয়ে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি না দিলে হয়তো পাপিয়া গ্রেপ্তার হতো না। এছাড়া বলার বা ভাবার কী আছে। এমন একজন পুঁচকে ‘সেক্স মেটারিয়াল’কে ধরতে যেখানে কোনো থানার এসআই বা ওসি’ই সর্বোচ্চ, সেখানে কেনো প্রধানমন্ত্রীর মতন রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীকে নির্দেশ দিতে হবে! আরেক খবরে দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী হাতে দেড়শ অপরাধীর তালিকা। এর আগেও এমনটা দেখেছি। সব কিছুতে প্রধানমন্ত্রীকে টেনে আনা কেনো? যারা এমনটা আনেন, তারা কি বোঝেন; এই যে, দেড়শ’র তালিকার কথা বলছেন, এমন অপরাধীরা ধরা না পড়লে, তার দায় পড়বে অনেকটাই প্রধানমন্ত্রীর উপর। যে বিষয়গুলো অনেক নিচের পর্যায় থেকেই সামলানো যায়, তার দায়িত্ব সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছানো কেনো? এতে কি অমন পর্যায়ের মানুষের সম্মান বাড়ে? প্রশ্নটা রইলো ভেবে দেখার জন্য। 

তিন. 
ক্যাসিনো কান্ডে গ্রেপ্তার হয়েছিলো এনু-রুপন। দুই সহোদর ভাই। ঢাকায় তাদের বহু বাসার একটিতে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব। সেই বাসা থেকে উদ্ধার হয়েছে নগদ ছাব্বিশ কোটি টাকারও বেশি। এক কেজির উপর স্বর্ণালংকার। পাঁচ কোটি টাকার এফডিআরসহ বিপুল পরিমান বিদেশি মুদ্রা। এর কিছুদিন আগে গ্রেপ্তারের সময়ও তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছিলো টাকা আর মাদকদ্রব্য। এরা দুজনেই ছিলেন শাসক দলের নেতা। গ্রেপ্তারের পর তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। পাপিয়াও বহিষ্কার হয়েছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এরা কি এমনি-এমনি এত টাকার মালিক হয়েছেন? না, তা হননি। কারো মদতে, কাউকে আরো টাকার মালিক বানিয়ে দিয়েই তারা এসব খুদকুঁড়ো জমিয়েছেন। তাদের অবস্থান অনুযায়ী এর বেশি অর্জন তাদের সম্ভব নয়। অন্তত দৃশ্যমান চোখে তাদের অবস্থান অতটা উপরের নয়। সুতরাং তাদের ‘লিফ্ট করানেওয়ালা’ কেউ বা কারা তো অবশ্যই রয়েছেন। সেই করানেওয়ালাদের লিফ্ট কতটা উপরে উঠে গেছে তা আন্দাজ করা হয়তো অসম্ভব। তাদের এক্সপোজ করাতো ‘দূর কা বাত’। আমাদের যত ঝাড়াঝাড়ি সব পাপিয়া-এনু-রুপন আর সম্রাটদের উপরেই। এর উপরের জার্নি শরীরের পক্ষে ‘হানিকারক’ বলেই মাধ্যমগুলো সেই জার্নিতে যেতে চায় না। তাদের দৌড় ‘পাপিয়া টু সম্রাট’ পর্যন্তই। গুলিস্তানের মুড়ির টিন, মিরপুর-টু-গুলিস্তান। 

চার. 
তবে ‘দেশ যে এগিয়েছে’ এ কথা সত্যি। না হলে কী চুনোপুঁটি ধান্দাবাজ, বাজিকর, জুয়ারি আর রূপজীবীদের কাছ থেকে এমনিতেই পাওয়া যাচ্ছে কাড়ি কাড়ি টাকা! গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী এনু-রুপনের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা টাকা গুনতে দুটি মেশিনের দিনভর লেগেছে। পাপিয়া’র এক মাসের হোটেল বিলই হয়েছে প্রায় তিন কোটি টাকা। প্রতিরাতে মদের বিল ভরেছে আড়াই লাখ টাকা করে। টাকাই টাকা!

বিপরীতে সাধারণ মানুষের দমবন্ধ হাঁসফাঁস অবস্থা। রোজগারের একটা অংশ শুধু পেঁয়াজ কিনতেই চলে যায়। যেখানে পাপিয়া’দের প্রতিদিন মদের বিল হয় আড়াই লাখ টাকা, সেখানে সাধারণ মানুষের মাসের বিদ্যুৎ, গ্যাস আর পানির বিল দিতেই বেঁচে থাকার ইচ্ছা উঠে শিকেয়। সঞ্চয়পত্রের সুদের টাকা দুম করে অর্ধেক হয়ে যায়, সাথে পেনশনজীবীদের বেঁচে থাকার কালও অর্ধেক হয়ে উঠে। সাধারণের হাত ঠেকে কপালে। অথচ ‘সেক্স মেটেরিয়াল’রা কাটায় রাণীর জীবন! আহা, কী বিচিত্র এই দেশ!

পুনশ্চ : লেখা শেষ করতেই আরেকটি মাধ্যমের শিরোনাম চোখে পড়লো, ‘হদিস মিলছে না ১৫০০ কোটি টাকার’। এই হিসাব না মেলা টাকাটা ব্যাংকের। যা লোপাট করেছে প্রকাশ কুমার। সংক্ষেপে ‘পিকে’। ব্যাংক থেকে এসব হাপিশ হওয়া টাকারই ক্ষুদ্র অংশ পাওয়া গেছে এনু-রুপন-পাপিয়া-সম্রাটদের কাছে। আর মূল অংশটা রয়ে গেছে এদের ‘লিফ্ট করানেওয়ালা’দের ভান্ডারে। পিকে বা তাদের আরো উপরের কারো কাছে।

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাকন রেজা পাপিয়া সম্রাট

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0209 seconds.