• ০৬ মার্চ ২০২০ ১২:০৩:৩৬
  • ০৬ মার্চ ২০২০ ১২:০৩:৩৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘হ্যাপি বার্থ ডে আব্বুজি’, ফাগুন এবার বলেনি : অর্থহীন জন্মদিন এবং বেঁচে থাকা

ছবি : লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেয়া

বার বার সময় পিছিয়ে যায়। ক্যালেন্ডারের পাতাও। বর্তমানটাকে অবিশ্বাস্য মনে হয়। ফাগুন নেই। কি করে সম্ভব! গত বছর মার্চের ছয় তারিখ। ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাতে বারোর ঘর পেরিয়ে বারোটা এক, দুই, তিন পেরুলে, ‘আব্বুজি হ্যাপি বার্থ ডে’- ফোনে ভেসে আসে ফাগুনে’র কণ্ঠস্বর। ছয় মার্চ আমার জন্মদিন। গত বছর পর্যন্ত এ দিনটা ছিলো আনন্দের, আজ মনে হয় অর্থহীন, কষ্ট এবং যাতনার। ফাগুনকে ছাড়া আমার বয়স বাড়ে কি করে! সময় কিংবা ক্যালেন্ডারের পাতা কিভাবে এগিয়ে যায়। আমি বুঝি না। এর আগে, রাতে উইশ করতে মনে না থাকলে সকালে উঠেই ‘উইশ’ করেছে ফাগুন। ‘আব্বুজি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, হ্যাপি বার্থ ডে’। তুই আর ‘হ্যাপি’ বলবি না বাবা। তোর ‘উইশ’ ছাড়া আমার জন্মদিন আর কোনো দিন ‘হ্যাপি’ হবে কিভাবে! তোর জন্মের পর তোকে ছাড়া নিজেকে কল্পনা করিনি কখনো। আজ এই জন্মদিন তোকে ছাড়া ‘হ্যাপি’ হবে! তুই-ই বল সম্ভব কিনা? তোকে ছাড়া আর একটা দিনও কি আর ‘হ্যাপি’ হবে রে বাপ!

পাঁচই মার্চ সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। মেয়েটা আমার জন্য কেক এনেছে। ও কাল চলে যাবে তাই ছয় ঘণ্টা এগিয়ে জন্মদিন পালন। ফাগুনের অপূর্ণতা ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা। ছোট ছেলেটা, ওর মা- সবাই মিলে মেয়ের সাথে চেষ্টা করে বিষাদের স্তরটা ভাঙতে। সেই স্তর ভাঙা কি যায়, যায় না। তবু চেষ্টা, তবু বেঁচে থাকা। মেয়েটার চেষ্টাটাকে মাটি করে দিতে মন চায়নি, ‘আব্বুজি, হ্যাপি বার্থ ডে’ সেই কণ্ঠস্বর মনে করে কেকটা কেটেছি হাসিমুখে। সত্যিই কি হাসিমুখ ছিলো? হয়তো। কিংবা নিজেদের সাথে নিজেরা লুকোচুরি খেলেছি। যাতনা লুকানোর খেলা। সেই খেলায় হাসিমুখগুলো ছিলো চেষ্টিত, জোর করে ভালো থাকার চেষ্টা। হায় চেষ্টা, সেও এক যাতনার নাম।

কথা হচ্ছিল এক তরুণ কবির সাথে। ফাগুনকে নিয়েই কথা। কবিতার ব্যাপারে ফাগুনের আগ্রহের কথা জানলাম সেই তরুণ কবির কাছ থেকেই। ফাগুন চলে যাবার আগের দিন কবিতা নিয়ে কথা হয়েছে ওর দু’ঘণ্টা ধরে। রকিবা হাসান যার ডাক নাম রাব্বি, জানালো, কবিতার প্রতি আগ্রহ ছিলো ফাগুনের। দেখা হলে মাঝেমধ্যেই বলতো, ‘ভাই, কবিতা শোনান।’ রাব্বির বর্ণনায় ফাগুনের প্রতিটা কথায় লজিক থাকতো। আর ও ‘প্লাগইন’টা বুঝতো। কোথায় কখন ‘প্লাগইন’ করতে হবে, সেটা বুঝেই কথা বলতো ফাগুন। সত্যিই জানতাম না, কবিতার প্রতি এতটা আগ্রহ ছিলো ওর। নিজে হয়তো লিখতো না, কিন্তু কবিতা বুঝতো। কতকিছুই না বুঝতো আমার ছেলেটা। ছবি, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ কী না বুঝতো ফাগুন। যেটা নিয়ে কথা বলতে যাবেন, ও কথা বলতো। ধীরে তবে যুক্তির সাথে। ওর দেয়া যুক্তি খণ্ডন করাও ছিলো খুব কঠিন। কতদিন আমাকে রাগিয়ে দিয়েছে। মাঝেমধ্যে জবাব দিতে না পেরে আমিই রেগে যেতাম। ও আমাকে রাগিয়ে মজা পেতো।

ফাগুনের এই বিকাশকে আমি ভয় পেতে শুরু করেছিলাম। কেন যেনো মনে হচ্ছিল ও বর্তমান পৃথিবীর চেয়ে একধাপ আগানো একজন মানুষ, চিন্তায় এবং বাস্তবতায়। প্রকৃতি এই অসঙ্গতি কি মেনে নেবে, সত্যিই এমনটা মনে হতো আমার। প্রকৃতি মেনে নেয়নি। হয়তো তার রাজের কোনো অংশ খুলে যেতো, সেই ভয়ে ওকে ‘অমিট’ করে দিয়েছে। গ্রিক মিথোলজি নিয়ে খুব ভালো পর্যবেক্ষণ ছিলো ফাগুনের। ও যে কখন গ্রিক মিথোলজি নিয়ে, বলতে গেলে একরকম গবেষণা শুরু করেছিলো তা বলতে পারবো না। যখন জানতে শুরু করলাম, মনে হচ্ছিল সে পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত পিএইচডি’র গবেষণা লেভেলের। এরজন্যেই বলছি, ও ছিলো সময়ের চেয়ে, বয়সের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে। হয়তো এটা ছিলো প্রকৃতিবিরুদ্ধ। প্রকৃতি তার বিরুদ্ধতা সহ্য করে না। আর সেই বিরুদ্ধতার সাথে যদি যোগ হয় জাগতিক যোগসাজশ। বিশুদ্ধতার বিরুদ্ধে অশুদ্ধতার আততায়ী হাত যখন উত্থিত হয় তখন আর করার কিছু থাকে না। মানুষকে নিয়তিবিদ্ধ হতে হয়।

পাঁচ মার্চ সন্ধ্যায় কেক কেটেছি ছেলে-মেয়ে ওদের মার মুখের দিকে চেয়ে। রাতের প্রথম প্রহরে ফাগুনহীন এমন ব্যাপার একেবারেই অসম্ভব ছিলো। ফাগুনের বা তার কণ্ঠস্বরের উপস্থিতি ছাড়া রাতের প্রথম প্রহর কেমন যাবে, যায় তা বুঝতে পারছি। পাঁজরগুলো মুচড়ে যাচ্ছে, চারিদিক জুড়ে ভিড় করে আছে অসহনীয় শূন্যতা। যে শূন্যতাকে পূর্ণ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। ফাগুনের শূন্যতা পূর্ণ করা প্রকৃতিরও সম্ভব হবে না। আমাকে শূন্য করতে গিয়ে প্রকৃতি নিজেও কিছুটা শূন্য হয়ে গেছে, হওয়া উচিত। 

শূন্যতার কথা থাক, যা পূর্ণ হবার নয় তা নিয়ে আলাপ শুধু যাতনাই বাড়ায়। তবে যাতনার আরেকটা কথা বলি। আমার ফাগুন, ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন চলে যাবার প্রায় সাড়ে নয় মাস পেরুলো। একজন গণমাধ্যমকর্মীকে খুন করা হলো। যার লাশ পাওয়া গেলো রেললাইনের ধারে। তার মৃত্যু কারণ আজো বের করা সম্ভব হলো না, এ এক অবিশ্বাস্য কথা। যার ফোন উদ্ধার হয়েছে। সম্ভাব্য একটা চিত্রও রয়েছে চোখের সমুখে, তবুও খুনি গ্রেপ্তার হচ্ছে না, প্রযুক্তির যুগে এটা অনেকটাই অসম্ভব এবং অবিশ্বাস্য ব্যাপার। পুলিশের উপর এখনো ভরসা করে আছি, আমি এবং আমার পরিবার। কতদিন এভাবে ভরসা ধরে রাখা যাবে জানি না। আমি এবং আমাদের সত্যিই তা জানা নেই। তবে এটুকু জানি, আমরা হাল ছাড়বো না। ফাগুনও ছাড়তো না। যার ফলেই ‘প্রান্ত’র মৃত্যু যে নিছক দুর্ঘটনা ছিলো না, সেটা সে ঠিকই বের করেছিলো। খবর করেছিলো। আর খুনিরা বের করেছিলো তাকে খুঁজে। বাবা হিসাবে আমিও ফাগুনের মতই। একইরকম নাছোড়বান্দা।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাকন রেজা ফাগুন রেজা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0219 seconds.