• ০৮ মার্চ ২০২০ ১৭:১৮:১২
  • ০৮ মার্চ ২০২০ ১৭:১৮:১২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

রবীন্দ্রনাথের গানের বিকৃতি খোদ রবীন্দ্রভারতীতেই, এটা বিকৃতি না প্রতিবাদের অন্য রূপ

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


ভারতে রবীন্দ্রভারতীর শিক্ষার্থীদের কীর্তি নিয়ে খুব কথা উঠেছে। কথা উঠেছে কলকাতার এক গাইয়ে রোদ্দুর রায়ের গান নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের গানে তিনি অশ্লীল শব্দ যোগ করে বিকৃত করেছেন। বিপুল উৎসাহে শিক্ষার্থীরাও অনুসরণ করেছেন রোদ্দুর রায়ের পদাঙ্ক। স্বভাবতই এনিয়ে শুরু হয়েছে চরম বিতর্কের। খোঁজা হচ্ছে এমন কর্মকান্ডের কারণ।

কলকাতার এক টিভি চ্যানেলের আলাপ শুনলাম। বলা হলো, ‘মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে গেছে।’। হ্যাঁ, হয়েছে, অস্বীকার করার জো নেই। আর সে ‘শুরুয়াত’ তারাই করেছেন। যারা আজকে গেলো গেলো বলে মাতম করছেন, সেই মানুষেরাই। যখন মানুষের যাপিত জীবন থেকে সংস্কৃতিকে জোর করে আলাদা করার কসরত শুরু হয়েছে তখন থেকেই মূল্যবোধরে স্খলন শুরু হয়েছে। সেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুরু করে বাংলাদেশ অবধি মানুষের জীবনাচরণকে পাল্টে ফেলার চেষ্টাই এমন অবক্ষয়ের জন্য দায়ি। কিভাবে তা পরে বলছি। এর আগে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বলে নিই। 

রবীন্দ্রনাথের গানের বিকৃতি নিয়ে এত কথা কেন, এই প্রশ্নটা তুলুন। এর আগেও অনেকের গান বিকৃত হয়েছে, তখন কথা উঠেনি। রবীন্দ্রনাথের গান সেই ধারাতেই বিকৃত হয়েছে। এক্সট্রিম কোন কিছুই বিনা চ্যালেঞ্জে যায় না। রবীন্দ্রনাথকে একটা শ্রেণি এমন জায়গায় তুলে রেখেছেন যে, তার ব্যাপারে কোনো সমালোচনা করা যাবে না। বিরুদ্ধাচারণ করা যাবে না। লেখক থেকে রবীন্দ্রনাথকে এই শ্রেণি ‘আচার্য’ করে তুলেছেন। বানিয়ে ফেলেছেন ‘রবীন্দ্র ধর্মের ধর্মরাজ’। অবস্থা দাঁড়িয়েছে ‘ধরা যাবে না ছোঁয়া যাবে না, বলে যাবে না কথা’র মতন। ফলে রবীন্দ্র সমালোচনার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। সোজা রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প রাস্তা খুলে যায়। আর এখনরকার যেসব কর্মকান্ড তা সেই বিকল্প রাস্তা প্রসূতই।

বাংলাদেশি লেখক ব্রাত্য রাইসু রবীন্দ্রনাথকে ছোট কবি বললেন। আর যায় কোথায় রবীন্দ্র ধর্মের অনুসারীরা তার উপর হামলে পড়লেন সদলবলে। উঠে পড়ে লাগলেন রাইসুর পেছনে। রাইসুর ফেসবুকের কমেন্টের জায়গা ভরে উঠলো অশ্লীল বাক্যবাণে। কথাটা এখানেই, রবীন্দ্র ধর্মানুসারীরা এত যদি অশ্লীল বাক্যবাণ হানতে পারেন, তবে অন্যের বাণ সইতে এতো ভয় কেনো! রোদ্দুর রায়তো আপনাদের ভাষাতেই কথা বলছে। এমন ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের কারণেই ঠাকুরবাড়ির অনুসারীদের বিপক্ষে ক্রমে ফুসে উঠছে মানুষ। ‘ধর্মরাজ’ ভেসে যাবার জোগার। তরুণরা সে রাজকে ভেঙে দিতে চাচ্ছে। সোজা রাস্তা আপনারা বন্ধ করে রেখেছেন বলেই বিকল্প পথে এগুচ্ছে তারা। বিকল্প যে মূল প্রকল্প হতে পারে না, এটা না বোঝার মতন নিশ্চয়ই অতটা গাড়ল আপনারা নন। বিকল্পতে কিছু ‘বদ’ এলিমেন্ট’ও এসে যায়। 

রবীন্দ্রনাথের কবিতার অন্যমাত্রা রয়েছে আমি নিজে স্বীকার করি সবসময়। যারা তাকে অবমূল্যায়ন করতে চান, তাদের মতকে শুনে নিজের মতটা জানাতে চেষ্টা করি। বলি, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি অনবদ্য। তার কাছে থেকে শেখার অনেক কিছু রয়েছে এবং তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত। কিন্তু বিপরীত কথাও রয়ছে। এখন যদি কেউ ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে’ লিখতো অথবা ‘জল পড়ে নাতা নড়ে’ ধরণের কিছু, তবে রবীন্দ্র ধর্মের অনুসারীরাই তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতেন। বলতেন, গেঁয়ো; মানে আধুনিক নন। হালের ট্রেন্ডে আরেকটু এগিয়ে বলতেন, বিজ্ঞানমনস্ক নন। অথচ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন বলেই তা পাঠ্যপুস্তকে উঠেছে। এই যে উঠা, এটা সে অর্থেই অনর্থক, বাহুল্য।

রবীন্দ্রনাথের বিচার তার লেখা দিয়ে। কিন্তু রবীন্দ্র ধর্মের অনুসারীদের কাছে উল্টোটা। তারা রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে লেখার বিচার করেন।  তালগাছ টাইপের অনেক লেখা রয়েছে রবীন্দ্রনাথের, যা এ সময় লেখা হলে হাস্যরসের কারণ হতো। এই সত্যটা স্বীকার করতে না পারার দূর্বলতাই সৃষ্টি করেছে রোদ্দুর রায়দের। রোদ্দুর রায়দের এমন গান এক অর্থে প্রচলিত ধারার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। বিক্ষোভ যেমন কখনো সহিংস হয়, রক্তক্ষয়ী হয়; গানের ক্ষেত্রে এটা তেমনি। সামগ্রিকতার বিচারে এই বিক্ষোভকে অস্বীকার করার কিছু নেই। 

যেখানে এক্সট্রিমিটি’র চর্চা হয়েছে, সেখানেই প্রতিবাদ হয়েছে। ভারতীয় নেতারা এমন চিন্তা করেই মহাত্মা গান্ধীকে ‘ধর্মরাজ’ বানাননি। তাকে নিয়ে সমালোচনার জায়গাটি উন্মুক্ত রেখেছেন। যার ফলেই কিছু লোকের অশ্রদ্ধা সত্বেও গান্ধীজি মহাত্মাই রয়ে গেছেন। তারা যদি গান্ধীজির সমালোচনার রাস্তাটা বন্ধ করে দিতেন। তবে গান্ধীজির বিরুদ্ধচারীর সংখ্যা বেড়ে যেতো। যুক্তির প্রাবল্য না থাকায় অযৌক্তিকতা জায়গা করে নিতো। জন্ম নিতো গান্ধী বিরোধী অসংখ্য রোদ্দুর রায়। নাথুরাম গডসে আজকে পূজিত হতো, অনন্য হয়ে উঠতো। 

রবীন্দ্রনাথকে এমন জায়গায় তুলে রাখা হয়েছে, যেখানে রেখে তার কোন কিছুরই সমালোচনা করা যাবে না। কেউ তো প্রার্থনা কক্ষেও রাখেন তার ছবি। অথচ রবীন্দ্রনাথ নিজেও এমনটা চাননি। প্রথা ভাঙতে তিনি ব্রাহ্মও হয়েছিলেন। রোদ্দুর রায়’রা যেমন প্রথা ভাঙার চেষ্টা করছে। তারুণ্যের সে ধারাতেই তেইশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ খোদ পৈতা ত্যাগ করে হয়েছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের অন্তর্ভুক্ত। অথচ ভক্তরা তাকেই বানিয়েছেন ‘দেবতা’। বলছেন, রবীন্দ্র সঙ্গীত ইবাদতের শামিল। বলিহারি এমন চিন্তা আর চেতনার। যৌবনে রবীন্দ্রনাথের যাপিত ব্যক্তি জীবন ছিলো সাধারণ গৃহস্থ যুবকের মতই। তিনিও বৌদির প্রেমে পড়েছেন, যেমন আর দশজন সাধারণ যুবক পড়েন। ধারণ করেছেন দশজন সাধারণ যুবকের যৌন ফ্যান্টসি, এর বাইরে কিছু নয়। কিন্তু এমন একজন মানুষের অর্থাৎ ব্যক্তির ব্যক্তিগতের সাথে সাহিত্যকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। তাকে বসানো হয়েছে সাধু তথা ‘ধর্মরাজে’র আসনে। তাকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে তার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন তার কথিত ভক্ত-অনুসারীরাই। রোদ্দুর রায়ের গান তাই দেখিয়ে দিয়েছেন আঙুল তুলে। 

কদিন আগে দেখলাম আমাদের এখানে পীর ভক্তদের মধ্যে কী নিয়ে যেনো সংঘর্ষ এবং তাতে প্রাণ হারিয়েছেন দুজন আদম সন্তান। রবীন্দ্রভক্তদের অবস্থাও এমনটা দাঁড়িয়েছে। তাদের কমেন্টের যে ভাষা দেখি তাতে রোদ্দুর রায়ও শিখতে পারবে। রোদ্দুর রায়দের অশ্লীলতা দোষে দুষ্ট করবেন, আবার নিজেরা সে দোষে রোদ্দুরকেও টপকে যাবেন, পারেনও বটে আপনারা! সামর্থ্য থাকলে এই ভক্তরা শুধু মুখে বা লেখাতেই নয় পীরের অনুসারীদের মতন মাঠেও নেমে যেতেন। কিন্তু সেই সাহস বা সামর্থ্য তাদের নেই। তাই অন্তত ব্রাত্য রাইসু ও রোদ্দুর রায়েরা শারীরিকভাবে অক্ষত আছেন। 

সবচেয়ে মজার বিষয়, এদের মধ্যে অনেকেই ভলতেয়ারকে উদ্ধৃত করেন। বলেন, ‘আমি আপনার কথার পক্ষে নই, কিন্তু আপনার বলার অধিকারের জন্য প্রাণ দেব।’ এটা এদের স্রেফ ভন্ডামী। প্রদর্শনবাদীতা। এদের নিজস্ব পক্ষের কথা আপনাকে বলতে হবে, তবেই আপনার জন্যে ‘ইনারা’ প্রণিপাত করবেন। একটু বাইরে বলে দেখুন না কী করে। আমি যে লিখছি, তাদের ভাষা ও কান্ডের কথা চিন্তা করেই লিখছি। লিখছি রবীন্দ্র সাহিত্যের স্বার্থেই। রবীন্দ্রনাথের সমালোচনার রাস্তা খুলে দিন। রাইসু তাকে ছোট কবি বলছেন, তাকে বলতে দিন। আপনিও বলুন, রাইসুকে দেখিয়ে দিন রবীন্দ্রনাথ কিভাবে বড় কবি। কিছু ইসলামী বক্তাকে নিয়ে বিতর্ক এ কারণেই। তারা যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চায় না, কেনো ইসলাম মহান। লাফ দিয়ে মাঠে নেমে পড়েন। অথচ আল্লাহতায়ালা স্বয়ং রাসুলকে তার সমালোচনাকারীদের উপেক্ষা করতে বলেছেন, বলেছেন ধৈর্য ধরতে। রবীন্দ্র অনুসারীরাও সেই বক্তাদের মতই। তাদের বিরুদ্ধাচারণ করলেই হেরে-রে-রে করে মাঠে নেমে পড়েন। এদের জন্য মূলত করুণা হয়। এরা সাহিত্যের কাঠমোল্লা। এই কাঠমোল্লাদের জন্য লেখার শেষে আমার নিজের দুটি লাইন উৎসর্গ করি। 

‘মতান্ধদের দিনরাত্রি সমান, অন্ধকার হাতড়ে তারা অন্ধকারই জমান।’ মতান্ধদের প্রাপ্তি আসলেই অন্ধকারই। বিলাতে গেলেও তারা সেই অন্ধকারই বিলান। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0227 seconds.