• ১৪ মার্চ ২০২০ ২১:১৩:৩০
  • ১৪ মার্চ ২০২০ ২১:১৩:৩০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মধ্যরাতে গণমাধ্যমকর্মীকে তুলে নিয়ে মোবাইল কোর্টে সাজা! ক্ষমতার ‘অপ’ না অন্যায় ব্যবহার?

আরিফুল ইসলাম। ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

‘মধ্যরাতে সাংবাদিককে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে মোবাইল কোর্টে এক বছরের জেল’! এমন একটি খবর এমনিতেই চোখে পড়ার কথা। বিশেষ করে আমাদের মতন যারা গণমাধ্যমে কাজ করেন। একজন গণমাধ্যমকর্মীকে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়াতো মোবাইলের কোর্টের কাজ হতে পারে না।

অপরাধ গুরুতর হলে সেটা পুলিশ বা অন্য আইনরক্ষাকারী বাহিনীর কাজ। আইনের এমন অন্যায় ব্যবহার অবিশ্বাস্য। আমিও অবিশ্বাস করতাম, যদি না আমার এক ছোটভাই, যিনি গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত, সামাজিকমাধ্যমে নিজের মন্তব্যসহ খবরটি শেয়ার না করতেন।

বাঁধন, আমার খুব প্রিয়জনদের একজন এবং স্নেহের। পুরো নাম বাঁধন অধিকারী। খবর সম্পাদনার কাজ করেন। বাংলা ট্রিবিউনের আন্তর্জাতিক ডেস্কের প্রধান। মেধাবী, সৎ এবং প্রতিবাদী এবং অপ্রয়োজনীয় কথা কম বলা মানুষ। তিনিই সামাজিকমাধ্যমে খবরটির সাথে যে মন্তব্য করেছেন তা একজন মানুষের ভেতরটা নাড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। তার মন্তব্যটা উল্লেখ করলাম না, বলতে পারেন ভয়ে। এই ভয়ের সংস্কৃতিটা তৈরি করতে সফল হয়েছেন তারা, যারা একজন গণমাধ্যমকর্মীকে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাবার দুঃসাহস দেখান। ভয় আমাদের সবখানে জেঁকে বসেছে। আমরা প্রতিবাদ আর প্রতিরোধহীন হয়ে উঠছি ক্রমেই। 

তবে এই প্রতিবাদ আর প্রতিরোধহীনতার জন্য আমরা নিজেরাই অনেকটা দায়ি। এমন অসহায় পরিস্থিতি আমাদের নিজেদেরই সৃষ্ট। নিজেদের রক্ষার দায়িত্ব আমরা পুরোটাই ছেড়ে দিয়েছি এমন এক পক্ষের কাছে, যাদের মুখোমুখি হতে হয় আমাদের প্রতিক্ষণ। ফলে যেকোন সময় তারা আমাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।  প্রতিপক্ষকে দিয়ে আর যাহোক নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। আরো মুশকিলের ব্যাপার হলো, এই বোধটাও আমাদের সকলের মধ্যে নেই। তরুণদের মধ্যে কিছুটা থাকলেও বুড়োরা বিস্মৃত। আর এই বুড়োরাই আমাদের মাথার উপর বসে আছেন।

যাক গে, যে খবরের কর্মীকে মাঝরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তিনি হলেন- কুড়িগ্রাম জেলার বাংলা ট্রিবিউন প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম। খবর অনুযায়ী তিনি কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসকের অপছন্দের তালিকায় ছিলেন। জেলা প্রশাসকের নানা কীর্তিকলাপ মানুষকে খবরের মাধ্যমে জানিয়ে দিচ্ছিলেন আরিফ। আর এ কারণেই সম্ভবত ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন তিনি। তবে সেই ক্ষিপ্ততা যে সকল সীমা ছাড়াবে তা অবিশ্বাস্য। একজন জেলা প্রশাসক আইনের সকল ব্যত্যয় ঘটিয়ে রাতের বেলা লোকজন পাঠিয়ে তাও আবার অস্ত্রধারী, একজনকে বাড়ি থেকে তুলে আনবেন এটা কি সত্যিই বিশ্বাস করার মতন? তারোপর মধ্যরাতে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে মদ ও গাঁজা রাখার অপরাধে সাজা দেয়া, সেতো রীতিমত দক্ষিণ ভারতের থার্ড গ্রেড কাহিনিকেও হার মানিয়েছে। 

আমি কুড়িগ্রামের বর্তমান পুলিশ সুপারকে চিনি। তিনি অন্তত ভালো মানুষ। পুলিশের মধ্যে সৎ মানুষ বলতে অনেকেই ভ্রু কুঁচকে উঠেন। আমি সেই পুলিশ সুপারকে নির্দ্বিধায় সৎ বলতে পারি। মহিবুল ইসলাম খান নাম উনার। ভালো কিছু করার ইচ্ছা তারমধ্যে ছিলো সবসময়। আমি শকড হয়েছিলাম ভেবে এই ঘটনায় তার যোগসাজশ নেইতো। দেখলাম না। বরং ওই গণমাধ্যমকর্মীকে তুলে নিয়ে যাবার পর তার বাসায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসেছেন এবং জানিয়েছেন এর সাথে তারা সম্পৃক্ত নন। খারাপ একটা বিষয়ের সাথে এটাই একমাত্র ভালো ও আশার দিক।

ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা কিসিমের কথা আমরা শুনছি। লুটপাটের নানা কান্ড আমাদের কাছে দৃশ্যমান হচ্ছে। আর এসব তুলে আনতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা নানাজনের বিরাগভাজন হচ্ছেন। অনেকেই প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছেন। আর সেই প্রতিপক্ষের দৃষ্টি গণমাধ্যমকর্মীদের পেছনে আটকে রয়েছে। অপেক্ষা শুধু সুযোগের। ক্ষমতার অপব্যবহার দেখে আমাদের চোখ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। দেখেছি অপব্যবহারের কোনো প্রতিকার নেই। প্রতিকারহীনতা অপব্যবহারকারীদের এখন ক্ষমতার অন্যায় ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। এক সময় ছিলো, একজন গণমাধ্যমকর্মীর একটি খবরে পুরা সরকার টলে যেত। আর এখন একজন সামান্য কর্মকর্তাকেও টলানো সম্ভব হয় না। কেন হয় না, এ প্রশ্নটা এখন আমাদের নিজেদেরকেই করতে হবে। কারণ ব্যর্থতা শুধু একপাক্ষিক নয়, দ্বিপাক্ষিক।

আরিফুল ইসলামকে সাজা দেয়ার প্রতিবাদে আমরা কি করেছি? যারা মাথার উপরে আছেন, তারা হয়তো বলবেন, আদালতের আদেশের ব্যাপারে কোন কিছু বলার বা করার নেই। আচ্ছা, তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু কোন আইনে মধ্যরাতে সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া ম্যাজিস্ট্রেটগণ কারো বাসায় উঠে পড়লেন, তল্লাশী চালালেন, এনিয়ে তো প্রশ্ন তোলা যায়। মধ্যরাতে মোবাইল কোর্ট বসাতে হলো, তাও একজন গণমাধ্যমকর্মীকে সাজা দিতে মদ-গাঁজা রাখার অপরাধে। তাও আবার আধাবোতল মদ এবং অনুল্লেখ্য পরিমান গাঁজা রাখা নিয়ে। তাও সান্ত্বনা না থাকতো, যে তার বাসা থেকে কার্টুন কার্টুন মদ, কেজি কেজি গাঁজা উদ্ধার হয়েছে এমনটা হলে। 
আরিফুলের স্ত্রী জানাচ্ছেন, তার স্বামীকে উঠেয়ে নেয়ার সময় পঞ্চাশ জনের মতন লোক ছিলো, তার গেটের বাইরে। এমনকি আশেপাশের বাড়ির গেটের বাইরেও লোক ছিল, যাতে কেউ বাইরে না আসতে পারে। তারমধ্যে কিছু লোক ছিলো আনসারের পোশাকে। অর্থাৎ পুলিশের কেউ ছিল না। এমন অভিযানে পুলিশ না থাকা কি বিস্ময়কর নয়। তারোপর এ ধরণের অপরাধের অজুহাতে রাত দু’টায় মোবাইল কোর্ট বসানো কি আরো অবিশ্বাস্য নয়! কি বলেন, গণমাধ্যমের বুড়ো নেতৃবৃন্দ এবং সচেতন নাগরিকরা? এটা কি ক্ষমতার অপব্যবহার না অন্যায় ব্যবহার? এর কি শুধু প্রতিবাদ প্রয়োজন, নাকি প্রয়োজন প্রতিরোধের?

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0217 seconds.