• বাংলা ডেস্ক
  • ২১ মার্চ ২০২০ ০৯:২৭:৪০
  • ২১ মার্চ ২০২০ ১০:১৪:০৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

চিকিৎসকদের নেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পোশাক

ছবি : সংগৃহীত

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে। বাংলাদেশেও ২০ জন এ ভাইরাসে আক্রান্ত এবং একজন এ রোগে মারা গেছে। এতে করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশেও। সাধারণ জ্বর-সর্দি-কাশি নিয়ে রোগীরা হাসপাতালে গেলেও চিকিৎসা মিলছে না। বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও এ ধরনের উপসর্গ থাকা রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না।

করোনাভাইরাস ছোঁয়াচে। একজন থেকে অন্যজনে সংক্রমিত হয়। অথচ করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি তাদের নেই। এমনকি পরীক্ষার সরঞ্জাম ও চিকিৎসাকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) কোনো ব্যবস্থাও নেই। এ কারণে করোনার উপসর্গ আছে এমন রোগীদের সেবা দিতে চিকিৎসক ও নার্সরা অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। বিভিন্ন হাসপাতালের অন্তত ১০ চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সমকাল।

চীনের উহান শহরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে। কিন্তু বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় পেয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনেক দেশ আগেভাগে প্রস্তুতি নেয়ায় করোনার মোকাবিলা সফল হয়েছে। এর মধ্যে সংক্রমিত দেশগুলো থেকে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ প্রবাসী দেশে প্রবেশ করেছেন। তাদের শুধু স্ট্ক্রিনিং করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বললেও তারা তা মানছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, করোনা সংক্রমণের পর বিদেশফেরত সবাইকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখার প্রয়োজন ছিল। সেটি সম্ভব না হলে আগে থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার প্রয়োজন ছিল। কারণ, বিদেশফেরত সাড়ে ছয় লাখ মানুষই সারাদেশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এ পর্যন্ত আক্রান্তদের সবাই বিদেশফেরত ও তাদের সংস্পর্শে আসা স্বজন। তারা নিশ্চয়ই প্রতিবেশীদের সংস্পর্শেও এসেছেন। ফলে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে রোগটি ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেটি হলে আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়বে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, ‘কিছু বিষয়ে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় দেশে করোনার সংক্রমণ ঘটেছে। এর মধ্যে তিন মাসে সংক্রমিত দেশগুলো থেকে অবাধে দেশি-বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়েছে। তাদের বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে থাকার যে মৌখিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তা বেশিরভাগ মানুষই মেনে চলেননি। প্রতিটি হাসপাতালে পাঁচ শয্যার আইসোলেশন ইউনিট চালু করার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে ওই ধরনের ইউনিট চালু হয়নি। কারণ, শুধু ইউনিট চালু করলেই তো হবে না। যারা আক্রান্তদের চিকিৎসা দেবেন, তাদের নিরাপত্তাও তো নিশ্চিত করতে হবে।’

চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) সরবরাহ করা হয়নি। এরপর সারাদেশে আরো এক হাজার ৩৫০টি আইসোলেশন শয্যা চালুর ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু পিপিই না থাকার কারণে চিকিৎসকরা জ্বর-সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টের রোগী পেলে সেবা দিচ্ছেন না। এ অবস্থায় সত্যিই যদি ওই ব্যক্তি করোনা সংক্রমিত হয়ে থাকেন, তাহলে তো যিনি সেবা দেবেন, তিনিও আক্রান্ত হবেন এবং তার মাধ্যমে রোগটি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্নিষ্টরা এত দিন কাজ না করে শুধুই কথার ফুলঝুরি ছড়িয়েছেন। তিন মাস সময় পেয়েও তারা করোনা পরীক্ষার পর্যাপ্ত কিট ও পিপিই সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। রোগটি দেশব্যাপী বিস্তার ঘটালে তখন পরিস্থিতি কী হবে? কারণ যারা সেবা দেবেন, তাদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই। এটি ভাবাই যায় না। থাকলে তারা কীভাবে সেবা দেবেন? এটি কেন ভাবা হলো না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষ তাহলে এত দিন কী কাজ করল? আদৌ কি কোনো পদক্ষেপ তারা নিয়েছিল, নাকি প্রতিদিন গণমাধ্যমের সামনে শুধু বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছেন।’ সংশ্নিষ্টদের প্রতি দ্রুত এসব সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে এক লাখ পিপিই, পাঁচ লাখ সার্জিক্যাল মাস্ক ও সার্জিক্যাল গগলস এবং অন্যান্য সরঞ্জাম চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা থেকে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। তবে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষ ক্রয় প্রক্রিয়ায় ধীরগতির নীতি অবলম্বন করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ কয়েকটি দাতা সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করে এক লাখ টেস্টিং কিট ও ১০ লাখ পিপিই প্রদানের আহ্বান জানান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র মতে, বর্তমানে সরকারের কাছে দেড় হাজারের মতো টেস্টিং কিট এবং সমপরিমাণ পিপিই মজুদ আছে। গতকাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩০০ পিপিই সারাদেশে বিতরণ করা হয়েছে।

অপর এক সূত্র জানায়, ১০ হাজার টেস্টিং কিট ও একই পরিমাণ পিপিই চালান দু'দিন আগে সিঙ্গাপুরে ছিল। সেটি এরই মধ্যে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে সেটি পৌঁছেছে কিনা, তা ওই সূত্র নিশ্চিত করতে পারেনি। এদিকে চীন গত বুধবার ঘোষণা দিয়েছে, তারা বাংলাদেশকে ১০ হাজার টেস্টিং কিট, ১৫ হাজার সার্জিক্যাল এন৯৫ রেসপিরেটর, ১০ হাজার মেডিকেল নিরাপত্তামূলক পোশাক ও এক হাজার ইনফ্রারেড থার্মোমিটার প্রদান করবে।

বিএমএ মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘করোনা মোকাবিলার চিত্র দেখে মনে হয়, স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তুতিতে মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। এখন পর্যন্ত ২০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। কয়েক দিন পরে যে সেটি বাড়বে না, এই নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারবে? একটি মাত্র স্থানে পরীক্ষা করা হচ্ছে। রোগটি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে তখন তা কীভাবে সামাল দেয়া হবে? জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষার পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। কিট ও পিপিই নিয়ে কর্তৃপক্ষ লুকোচুরি করছে। কেন এমনটি করা হচ্ছে? করোনাভাইরাস মোকাবিলায় কী পরিমাণ কিট ও পিপিই প্রয়োজন, সেগুলো তাদের দ্রুত জানানো উচিত।’

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বর্তমানে কী পরিমাণ কিট ও পিপিই আমাদের হাতে মজুদ আছে, সেটি বড় কথা নয়। এগুলোর কোনো সংকট হবে না। এরই মধ্যে বেশ কিছু কিট ও সরঞ্জাম এসেছে। আরো এক লাখ টেস্টিং কিট সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।’

ডা. আবুল কালাম আজাদ আরো বলেন, ‘পিপিই সব চিকিৎসকের জন্য অত্যাবশ্যকীয় নয়। করোনা সন্দেহভাজন রোগীদের সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও নার্সদেরই শুধু এগুলোর প্রযোজন হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা পিপিই সংগ্রহ করছি।’

বাংলা/এনএস

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0219 seconds.