• বাংলা ডেস্ক
  • ২১ মার্চ ২০২০ ১২:১৬:২৮
  • ২১ মার্চ ২০২০ ১২:১৬:২৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

কারখানা বন্ধে দ্বিধায় গার্মেন্টস মালিকরা

ফাইল ছবি

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ধাক্কা লেগেছে দেশে তৈরি পোশাক শিল্পেও।  ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ায় দুই সপ্তাহের বেশি কারখানা সচল রাখা সম্ভব নয় বলে জানান মালিকরা। এছাড়া একই ছাদের নিচে অনেক শ্রমিক কাজ করায় রয়েছে সংক্রমণের ঝুঁকিও। এমতাবস্থায় কারখানা বন্ধ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হীনতায় শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।

করোনার প্রদুর্ভাব ঠেকাতে কারখানা বন্ধের দাবি তুলেছেন শ্রমিক সংগঠনগুলোও। একদিকে কাজ কমে আসা, অন্যদিকে শ্রমিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি—সব মিলিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেয়া উচিত বলে মনে করছেন মালিকদের একটি অংশ। আবার আরেকটি অংশ সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে কারখানা চালু রাখার পক্ষে এখনো। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিজিএমইএ’র নেতারা তাকিয়ে আছে শ্রম মন্ত্রণালয়ের দিকে। এমন খবর প্রকাশ করেছে বণিক বার্তা।

এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, ‘শ্রম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আগামীকাল সভার পর এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব হবে। আমরা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করবো।’

বিজিএমইএ’র তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ হাজার ৬২১টি পোশাক কারখানা আছে। এর মধ্যে সরাসরি রপ্তানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত প্রায় আড়াই হাজার। এতে প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিক কাজ করে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

সম্প্রতিক করোনা পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। সংস্থাটির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর তুওমো পৌতিয়াইনেন বলেন, ‘বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের ক্রয়াদেশ এর মধ্যেই কমতে শুরু করেছে। স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তো রয়েছেই। এ ভাইরাস একই সঙ্গে প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিকের অর্থনৈতিক অবস্থা ও জীবনযাত্রায়ও প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাতকে ভুলে গেলে চলবে না।’

এদিকে গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে কারখানা সাময়িক বন্ধের দাবি জানান বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির নেতারা। ওই বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘এর মধ্যেই ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক ব্র্যান্ড ক্রয়াদেশ কমাচ্ছে, কোথাও কোথাও বাতিল করছে। এ পরিস্থিতিতে কারখানায় শ্রমিকদের মধ্যে করোনা সংক্রমিত হলে ভবিষ্যতে রপ্তানি আয়ের শীর্ষে থাকা এ খাত আরো হুমকি ও বিপদের মধ্যে পড়বে। শ্রমিকদের মধ্যে করোনা ছড়ালে ক্রেতারাও ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ক্রয়াদেশ দেয়ার ব্যাপারে অনুত্সাহিত হবে, যা অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে কারখানা বন্ধ রাখলে সাময়িকভাবে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হলেও ভবিষ্যতের বিপদ দূর হবে।’

এদিকে বিভিন্ন কারখানার উত্পাদন ব্যবস্থাপকরা জানান, বিভিন্ন কারখানায় যে পরিমাণ কাজ পড়ে আছে, তা দিয়ে সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ কারখানা সচল রাখা যাবে। এরপর এমনিতেই কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। যদিও কারখানা বন্ধ, নাকি সচল থাকবে সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি মালিকরা।

জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরেই পোশাক শিল্পের কারখানা সচল বা বন্ধ করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলে আসছে। সরকারের বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা, দুই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বর্তমান পর্ষদের মধ্যে সভাও হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি সভা থেকে। তবে সভায় উপস্থিত কিছু শিল্পোদ্যোক্তারা কারখানা বন্ধ করা উচিত বলে মত প্রকাশ করেছেন।

কিন্তু উভয় সংকটে পড়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না সব মালিক। কারণ কারখানা বন্ধ করলে শ্রমিকের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিয়েই কারখানা বন্ধ করতে হবে। এজন্য সরকারের বিভিন্ন নীতি সুবিধা নিশ্চিত করেই তারা কারখানা বন্ধের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পথে এগোতে চান।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআই’র সহ-সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আমি আজই কারখানা বন্ধ করে দিতাম, যদি কারখানার চেয়ে শ্রমিকরা আরো ভালো পরিস্থিতিতে থাকবে এমন নিশ্চয়তা পেতাম। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি।’

দেশ এখনো কঠিন অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করেনি দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমরা শ্রমিকদের অনেক জীবাণুমুক্ত পরিবেশের মধ্যে রাখতে পারছি এবং জীবাণুমুক্ত থাকার চর্চাটা কারখানা থেকে শ্রমিকের আবাসস্থলেও ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিচ্ছি। পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে ঢাকা শহরে সংক্রমণ হয়ে যাচ্ছে। সবকিছু বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তখন আমরা কারখানা বন্ধ না সচল থাকবে সে বিষয়ে ভাববো।

আরো কয়েকজন পোশাক শিল্প মালিক একই দাবি করে জানান, আতঙ্ক ও সংক্রমণ ঝুঁকির বিষয়েই মালিকরা সজাগ আছেন। কারখানার প্রতিটি ফ্লোর যথাযথ ব্যবস্থায় জীবাণুমুক্ত করা হচ্ছে। কারখানায় কর্মরত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টায় প্রতি মুহূর্তে তাদের সতর্ক ও সচেতন করা হচ্ছে।

তারা জানান, এখন যদি আমরা কারখানা বন্ধ করে দিই, তাহলে শ্রমিকদের আরো ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়া হবে। কারণ শ্রমিকরা কারখানা বন্ধ হলেও গ্রামে ফিরে যাবে। বাসে বা ট্রেনে চলাচল দিয়ে ওই শ্রমিকরা সংক্রমণ ঝুঁকিতে পড়বে। এরপর গ্রামে যাওয়ার পর বিদেশফেরত প্রতিবেশীদের সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে কারখানা বন্ধ হলে বিভিন্ন জেলায় ফিরে যাওয়া শ্রমিকের সংক্রমণ ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে।

এর বিপরীতে মালিকদের আরেকটি অংশ জানান, ক্রেতারা বলছেন পণ্য শিপমেন্ট করতে পারবো না। কাপড় কাটতে পারবো না, উত্পাদন করতে পারবো না। তাহলে কারখানায় শ্রমিক বসিয়ে রাখার সুযোগ কোথায়? আবার উত্পাদন যেগুলো চলছে, সেগুলো যদি শিপমেন্ট না করি কারখানায় তো স্থান সংকুলান হবে না। আবার অন্যদিকে আমরা ভাবছি স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, কারণ বাচ্চারা সব কাছাকাছি বসে। পোশাক শিল্পও ওই ক্যারেক্টারের। একই ছাদের নিচে অনেক শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করেন। একসঙ্গে চলাচল করছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে আমরা যতই জীবাণুমুক্ত রাখার চেষ্টা করি না কেন সংক্রমণ প্রতিরোধ করা খুবই জটিল বিষয়।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘কারখানা বন্ধ বা সচল রাখার বিষয়ে আমরা আলোচনা করছি। এখানে কারো একক সিদ্ধান্ত নয়, বরং অনেকে মিলে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বন্ধ করার সিদ্ধান্তটি আসবে সবশেষে। আমরা সরকারের কাছে শিল্প বাস্তবতা তুলে ধরব। সরকারের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করেই চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হবে।’

এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কেএম আলী আজম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কারখানা বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এখনো বন্ধের মতো কোনো অবস্থা এসেছে বলে আমার মনে হয় না। বন্ধের বিষয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, আমরা বলেছি বন্ধের মতো কোনো অবস্থা এসেছে বলে আমরা মনে করি না। আর তাছাড়া বন্ধের বিষয়ে মন্ত্রণালয় এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।’

বাংলা/এনএস

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0878 seconds.