• ২১ মার্চ ২০২০ ১৫:২৫:০৫
  • ২১ মার্চ ২০২০ ১৫:২৫:০৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ভয়ংকর পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা, প্রয়োজন ভরসার

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখে আমরা। অথচ এমন সময় কিছু লোকের কর্মকাণ্ড আশ্চর্য লাগে। এমনিতেই আমরা কঠিন সময় পাড়ি দিয়ে চলছি। দীর্ঘদিন ধরেই মানসিকভাবে আমরা একধরণের কোয়ারেন্টাইনে আছি। মূলত আমাদের বলাগুলোকে বুকের মধ্যে কোয়ারেন্টাইন করে রেখেছি নিজেরাই।

যার ফলে এখনো বলতে পারছি না, কোভিড-১৯ মোকাবেলায় এত কম টাকা বরাদ্দ কেন? প্রশ্ন করতে পারছি না মানুষের জীবনের চেয়ে উৎসব বড় কিনা! অথচ কিছু লোক এরমধ্যে আছেন বাহাস নিয়ে। নানা বাহাস। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বিরক্তির স্বঘোষিত মূর্খ নাস্তিক, আর অন্ধ আস্তিকদের বাহাস। 

শেষের দিক থেকে শুরু করি। সামাজিকমাধ্যমে এক হুজুরকে দেখলাম মসজিদে জামায়াত বন্ধের বিপক্ষে জ্বালাময়ী ওয়াজ করছেন। এই অন্ধটাকে কে বোঝাবে, ধর্ম হিসাবে ইসলাম এতটা গ্রহণীয় এ কারণেই যে, মানব কল্যাণে বিজ্ঞানের সাথে ধর্মটির কোনো সাংঘর্ষিক দিক নেই। ইসলামি স্কলার’রা সবাই বসে তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রয়োজনে জামায়াতে নামাজ আদায় বন্ধ করার জন্য। আরেকটা কথা জামায়াতে নামাজ আদায় ফরজ নয়, ঘরে বসে কেউ যদি নামাজ আদায় করেন, তিনি ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবেন না।

একমাত্র আল্লাহর অংশীদারিত্বের মতন পাপ না করলে, কেউই ইসলাম থেকে খারিজ হয় না। ইসলাম এমন একটা ধর্ম যার মধ্যে জীবনযাপনের সমস্ত দিক নির্দেশনা দেয়া রয়েছে। আর এই ইসলামকে এই অন্ধরা বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিতে চাচ্ছে।

অপরদিকে রয়েছে একপাল মূর্খ ও স্বঘোষিত নাস্তিক। যারা নাস্তিক্যবাদের মূলটাই জানে না। নাস্তিক্যবাদের মূল কথা হলো তারা নিজেরা ঈশ্বর মানেন না, কিন্তু যারা মানেন তাদের সাথে বিরোধ করেন না। অথচ এমন একটা ভয়ংকর পরিস্থিতিতে এই মূর্খরা রয়েছে মসজিদে জামায়াত বন্ধ তথা মসজিদ বন্ধ করার ধান্ধায়। এদের কথা একটাই নামাজের জামায়াত কেন বন্ধ হচ্ছে না। অথচ এদের একবারও বলতে শোনা যায়নি কেন আক্রান্ত এলাকাগুলো শাটডাউন করে দেয়া হচ্ছে না। যেখানে প্রবাসী বেশি, তারা কোয়ারেন্টাইনের শর্ত মানছেন না, সে সব জায়গার সাথে দেশের অন্য জায়গার যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে না কেন। এই যোগাযোগ বন্ধ হবার পরেও যদি সামাজিক সংক্রমণ হতে থাকে তখন জামায়াতের মতন ব্যাপারগুলো শাটডাউন করে দেয়া যাবে। 

এটা পরিষ্কার আমাদের দেশের সংক্রমণের কারণ বিদেশ থাকা আসা লোকজন। তারা নিজেরা সংক্রমিত হয়ে এসে নিজ আপনজনসহ প্রতিবেশিদের আক্রান্ত করেছেন। প্রতিবেশিদের থেকে সামাজিক সংক্রমণ ঘটেছে। সুতরাং প্রথমেই দেশের প্রবেশের রাস্তা বন্ধ করে দিলে এমন সংক্রমণ সম্ভবত ঘটতো না। চীনে সংক্রমণ ঘটার পর বাংলাদেশ তিন মাসের বেশি সময় পেয়েছে, বিপরীতে প্রস্তুতি কী ছিলো? চিকিৎসকের নিরাপত্তা পোশাক যাকে পিপিই বলা হয় সেগুলো কই? বাংলাদেশে যদি এক লাখ চিকিৎসক থেকে থাকেন তাহলে প্রতিদিন অন্তত একলাখ পোশাক লাগবে। তিন মাস যদি এমন চলে তাহলে নব্বই লাখ পোশাক। আছে বাংলাদেশে? 
দক্ষিণ কোরিয়া কোভিড নাইনটিনকে ঠেকিয়েছে শুধুমাত্র পরীক্ষা করে। তারা এতবেশি পরীক্ষা করেছে যে তাতেই সম্ভব হয়েছে প্রকৃত আক্রান্তদের চিহ্নিত করা এবং সুস্থ জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক করা। না হলে দক্ষিণ কোরিয়ায় ম্যাসাকার হয়ে যেতো। কিন্তু আমাদের পরীক্ষার কী অবস্থা? কিট তো নেই-ই, উল্টো গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র একটা কিট বানানোর অনুমতি চাইলো তাতেও কত তালবাহানা! অথচ এই কিট বানানোর প্রকল্পতে উল্টো সাহায্য করা উচিত ছিলো এবং তাদের তাগাদা দেয়া উচিত ছিলো দ্রুত বানানোর। এত কম পয়সায়, কম সময়ে, সহজে নিশ্চিত হওয়া গেলে দ্রুত আক্রান্তদের পৃথক করা যেতো। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার মতন আমরাও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারতাম।

আমরা উৎসবের নামে বেশুমার খরচ করতে পারি। বিটিভির উন্নয়নে দিতে পারি প্রায় উনিশ’শ কোটি টাকা, আর করোনা নিয়ন্ত্রণে, থাক নাইবা উল্লেখ করলাম। তারচেয়ে অর্থমন্ত্রীর কথায় আশা ধরে রাখি। উনি বলেছেন, ‘করোনা নিয়ন্ত্রণে যতটাকা লাগে দিবে সরকার’। আমাদের আশাবাদী হওয়া ছাড়া এই মুহূর্তে কোনো উপায় নেই। আমরা নানা কথায় আশাবাদী হচ্ছি। যেমন তাপমাত্রা ও আদ্রতার কারণে আমাদের দেশে করোনা ভাইরাস দ্রুত ছড়াতে পারবে না, এই কথায় আমরা কিছুটা হলেও ভরসা পাচ্ছি। এর কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। যার ফলে গণমাধ্যমেও ঠাঁই হয়েছে খবরটার। আমরা এটুকুতেই আশা করে আছি। এমন আশার কারণও রয়েছে। আমরা জানি আমাদের চিকিৎসার অবস্থা। আমরা অভ্যস্ত দীর্ঘদিনের বাগাড়ম্বরে। তাই আবহাওয়ার উপর ভরসা করা ছাড়া আর উপায়ই বা কি আছে। তাই এটুকুতেই আমরা আশাবাদী হই, হতে হয়।

আরেক শ্রেণি উপায় নাই জেনেই খোঁজে পীরের স্বপ্নে পাওয়া থানকুনি পাতা। কারণ তারা জানে, আক্রান্ত হলে এদেশের চিকিৎসার প্রায় সবটুকুই কথিত ভিআইপিদের দখলে চলে যাবে। যেটুকু ব্যবস্থা রয়েছে তা ভিআইপিদের দিয়েই কুলোবে না। সুতরাং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা দূরাশা। তাই তারা সমাধান খুঁজছে থানকুনি পাতায়। এই যে অন্ধত্ব বা অন্ধবিশ্বাস এর পেছনের কারণটাও হলো অসহায়ত্ব। বঞ্চনার অভিজ্ঞতা, না পাওয়ার যন্ত্রণা। বস্তির রহিমা খালার কী হবে? কোথায় যাবে সে চিকিৎসা করাতে।

অ্যামেরিকায় এক বাংলাদেশি করোনা আক্রান্তের চিকিৎসার কথা শুনলাম সামাজিকমাধ্যমে। তিনি যখন বেশি অসুস্থতা অনুভব করলেন, তখন ফোন করলেন স্বাস্থ্য বিভাগে সাহায্যের জন্য। আধঘণ্টার মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে চিকিৎসক হাজির। চিকিৎসক দেখেননি তিনি দরিদ্র বাংলাদেশে থেকে এসেছেন বা উনার সামাজিক আর অর্থনৈতিক অবস্থান। কিন্তু আমাদের দেশে এর উল্টোটা। একজন সাধারণ মানুষের সাহসই নেই এভাবে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকার। সেই সাহস তাদের দেয়া হয়নি। 

যাক গে, স্বঘোষিত নাস্তিকদের কথা বলছিলাম। এরা শুধু মেতে আছে ধর্ম নিয়ে, বিশেষ করে ইসলাম। তাদের অন্য কিছুতে মাথাব্যথা নেই। কেন মসজিদ বন্ধ করা হচ্ছে না এ নিয়ে তাদের যত মনোবেদনা। যেন মসজিদ বন্ধ করলেই করোনা সংক্রমণ বন্ধ হয়ে যাবে। অথচ পাড়ার চায়ের দোকানটির কথা তাদের খেয়াল নেই, যেখানে এক কাপে দশজন চা খাচ্ছেন। এরাও মূলত মতান্ধ, ডগমাটিক। এমন ডগমা’র মাধ্যমেই তারা নিজেদের জাহির করতে চান। এক্সপোজের এ নেশাটা এত মারাত্মক যে তা রীতিমতো অসুস্থতার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমন একটা ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও তারা মানুষকে ব্যঙ্গ করতে ছাড়ছে না। যারা নাকি খুবই সাধারণ মানুষ, যাদের এ মুহূর্তে বড় প্রয়োজন ভরসার। 

আরেকটা কথা। আমাদের অনেকে প্রয়োজনের প্রায়োগিকতাটা বোঝেন না। আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় সবার হ্যান্ড স্যানিটাইজার কেনা সম্ভব নয়। যে ভাইরাসটি কম দামি কাপড় কাচা সাবানেই মরে যায়, সেখানে স্যানিটাইজারের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং আমাদের অল্প শিক্ষিত মানুষকে আমরা যদি স্যানিটাইজার বিলানো শুরু করি, তবে তারা ভাবতে পারে এছাড়া ভাইরাস মরে না। ফলে তারা যখন তা কিনতে অক্ষম হবে, তখন তারা মানসিকভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়বেন। তারচেয়ে আমরা যদি কাপড় কাচা সাবান দিয়ে বলতাম, এটা দিয়ে ভালো করে হাত ধুলেই ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব। তবে তারা তো বিশ্বাস করতো এবং নিজেরা যতটুকু সম্ভব হাত ধোয়ার চেষ্টা করতো। 

এমন অবস্থায় একজনকে দেখলাম মানুষকে স্যানিটাইজার বিলাচ্ছেন। কেন রে বাবা, স্যানিটাইজারের পয়সা দিয়ে দশগুন বেশি কাপড় ধোয়া সাবান পাওয়া যায়। সেটা বিলালেইতো হতো। ভাইরাসের প্রোটিন স্তর ভাঙতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ক্ষার। তাই স্যানিটাইজারের চেয়ে কাপড় ধোয়া সাবান অনেক বেশি কর্মক্ষম দামও কম। তাই আবার বলি, সাধারণ মানুষদের সাধারণ জিনিস দিন। তাদের এমন ধারণা দেয়া দরকার নেই যে, দামি স্যানিটাইজারই ভাইরাস মারতে সক্ষম। এমন কাজটা বুদ্ধিমানের নয় অবশ্যই। অতএব বুদ্ধিমান হতে ঠিক কাজটাই করা উচিত। নাকি প্রোটিন বা স্নেহ তথা তৈলের স্তর ভাঙতে এসব তৈলজীবীদের অনিহা?

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.1349 seconds.