• ২৪ মার্চ ২০২০ ২২:১২:১১
  • ২৪ মার্চ ২০২০ ২২:৫৭:১১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘স্টে হোম, স্টে সেইফ’ কি সে ভাতে মাখিয়ে খাবে?

ছবি : সংগৃহীত


রকিবুল শিপন :


ঢাকা শহরে মেস বাড়ি আছে কত? কোনো আইডিয়া?
বাদ দেন। আচ্ছা, বলেন তো ছাত্ররা ছাড়া এসব মেস বাড়িতে আর কারা ভাড়া থাকে? তাদের সংখ্যা কত হতে পারে?

আপনার অফিসের পিয়ন, দারোয়ান, ক্লিনার, সিকিউরিটি গার্ড, রাস্তায় চলা বাসের ড্রাইভার, হেলপার, কন্ডাকটর, অফিসের সামনের ছোট চা দোকানি, মহল্লার ময়লার গাড়ি টানা ছেলেটা-এরা কোথায় থাকে?
জানেন?

উত্তরটা সম্ভবত না। জানার চেষ্টাও করেননি কোনোদিন।
জানা তো দূরের কথা, এসব লোকের সঙ্গে হয়তো কোনোদিন বাতচিৎই হয়নি আপনার।
দরকারই পড়ে না।

হ্যাঁ, নিম্ন আয়ের এই মানুষগুলোই থাকে মূলত মেস বাড়িতে। গাদাগাদি করে থেকে, বিস্বাদ খাবার খেয়ে কোনো রকমে কাটিয়ে দেয় উন-মানুষের জীবন। আর মাস বা সপ্তাহ শেষে যে মাইনে পায় তার থেকে বহু কষ্টে অনেকটা বাঁচিয়ে বাড়িতে পাঠায় এলাকায় পরিবারের জন্য়।

নিজের আরাম আয়েশের জন্য় এই লোকগুলোকে জীবীকার লোভ দেখিয়ে ঢাকায় এনেছেন আপনারা। বিনিময়ে তারা পেয়েছে আলো-বাতাসহীন স্যাঁতস্যাঁতে ঘর, পাঙাস আর তেলাপিয়ার ঝোল, ঘামের দুর্গন্ধ, ছাড়পোকায় ভরা চৌকি আর তাতে এক কাত হয়ে থাকার লাইসেন্স।

ঢাকা শহরে রিকশার সংখ্যা কত?
উত্তরটা আমিই বলি, অন্তত ১১ লাখ। বেশিরভাগ রিকশা চলে দুই শিফটে। তাতে চালকের সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ লাখের বেশি।

এরাও কিন্তু ওই মেস বাড়িতেই থাকে।
মেসে থাকা ছাত্রদের অনেকে চলে টিউশনি করে। কারো কারো আবার টাকা বাড়িতেও পাঠাতে হয়।
গার্মেন্টেস কর্মীদের কথা না হয় বাদই দিলাম।
অফিস-আদালতের কাজে, ডাক্তার দেখাতে, ব্যবসাসহ আরো নানা কাজে প্রতিদিন বাইরে থেকে ঢাকায় আসে অন্তত হাজার দুয়েক মানুষ।
তারা থাকে কোথায়?

আপনি ভালো চাকরি করেন। জীবনের মায়াও বেশি। তাই আপাতত বাসাকেই অফিস বানিয়ে ফেলেছেন। ছবিসমেত স্ট্যাটাস দিচ্ছেন ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’।
শুনতে বেশ লাগে। একটা আলাদা ভাব আছে।
কিন্তু পিয়ন, দারোয়ান, ক্লিনার, সিকিউরিটি গার্ডের কি হবে?
গাড়ির চাকা না ঘোরলে টাকা মেলে না যাদের সেই বাস চালক, হেলপার আর কন্ডাকটরের কি হবে?
রিকশাওয়ালারা কি করবে?

আপনার পরিবার আপনার সাথে আছে। মাসের বাজার করে ফেলে ঘরে খিল এঁটেছেন। আত্মীয়, বন্ধুবান্ধবদেরও একই পরামর্শ দিচ্ছেন। আর দিন রাত চেঁচিয়ে যাচ্ছেন লক ডাউন দাও লক, লক ডাউন দাও।
ওই লোকগুলোর তো ঢাকা শহরে কোনো আত্মীয় নেই। পরিবার থাকে গ্রামে। রোজগারও প্রায় বন্ধ। তাহলে এই দমবন্ধ করা সময়ে তারা পরিবার-স্বজনদের ফেলে ঢাকায় থাকবে কিভাবে?

সে কারণেই রেল স্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাটে এত ভিড়। এরা বাড়ি ফিরতে চায়। বাড়ি যেতে চায়, কারণ তারা মনে করে সেখানে গিয়ে করোনায় ধরলে তাও দেখার কেউ থাকবে। এই শহরে অসুখ হয়ে মরে কঙ্কাল হলে গেলেও কেউ খোঁজ নেবে না!

বাড়িমুখী এই ভিড়ে আপনার কোনো স্বজন, বন্ধু আছে? নাই বোধ হয়। কারণ আপনি তাদের সতর্ক করেছেন। নিরাপদে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। দিনে তিন দু গুনে ছয় বার স্ট্যাটাস দিচ্ছেন ‘স্টে অ্যাট হোম, স্টে সেফ’।
এই লোগুলোর তো ঢাকায় কোনো ‘বাড়ি’ নেই। তাই ‘নিরাপদে’ থাকার জন্যই বাড়ির পথ ধরেছে তারা। বিপদে মানুষ আপনজনের কাছে যাবে, এটাই তো এ অঞ্চলের নিয়ম।

আপনার সাবধান বাণী তাদের কানে যায় না। কারণ আপনার আর তার কমিউনিটি আলাদা। সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার সার্কেলে সেই লোকগুলোই আছে যারা আপনার মতো করে ভাবে, ভিন্নমতও থাকতে পারে, তবে জ্ঞানে-গুনে আপানারা কাছাকাছি। যাবতীয় আপডেট ইনফরমেশন, করণীয় ইত্যাদি শেয়ার করে আপনি তাদের সাবধান করে, তারা আপনাকে।

ব্যাংকে একাউন্ট না থাকলেও সোশাল মিডিয়া ওই লোকগুলোরও আছে। তাদের বন্ধুরাও তাদের মতোই। তারাও একে অপরকে সাবধান করে। কিন্তু তাদের কাছে আপনার আপডেট ইনফরমেশন পৌঁছায় না। কারণ আপনার মস্তিস্ক যে ভাষায় ওই ইনফরমেশন প্রসেস করে, ওই ভাষা ওদের বোধগম্য না। সোশ্যাল ডিসটেন্সিং, কোয়ারেন্টিন, সেল্ফ আইসোলেশন ইত্যাদি ওদের মাথার ওপর দিয়ে যায়।
তাই তারা শুনে মুফতি ইব্রাহীম, তারেক মনোয়ার, আজহারির কথা।
আর আছে গুজব।
ফলে এই সময়ে বাড়ি যাওয়া কতটা ঝুঁকির তারা অনুমানই করতে পারে না।
আর তাদের বাড়ি যাওয়া নিয়ে আপনার দুশ্চিস্তার কারণ এটা না যে ওই লোকগুলো করোনায় আক্রান্ত হতে পারে, আপনি তাদের জন্য় সমব্যথী। বরং টেনশনটা এই জন্য় যে তারা আক্রান্ত হলে আপনার জীবনও ঝুঁকিতে পড়বে।

জীবনের প্রতি আপনার বড় মায়া। এত তাড়াতাড়ি মরতে চান না। তাই ভিড়ে ভরা লঞ্চ-ট্রেন দেখে আপনি আঁতকে উঠেন।

শুধু যদি ওদের আক্রান্তের ভয় থাকতো আপনি এতো ভয়ে থাকতেন কিনা সন্দেহ আছে। যেমন ইবোলায় আফ্রিকা যখন হাহাকার করছে, তখনো হয়তো আপনি ইবোলার কথা শুনেনওনি। কারণ ওতে আপনার মরার ঝুঁকি ছিল না।
করোনা নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত বিদেশি মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে। কিন্তু এরকম জনবহুল দেশে করোনা ঠেকাতে চাইলে, মানুষ বাঁচাতে চাইলে আমদের চাই নিজস্ব মডেল।

চীন এক কোটি ১০ লাখ মানুষকে তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করেছিল। ইতালিও করেছে।
বাংলাদেশ কি তা পারবে?
না পারলে কেন পারবে না, প্রশ্ন করেছেন? দেশ তো মধ্যম আয়ের হয়েছে। মাথাপিছু আয়ও প্রায় দুই হাজার ডলার। তবু পারে না কেন?

টুকটাক জিনিস কেনার কেনার দরকার ছিল কাল। রিকশায় যাচ্ছিলাম দোকানে। চালক কিশোর ছেলেটা বলল, ‘আগে জমা ছিল ৪৮০ টাকা। এখন খ্যাপ কমে গেছে। ৮০ টাকা লেস করছে মালিক। ৪০০ টাকা দেওন লাগে। কিন্তু সারা দিনে তো জমার টাকাই ওঠে না। মালিকরে কি দিমু, আমি কি খামু।’

রাস্তায় মাছ কিনছিলাম। কাটার সময় আমার পেছনেই দরিদ্র এক মহিলা এসে দাঁড়ালেন। দেখলেই বোঝা যায় মাছ কেনার সামর্থ্য নেই।
মাছ কাটায় ব্যস্ত ছেলেটা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই মহিলা বললেন, ‘ভাই মাছটা কাটা শেষ হইলে নাড়িভুড়িগুলা আমারে দিয়েন।’

লোকজন চলাচল কমিয়ে দেয়াতেই এই অবস্থা। পুরোপুরি লক ডাউন হলে কি হবে?
এই মহিলার তো মাছের নাড়িভুড়িও জুটবে না। আপনার ‘স্টে হোম, স্টে সেইফ’ কি সে ভাতের সাথে মাখিয়ে খাবে?

লেখক : সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট বিষয়

করোনাভাইরাস

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0224 seconds.