• ০২ এপ্রিল ২০২০ ১৬:৫৪:১৩
  • ০২ এপ্রিল ২০২০ ১৬:৫৬:০৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

দানের নামে ফটোসেশনে জমায়েত, বিপদ বহুগুণ

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


‘করোনা’ কালে কিছু মানুষের দান-ধ্যানের যে চিত্র দেখতে পাচ্ছি তাতে বিস্মিত হবার চেয়ে আতঙ্কিত হচ্ছি বেশি। দানের নামে ফটোসেশনের আধিক্য এবং সাধারণ মানুষের জমায়েত, হুড়োহুড়ির এসব দৃশ্যে আতঙ্কিত না হবার কোনো সঙ্গত কারণ নেই। করোনা’র মতন ভয়াবহ মহামারির কালেও দানের নামে রাজনৈতিক ফটোসেশনের ফ্যাশন থেকে কিছু মানুষ মুক্ত হতে পারেননি।

সামাজিক দূরত্ব থেকে বেরিয়ে এখন বলা হচ্ছে ব্যক্তি পর্যায়ের শারীরিক দূরত্ব রক্ষার কথা। আমাদের মতন দরিদ্র দেশের পক্ষে এই দূরত্ব বজায় রাখা ছাড়া কোনো উপায় নেই। যেহেতু পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। এই ব্যর্থতা এবং উপায়হীনতার কথা জানা সত্বেও এক শ্রেণির মানুষ নিজেকে জাহির করতে সাহায্য বিতরণের নামে মানুষ জমায়েত করছেন। গণ ও সামাজিক মাধ্যমে এমন অসংখ্য ছবি ও ভিডিও চিত্র ছড়িয়ে রয়েছে।

দিল্লির একটি তাবলিগ জমায়েত থেকে বিপুল হারে ছড়িয়েছে করোনা ভাইরাসের সংক্রমন। পাঞ্জাবে এক শিখ ধর্মগুরুর জন্য সেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ কোয়ারান্টিনে। আর আমরা সাহায্যের নামে মানুষকে জমায়েত করছি। এই জমায়েতের পরিণতি কি হতে পারে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ চোখের সামনেই রয়েছে। তা সত্বেও আমাদের এসব কথিত দানবীররা তাদের বীরত্ব দেখাতে ফটোসেশন করছেন। মানুষকে এত সাহায্য করার ইচ্ছা তাহলে তা সরকারের ফান্ডে দান করুন। ধর্ম বলছে এমন ভাবে দান করা উচিত যাতে ডান হাতের দান বাম হাত টের না পায়। আপনি সরকারকে দিন, সেনাবাহিনীকে দিন। এছাড়াও রয়েছে বেসরকারী ‘বিদ্যানন্দ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান যারা খুবই ভালো কাজ করছে অসহায় মানুষদের জন্য তাদের দিন। আঞ্জুমানে মফিদুল তাদের দিন। তাদের দিবেন না। আপনাদের তো দান নয় ফটোসেশনই মূল লক্ষ্য। অন্যদের দিলে তো আপনার ছবি গণমাধ্যমে আসবে না। সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করতে পারবেন অমুক দানবীর আজ পঞ্চাশ জন মানুষকে খাওয়ালেন। সত্যিকার অর্থে ব্যক্তিগত ভাবে দেবার ইচ্ছে থাকলে রাতে বেড়িয়ে পড়ুন। মানুষের দ্বোরগোড়ায় পৌঁছে দিন খাবারের প্যাকেট। 

শুধু দানের কথা নয়। আমি আশ্চর্য হয়েছি কিছু সচেতনতা মূলক কর্মকাণ্ডের ছবিতে। একটি ছবিতে দেখলাম সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি করোনা সম্পর্কে লিফলেট ছড়াচ্ছেন, মানুষকে সচেতন করতে বক্তব্য রাখছেন। সেখানে এক গাদা মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি তাদের সচেতন করছেন। নূন্যতম শারীরিক দূরত্ব তাদের মাঝে নেই। সচেতনতার লেভেল ভেবে দেখেছেন কী! এমনি দায়িত্বশীল এরা। এমন প্রশ্নবোধক সচেতনতা বৃদ্ধির ছবির অভাব নেই মাধ্যমগুলিতে। 

‘অভ্যাস যায় না মরলে’, এমন প্রবাদটি এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি। এমন অবস্থা মূলত আমাদের দীর্ঘদিনের প্র্যাকটিসের ফসল। ইতোপূর্বে আমরা নানা প্র্রাকৃতিক দুর্যোগ এমন ফটোসেশনেই পার করেছি। বন্যা হোক, ঝড় হোক কিংবা রাজনৈতিক ক্যারিকেচার সব কিছুই এমন প্রচারণার জাহাজেই পাড়ি দিয়েছি। শুধু তাই নয় একেবারে পৌঁছে গেছি কূলেও। করোনাকেও আমরা এমন ভাবেই পাড়ি দিতে চাচ্ছি। ‘প্রতি ডুবেই শালুক’ যে পাওয়া যায় না এই প্রবাদটিও আমরা ভুলতে বসেছি। মূলত জীবন থেকে সাধারণ শিক্ষাটাও আমরা গুলে খেয়েছি। এসব ভুলে বসা আর গুলে খাওয়াদের, যারা সাধারণ কথা না বোঝে তাদের অসাধারণ কথা দিয়ে বোঝানো মূলত বোকামি। এদের লেভেল ওই পর্যন্তই।

সারা বিশ্বের চিত্র এখন চোখের সামনে। তাও যদি না বোঝে কেউ তাদের কী দিয়ে বোঝানো যাবে। আমাদের এক ভুল হয়েছে লকডাউন না করে, গাড়ি বন্ধ না করে, ছুটি ঘোষণা করা। এরফলে সারাদেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এটা না করলে শুধু ঢাকা ঝুকির মধ্যে থাকতো। সারাদেশ এমনভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়তো না। ঢাকাতে রোগ এবং রোগীর অনুসরণ সহজ হতো। এখন সারাদেশে খুঁজে মরতে হচ্ছে। নানা জায়গায় সর্দি-জ্বরে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, সাথে বাড়ছে মানুষের সংশয় আর সন্দেহ। আর সারাদেশের এই ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছেন তথাকথিত এইসব দানবীররা। পঞ্চাশ-একশ জনকে সাহায্য দেয়ার কথা বলে জড়ো করছেন হাজার মানুষ। গাদাগাদি এসব মানুষের মধ্যে একজন সংক্রমিত থাকলেই তো সর্বনাশের শুরু।

বাংলাদেশে অনেক ধনীলোক রয়েছেন। এদের মধ্যে ভালো মানুষও আছেন। আকিজ গ্রুপ একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে গণস্বাস্যেরৃর সাথে যৌথভাবে করোনা হাসপাতাল স্থাপনের কাজ শুরু করে। আরো কিছু ধনীলোক এগিয়ে এসেছেন এভাবে। যারা এগিয়ে এসেছেনতো এসেছেনই। যারা এগিয়ে আসেননি, তাদের প্রতি সরকার আহ্বান জানাতে পারে। সরকারের আহ্বানে একটা শক্তি রয়েছে, তাতে কাজ না হবার কারণ নেই। তারোপর রয়েছে অসংখ্য দুর্নীতিবাজ। যারা নানা কান্ডের সাথে জড়িত। বালিশকান্ড থেকে নানা কান্ডের জন্ম দিয়েছেন, তাদের টাকা-পয়সার সন্ধান করে তার একটা অংশও মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে লাগানো যায়। অন্তত এমন দুঃসময়ে তাদের অসৎ আয় একটি সৎ কাজে ব্যয় হোক। 

আমাদের অনেকে দেখি করোনা বিষয়ে বাঁচার পথ বাতলানোর পরিবর্তে ভীতি ছড়ানোর কাজ করছেন। ক্রমাগত ভীতিকর খবরে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত মানুষের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়ে। সুতরাং আশার কথাও কিছু শোনানো উচিত। সবচেয়ে বেশি উচিত করোনায় কতজন মারা যাবেন তার হাইপোথিসিস না করে করোনাকালীন ও করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক অবস্থা কিভাবে পাড়ি দেয়া যায় তা চিন্তা করা। ভবিষ্যত ভেবে কাজ করাই দূরদর্শিতা। আমাদের মতন দরিদ্র দেশগুলোতে করোনায় মারা যাবে হয়তো কিছু মানুষ, বিপরীতে অর্থনীতি না সামলানো গেলে দীর্ঘকালীন সময় ধরে না খেয়ে মারা যাবে তারচেয়ে বেশি। সত্যিকার সচেতন মানুষদের এটা ভাবতে হবে। কারণ ফটোসেশনে ব্যস্তদের এসব ভাবার সময় নেই। এই উজবুক শ্রেণিটা হয়তো সে সময়ও ব্যস্ত থাকবে ফটোসেশনে। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0805 seconds.