• বাংলা ডেস্ক
  • ০৩ এপ্রিল ২০২০ ১০:৩৭:৪৫
  • ০৩ এপ্রিল ২০২০ ১৩:৩৪:৫১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

দেশে বিনা চিকিৎসায় মৃতের সংখ্যা বেড়েছে

ছবি : প্রতিকী

প্রাণাঘাতী করোনাভাইরাস আতঙ্কের মধ্যেই দেশে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। একাধিক হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটেছে। এমনকি করোনাভাইরাসের কারণে হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোয় সাধারণ রোগের চিকিৎসা না করানোর অভিযোগ উঠেছে।

এমনই একজন খুলনার স্কুলছাত্র রিফাত যকৃতের জটিলতায় ভুগছিলেন। ৩১ মার্চ, মঙ্গলবার দুপুরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্বজনরা সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ে যান খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ‘চিকিৎসক নেই’ বলে ফিরিয়ে দেয়া হয়। খালিশপুর ক্লিনিক, সার্জিক্যাল হাসপাতাল আর ময়লাপোতা হাসপাতাল—কোথাও মেলেনি চিকিৎসা। এরপর সন্ধ্যায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ছোট্ট রিফাত।

২৮ মার্চ সকালে মুক্তিযোদ্ধা আলমাছ উদ্দিনের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। চিকিৎসার জন্য সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে রাজধানীর ছয়টি হাসপাতালে গেলেও কোনোটিই ভর্তি নেয়নি। রাতে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ ওয়ার্ডে জায়গা মেলে। সেখানে তাত্ক্ষণিকভাবে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়নি। অনেকটা বিনা চিকিৎসায় পরদিন সকালে মারা যান আলমাছ উদ্দিন।

সিলেট নগরীর হাউজিং এস্টেটের বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিনকে (৬৫) নিয়মিত ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন। এজন্য ১৫ মার্চ তাকে সিলেট কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালে নেয়া হয়। সে সময় কিছুটা শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন তিনি। একদিন আগে তার ছেলে যুক্তরাজ্য থেকে এসেছে শুনে ডায়ালাইসিস না করে তাকে বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। পরে সিলেটের আরো কয়েকটি হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন গিয়াস উদ্দিনের স্বজনেরা। চিকিৎসা না পেয়ে ২৪ মার্চ তার মৃত্যু হয়।

এছাড়াও করোনার উপসর্গ থাকায় কার্যত বিনা চিকিৎসায় নোয়াখালীতে দুজন, নওগাঁয় একজন, বগুড়ায় একজন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন, পুরান ঢাকায় একজন, ঢাকার মিরপুরের টোলারবাগে একজন ও চাঁদপুরের এক ব্যবসায়ীর ঢাকায় মৃত্যু হয়। দেশের িবিভিন্ন গণমাধ্যম এই খবর প্রকাশ পায়। জ্বর-সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ থাকলেই রোগীদের ফিরিয়ে দিচ্ছে বা ঢাকায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে দেশের বেশির ভাগ হাসপাতাল-ক্লিনিক।

রোগীর স্বজনরা যখন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে চিকিৎসা না করার অভিযোগ তুলছেন, তখন উল্টো রোগী বা তাদের স্বজনদেরই দোষারোপ করছেন চিকিৎসকরা। বিষয়টি সম্পর্কে একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছে বণিক বার্তা। তারা জানিয়েছেন, করোনার উপসর্গ থাকলে তাদের কি করতে হবে, তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা সরকার দিয়েছে। কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, কীভাবে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে—সব তথ্যই উন্মুক্ত। তারপরও এসব উপসর্গ নিয়ে মানুষ যখন করোনা চিকিৎসায় প্রস্তুত নয় এমন হাসপাতালে আসে—তাহলে তাদের ফিরিয়ে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

গণমাধ্যমের খবর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিনই করোনার উপসর্গ নিয়ে চার-পাঁচজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। কোনো দিন মৃত্যুর সংখ্যাটি আটজন পর্যন্ত ছিল। তবে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জাানান, করোনার উপসর্গ নিয়ে যারা মারা গেছেন, পরীক্ষার পর তাদের কারো শরীরেই করোনাভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়েনি।

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাভাইরাসের কারণে শুধুমাত্র বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু নয়, হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোয় সাধারণ রোগের চিকিৎসাও মিলছে না বলে অভিযোগ করছেন রোগীরা। মহাখালীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালে গত বৃহস্পতিবার নিয়মিত কেমোথেরাপি দেয়ার তারিখ ছিল ঢাকার এক গণমাধ্যম কর্মীর মায়ের। দুদিন আগে হাসপাতাল থেকে কেমো নিতে তাদের আসতে নিষেধ করে দেয়া হয়। শুধু ঢাকার এই ক্যান্সার হাসপাতাল নয়, সারা দেশেই রোগীদের নিয়মিত সেবা বন্ধ করে দিয়েছে অসংখ্য বেসরকারি ক্লিনিক।

সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে গত ২৪ মার্চ অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ভর্তি করাতে গিয়েছিলেন দক্ষিণ সুরমার বাসিন্দা আব্দুল মজিদ। তবে রোগীকে ভর্তি করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে স্ত্রীকে ভর্তি করেন তিনি। ২৭ মার্চ একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন আব্দুল মজিদের স্ত্রী। করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর সিলেটে এমন ঘটনা বেড়েছে।

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় জানান, সম্প্রতি অন্তঃসত্ত্বা রোগীর চাপ বেড়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন নারী আমাদের এখানে ভর্তি হচ্ছেন, যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।

ক্লিনিকগুলোর নিয়মিত সেবা বন্ধের বিষয়ে সিলেট প্রাইভেট মেডিকেল অ্যান্ড ডায়াগনোস্টিক সেন্টার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ডা. নাসিম আহমদ বলেন, ‘আমরা তো রোগীদের সেবা দিতেই চাই। কিন্তু আমাদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) নেই। এ অবস্থায় রোগীর কাছে যাওয়া চিকিৎসকদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। রোগী, চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবার জন্য একটি অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি হয়েছে।’

দেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসের আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়। এরপর থেকেই রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে চলে যায় হাসপাতালগুলো। সর্দি-কাশি-জ্বর কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গের রোগীদের ফিরিয়ে দিতে শুরু করে একের পর এক হাসপাতাল। শুধু করোনা উপসর্গ নয়, নিয়মিত সেবাও বন্ধ করে দিয়েছে অনেক সাধারণ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল।

এ বিষয়ে অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) আমিনুল হাসান বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসা না পাওয়ার দুই-একটি ঘটনার কথা আমরা জেনেছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।’

বাংলা/এনএস

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0869 seconds.