• ০৫ এপ্রিল ২০২০ ১১:১৪:১৯
  • ০৫ এপ্রিল ২০২০ ১১:১৪:১৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আগামবেনের কথা ভুলে যান

ছবি : সংগৃহীত


সার্জিও বেনভেনুতো


করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের বৈশ্বিক মহামারী প্রসঙ্গে সার্বভৌমবাদীদের (Sovereignists)—নব্য-ফ্যাসিস্টদের উন্নততর যে মহান (!) নামে ডাকা যায়—কাছ থেকে তৎক্ষণাৎ যে প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়, সেখানে আমরা বস্তুত বিদেশাতঙ্কগ্রস্ত [i] ব্যক্তিদের কাছ থেকে যেরূপ আচরণ প্রত্যাশা করা হয় তার প্রতিচ্ছবিই দেখতে পেয়েছি: সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া এবং বিদেশিদের মধ্যে কোভিড-১৯ চিহ্নিত করা। ঘরোয়া পর্যায়ে কোন কিছু না করেই ইউরোপের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠিক এটাই করেছেন। যেন বিপদ সবসময় বাইরে থেকেই আসে, কখনোই নিজেদের ভেতর থেকে নয়!

প্রচলিত আছে যে, এই বৈশ্বিক মহামারীর কল্যাণে নব্য-ফ্যাসিস্টদের পায়ের তলার মাটি সরে যাবে (নব্য-ফ্যাসিস্টদের মধ্যে আমি যাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করছি তারা হলো ট্রাম্প, জনসন, সালভিনি, এরদোয়ান...)। বাস্তবিকপক্ষে, যেকোন ক্ষেত্রে যে কেউ সংক্রমিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিপদটি বাইর— যেমন আফ্রিকা, চীন, মুসলিম দেশগুলো ইত্যাদি—  থেকে  আগত নয়। এমনকি ভেতরের কোন ভিন্ন পরিচয়ে ভূষিত ও প্রান্তিক করে রাখা গোষ্ঠী — যেমন শতাব্দীকাল ধরে ইউরোপে বিচ্ছিন্ন করে রাখা ইহুদিদের— থেকেও নয়। বিপদ রয়েছে সর্বত্র, এমনকি একটা শিশুর মধ্যেও, একজন বয়োবৃদ্ধের মধ্যে, একজন প্রিয়জনের মধ্যে...। যেমনটা সাংবাদিক মাছ্যিমো গুয়ান্নিনি (Massimo Guannini) বলেছিলেন যে, “আমরা বিপদে নাই, বরং আমরাই বিপদ”। স্মিটীয় রাজনৈতিক প্রাণী হওয়ার ক্ষেত্রে বৈপরীত্যের দ্যোতনার যে মৌলিকত্ব— আমাদের বনাম তাদের, আমি বনাম অন্যেরা— তা ধ্বসে পড়েছে এবং আমরা সবাই এখানে সমান বিপজ্জনক। বেদুঈনের দল, আমার আপন মেয়ের চেয়ে বেশী বিপজ্জনক নয়। বর্ণবাদী চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া এক ঘা’য়ে তাদের সকল জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছে।

এই অবস্থার মধ্যে, বিভিন্ন দেশসমূহ যখন শেঞ্জেন অঞ্চলকে [ii] সাময়িকভাবে স্থগিতাদেশে রাখছে, এটা আমাকে মোটেই উদ্বিগ্নতায় ফেলছে না। বরং এটা আরো বেশী গোলমেলে লাগতো যদি প্রতিটা রাষ্ট্র একে অপরের বিরুদ্ধে অবরুদ্ধ অবস্থা জারি করতো, তবে বাস্তবে এটা সামগ্রিক অবস্থার অনেকগুলো স্থবিরতার একটি মাত্র : প্রতিটা নাগরিক যেখানে অন্য আরেকজনের সাথে মেলামেশা থেকে নিজেকে বিরত রাখছে।

প্রসিদ্ধ দার্শনিক জর্জিও আগামবেন (এই একই সংকলনে) লিখেছেন :

স্বাধীনতার আইনসিদ্ধ টুঁটিচাপা থেকেও আমার কাছে আরো বেশী দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, মানবিক সম্পর্কের অবনতিও তারা উৎপাদন করতে পারে। অন্য ব্যক্তি, তিনি যে কেউ হতে পারেন, এমনকি কোন আপনজন, নিকটবর্তীও হওয়া যাবে না আর স্পর্শও করা যাবে না, এবং অবশ্যই অবশ্যই একটা সুনির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, আর এই দূরত্বের পরিমাণ কারো কারো মতে ১ মিটারের মতো, কিন্তু বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক পরামর্শ অনুযায়ী এই দূরত্বের পরিমাণ হতে হবে সাড়ে ৪ মিটার (মজার বিষয় খেয়াল করেন, এই অতিরিক্ত ৫০ সে.মিও গুরুত্বপূর্ণ!) আমাদের সহচর্যগুলোকে বিলোপ করা হচ্ছে।

নির্বিচারে এমন একটা ভাসা-ভাসা প্রতিক্রিয়া কল্পনা করাও দুরূহ ব্যাপার। বরঞ্চ, পছন্দের মানুষকে প্রিয়জনকে আলিঙ্গন করা, আদর করা, পোনামাছের মতো সার্বক্ষণিক তাদের সাথে লেপ্টে থাকার গতানুগতিক যেই ধারণা সে ব্যাপারটিকে একদম বদলে দিয়েছে এই মহামারী...। আজ ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয় প্রিয়জন থেকে নিজেকে দূরত্বে ঠেলে দিয়ে কিংবা প্রিয়জনকে নিকটে আসা থেকে বিরত করে। এটা এমন একটা প্যারাডক্স (আপাতবৈপরীত্য) যেটা সকল অলস ভাবাদর্শিক (ideological) কাঠামোকে ধ্বসিয়ে দিয়েছে(ভাবাদর্শিক বলতে এখানে মার্ক্সীয় পরিভাষাগত অর্থে ভাবাদর্শিক নয়), হোক তা বামপন্থার বা ডানপন্থার, অবশ্যই ‘পপুলিস্ট বা লোকরঞ্জনবাদী বা জনপ্রিয়তাবাদীদের’ কথা আমি উল্লেখ করতে চাচ্ছি না।

কিছু রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমের উপদেশমূলক প্রচারণা আমাদের স্বার্থপরতার পাশাপাশি আমাদের পরার্থপরতার প্রতিও আহবান জানায় : “আপনি যদি অন্যকে এড়িয়ে যান তবে আপনি তাদের রক্ষা করছেন, সাথে নিজেকেও বাঁচাচ্ছেন।” আসলে, প্রায় ক্ষেত্রেই এটা যেকোনভাবেই সত্য। আর এখন এটা অত্যন্ত সাধারণ জ্ঞাত বিষয় যে, আর সবার মতো তরুণরাও সংক্রমিত হতে পারে, তবে তাদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি সচরাচর  এমনটি নয়। আর এটাও স্বাভাবিক জ্ঞাত বিষয় যে, বৈশ্বিক এই মহামারীটি বয়োবৃদ্ধদের জন্য অত্যন্ত মরণঘাতী, যাদের বয়সসীমা পঁয়ষট্টি-ঊর্ধ্ব তাদের জন্য ঝুঁকি আরো প্রবল।

আমার এক তরুণ বন্ধু কমপক্ষে তিন মিটারের দূরত্বে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। আমি তার এই শারীরিক স্পর্শ এড়ানোকে সাধুবাদ জানাই, কারণ আমি জানি মূলত এই প্রক্রিয়ায় সে আমাকে রক্ষা করছে। কেননা আমি একজন বৃদ্ধ। এটা সত্য যে, সে তার পরিবারের প্রবীণদেরকেও রক্ষা করছে: তার বাবা, তাঁর মা....। তবে যাইহোক, আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ৷

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে আমি কিছু মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি যারা এই সামাজিক দূরত্বের যে রীতি তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলনা এবং এমনকি তারা নিরাপত্তা দস্তানা বা মুখ-আচ্ছাদনি কাপড় (ফেস মাস্ক) ব্যবহার করেনি; উপরন্তু তারা এই ব্যাধির গুরুতর অবস্থা সম্পর্কে নিজেদের সংশয় প্রকাশ করেছে। তাদের যুক্তি থেকে আমি যতটুকু বুঝতে পারি যে, তারা মূলত নাক-সিঁটকানো স্বভাবের ও চরমভাবে অসামাজিক লোক। এই সময়ে সামাজিকতা মানেই জনসমাগম এড়ানো।

গত শীতকালে ইতালিতে প্রায় ৮ হাজার মানুষ ফুসফুসজনিত জটিলতায় মারা গিয়েছিল ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপে, যেখানে বেশীরভাগই ছিল বয়স্ক ব্যক্তি। আর এই বছরে, করোনা ভাইরাসের প্রকোপে, মৃতের সংখ্যা ২০-২৫ হাজার পর্যন্ত হতে পারে, যা ‘স্বাভাবিক’ সংখ্যার প্রায় তিনগুণ বেশী, এবং বলাবাহুল্য যার শিকার বয়স্করাই বেশী। ‘মাত্র’ তিনগুণ বেশি মানুষ একটা মৌসুমী ব্যাধিতে মারা যাওয়ার তথ্যটাই কি এটা বলার জন্য পর্যাপ্ত যে ‘আগামবেন সত্য বলছেন যে এটা বস্তুত একটা কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট মহামারী’? নাহ। কারণ এটা একটা অজানা ভাইরাস যা আরো ভয়াবহ পরিণতি ঘটাতে পারে৷ যা করা হচ্ছে তা নিছক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এবং, সর্বোপরিঃ আমাদের সমাজে এটা মোটেই প্রীতিকর নয় যে, এক শীতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ বেশী মানুষ মারা যাক। এটা একটা বায়োপলিটিক্যাল—ওহ! আচ্ছা, নৈতিক— ব্যবস্থা।

বরিস জনসনের মতো একটা বিদঘুটে ভাঁড় ব্রিটিশ জনগণের উদ্দেশ্যে বলেছে, “আপনজনদের হারানোর প্রস্তুতি নিন তাদের অন্তিম সময় এসে যাওয়ার পূর্বেই।” যারা মরণমুখে তাদের সম্বোধন করে কেন কিছু বলা হলো না? কেন বলা হলো না “আপনার অন্তিম প্রয়াণের জন্য প্রস্তুতি নিন?” মনে হয় যেন মৃত্যু সবসময়ই অপরের মরণ। সম্ভবত তিনি বলতে চেয়েছেন, “তোমাদের বয়োবৃদ্ধ...দের প্রয়াণের জন্য প্রস্তুত হও।” যারা মারা যাবে, বরিস জনসনের মতে, মরে যাবার সমস্ত ব্যাপার যাদের রয়েছে, তারা সম্বোধন পাওয়ার বা তাদেরকে সম্বোধন করার সকল রীতি বিলুপ্ত হয়েছে, তারা আর একটি ‘আপনি’ হিসেবেও আমলযোগ্য নয়।

অনুবাদ : খান মুনতাসির আরমান

[সার্জিও বেনভেনুতো ইতালীয় মনঃসমীক্ষক ও দার্শনিক। ইউরোপীয় মনঃসমীক্ষণের জার্নালের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদকদের একজন। তিনি ইতালীয় জাতীয় গবেষণা পর্ষদের [The Consiglio Nazionale delle Ricerche (CNR)] কগনিটিভ সায়েন্স ও টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের একজন গবেষক। এই পর্ষদ ঘোষণা দিয়েছিল যে SARS-CoV2 মহামারি ইতালিতে নেই। পরবর্তীতে এই ঘোষণার সূত্র ধরে দার্শনিক জর্জিও আগামবেন করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবিলায় ব্যতিক্রমী (জরুরী) অবস্থা ডেকে আনাকে অকারণ জরুরত উল্লেখ করে লিখেন “অকারণ জরুরতের ডেকে আনা জরুরি অবস্থা” লেখাটি। এই লেখার অপর একটি ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে ‘এক বৈশ্বিক মহামারীর উদ্ভাবন’ শিরোনামে। আগামবেনের এই লেখার সূত্রে তীব্র বিতর্কের সূচনা হয়। ফলশ্রুতিতে দার্শনিক, তাত্ত্বিক, মনঃসমীক্ষক, ভাইরোলজিস্ট ও  রাজনীতিবিশারদেরা তীব্র সমালোচনার ঝাণ্ডা নিয়ে হাজির হয়েছেন।

সেই বিতর্কের অংশ হিসেবে বেনভেনুতো’র সমালোচনামূলক Forget about Agamben লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে তারই প্রতিষ্ঠিত ও সম্পাদিত ইউরোপীয় মনঃসমীক্ষণের জার্নালে। বেনভেনুতো’র এই লেখাটি অনুবাদ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী খান মুনতাসির আরমান।]

অনুবাদকের টীকা :

[i] বিদেশাতঙ্ক— অন্য দেশের লোকদের ব্যাপারে অপছন্দ বা ঘৃণা আছে এমন, জেনোফোব।

[ii] শেঞ্জেন অঞ্চল—ইউরোপের ২৬টি রাষ্ট্র, যেখানে পাসপোর্ট ও সব ধরনের সীমান্ত-নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বাতিল হয়েছে।

কৃতজ্ঞতা : বোধিচিত্ত

বাংলা/এসএ

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.1105 seconds.