• ০৫ এপ্রিল ২০২০ ১৮:৪৫:৪৪
  • ০৫ এপ্রিল ২০২০ ১৮:৪৫:৪৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

পোশাক শ্রমিকদের মহামারির দিকে ঠেলে দেয়ার দোষ আপনারও

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


অনেকের আক্ষেপ দেখছি পোশাক কারখানা খোলা এবং শ্রমিকদের গাদাপ্গাদি করে নিয়ে আসার বিষয়ে। যারা আক্ষেপ করছেন তাদের আগে প্রশ্ন করে নিই, সিস্টেম যে ক্র্যাশ করছে তা ক্রমাগত ইরর দেখে কি বুঝতে পারেননি? জানি, পেরেছেন, কিন্তু আপনিও সুবিধাবাদী, ইরর’গুলোকে কারেকশান করেন নাই, পালন করেছেন। আপনার পালিত সেই বিগড়ে যাওয়া সিস্টেমই আজ এই অবস্থার সৃষ্টি করেছে।

শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের ল্যাব প্রধান পিসিআর মেশিন বসানোর সময় পদত্যাগপত্র দিলেন। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বীরের মতন পলায়নের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। অনেকে এ বিষয়ে তাকে ধুয়ে দিচ্ছেন। আরে ভাই তার কী দোষ! তাকে তো এই বিগড়ে যাওয়া সিস্টেম পদায়ন করেছে। সাহসী লোককে বাদ দিয়ে মেরুদণ্ডহীন একজন মানুষকে বসিয়েছে প্রধানের পদে। সে তো দুর্যোগ দেখলে পালাবেই। এই মেরুদণ্ডহীনদের যারা বসিয়েছেন তারা দায়ি এজন্যে, যে বসেছে সে দায়ি নন।

সুযোগ সন্ধানী, সুবিধাবাদীরা চিরকালই থাকবে, এদের মধ্যে থেকে আসল জনকে বেছে পদায়ন করাটাই দায়িত্বশীলতা। এখানে ‘জ্বি হুজুর’ শুনে মুগ্ধ বা আপ্লুত হবার কিছু নেই। সেই আপ্লুত হবার খেসারত দিতে হচ্ছে এখন, সবচেয়ে প্রয়োজনের সময়। 

আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যে বড় ধরণের গন্ডগোল রয়েছে তা কি বোঝা যাচ্ছিল না? যাচ্ছিল। বালিশকাণ্ড, পর্দাকাণ্ড, থার্মোমিটারকাণ্ড এসব নানা কাণ্ড জানান দিয়েছিলো সেই গণ্ডগোলের কথা। আমরা গা লাগাইনি। এখন বোঝা যাচ্ছে তো একটা বালিশ বা পর্দার দামে কতগুলো পিপিই বা মাস্ক পাওয়া যায়। স্ট্যান্ড বা অন্যান্য জিনিসের দামে একটা ভেন্টিলেটর কেনা যায়। এই সিস্টেম ইরর চিহ্নিত করাই হলো দায়িত্ববানদের আসল কাজ। অবশ্য সরিষায় ভূত থাকলে বলার কিছু থাকে না। 

যাক গে, আক্ষেপ আর আফসোস করনেওয়ালাদের বলি, সিস্টেম ইররের দায়টা কিন্তু আপনারা এড়াতে পারেন না। প্রথমেই বলেছি এই কথা, আবার বলছি। একটা সিস্টেম বিগড়ে যাবার ঘটনা হঠাৎ করে ঘটে না, ধীরে ধীরে ঘটে। সেই ধীরে গতির ইরর আপনাদের চোখের সামনেই ঘটেছে। ক্রমে সিস্টেমটা বিগড়ে যাচ্ছে এমনটা বুঝেও হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া আপনারা সবাই চুপ ছিলেন। আজ সিস্টেমটা মহাদুর্যোগের সময়ে আপনাদের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন দাঁড়িয়েছে তখন দেখছেন, আপনাদের আগের কথাগুলো স্রেফ ফানুস ছিলো। ছিলো ক্ষণিকের জ্বলে উঠা আলো। এখন আপনাদের চোখের সমুখে অন্ধকার। আর সে অন্ধকার আপনাদেরই সৃষ্টি।

এই যে আয় নিয়ে বাগাড়ম্বর, সেটা যে কত ঠুনকো, আজ করোনা’কালে তা বোঝা যাচ্ছে। মৃত্যু ভয় নিয়েও পেটের দায়ে মানুষ ছুটে এসেছে ঢাকায়। এই দরিদ্র মানুষদের নিয়ে এই খেলা খেলছেন কারা। এর আগেও ঢাকা বন্ধ না করে ছুটি ঘোষণা করা হলো। গ্রামে ছুটলো অসংখ্য মানুষ কোন রকম শারীরিক দূরত্ব না রেখে। এবার ঢাকায় ডেকে আনা হলো সেই মানুষগুলোকেই এবারও কোনোরকম শারীরিক দূরত্ব রক্ষা করা হলো না। মানুষের জীবনের ন্যূনতম মূল্য দেয়ার চিন্তাও এই সিস্টেমের মাথায় নেই। থাকলে এমন কাণ্ডের জন্য সংশ্লিষ্টদের গণহত্যা সংশ্লিষ্ট আইনে বিচার হওয়া উচিত ছিলো। কারণ এতে গণমৃত্যুর সম্ভাবনাই তৈরি হয়েছে। অন্তত করোনা’কালের বাস্তবতা তাই বলে।

অনেকে দেখলাম এ নিয়ে পুঁজিবাদকে খুব গালি দিয়েছেন। কোনো কোনো বামের কাজই এই। বুঝুক না বুঝুক শব্দ শিখেছে কয়টা। এরমধ্যে পুঁজিবাদ অন্যতম। তাদের বলি দক্ষিণ কোরিয়া তো পুঁজিবাদী, নয় কি? তারা এতো ভালোভাবে করোনা ভাইরাসকে হ্যান্ডেল করলো কিভাবে। তারা তো বামদের মতন মৃত্যু বা আক্রান্তের সংখ্যা লুকায়নি। যেমন লুকিয়েছে উত্তর কোরিয়া। অনেক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রই মহামারি সামাল দিচ্ছে সফলভাবে। তারা তো তাদের শ্রমিকদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে না। মারি-মড়কের সময় কোনো বাদ’ই খাটে না। এখানে যা খাটে তা হলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা এবং তা যোগ্য জায়গায় যোগ্য লোক বসানো হলেই সম্ভব। এখানে যা হয়েছে তা হলো সিদ্ধান্তহীনতা বা দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেবার ফল। জায়গামত যোগ্য লোক না থাকলে যা হয় আর কী।

স্বাস্থ্যখাত চলে আসছে এবং চলবে এ ধারণায় আমাদের সিস্টেম ইরর সুবিধাবাদীদের এই জায়গায় বসিয়েছে। যেহেতু এই খাত দেশের নীতি নির্ধারণে বা মেগা প্রকল্প অনুমোদনে লাগে না সেহেতু এ খাতের পদায়নের দিকে নজর ছিলো কম। ফলে অনেক জায়গাতেই সুবিধাবাদীরা চেয়ারটা দখলে নিয়ে আছেন। আর এই সুবিধাবাদীদের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে হযবরল অবস্থার। হাসপাতালে চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে না। রোগীরা পাঁচ সাত হাসপাতাল দৌড়ানোর পর চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছেন। অথচ চিকিৎসা মৌলিক অধিকারগুলির অন্যতম। একজন নাগরিককে চিকিৎসা দিতে রাষ্ট্র বাধ্য। রাষ্ট্র বিষয়ক ধারণার উদ্ভবই হয়েছে এই মৌলিক অধিকারগুলোর উপর ভিত্তি করে। এটা নিশ্চিত না করতে পারলে রাষ্ট্র অকার্যকর, অক্ষম। সিস্টেমের ক্রমাগত ইরর আজকে আমাদের এমনি একটা অবস্থার সামনে দাঁড় করিয়েছে। আমরা ক্রমশ নিরাশ হয়ে উঠছি, অসহায় হয়ে পড়ছি। 

কেন এই অবস্থা হলো তার ছোট একটা ব্যাখ্যা দিই। আমাদের সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, আমলা এবং অন্যান্যদের কেউই ভাবেননি এমন একটা মহামারি’র সৃষ্টি হতে পারে। তথাকথিত বিজ্ঞামনস্করা তো আরো ভাবেননি। তাদের দূরদর্শিতার দৌড় অতটা ছিলো না যা দিয়ে তেমনটা ভাবা যায়। ফলে তারা নিজেদের সুবিধা লোটার তালেই ছিলেন। রাষ্ট্রকে তার ভুলটা ধরিয়ে দিতেও গা করেননি। বরং সেই ভুলগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। ফলে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ সিস্টেম ইররের। অথচ এই ভুলগুলিকে যদি ঠিক সময়মত অ্যাড্রেস করা যেতো তবে অন্তত এমন অবস্থার সৃষ্টি হতো না। এখন হয়তো অনেকে হাত কামড়াচ্ছেন, নিজেদের বিপদটা সামনে দেখে। কিন্তু লাভ কী! তারপরেও উচিত এখনো যতটা সময় আছে সেটুকু কাজে লাগাতে হবে, সাধ্যের বাইরে হলেও। সাথে অযোগ্যদের চিহ্নিত করতে হবে, আগামীর জন্যে। দুঃসময়ের পর যেন এরা আবার সুবিধা লুটতে না পারে। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0709 seconds.