• ০৭ এপ্রিল ২০২০ ১৯:৩১:১৫
  • ০৭ এপ্রিল ২০২০ ১৯:৩১:১৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘বন্দুক আর অসুখ হামাক কয়দিন ঘরত বসাইয়া রাখিপে’

নাগর নদী। ছবি : সংগৃহীত


আলী আহসান হাবিব :


ওপারে ভারত আর এপারে বাংলাদেশ। মাঝখানে দু-দেশের সীমানা ভাগ করে বয়ে গেছে নাগর নদী। নদীর প্রবাহ দু-পারের মানুষের দেশভাগ করে দিলেও ভাগ করেনি তাদের জীবন আর জীবিকা। দেশভাগের আগে ও পরেও দু-পারের হাজার হাজার মানুষের উপার্জন ক্ষেত্র ছিল এই নদী, নদীর মাছ, নদীর বালু আর নুড়ি পাথর। 

এখন-নদী বয়ে চলেছে তর তর করে। উত্তপ্ত সূর্য্য নদী পারের বালু রাশিকে পুড়িয়েই চলেছে। অথচ, জীবিকার জন্য দিনরাত এক করে দেয়া সেই কোলাহল এখন আর নাই। চারদিকে যতদুর চোখ যায়-ধুধু বালু মাঠ। 

সীমান্ত ঘেষা নাগর নদীর শুনশান দৃশ্য ৮৫ বছরের দীর্ঘ জীবনে দেখেননি নাঈমুল মোড়ল। চোখ তার ছল ছল করছিল। অনেক হাক ডাকের মানুষ বলে খ্যাত এ নদী পাড়ের নাঈমুল মোড়ল অস্ফুট কণ্ঠে বললেন, ‘ওই পাড়ত বিএসএফ আর এই পাড়ত বিজিবি রাইফেল লেহেনে আছে বাহে। নতুন কিবা অসুখ আসিছে। অসুখ নাকি উমহাক (ওদের) আর হামাক (আমাদের) ধরিবে, এই তাহানে বন্ধুক তাক করে আছে হামারতি (আমাদের দিকে)। ওই নদী আর নদীর পাড় ছিল হামার মা, হামার গোলা ঘর। ওই নদীই হামাক ভাত দিয়া আসিছে বছরের পরে বছর। এলহা, একবেলা কোনহ রকমে খাই, আর সারাদিনের খবর নাই। স্বাধীনের পরে একবার দুর্বিক্ষ দেখেছিনো-তাহো (তবু) এত কষ্ট পাইনি হামরা। ছুয়া পুয়া নাতি নাতনীলার কান্দন আর কেতদিন সহিম বাহে। বন্দুক আর অসুখ হামাক কয়দিন ঘরত বসাইয়া রাখিপে? ভুক (ক্ষুধা) যে অসুখ আর বন্দুক মানিবেনা বাপু। সরকারি লোক এইঠে আসেনা। হামার কপালত ইলিফও (রিলিফ) জোটেনা।’

ঠাকুরগাওয়ের সীমান্তবর্তী বালিয়াডাঙ্গী, রানীশংকৈল আর পীরগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৮৫ কিলোমিটার এলাকার সীমানাকে বিভক্ত করে রেখেছে নাগর নদী। রানীশংকৈল, পীরগঞ্জ ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার সাথে জেলা সদরের যোগাযোগ হয়তো কিছুটা সহজ। তারপরেও রানীশংকৈল উপজেলার ধর্মগড় চেকপোস্ট থেকে শুরু মাঝে হরিপুর আর পীরগঞ্জ উপজেলার  বৈরচুনা পর্যন্ত সীমান্ত রেখার কাছাকাছি গ্রামগুলোর পথঘাট অনেকটাই দুর্গম।

হরিপুর উপজেলার দনগাঁও, রহমতপুর, বসলগাও সহ আরও কয়েকটি এলাকার সীমান্ত পাড়ের মানুষগুলোর চোখেমুখে শুধুই হতাশা। তারা সরকারি সহায়তা না পেতে পেতে কেউ তাদের জন্য কোন সহায়তা এনে দিবে-এমন প্রত্যাশা করতেও ভুলে গেছে তারা। অতীতে দেশের প্রায় অনেক রকম দুর্যোগের সময়ও এই নাগর নদী তাদের পরিবারের আহার জুগিয়েছে। কিন্তু এবার, সারা বিশ্বের এমন দুর্যোগে নদীও তাদের আহারের জোগান দিতে ভুলে গেছে। ওপারে বিএসএফ আর এপাড়ে বিজিবি। দুপাড়ের দুই সীমান্ত প্রহরীর বন্ধুকের নলের আগায় হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষ। 

অসহায় মানুষগুলোর দিকে তাকানো যায় না? মনে হয়, এই বুঝি ওদের ক্ষুধার বিস্ফোরন ঘটবে, হয়তো পরিবারের লোকজনের আহার জোগাতে গিয়ে বুলেট বিদ্ধ হয়েও কেউ কেউ একটু খানি খাবার এগিয়ে দিয়ে বলবে, ‘এই নাও জীবন বাঁচাও তোমরা।’ 

বৃহত্তর দিনাজপুর এলাকার কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, ইটভাটা শ্রমিকসহ অন্যান্য শ্রমিকরা কোনো না কোনোভাবে দিনে তিন বেলা না হোক অন্তত দুবেলার আধাপেট খাবার জোগাড় করছেই। অথচ, নাগর পারের এ মানুষগুলো না পারে শষ্য উৎপাদন করতে, না আছে এত শত শত মানুষের অন্য কোন কর্মসংস্থান। নদী থেকেই খাদ্যের জোগান পাওয়া মানুষগুলোর খুব বেশি সামর্থ্য না থাকলেও খুব বেশি খাদ্যাভাবে পতিত হয়নি কখনও। হয়তো চিকিৎসা সহ শিক্ষা ব্যবস্থার কিছুটা ঘাটতিতো রয়েছেই। তবে, তাদের পরিশ্রমী শরীরে এবার খাদ্যের অভাব-অতীতের সকল ইতিহাসকেই ছাড়িয়ে গেছে।

লেখক : সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট বিষয়

নাগর নদী

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0726 seconds.