• ০৮ এপ্রিল ২০২০ ১৬:২৫:৫০
  • ০৮ এপ্রিল ২০২০ ১৬:৫০:১৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আমেরিকাকে পেছনে ফেলতে চীনের করোনা ফাঁদ!

ছবি : সংগৃহীত


হৃদয় আলম :


একবার এক অহংকারী ডাঁশমাছি এক সিংহের কাছে গিয়ে বললো- শোন সিংহ তোর চেয়ে আমি অনেক শক্তিশালী। আমি তোকে ভয় পাই না। তোর যদি বিশ্বাস না হয় আমার সাথে যুদ্ধ করতে আয়। দেখি কে যেতে।

এরপর আর কথা না বাড়িয়ে মাছিটি সিংহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। একটি মুহূর্তেই গিয়ে সিংহের নাকের ডগায় হুল ফুটিয়ে দিলো। সিংহ বেচারা মাছিকে থাবা দিয়ে ধরতে গিয়ে নিজের নখে নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করে একসময় কাহিল হয়ে পড়লো। ডাঁশ মাছিটি এবার সিংহের সঙ্গে যুদ্ধ জিতে গোঁ গোঁ করে বিজয়-সঙ্গীত গাইতে গাইতে উড়ে চলে গেল।

কিন্তু বেশীদূর যাওয়া হল না তার, সোজা গিয়ে জড়িয়ে গেল কাছাকাছি এক মাকড়সার জালে। এর কিছুক্ষণ পরেই চলে গেল মাকড়সার পেটে। মরার আগে ডাঁশটা আফসোসের সঙ্গে বলল- ‘কী দুঃখের কথা, আমি সিংহের মত একটা মহা শক্তিশালী জন্তুকে অনায়াসে হারিয়ে দিয়ে এলাম, অথচ একটা তুচ্ছ মাকড়সার কাছে শেষ হয়ে গেলাম!’

এ গল্প থেকে আমরা অনুধাবন করতে পারি, নিজে নিজেকে বড় ভাবলেই কিছু আসে যায় না। কোনো না কোনো সময় ঠিকই ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এ মাছিটার মতোই চীন এখন ভাবছে।

চীনের ভাবনা, ‘মুই কী হনু রে!’ সামনের-পেছনের ভাবনা পরে আসবে।

সহজভাবে বলতে গেলে মহামারীকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিকভাবে আমেরিকাকে পেছনে ফেলাই চীনের উদ্দেশ্য। এর কিছুটা আঁচ করতে পারছি আমরাও। কয়েকমাসের ব্যবধানে সংকট কাটিয়ে চীন মাস্ক, ওষুধ, ভেন্টিলেটর বিক্রি করছে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে।

তাছাড়া যেই বাজার থেকে এ ভাইরাস ছড়ালো, পশু বিক্রির সেই হাটও খুলে দেয়া হলো এতো তাড়াতাড়ি! চীন এসব ইচ্ছে করে করছে কিনা তাও সময় বলবে। তবে, আপাতত চীনের এতো দ্রুত বিস্তর এ পরিবর্তন স্বাভাবিকই ইঙ্গিত দিচ্ছে অন্যদিকে।

প্রশ্ন উঠছে, যেখান থেকে এ ভাইরাসের ছড়াছড়ি ক’দিন বাদেই সেখানে সব ঠিক হয়ে গেলো? প্রশ্ন উঠছে আদৌ কী মহামারী, নাকি ব্যবসায়ের নতুন ফাঁদ!

যদি কখনো প্রমাণ হয় চীন কাজটি ইচ্ছে করেই করেছে তবে খুব বেশি অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ আগে থেকেই বিষয়টি জানলেও কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি চীন সরকার। কেন এ লুকোচুরি তা নিঃসন্দেহে সন্দেহের কারণ।

তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উহানে প্রথম করোনা সংক্রামণের খবর মেলে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ‘সন্দেহজনক’ ভাইরাসের বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করেন। তবে, তখন যে আট ডাক্তার মুখ খুলেছিলেন তাদের সম্পূর্ণ বয়ান প্রকাশ করেনি চীন। এরপর ২৫ ডিসেম্বর থেকে হু হু করে বাড়তে থাকে আক্রান্তের সংখ্যা। এরপর ‘লি ওয়েনলিয়াং’ নামের এক চিকিৎসক প্রকাশ্যে কোভিড- ১৯ নিয়ে সতর্ক করে এর উপসর্গগুলো সামনে আনেন।

৩১ ডিসেম্বর উহানের স্বাস্থ্য দপ্তর ঘোষণা করে করোনাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে সংক্রামিত হয় না। সে সময় বলা হয় একজন চিকিৎসাকর্মীও আক্রান্ত। এরপর চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি চীন সরকার ডক্টর ওয়েনলিয়াংয়ের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছড়ানোর অভিযোগে মামলা করেন। পুলিশের কাছে ‘ভুল’ স্বীকার করতে বাধ্য হন চিকিৎসক। তাকে দিয়ে মুচলেকা লিখিয়ে নেয় চীন সরকার।

পরে উহানের সব নমুনা পরীক্ষা বন্ধ করে দেয় চীন সরকার, নষ্ট করে দেয়া হয় স্টকে থাকা নমুনাও। পরের কিছুদিন আক্রান্তদের ‘নিউমোনিয়ার’ মতো কিছু হয়েছে বলে সরকারি রেকর্ডে নথিভূক্ত করা হয়।

৮ জানুয়ারি ফের বিবৃতি দিয়ে চীন সরকার জানায়, মানুষ থেকে মানুষে করোনা সংক্রামণের কোনো প্রমাণ মেলেনি। ১২ জানুয়ারি করোনায় আক্রান্ত হয়ে ডক্টর ওয়েনলিয়াং হাসপাতালে ভর্তি হলে তার মৃত্যু হয়।

এরপর যাবতীয় পরামর্শ উড়িয়ে চীন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৪০ হাজার পরিবারকে খাবার আদান প্রদানের অনুমতি দেয়া হয়।

১৩ জানুয়ারি প্রথম চীনের বাইরে করোনা সংক্রামণের খবর মেলে, আক্রান্ত হন থাইল্যান্ডের ৬১ বছরের বৃদ্ধা। আর এরপরের ইতিহাস সকলেরই জানা।

চীনের উহান প্রদেশ থেকে ছড়ানো করোনা চীন ইচ্ছা করে ছড়িয়েছে কিনা তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু এ ভাইরাস যে কোনো ল্যাব থেকে চীন ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে বানায়নি তা বলা যাবে না। কারণ চীন থেকে ছড়ানো করোনাভাইরাসে যখন বিশ্ব নড়বড়ে, অর্থনীতি বিপর্যস্ত তখন চীন রীতিমতো ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে। তারা নতুন মাস্ক, গ্লাভস আর স্যানিটাইজার উৎপাদনের কাজ শুরু করেছে। এসব তারা বিশ্বের রপ্তানি করবে!

এদিকে কিছুদিন আগে কানাডার ন্যাশনাল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে কর্মরত একদল চীনা গবেষকের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তাদের অ্যাকসেস কার্ড কেড়ে নেয়া হয়। এ ল্যাবে বিভিন্ন প্যাথোজেন বা মারণ-ভাইরাস নিয়ে কাজ করা হতো। মূলত এই গবেষকদল নিয়ম ভেঙে চীনসহ কয়েকটি দেশের কাছে বায়োওয়েপন প্রোগ্রামের কথা বলেছিলো।

এছাড়া একমাত্র উহানে রয়েছে চীনের একমাত্র লেভেল-ফোর মর্যাদার ভাইরোলজি ল্যাবরেটরি। তাই কোভিড-১৯ ল্যাবে তৈরি হতে পারে বিষয়টি একদম উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়।

করোনা কাটিয়ে চীনের শিল্পমহল এখন সচল। কল-কারখানা এ মাসেই চালু হয়েছে। শিল্প কারখানাগুলোকে করোনার সরঞ্জাম তৈরির জন্য জোর দেয়া হচ্ছে। যা দরকারে বিদেশে রপ্তানি করা হবে। গ্লাভস, মাস্ক, ভেন্টিলেটর, ওষুধ সবই তৈরি করছে তারা।

সোজা করে বললে বলতে হবে, গোটা বিশ্বকে আইসিইউতে ঠেলে দিয়ে এখন এবার চিকিৎসা সামগ্রী বানাচ্ছে চীন। বলা বাহুলু এই মহামারী থেকে বিপুল বিদেশি মুদ্রা লাভ করছে বেইজিং।

এই মুহূর্তে চীনের জনজীবন একদম স্বাভাবিক। রেস্তোরাঁ, টুরিস্ট জোন এমনকী দ্যা গ্রেট ওয়াল অব চায়না খুলে দেয়া হয়েছে দেশের নাগরিকদের জন্য।

মূল কথা করোনার ধাক্কা সামলিয়ে উঠে পড়েছে চীন। আর এবার তারা বিশ্বের ধাক্কা সামলাতে আর নিজেদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বাণিজ্যের পালে হাওয়া টানছে বেইজিং।

চীনে প্রায় সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। যেই মাংসের বাজার থেকে করোনা ছড়িয়েছে তার দরজা খুলে দিয়েছে চীনা সরকার। সংকট কাটতে না কাটতেই এ বাজার চালুর সিদ্ধান্ত সন্দেহের পালে আবারো হাওয়া লাগিয়ে যায়। উহানে কোভিড-১৯ সংক্রামিতদের মধ্যে ৫ জনই ছিলো ওই ‘ওয়েট মার্কেটের’ কর্মী।

যেখানে বিজ্ঞানী এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে এই মার্কেট থেকেই করোনা ছড়িয়েছে, তখন বিশ্বে চলমান করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হতেই কেন চীনের এ ধরনের সিদ্ধান্ত? অনেকের আবার দাবি ২০০২ সালে সার্স মহামারীর কারণও ছিলো চীনের এই পশু বিক্রির বাজার।

চীনে করোনা সংক্রামণের চূড়ান্ত পর্যায়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি চাইনিজ পিপলস কংগ্রেস ভোটাভুটি করে দেশের সব ওয়েট মার্কেট বা পশু বিক্রির মার্কেটে তালা ঝোলানোর পক্ষে মত দেয় কিন্তু কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানেই ফের খুলেছে বাজার!

চীনের দাবি তারা সম্পূর্ণ সংকট মুক্ত। আর তাই ছন্দে ফেরার চেষ্টাকে দ্রুতগতি দিতে এ সিদ্ধান্ত।

এসব তথ্য স্পষ্ট করে আঙ্গুল তোলে চীনের দিকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দল চীনে যাওয়ার পর প্রথম জানা যায়, মানুষ থেকে মানুষে করোনা সংক্রামণ শুধু সম্ভবই না বরং হচ্ছেও। সেই সংক্রামণের তাণ্ডব এখন চলছে বিশ্বের বহু দেশে। প্রাণহানী-মন্দা, অভাব সবই প্রবল হয়ে উঠছে বিশ্বব্যাপী। কিন্তু চীন!

জবাব মিলবে সময়ে। কিন্তু এরই মধ্যে চীনকে কাঠগড়ায় তুলে কোটি কোটি টাকার মামলা হচ্ছে বিশ্বের নানান প্রান্তে। আমেরিকার টেক্সাসের ল্যারি ক্লেম্যান নামের এক আইনজীবী ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের মামলা করেছেন।

এই মুহূর্তে অন্তত ৯ হাজার চীনা সংস্থা নতুন করে মাস্ক বানাতে শুরু করেছে। এ সময় বিশ্বে মাস্কে চাহিদা প্রচুর বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত। আর চড়া দামে এসব মাস্ক কিনতেও রাজি হবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। তবে, চাঞ্জল্যকর বিষয় হলো এসব সংস্থা গত দুইমাস ধরেই মাস্কের ব্যবসা শুরু করেছে।

বর্তমানে চীনে ১৬ কোটি ৬০ লক্ষ মাস্ক তৈরি হচ্ছে। আর যারা এ মাস্ক তৈরি করছে তার মধ্যে অন্যতম ‘ডন পরিমার’। চীনের যত মাস্ক তৈরি হয় তার প্রায় ৪০ শতাংশ তৈরি করে এই সংস্থা। করোনা মহামারীর পর ডন পরিমারের শেয়ার দর বেড়েছে ৪১৭ শতাংশ।

শুধু অভিযোগই নয়, তথ্য প্রমাণও চীনের বিরুদ্ধেই যাচ্ছে। বিষয় যাই হোক কিছু একটা গোলমাল যে আছে তা আঁচ করাই যাচ্ছে।

১৯৯৯ সালে চীনে প্রকাশিত হয় ‘ Unrestricted Warfare: China's Master Plan to Destroy America'। বইটির লেখক চীনের দুইজন জেনারেল ‘কেআও লিয়াং’ এবং ‘ওয়াং সিয়ায় জু’। বইটিতে তারা লিখেছিলেন আমেরিকার সাথে যুদ্ধ করে নয় বরং মাথা খাটিয়ে বাণিজ্যিক প্রসারের মাধ্যমে আমেরিকাকে পেছনে ফেলতে পারে চীন। এই বইয়ের কথা বলছি, কারণ এ বইয়ে যে ধরনের কৌশলে কথা বলা হয়েছিলো তা বর্তমান পরিস্থিতির সাথে বেশ মিলে যাচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0891 seconds.