• ০৮ এপ্রিল ২০২০ ২৩:০৪:০৭
  • ০৮ এপ্রিল ২০২০ ২৩:০৪:০৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

শুধু কি চিকিৎসকদেরই দোষ, না কী এসব ঐতিহাসিক ভুলের একটি চিত্রমাত্র

ছবি : সংগৃহীত


আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি :


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সুমন চাকমা মৃত্যুর কয়েকদিন আগে লিখেছিলো- ‘আমার করোনা হয়নি। অথচ পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে করোনার কারণেই আমাকে মারা যেতে হবে।’ আগে থেকেই অসুস্থ সুমনের বুকে টিউমার হয়েছিলো। ভারতে চিকিৎসা শেষে মোটামুটি ভালোই ছিলো। সম্প্রতি অসুস্থ হয়ে পরলে কোন হাসপাতাল সুমনকে ভর্তি করতে রাজি না হওয়ায় চিকিৎসা না পেয়েই মারা গেলো। এমনই আরো বেশ কিছু মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটছে।

করোনা আতঙ্কে যখন মানুষ দিশেহারা তখন বিভিন্ন হাসপাতাল ক্লিনিকের চিকিৎসাসেবা নিয়ে আসছে একের পর এক অভিযোগ। অনেক চিকিৎসক চিকিৎসা দিচ্ছেন না বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। স্বভাবতই ক্ষোভ তৈরি হওয়ার কথা এবং সেটাই হয়েছে। একই সাথে আমরা দেখেছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘৃণাও ছড়াচ্ছেন অনেকে।

কিন্তু এই যে একটা পরিস্থিতি তৈরি হলো, এই দুর্যোগে যেখানে চিকিৎসক-স্বাস্থ্য কর্মীদের সবার অগ্রগণ্য সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার কথা সেখানে অনেকে ক্লিনিক বন্ধ করা হয়েছে, সেবা সীমিত করে দেয়া হয়েছে, অনেক চিকিৎসকরা ঠিকমত চিকিৎসা দিচ্ছেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে এইসব অভিযোগ-পরিস্থিতি কি হঠাৎ করেই তৈরি হয়েছে না কি এর পেছনে রয়েছে ‘ঐতিহাসিক ভুল’। একতরফা বিষোদগার না করে কেন এমন হচ্ছে এই প্রশ্নটা সামনে আনা জরুরি ছিলো অথচ দুঃখের বিষয় সেই আলোচনার বদলে আমরা দেখছি ঘৃণার ছড়াছড়ি। যে সিস্টেম, যে ব্যবস্থাপনা, যে মূল্যেবোধ রাষ্ট্র দিনের পর দিন তৈরি করেছে আজ তার ফলাফলইতো এইসব দৃশ্যের জন্ম হয়েছে। 

মিথ্যে বাহাদুরি নিয়ে গড়ে তোলা একের পর এক বিকল ও নড়বড়ে সিস্টেম যখন সব এলোমেলো করে দিয়েছে তখন যে যার দিকে পারছে আঙুল তুলছে। এই ধরনের পরিস্থিতি নিয়ে প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী অরুন্ধতী রায় বলেছিলেন ‘...কিন্তু বহু বছর ধরে চলেছে ভুলের পরে ভুল, দুর্নীতির পরে দুর্নীতি, অপচয়ের পর অপচয়। এখন হঠাৎ করে বিকল্প চাইলে বিকল্প আকাশ থেকে পড়বে না। পেছনের ঐতিহাসিক ভুলগুলোকে আগে শোধরাতে হবে।’

ঠিক একইভাবে যারা গত দুইদিন ধরে হঠাৎ করেই চিকিৎসকদের কাছ থেকে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, দায়িত্বশীল আচরণ, সাহসী বীরের আচরণ দাবি করছেন তাদের কাছে প্রশ্ন তারা কোন সমাজে বসে এই দাবিটি রাখছেন? আমাদের অতীতটা কেমন? সমাজ ব্যবস্থাটা কেমন সেটা কি তারা ভুলে গেছেন? এখন হঠাৎ করেই যারা দাবি তুলেছেন হাসপাতালে হাসপাতালে ক্লিনিকে ক্লিনিকে মানবিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে যাবে, চিকিৎসক-চিকিৎসা কর্মী এবং স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীরা সবাই বীরের মতো ঝাপিয়ে পরবে। এই ভঙ্গুর, রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়নের সমাজে, মূল্যবোধহীন সমাজ ব্যবস্থায় কি করে এই দাবির ভিত্তি তৈরি হবে? এই মানবিকতা, এ বীরত্ব এই পেশাদারিত্ব কী চিকিৎসক-স্বাস্থকর্মীদের কাছে আসমান থেকে নেমে আসবে হঠাৎ করে? তারা তো এ সমাজেই তৈরি, তারাতো এখানেই বসবাস করেন...।

অনেক চিকিৎসকরা-স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে লড়াই করছেন কিন্তু সামগ্রিতভাবে তারা সেটা পারছেন না কেন? উত্তরটা সহজ, সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাটা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব যাদের তৈরি করার দায়িত্ব তারা পারেননি বলেই আজ এই অবস্থা।

যে হাতে এই লেখাটি লিখছি সেই হাত দিয়েই কয়েকদিন আগে লিখেছিলাম কিউবার চিকিৎসকদের বীরত্বের কথা, আত্মত্যাগের কথা। তারা কী স্বগৌরবে কী মর্যাদা আর বীরত্ব নিয়ে ইতালির মৃত্যুপুরীতে গিয়েছে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য। দেশে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের মেডিকেল টিম। আর সেখানে আমাদের হাসপাতাল আমাদের চিকিৎসক স্বাস্থকর্মীরা নিজেরাই সেবা দিতে ভয় পাচ্ছেন। কেন? কিউবানরা পেরেছে কারণ কিউবার সমাজ রাজনীতি রাষ্ট্রের গঠন তাদের এভাবে তৈরি করেছে। আমাদের চিকিৎসকরা পারছে না কারণ তাদেরকে সেভাবে তৈরি করতে পারেনি। প্রায় একই আয়তনের এই দুইটি দেশের চিকিৎসা সিস্টেমের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে মূল সমস্যাটা কোথায়।

আজকে ভয়ে যেসব চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীরা আড়ষ্ট হয়ে আছেন এই ভয় কী তাদের পাওয়ার কথা না? অবশ্যই এর যৌক্তিকতা আছে। কারণ তারাই জানেন কতটা ভঙ্গুর আমাদের এই চিকিৎসা ব্যবস্থা। তাদের করোনা মোকাবিলার জন্য কতটা তৈরি করা হয়েছে সেসবের আসল চিত্র এই স্বাস্থ্যকর্মীদের চেয়ে আর কে ভালো জানে?

আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলদের, মন্ত্রীদের করোনা সংক্রান্ত প্রস্তুতি নিয়ে কিছুদিন আগেও যেসব বক্তব্য পাওয়া গেছে তার ভেতরইতো লুকিয়ে আছে, তাদের ব্যবস্থাপনা আর লড়াইয়ের প্রস্তুতির নমুনা। এই সময়ে এসে প্রতিটি মুহূর্ত দিয়ে, আমাদের জীবন দিয়ে আমরা এখন উপলব্ধি করছি সেইসব প্রস্তুতির নমুনা।

করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে বলে যে কথা বলতেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সেই স্বাস্থ্যমন্ত্রীও বলতে বাধ্য হলেন সমন্বয়হীনতার কথা। আজ এই দুর্যোগে এই মহামারীতে যে হযবরল অবস্থা তৈরি হয়েছে সেটা হওয়ারই কথা ছিলো। কারণ এই পথটা দীর্ঘদিন বসে তৈরি করা হয়েছে এবং সেটাকে উন্নয়ন বলে প্রচার করেছে। একের পর এক ভুল একের পর এক গণবিরোধী ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্যখাত চলে গেছে ব্যবসায়ীদের দখলে। ফাইভস্টার হাসপাতাল গড়ে তোলা সেইসব মুনাফালোভীরা তাদের ধর্ম অনুযায়ী সরে এসেছেন। কিন্তু দিনের পর দিন যারা বিভিন্ন সেক্টরকে এমন মুনাফাভোগীদের হাতে তুলে দিলো আজ তারাই  জনগণের বিরুদ্ধে খেপিয়ে দিয়েছেন। এখন সবাই সবার প্রতিপক্ষ! এই সমাজে বাস করতে করতেই একটি শিশু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার কিংবা অন্য যে পেশাতেই যাক না কেন সে শিখে যায় শুধু নিজের জন্য বাঁচো। আর এই জন্যই আমরা হরলিক্সের বিজ্ঞাপনে দেখতে পাই- রাত জেগে পড়া শিশুটি তার মাকে বলে, বড় হয়ে সে ডাক্তার হবে এবং ডাক্তার হয়ে অনেক বড় বাসা নিবে! বিজ্ঞাপনের এই ভাষার ভেতরই লুকিয়ে আছে এই সমাজ কিভাবে তার নাগরিকদের গড়ে তুলছে।

যতদিন পর্যন্ত মূল জায়গাটি ঠিক করা না যাবে ততদিন পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকবে। শুধু মাত্র ক্ষুধার তাড়নায় পথে নামা শ্রমিকটি মার খাবে, কৃষক মরবে, শিক্ষক সমাজ অপদস্থ হবে, সাংবাদিক সমাজ অবরুদ্ধ থাকবে, চিকিৎসকরা এমন গাল-মন্দ শুনবেন, নিরাপত্তা রক্ষীদের নাম হবে নির্যাতক। সব, সব কিছুই এমন উল্টো হয়ে ঝুলে থাকবে। এমন চরম হতাশা পূর্ণ সময়ে আমরা নিঃশ্বাস এবং বিশ্বাস খুঁজতে কোথায় যাবো?

নারায়নগঞ্জ লকডাউন থাকায় বাড়ি বাড়ি প্রয়োজনীয় খাবার আর জরুরি ওষুধ পৌঁছে দেয়া ইমার্জেন্সি নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী দলের সংগঠক তরুণ প্রকৌশলী এবং এক্টিভিস্ট মাহবুব সুমনের একটি কথা মনে পরছে-  ‘আজকে সারাদিন ভয়ঙ্কর এলাকাগুলোতে ঔষধ বাজার দিতে দিতে কয়েকটা লাইন ঘুরতে থাকে মাথায়। এরকম জীবনইতো চেয়েছিলাম। যেখানে কোন আশা থাকবেনা সেখানে আমরা থাকবো। আমাদের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে কাজ করে যাব পৃথিবীর জন্য। প্রাণ প্রকৃতির জন্য। এই আমরা কারা’

সুমন যে প্রশ্নটি রেখেছেন এই আমরা কারা? সেই আমাদের জাগাতে পারলেই একদিন সব মানুষ তার মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবে...বাঁচার স্বপ্নটা ফিরে পাবে।

লেখক: সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

করোনাভাইরাস চিকিৎসক

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0711 seconds.