• নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ০৯ এপ্রিল ২০২০ ১৩:৩৯:১৮
  • ০৯ এপ্রিল ২০২০ ১৩:৩৯:১৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

এপ্রিলের মাঝামাঝি করোনার ভয়াবহতা বাড়বে দেশে

দেশে করোনায় আক্রান্ত এক ব্যক্তির জানাযা। ছবি : সংগৃহীত

চীনের উহানে কোভিড-১৯ নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার সোয়া দুইমাস পর বাংলাদেশেও শনাক্ত হয় এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী। ৮ মার্চ এ সংবাদ নিশ্চিত করে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এরপর দিনে ২-৩ জন করে বাড়তে থাকে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা। এরপর গত কয়েকদিনে তা বাড়া শুরু করে লাফিয়ে।

গত ৫ এপ্রিল, রবিবার আইইডিসিআর দেশে ৯ জন করোনারোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য দেয়। এর পরদিন সোমবার তা বেড়ে দ্বিগুণ হয়। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৮ জন রোগী শনাক্ত হয় বলে জানায় তারা। এরপর মঙ্গলবার ৩৫ জন ও গতকাল বুধবার ৫৪ জনের শরীরে এ ভাইরাস শনাক্ত হয়। অর্থাৎ দেশে গত কয়েকদিন ধরে কোভিড-১৯ পরীক্ষা বাড়ার সাথে সাথে রোগীর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে।

বাংলাদেশের জন্য করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এপ্রিল মাসটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা আশঙ্কা করছে, দেশে করোনার ভয়াবহতা আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে বাড়তে পারে। এর কারণ, একদিকে যেমন সামাজিক সংক্রমণ দেখা দিতে শুরু করেছে, তেমনি সেটা ঠেকিয়ে রাখার জন্য ছুটি লকডাউনসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। কার্যকর পদক্ষেপ এবং মানুষ নিয়ম-নীতি না মানলে ৫-২০ লাখ লোক আক্রান্ত হতে পারেন বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ৫ এপ্রিল আইইডিসিআর পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, সংক্রমণের তৃতীয় স্তরে প্রবেশে করেছে বাংলাদেশ। কারণ ঢাকার টোলারবাগ ও বাসাবো, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর (শিবচর), গাইবান্ধা (সাদুল্লাপুর)-এসব এলাকায় 'ক্লাস্টার' বা গুচ্ছ আকারে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

এর আগে সীমিত আকারে কমিউনিটিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে বলে মার্চ মাসের শেষের দিকে জানিয়েছিলেন তিনি। ঢাকার বাইরের বেশ কয়েকটি জেলাতেও এখন ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। এতে সংক্রমিত রোগীদেরম মধ্যে নারী, পুরুষ, শিশুসহ সকল বয়সী মানুষেরই দেখা মিলছে।

মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গতকাল বুধবার বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন সংক্রমণের দিক থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের মাঝামাঝিতে রয়েছে। ভাইরাসটি কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়লেও সেটা এখনো ক্লাস্টার আকারে রয়েছে।’

যখন কোনো দেশে এতে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় না, তখন সে দেশটি থাকে প্রথম স্তরে। সে দেশটি সংক্রমনের দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করে, যখন সেখানে বিদেশফেরত কারো মাধ্যমে সংক্রমিত শনাক্ত হয়। সমাজে সীমিত আকারে রোগটি ছড়িয়ে পড়লে তখন সে দেশ সংক্রমনের তৃতীয় স্তরে পৌঁছায়। আর সেটি তখনই চতুর্থ স্তরে পৌঁছায়, যখন সমাজে ব্যাপক হারে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে এবং বহুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটতে থাকে।

স্বাস্থ্য সচিব আসাদুল ইসলাম ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, দেশ সংক্রমনের তৃতীয় স্তরে রয়েছে, যা এ মাসেই চতুর্থ স্তরে পৌঁছাতে পারে।

বৈশ্বিক এ মহামারি মোকাবিলায় সরকার সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে সেনাবাহিনী পর্যন্ত সকলে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে নিয়োজিন আছেন। আমরা আশা করবো সাধারণ মানুষও আমাদের সাহায্য করবেন।’

প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরণের ভয়াবহতার সময় আমরা মনে করতে পারি। যদি কোন চিকিৎসা সেবা বা সতর্কতা না নেওয়া হয় তবে রোগতত্ত্ব অনুযায়ী এরা কিছু সংখ্যায় ছড়াতে থাকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটা ৫-২০ লক্ষ হতে পারে।’

ইতালি-স্পেনের থেকে বাংলাদেশের আবহাওয়া ভিন্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন বাংলাদেশের মত পরিবেশে এসে করোনা ভাইরাস তার জিনগত পরিবর্তনও করতে পারে।’ যদি তেমন হয়ে থাকে এ দেশে করোনাভাইরাসের তীব্রতা কম হবার প্রবণতা থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।

ডা. লেলিন চৌধুরী আরো বলেন, ‘তবে এককভাবে শুধু সরকার, চিকিৎসক সমাজ বা জনগণ নয় এই ভয়বাহতা মোকাবিলায় দরকার, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা।’

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের এই এপ্রিল মাসটা খুব ক্রিটিক্যাল। ঢাকা শহরেই বেশিরভাগ পজিটিভ রোগী পাওয়া গেছে। নারায়ণগঞ্জেও বেশ কিছু রোগী পাওয়া গেছে। এরকম যেসব স্থানে বেশি রোগী পাওয়া গেছে, সেসব এলাকা লকডাউন করে রোগটি সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেটা যদি ঠিকভাবে করা যায় তাহলে আমরা বেঁচে যাবো।’

তার ভাষ্য, ‘করোনাভাইরাস কন্ট্রোল করতে হলে সেটা এই এপ্রিল মাসের মধ্যেই করতে হবে। এর চেয়ে বেশি সময় দেয়া যাবে না। আমরা যদি সেটা করতে না পারি, ব্যর্থ হই, তাহলে অবস্থা খুব খারাপ হবে। তখন লম্বা সময় ধরে আমাদের করোনাভাইরাস পুষতে হবে।’

তাই এই এপ্রিল মাসটাকে খুব ক্রিটিক্যাল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখন সবকিছু বন্ধ রয়েছে, সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেও যদি রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে পরে আর নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’

এই মুহূর্তে সবার আগে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবিএম আব্দুল্লাহর। তার মতে, ‘সরকার সব ধরণের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নামায় দিয়েছে রাস্তায়, এখন সাধারণ মানুষ যদি সচেতন না হয় তবে এটা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।’

করোনাভাইরাসের সামাজিক সংক্রমণ ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের বেশ কয়েকটি জেলা পুরোপুরি লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। লকডাউন করা হয়েছে রাজধানীর যেসব এলাকায় এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে সেসব এলাকাও। লকডাউন ঘোষিত এসব এলাকায় কেউ ঢুকতে বা বের হতে পারছেন না।

জনসাধারণকে ঘরে থাকা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা নিশ্চিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে রাস্তায় নেমেছে সেনাবাহিনী। আর ২৬ মার্চ থেকে যে সাধারণ ছুটি শুরু হয়েছিল, তা বাড়িয়ে এপ্রিলের ১৪ তারিখ পর্যন্ত করা হয়েছে। এ সময় সকল রকমের যানবাহন, নৌযান, বিমান ও রেল চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকেই স্থান ত্যাগ করতে দিচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তবে এর মাঝেও কোথাও কোথাও মানুষের বাইরে বের হওয়া রোধ করা যাচ্ছে না। তারা নানা অজুহাত দেখিয়ে বাড়ির বাইরে বের হচ্ছেন। তারা সামাজিক দূরত্ব মানার নির্দেশনাও মানছেন না। যা এ মুহূর্তে ঝুঁকি তৈরি করছে।

সূত্র : বিবিসি বাংলা, চ্যানেলটুয়েন্টিফোর

বাংলা/এসএ

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.1027 seconds.