• ২০ এপ্রিল ২০২০ ০১:৫০:৫৩
  • ২০ এপ্রিল ২০২০ ০১:৫৬:১৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ত্রাণ না অধিকার, প্রাপ্যদের হাতে কী?

ফাইল ছবি


আয়াজ উর রাহমান :


করোনাভাইরাসের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে পুরো দেশ যখন লকডাউন তখন বিপাকে পড়েছেন এ দেশের এক শ্রেণির মানুষ। বিশেষ করে যারা দিন আনে দিন খায় তাদের জন্য এই সময়টা খুবই চ্যালেঞ্জিং বলা যায়। আর এরকম এক পরিস্থিতিতে তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় সংকট পূরণ করা যেখানে রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব হওয়ার কথা ছিল সেখানে সারাদেশে চলছে ত্রাণের নামে তামাশা।

এ ধরনের তামাশা যদিও আমাদের দেশের দীর্ঘদিনের চিত্র তবে এবার করোনাকালে সবচেয়ে বড় মহামারীতে রূপ নিয়েছে ত্রাণ বিতরণের নামের এই তামাশাটা। 

বন্যা কিংবা দেশে বড় কোনো দুর্যোগ হলেই দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি পালন করেন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আর এই ত্রাণের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকেন দেশের দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। যদিও তাদের এই অপেক্ষা প্রতিবারই বিফলে গেছে। যার ব্যতিক্রম ঘটেনি এবারও। 

কিন্তু প্রতিবারই কেন এমনটা হচ্ছে? কারণ যারা ত্রাণ দেন তারা আসলেই মানুষকে সহযোগিতার জন্য দিচ্ছেন নাকি ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলে দিচ্ছেন সেটা একটা বড় প্রশ্ন হতে পারে। এখন সরকারি পর্যায়ে যারা ত্রাণ দেন তারা বেশিরভাগই রাজনৈতিক প্রচারে ত্রাণ দিয়ে থাকেন। কেননা তাদের এই ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি বড় করে আসছে আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলোতে। ত্রাণ বিতরণের থেকে ত্রাণ বিতরণের এই খবরটা গণমাধ্যমে প্রচার হলে এলাকার দায়িত্বশীল চেয়ারম্যান, মেম্বার অথবা কাউন্সিলরদের বেশি উপকারে আসে।

কেননা ওনাদের এই দানশীল মনোভাবের প্রভাব যেমন দলীয় রাজনীতিতে পড়ছে তেমনই এলাকার আপামর জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছাচ্ছে। যার জন্য ত্রাণ বিতরণের এই গুরুদায়িত্বটাকে তারা ব্যক্তিগত প্রচারের স্বার্থেই গুরুত্বের সাথে নেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরেই আমরা দেখছি ত্রাণ বিতরণের খবর প্রকাশের পর ত্রাণ নিয়ে গেছেন চেয়ারম্যান, মেম্বাররা। তার মানে খবর প্রচারটাই ছিল মুখ্য।

আর মিডিয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ খবর প্রচারের জন্য স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সংবাদকর্মীদের পকেটেও অনেক সময় এই দায়িত্বশীলরা গুজে দেন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্মানি। যাতে করে তাদের খবরটা ভাল করে প্রচার হয়। মানে পুরো বিষয়টাই বলা যায় এক ধরনের সাজানো গুছানো তামাশা। যে তামাশাটা দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের দেশের দায়িত্বশীলরা করে আসছেন। 

তবে এবার আমরা গণমাধ্যমে যেটা নতুন করে দেখছি সেটা হল ত্রাণ চুরিরকাণ্ড। যারা সরকারি ত্রাণ বিতরণের দায়িত্বে আছেন তারা ত্রাণ লুকিয়ে রাখছেন নিজ ঘরে। কারণ ত্রাণটাকে তো তারা তাদের ব্যক্তিক সম্পত্তি মনে করছেন। এই ত্রাণ যে জনগণের প্রাপ্য হিস্যা সেটা তো তারা বুঝেনই না। বুঝবেনই বা কীভাবে? ত্রাণ বিতরণের ঘোষণাটাই এমনভাবে দেওয়া হয় যেন জনগণকে ভিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। যদি বলা হয় ‘ত্রাণ’ শব্দটাতেই আসলে সমস্যা আছে তবে আমার মনে হয় না ভুল হবে। ‘ত্রাণ’ শব্দের পরিবর্তে যদি জনগণের ট্যাক্সের প্রাপ্য হিসাব জনগণকে ফেরত দেওয়ার দায়িত্বটা এদেরকে বুঝানো যেত তাহলে দেশের মালিকরা তাদের প্রাপ্য মর্যাদাটুকু অন্তত পেত। 

কিন্তু দেশের প্রকৃত মালিকদের প্রাপ্য মর্যাদাটা দেওয়ার বদলে আমরা দেখছি তাদের প্রাপ্য হক চুরি হচ্ছে। আর এসব মানতে না পেরে জনগণের চাপা ক্ষোভ রূপ নিচ্ছে বিক্ষোভে। করোনার এই পরিস্থিতিতে যেখানে সামাজিক দূরত্বটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন সেখানে জনগণ পেটের দায়ে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে। আর এটাকে নিয়ন্ত্রণে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে মামলা হামলার মতো হয়রানি সব কর্মকাণ্ড।

শুধু তাই নয় মারধরের মতো অমানবিক চিত্রও আমাদের দেখতে হচ্ছে। কিন্তু এসব তামাশার মধ্যে জনগণের প্রাপ্য হকটাই যে আসলে তাদের কাছে পৌঁছতে পারছে না সেটা ভাবার সময় কি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের আছে? নাকি নিজেদের ব্যার্থতা ঢাকতে দায় এড়ানো কথাবার্তা আর বল প্রয়োগ করতে পারাটাই বড় ক্রেডিটের। কিন্তু আমাদেরকে ভাবতে হবে করোনাকাল আর ক্রেডিট নেওয়ার সময় না।

ইতোমধ্যেই বিশ্বের বাঘা বাঘা রাষ্ট্র করোনা মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। তাদের তুলনায় যদি বাংলাদেশের পরিস্থিতিটা দেখা হয় তাহলে বলব আমাদের অবস্থা সব মিলিয়ে আসলেই খারাপ। কেননা করোনা মোকাবেলায় আমাদের এখন পর্যন্ত তেমন কোনো প্রস্তুতিই নেই, নেই আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা। তার মধ্যে যদি দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেয় তাহলে করোনার চেয়ে খাবারের অভাবেই দেশের বেশির ভাগ মানুষ মারা যাবে। এখনই অনেক বিশেষজ্ঞরা দুর্ভিক্ষের আভাস দিচ্ছেন। কিন্তু এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের দায়িত্বশীলরা কতটুকু ভাবছেন।

পরিস্থিতির ভয়াবহতাটা হয়ত রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলরা ইতোমধ্যেই বুঝে গেছেন। কিন্তু পরিস্থিতি মোকাবেলায় কি করণীয় সেটা কি তারা ঠিক করেছেন? পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো শক্তি যে আমাদের নেই সেটা বললে ভুল হবে। তবে আমরা পরিকল্পিত না বা সঠিক পরিকল্পনাটা করছি না। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের করণীয় বিষয়গুলো দ্রুত গুছিয়ে নেওয়ার সময় এখনই। তাই ছোটখাট এসব দায়ভারগুলো এখন আর এড়িয়ে না গিয়ে যার যার দায়িত্বের জায়গাটা সঠিকভাবে পালন করাটা হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

কীভাবে জনগণকে ঘরে রেখে তাদের প্রাপ্য সুযোগ সুবিধাগুলো পূরণ করা যায় সেটা গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে। শুধু লকডাউন করে জনগণকে ঘরে থাকতে বাধ্য করা যাবে না। জনগণের নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য রাষ্ট্রকে প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে। তাহলেই করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0650 seconds.