• ২২ এপ্রিল ২০২০ ১৫:১৪:৪১
  • ২২ এপ্রিল ২০২০ ১৯:১৩:৪৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘সরকারের দুর্বল পদক্ষেপে জনগণ ঝুঁকিতে’

ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। ফাইল ছবি

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মহামারীর কবলে সারাবিশ্ব। যা আঘাত হেনেছে বাংলাদেশেও। তাই এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে কার্যত অঘোষিত লকডাউন জারি করেছে সরকার। এতে করে সাধারণ আয় করা মানুষসহ দুস্থ, দিনমজুর, শ্রমজীবী ও কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। এই মহাদুর্যোগের দিনে এসব অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে  শিক্ষক, ছাত্র, শ্রমিক, ডাক্তার, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক কর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ‘করোনা দুর্গত সহযোগিতা কেন্দ্র’।

এ কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্বে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। যুগ্ম-আহ্বায়ক ঢাবি শিক্ষক সামিনা লুৎফা ও ইবি শিক্ষক সাজ্জাদ জাহিদ। কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্বে আছেন রাজনৈতিক সংগঠক মাসুদ খান। কোষাধ্যক্ষ হিসেবে আছেন সাংবাদিক রফিকুল রঞ্জু এবং হিসাবরক্ষকের দায়িত্বে আছেন সাংবাদিক আরিফুল সজীব ও আশরাফুল সাগর।

বর্তমান দেশের করোনা পরিস্থিতি ও করোনা দুর্গত সহযোগিতা কেন্দ্রে কাজ নিয়ে বাংলা’র সাথে খোলামেলা কথা বলেছেন সংগঠনটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। দুই পর্বের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারটির আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বাংলা’র নিজস্ব প্রতিবেদক নূর সুমন

বাংলা : সারাবিশ্বের ন্যায় করোনাভাইরাসের মহামারী আমাদের দেশেও হানা দিয়েছে। এমতাবস্থায় আপনারা ‘করোনা দুর্গত সহযোগিতা কেন্দ্র’ করে তুলেছেন- এর পেছনে আসলে কারণ কি (কোন চিন্তা থেকে এটা গড়ে তুলেছেন)?

ড. তানজীমউদ্দিন খান : এখানে দুটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- একটা হচ্ছে আমাদের আগের অভিজ্ঞতা। আমরা এই ধরনের প্রয়াস আগেও নিয়েছি এবং আমরা ছাত্র, শিক্ষক ও রাজনৈতিক কর্মীদেরকে নিয়ে বন্যার সময়, সিডরের সময় সময় এরকম সহযোগিতা কেন্দ্র করেছি, রানা প্লাজার দুর্ঘটনার সময় বাংলা বিভাগের শিক্ষক মেহের নিগারের নেতৃত্বে আমরা  শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গড়ে তুলি ঢাকা ইউনিভার্সিটি কেয়ার গিভার্স । কেয়ার গিভার্সও এখানে কাজ করছে। এখন শিক্ষক, চিকিৎসক, সংবাদককর্মী, সমাজকর্মী, রাজনৈতিক কর্মী, প্রকৌশলী, শ্রমজীবীসহ অনেক শ্রেণি, পেশার মানুষ আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন এবং হচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারীর বিপদে মানুষের পাশে থাকার আমাদের পুরোনো তাড়নাকেই জাগিয়ে তুলেছে। 

আরেকটা বিষয় ছিলো- এই সংকটের যে ধরন বন্যা, সাইক্লোন কিংবা সিডর থেকে একবারেই ভিন্ন। এটা একটা বহুমাত্রিক মহাদুর্যোগ। এই দুর্যোগ যেমন স্বাস্থ্যগত সংকট তৈরি করেছে, একই সঙ্গে অন্যান্য সংকট যেমন- অনাহার-দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক মন্দা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা এর অবধারিত সঙ্গী। তাই এই মুহুর্তে বহুমুখী সংকটে আমরা মনে করছি  আমাদের একত্রিত হওয়া খুব জরুরি- যে পেশাতেই থাকিনা কেন। কিংবা এই সংকটের যে প্রকৃতি সেখানে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য একমুখী কোনো চিন্তা মোটেই কার্যকরী হবেনা। তাই বিভিন্ন ধরনের মানুষের যে চিন্তার বৈচিত্র্য সেটাকে কাজে লাগানো ও তা নিজেদের মধ্যে অনুশীলন এবং সমন্বয়ের জন্য এই ধরনের প্লাটফর্ম।    

বাংলা : আপনাদের কমিটিতে লক্ষ্য করা গেছে শিক্ষক, ছাত্র, শ্রমিক, ডাক্তার, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক কর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছে- এটা যদি একটু ব্যখ্যা করতেন?

ড. তানজীমউদ্দিন খান : এই সংযোগ ঘটার মধ্যে দিয়ে এই সংকটের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য বোঝাটা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কৌশল নির্ধারণ আমাদের জন্য সহজ হয়েছে। যেমন- আমাদের সঙ্গে শ্রমজীবী, কৃষক আছে। তাদের সংকটটা কি তা কিন্তু ঢাকায় বসে আমি বুঝতে পারবো না। কিন্তু এই প্লাটফর্মের কারণে তাদের সঙ্গে সমন্বয় ঘটেছে। আবার এই করোনাভাইরাস সংক্রমণের মহামারীর কারণে শারীরিকভাবে সবার পক্ষে উপস্থিত হয়ে কাজ করা সম্ভব নয়। আবার দেখা যাচ্ছে যারা কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়নি তাদের জন্যও চিকিৎসক সংকট দেখা দিবে সেটা শুরুতেই আমরা অনুধাবন করে আমাদের চিকিৎসক বন্ধুদের শরণাপন্ন হই এবং আমাদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইন জরুরি মেডিকেল পরামর্শ দেয়ার ব্যবস্থা করেছি আমরা। আসলে বিভিন্ন চিন্তা সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে এই সংকটের চরিত্রটা বোঝা এবং আমরা কীভাবে কাজ করতে পারি তা বুঝা আমাদের জন্য সহজ হচ্ছে।

বাংলা : এই কাজে সাধারণ মানুষের কাছে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

ড. তানজীমউদ্দিন খান : সাধারণ মানুষের কাছে আমরা বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছি। সাড়া আমরা এই অর্থে বলছি- যিনি আমাদেরকে পাঁচ টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছেন, এটাও কিন্তু একটা বড় সাড়া। এর বাইরে অনেকে শ্রম দিচ্ছেন, পরামর্শ  দিচ্ছেন, মেধা দিয়ে বুদ্ধি দিয়ে আমাদেরকে সাহায্য করছেন। অনেকে আবার মাঠে পর্যায়ে কাজ করছেন। সবারই সবরকমের অবদান আছে। এখন যেটা হচ্ছে- আমাদের সঙ্গে যারা আছেন, তাদের মধ্যে ওরকম কেউ নেই যিনি খুব অর্থশালী, আমাদের অনেক বড় রকমের অর্থ দিয়ে সহায়তা করবেন। আসলে ছোট ছোট অর্থ সহায়তাগুলোই কিছুটা বড় হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে আমরা বড় সাহায্য পেয়েছি- আমাদের প্রবাসী বন্ধুদের কাছ থেকে,  যদিও সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক অনেক কম। এই প্রবাসী বন্ধুদের অনেকেই রানা প্লাজা, সিডর, বন্যার সময় আমাদের পাশে ছিলেন।  

কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে শুরুর দিকে এই সহযোগিতার গতি ছিলো, অনেক কমে এসেছে। যেহেতু সংকটটা দীর্ঘায়িত হচ্ছে মধ্যবিত্তরাই ধীরে ধীরে সংকটের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। অথচ এই মধ্যবিত্তই মূলত আমাদের কাজের প্রাণশক্তি।  তারপরও আমাদের যা আছে, যতটুকু আছে সেটা দিয়েই আমরা সর্বোচ্চটা করার চেষ্টা করছি।  

বাংলা : আপনারা এগুলো কীভাবে বিতরণ করবেন এবং কোথায় কোথায় বিতরণ করবেন?

ড. তানজীমউদ্দিন খান : আমরা দুইভাবে কাজ করছি। প্রথমত আমরা অনলাইনে প্রচারণা চালাই যার মধ্য দিয়ে আমরা চেষ্টা করি সামর্থ্যবান মানুষ যেন তাদের সহযোগিতার হাতটা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু আগেই বলেছি সংকটটা দীর্ঘায়িত হওয়ায় সহযোগিতার হাতটা যতটা শক্তিশালী হওয়ার দরকার ততটা হয়নি। উল্টোভাবে প্রতিদিন আমাদের কেন্দ্রের দিকে শরণাপন্ন হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে অনেক ব্যক্তিগত ফোন আমরা এখন অনেক পাচ্ছি। তাদেরকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। আরেকটা হচ্ছে- ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন সংগঠন কাজ করছে। সেই সংগঠনগুলোর সাথে আমারা যুক্ত হচ্ছি, সবার কাজ কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় করার চেষ্টা হচ্ছে।

আমরা ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ১২টিরও বেশী জেলার প্রায় ৬০০ পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছি অন্য অনেক  সংগঠনকে সাথে নিয়ে।  এর মধ্যে রাজবাড়ি, ফরিদপুর, গাইবান্ধা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর অন্যতম। এছাড়াও ব্যক্তি পর্যায়েও আমরা নগদ অর্থ সাহায্য দিচ্ছি। 

আপাতত আমরা চিন্তা করছি, যেহেতু সরাসরি মাঠ পর্যায়ে খাদ্যদ্রব্য বিতরণটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে,  এক-দুই সপ্তাহ পর আর কাজ করতে পারবে কিনা তা কিন্তু অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তাই বিকাশ, নগদ, রকেট এই সেবারগুলোর মাধ্যমে নগদ অর্থ সাহায্য করাটাই গুরুত্ব পাবে। মাঠে যারা কাজ করছেন তাদের অনেকেই খাবারের ব্যবস্থা করছে। মোটামুটি দু’সপ্তাহ থেকে একমাস যেন কোন পরিবারের খাবারটা নিশ্চিত করার জন্য তারা  চাল, ডাল, তেল, আলু, পেয়াজ, লবণ দিচ্ছেন। তাদের ওই প্রয়াসের সঙ্গে আমাদের প্রয়াসটাকে যুক্ত করছি। যেমন- কোন সংগঠন কিছু পরিবারকে সহযোগিতার করার জন্য ৪০ হাজার টাকার বাজেট হয়েছে, সেখানে আমরা হয়তো ১৫-২০ হাজার টাকা দিয়ে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করছি।

বাংলা : এই মাহামারী মোকাবেলায় অন্য দেশের ন্যায় আমাদের সরকারও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে- এটা আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড. তানজীমউদ্দিন খান : সরকার তো  এখন পর্যন্ত অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে যে ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিলো সেটা হয়নি এবং সমন্বয়েরও অভাব রয়েছে। বাস্তবে আসলে প্রস্তুতির অনেক ঘাটতি রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক জরুরি বিষয়ে আমরা সমন্বয়হীনতা দেখছি। তার একটা উদাহরণ দিচ্ছি- একসময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বলা হলো সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যে প্রতিটা উপজেলায় ২টা করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করতে হবে। অথচ পরের দিনেই বলা হলো-  এরকম সিদ্ধান্ত হয়নি, এটা ভুলক্রমে চলে গেছে। তার মানে কি?  টেস্টের মতো বিষয় নিয়েও এরকম ভুল হতে পারে! আবার বলা হচ্ছে, এন-৯৫ মাস্কের বদলে ‘ভুল’ করে সাধারণ মাস্ক প্যাকেটে চলে গেছে। আর এই ভুলের খেসারত এখন দিচ্ছেন চিকিৎসক-নার্সসহ প্রায় ২০০জন স্বাস্থ্যকর্মী, তারা আজ করোনায় আক্রান্ত। অন্যান্যরাও এখন ঝুঁকির মধ্যে আছেন। তার মানে হচ্ছে কোথাও না কোথাও নিশ্চয় সমন্বয়হীনতা ও তদারকির অভাব রয়েছে।

এই মহামারীকে ঘিরে মোটাদাগে যে চারটি ঝুঁকি রয়েছে। যেমন- স্বাস্থ্য ও রোগ সংক্রমণগত সংটক, অনাহার ও দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিকমন্দা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা। এই চার ক্যাটাগরিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে নেতৃত্ব ও তাৎক্ষণিক সিন্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা দিয়ে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সার্বিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সমন্বয় করতে হবে। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে কি করা উচিত, বিশেষ করে অনাহার, দুর্ভিক্ষ এবং সংক্রমণ রোধ করার ক্ষেত্রে যে ধরনের পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে নেয়া উচিত ছিলো সেটা আসলে মোটা দাগে অনুপস্থিত। যার ফলে সামগ্রিকভাবে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে সেগুলো খুব সমন্বিত পদক্ষেপ নয় এই চার ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলা করার জন্য। এতে করে বেশ কিছু দুর্বলতার কারণে আমরা এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছি।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.3010 seconds.