• ২৩ এপ্রিল ২০২০ ০২:৩০:১৬
  • ২৩ এপ্রিল ২০২০ ০২:৩০:১৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ভিআইপি নামক ‘মোর দ্যান সিটিজেন’ কারা!

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


উচ্ছল এক তরুণ গণমাধ্যমকর্মী মেহেদী হাসান। ‘পূর্বপশ্চিমবিডি’ নিউজ পোর্টালটিতে জামালপুরের হয়ে কাজ করে। ওর সাথে পরিচয় আমার বড় ছেলে ফাগুন নিহত হবার পর। প্রথম দেখাতেই সরাসরি সে নিজেকে আরেক ফাগুন বলে দাবি করেছিলো। আমি থমকে গিয়েছিলাম। সে থেকে নিজের সন্তানের মতই দেখি ওকে।

ওদের মতন তরুণ যারা গণমাধ্যমে কাজ করে ওরা সবাই আমার কাছে ফাগুন, ফাগুন রেজা। প্রতিশ্রুতি, মেধা আর সততার দুর্লভ সমন্বয়। একুশ মে ছিলো ফাগুন নিহত হবার এগারো মাস। সেদিনই জানলাম মেহেদীর করোনা আক্রান্ত হবার খবর। 

যখন শুনলাম মেহেদী করোনা পজিটিভ, শঙ্কিত হলেও আশ্চর্য হইনি। কারণ করোনার গতি-প্রকৃতি খেয়াল রাখছিলাম আমি। এনিয়ে বেশ কয়েকটি লেখাও প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে। আমার ধারণাতেই ছিলো, আমাদের দেশে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। দক্ষিণ এশিয়ায় করোনার প্রকৃতি যারা অনুসরণ করছেন, তারা জানেন এখানে উপসর্গহীন করোনা রোগী অসংখ্য। কেউ কেউ বলছেন, ৮০ ভাগই উপসর্গহীন। সুতরাং মেহেদী আক্রান্ত হতেই পারে। এমনকি আমি নিজেও আক্রান্ত কিনা সেটা বোঝার উপায় নেই। যেহেতু আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে টেস্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না, সে কথাতে আর না যাই। জানা কথা বারবার বলতেও খারাপ লাগে।

মেহেদী’র কথায় আসি। দু’দিন ধরে সামাজিকমাধ্যমে ওর মন্তব্য দেখছিলাম। ওর মধ্যে এক ধরণের শংকা কাজ করলেও, সাহস হারায়নি। এমন অবস্থায় ওর মতো সাহস ধরে রাখা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। মেহেদী বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছে। আর মেহেদী’র এই চ্যালেঞ্জটাই এদেশের মানুষের করোনা কাটিয়ে উঠার মূল উপায়। না, সত্যি আর কোনো উপায় নেই। নিজের ইমিউন সিস্টেম আর মনোবলই আমাদের দেশের মানুষদের ভরসা। কেন ভরসা বা মূল উপায় তা খুলে বলতে গেলে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার কথা বলতে হয়।

প্রবাসীজন ডা. সজল আশফাকের একটি লেখা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি দেশে করোনায় আক্রান্ত তার এক মৃত আত্মীয়ার চিকিৎসা বিষয়ে লিখেছেন। যে লেখায় উঠে এসেছে খোদ ঢাকার করোনা চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত একটি হাসপাতালের করুণ চিত্র। যেখানে অক্সিজেন মাস্কটাও রোগীর নাকে তুলে দেবার কেউ নেই। এরপরও কি কেউ বলবেন, আমাদের ভরসার জায়গা নিজ ইমিউন সিস্টেম আর মনোবল নয়? 

এর সাথে যোগ করি দেশে ভিআইপিদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ হাসপাতাল নির্ধারণের ব্যাপারটি। অ্যাপোলোর মতন আধুনিক হাসপাতালকে ভিআইপিদের চিকিৎসার জন্য নেয়ার চিন্তা চলছে। যেখানে আইসিইউ সহ সকল আধুনিক ব্যবস্থা থাকবে। বিপরীতে দেশের ৬৩টি জেলায় কোটি কোটি মানুষের চিকিৎসার জন্য একটা ভেন্টিলেটর নেই। এখন অঙ্কের হিসাবে বলি দেশের ১৬ কোটি মানুষের সমান এই গুটিকয়েক ভিআইপির প্রাণ! ১৬ কোটি মানুষের জীবনের চেয়ে কি হাতেগোনা কজন ভিআইপির জীবন মূল্যবান! তারা কি মানুষের উপরের কোনো প্রজাতি! এমন মূল্যমান তারা কী দিয়ে মাপেন? মাপার মানদন্ডটা কী? আমার ক্ষুদ্র চিন্তায় আসে না এমন দন্ডের কথা। জানি না কারো আসে কিনা। কেউ কি নিজের সামনে দাঁড়ানো মৃত্যুকে দেখেও অন্যকে ভিআইপি ভাবেন কিনা! জানি না, আমি এবং আমরা সত্যিই জানি না। 

মেহেদী অবশ্য সামাজিকমাধ্যমে লিখেছে জামালপুরে যেখানে তাকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে, সেখানের অবস্থা ভালো। চিকিৎসকরাও তার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছেন, খোঁজ নিচ্ছেন। এমনটা সবক্ষেত্রেই হোক তা আমরা চাই। আমরা চাই রোগীকে রোগী হিসাবেই চিহ্নিত করা হোক ভিআইপি হিসাবে নয়। সব রোগীই ন্যূনতম চিকিৎসা পান। ফিরে আসুন মৃত্যু নয় জীবনের তীরে। কিন্তু চিকিৎসকরাও কি ভালো আছেন? নেই।

এন ৯৫ মাস্ক কান্ডের কথাতো এখন সবারই জানা। প্রদেয় পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট যা সংক্ষেপে পিপিই নামে পরিচিত তার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। না উঠার কারণ নেই। যেহেতু এসব পড়েই এক বিশাল সংখ্যক চিকিৎসাকর্মী কোভিড নাইনটিনে আক্রান্ত হয়েছেন। সারাদেশে আক্রান্তদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ চিকিৎসক এবং চিকিৎসাকর্মী। আমার জেলা শেরপুরেও আক্রান্ত ২৪ জনের মধ্যে বেশির ভাগই চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মী। মৃত্যুভয় চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদেরও রয়েছে। তাদের পরিবার-স্বজন রয়েছে।

সঠিক প্রটেক্টিভ গিয়ার ছাড়া তাদের সম্ভাব্য মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ধর্ম বলে জীবন বাঁচানো ফরজ। সুতরাং মৃত্যু ভয়ের চেয়ে বড় কোনো ভয় নেই। তারপরেও আমাদের সিংহভাগ চিকিৎসকই কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের স্যালুট। চিকিৎসার ঘাটতি যেখানে রয়েছে সেখানে দোষ চিকিৎসক বা চিকিৎসা কর্মীদের নয়, দোষ সমন্বয়ের, পরিকল্পনার। 

সমন্বয় আর পরিকল্পনার ঘাটতিটা কোনখানে তা মোটামুটি দৃশ্যমান। শনাক্ত আক্রান্তের সংখ্যা আড়াই হাজারে পৌঁছার পর করোনা মোকাবিলায় গঠিত হয়েছে জাতীয় পরামর্শক কমিটি। যে কমিটি অন্তত আরো তিন মাস আগে গঠিত হবার কথা ছিলো। তখন গঠিত হলে এতদিন পর্যন্ত করোনা মোকাবিলার একটা সঠিক গাইড লাইন পাওয়া যেতো। দৃশ্যমান উন্নতি চোখে পড়তো। এই জরুরি কমিটি গঠনেও আমরা তিন মাস পিছিয়ে। অর্থাৎ এটা পরিষ্কার করোনার অনুসরণে এবং নিয়ন্ত্রণে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। সারাবিশ্বের তুলনামূলক গ্রাফ অন্তত তাই বলে। না বলার কারণও নেই। রাষ্ট্র যেখানে তার নাগরিকদের সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ, সেখানে যখন ভিআইপি নামক প্রজাতির উদ্ভব ঘটে এবং তারা ‘মোর দ্যান সিটিজেন’ হয়ে উঠেন, তখন পিছিয়ে পড়ার দৃশ্যটা আরো প্রকট হয়ে উঠে।

শেষে আবার মেহেদীর কথায় আসি। ছেলেটি ভালো হয়ে উঠুক। ফিরে আসুক মা-বাবার কাছে। আমাদের কাছে। সন্তানহারা আমি জানি, হারানোর ব্যথা। ফাগুন, আমার ছেলেটা আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে আজ এগারো মাস। বলতে গেলে বছর ঘুরতে চলেছে। অথচ প্রতিদিন চলে যাওয়ার কষ্টটা নতুন করে জেগে উঠে, মনে হয় কালকেই ছিলো ও। এই কষ্ট যেনো আল্লাহাতায়ালা আর কোনো বাবা-মা’কে না দেন। অসীম দয়ালু আল্লাহ যেন এমন বিপদ থেকে আমাদের, সব মানুষদের রক্ষা করেন। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।  

সংশ্লিষ্ট বিষয়

করোনাভাইরাস ভিআইপি

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0690 seconds.