• ২৩ এপ্রিল ২০২০ ১৩:১৭:২৬
  • ২৩ এপ্রিল ২০২০ ১৩:১৭:২৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

দ. কোরিয়া নাকি ইতালি, কোন পথে বাংলাদেশ?

ফাইল ছবি


নাজিফা ফারহাত


বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি চিহ্নিত করা হয়েছে মার্চের ৮ তারিখে। এর প্রায় দুই মাস পর সংক্রমণের হটস্পটগুলোর দিকে তাকালেই বুঝা যায়, ব্যাপক হারে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হচ্ছে। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

আপাতত বহির্বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, সাধারণত দুটো সম্ভাবনার আছে আমাদের সামনে।

এক. দেশগুলো শুরু থেকেই এটাকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নিয়ে একে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। উদাহরণস্বরূপ, দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, শ্রীলাঙ্কা, নিউজিল্যান্ড এবং জার্মানি।

অপর দিকে, দেশগুলো উপযুক্তভাবে প্ল্যান নিয়ে কাজ করেনি। যেমনটা ঘটেছে ইতালি, স্পেন, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশের নিয়তি কী হবে তা চিহ্নিত করার আগে আসুন দেখি এই দুই পক্ষ করোনা মোকাবেলায় কী পথ অবলম্বন করেছে :

পাবলিক লাইব্রেরি অব সায়েন্স নামক জার্নালে ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা-এ মহামারী মোকাবেলার কৌশলসমূহ’ নামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে জীববিজ্ঞানীরা ৪টি অতি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো গ্রহণ করলে সরকার ফ্লু মহামারী নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা বেশি।

সেই ৪টি পদক্ষেপ হচ্ছে-

আক্রান্তের হার কমানো; স্বাস্থ্যসেবার কার্যক্ষমতা মাথায় রেখে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা; খুব সামান্য পরিসরে হলেও অর্থনীতির চাকা সচল রাখা; এবং একটি কার্যকরী প্রতিষেধক, যা এই সংক্রমণের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করবে আবিষ্কারের জন্যে অপেক্ষা করা।

দক্ষিণ কোরিয়া এই পদক্ষেপগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। জানুয়ারির ২০ তারিখে তারা প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করে এবং অনতিবিলম্বে সমস্ত দেশজুড়ে ব্যপক পরীক্ষা কর্মসূচির প্রস্তুতি নিয়ে ফেলে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করে তারা সংক্রমণের যাত্রাপথ ও আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গের ভ্রমণ ইতিহাস সুনিশ্চিত (শনাক্ত) করে। যাদের মধ্যে অত্যন্ত মৃদু লক্ষণও দেখা দিয়েছে তাদেরকেও তৎক্ষণাৎ চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা হয়। তাছাড়া তারা সমস্ত বন্দর ও সীমান্তের মাধ্যমে যাতায়াতের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করে বিদেশফেরত যাত্রীদেরকে কোয়ারেন্টাইনে যেতে বাধ্য করে।

আর ঠিক এভাবেই তারা দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে অবরুদ্ধ না করেও কোভিড-১৯ সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

এখন তারা সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে এবং এতটাই সুরক্ষিত যে গত ১৫ এপ্রিলে সে দেশের জাতীয় নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এটার ঠিক বিপরীত দিকে রয়েছে  ইতালির ঢিলেঢালা প্রতিক্রিয়া। জানুয়ারির ৩১ তারিখে প্রথম ব্যক্তি শনাক্ত হবার এক মাস পরেও সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইগি দি মায়ো একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘ইতালির জন্যে ভাইরাসের বিস্তার থেকেও অধিক ক্ষতিকর ভুল তথ্যের বিস্তার। ভাইরাসটি কেবল দেশের ০.১% মানুষকে আক্রমণ করেছে।’

প্রথম যে ভুলটি ইতালির রাজনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা করেছেন তা হচ্ছে করোনাভাইরাসের ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেননি। এক মাসে বিশালসংখ্যক নিশ্চিত সংক্রমণের ঘটনার পরেও তারা প্রথম লকডাউন জারি করেন মার্চের ৯ তারিখে।

ততদিনে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। তারা সংক্রমণের  হার কমাতে ব্যর্থ হয় যেটার খেসারত দিতে গিয়ে তাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মধ্যে ইতালি দ্বিতীয় স্থানে। কিন্তু আফসোস, তাদের নাগরিকরা এই ক্রান্তিকালে সেটার পূর্ণসেবা গ্রহণ করতে পারেন নি, কারণ রোগীর সংখ্যা স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা ছাপিয়ে যায়।

এটা তাদেরকে এতটাই নাজেহাল করে ফেলে যে দেশটিতে খুব দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা যায়, স্বাস্থ্যকর্মীসহ ১০০ জন চিকিৎসকের প্রাণহানি হয় এবং এতকিছুর পরেও ইতালি এখনো সম্পূর্ণভাবে দাঁড়িয়ে উঠতে পারেনি। রাতারাতি তারা করোনার বৈশ্বিক কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। এখন ইতালীয়রা বিশ্ববাসীকে তাদের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্যে উদ্বুদ্ধ করছে।

গবেষকরা বলছেন যে, একটা দেশ যদি প্রথম তিন ধাপ সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে তাহলে তারা ঊর্ধ্বমুখী রোগীর সংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে  সক্ষম হবে। রোগীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গোটা পরিস্থতির ওপর সেই দেশের নিয়ন্ত্রণের মাত্রা কতটুক এবং অর্থনীতি কত দ্রুত আগের অবস্থায় যেতে পারবে তার ইঙ্গিত দেয়।

যেখানে দক্ষিণ কোরিয়া এই লক্ষ্য অর্জন করে বিচক্ষণতার প্রমাণ দিয়েছে, ঠিক সেখানে ইতালি ব্যাপারটাকে অবহেলা করে কড়া মাশুল দিতে বাধ্য হয়েছে।

কিন্তু, একটা দেশ সংক্রমণের প্রভাব বিস্তার যতটুকুই সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসুক না কেন, এই মুহূর্তে সবার এই ‘মহামূল্যবান ভ্যাকসিন’ অত্যন্ত প্রয়োজন।

একটি কার্যকরী ভ্যাকসিন কেবল দক্ষিণ কোরিয়া আর ভিয়েতনামের মত দেশকে আরো আরো শক্তিশালীই করবেনা, বরং তারই সাথে ইরান ও ইতালির মত দেশকে করবে পুনরুদ্ধার। আর বাংলাদেশের মত আক্রান্ত দেশগুলোর জন্যে হয়তো এটাই একমাত্র পরিত্রাণের আশা।

দমনের প্রক্রিয়াতে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান হচ্ছে দ্বিতীয় ধাপে (২০ এপ্রিল পর্যন্ত)। প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি চিহ্নিত হয় ৮ মার্চ। প্রচুর সমালোচনার পর, সরকার দেশব্যাপী লকডাউন জারি করতে বাধ্য হয় মার্চের ২৬ তারিখে।

তবে এই সময়ের মধ্যেই সীমিত আকারে জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয়,  রাজধানী ঢাকার একটি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, শপিং মল ও রেস্তোরাঁ চলে পুরোদমে। বাংলাদেশ বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ যতদিনে বহির্বিশ্বের সাথে সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলো ততদিনে, অর্থাৎ ৫ এপ্রিলের মধ্যে অনেক মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপফেরত প্রবাসী দেশের আনাচে কানাচে যে যার মত ছড়িয়ে পড়ে।

বিশ্বের অন্যতম দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ করোনাভাইরাস মোকাবেলায় দূরদর্শিতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

প্রথম শনাক্তকরণের ১৭ দিন পর ২৫ মার্চ তারিখে প্রথমবারের মত জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ততদিনে এ মহামারীতে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৯ জনে এসে দাঁড়িয়েছে এবং ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তখন থেকে আজ অবধি প্রধানমন্ত্রীসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তারা একই বুলি আওড়িয়ে যাচ্ছেন যে, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’ তাদের দাবি অনুযায়ী, পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও, চিকিৎসকরা পিপিইর দাবিতে প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন, টেস্টের সরঞ্জাম চীন থেকে এসে পৌঁছেছে  দু-সপ্তাহ পর। আর সরকারের চার সপ্তাহ লেগে যায় দেশজুড়ে টেস্টিং ব্যবস্থা চালু করতে। এর ঠিক পরপরই আক্রান্তের সংখ্যা এক লাফে শতকে উত্তীর্ণ হয়।

আমাদের হাতে ঠিক দুই মাস সময় থাকা সত্ত্বেও সরকার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি। ঠিক ইতালির মত, আমাদের সরকারও করোভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি উপেক্ষা করলো। আমরা ইতোমধ্যেই টের পাচ্ছি এটার ক্ষতিসাধনের ক্ষমতা, তবে ভয়ের বিষয়টা হচ্ছে যে এটার পূর্ণরূপ এখনো উন্মোচিত হয়নি। আমরা স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে যেতে চাই, তবে সেখানে পৌঁছানোর কেবল দুটো উপায় আছে-

জনসংখ্যার অনুপাতে সর্বনিম্ন মৃত্যুসংখ্যা নিশ্চিত করে- অথবা নজিরবিহীন মৃত্যুসংখ্যা নিয়ে এক মহাবিপর্যয়ের সাক্ষী হয়ে থাকা। এখন যেহেতু বাংলাদেশ সংক্রমণ বিস্তার লাভের সবচেয়ে সংকটপূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, তাই সময়ই হয়তো বলে দিবে এর পরিণাম।

যদিও এখনো অনেক কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে তবুও আমাদের প্রশাসনিক পদক্ষেপ আমাদেরকে প্রতিনিয়ত বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, যা অদূর ভবিষ্যতে ইতালির মতোই হতে পারে।

প্রশাসন, জনগণ, দুর্বল অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যখাত এসবের মাঝে বিদ্যমান সম্পর্কে আস্থার অভাব সামনের দিনে হয়তো ভয়াবহ দুর্যোগ ডেকে আনবে।

মূল লেখা পড়তে ক্লিক করুন

লেখক : তরুণ গণমাধ্যমকর্মী

বাংলা/এসএ/

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0776 seconds.