• ২৩ এপ্রিল ২০২০ ১৭:৪১:০০
  • ২৩ এপ্রিল ২০২০ ১৭:৪৯:৪৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘মানুষ বাঁচাতে হলে কৃষক-চিকিৎসক-নার্সকে বাঁচাতে হবে’

ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। ফাইল ছবি

দেশে অঘোষিত লকডাউনের কারণে দুস্থ, দিনমজুর, শ্রমজীবী ও কৃষকসহ বিপাকে পড়েছেন সাধারণ আয়ের মানুষরাও। তাই করোনাভাইরাস মহামারীর এই দিনে এসব অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে শিক্ষক, ছাত্র, শ্রমিক, ডাক্তার, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক কর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ‘করোনা দুর্গত সহযোগিতা কেন্দ্র’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খানকে আহ্বায়ক ও ঢাবি’র আরেক শিক্ষক সামিনা লুৎফা ও ইবি শিক্ষক সাজ্জাদ জাহিদকে যুগ্ম-আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্বে আছেন রাজনৈতিক সংগঠক মাসুদ খান। কোষাধ্যক্ষ হিসেবে আছেন সাংবাদিক রফিকুল রঞ্জু এবং হিসাবরক্ষকের দায়িত্বে আছেন সাংবাদিক আরিফুল সজীব ও আশরাফুল সাগর।

বর্তমান দেশের করোনা পরিস্থিতি ও করোনা দুর্গত সহযোগিতা কেন্দ্রে কাজ নিয়ে বাংলা’র সাথে খোলামেলা কথা বলেছেন সংগঠনটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। দুই পর্বের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারটির আজ প্রকাশ করা হলো শেষ পর্ব। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বাংলা’র নিজস্ব প্রতিবেদক নূর সুমন

বাংলা : করোনা আতঙ্কের কারণে এখন সাধারণ রোগীরাও চিকিৎসা পাচ্ছে না। এতে করে অনেকেই মারা যাচ্ছে। যা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশ পেয়েছে- এমনটা কেন হচ্ছে?

ড. তানজীমউদ্দিন খান : এমন হওয়ার জন্য আমি দুটা কারণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। একটা হচ্ছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ধরনকে নিয়ে যেভাবে উপস্থাপন হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে বা গণমাধ্যমের মাধ্যমে সেটা আমার কাছে মনে হয়েছে খুব সঠিক ছিলো না। বিশেষ করে যারা সংক্রমিত হচ্ছেন সেই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা গেলে তার বাসায় লাল রং দিয়ে ক্রস চিহ্ন দেয়া কিংবা লাল পতাকা উড়িয়ে দেয়া। এর মধ্য দিয়ে রোগাক্রান্ত মানুষকে একধরনের ‘বিপদজনক’ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মনে হচ্ছে তারা যেন অস্পৃশ্য, অচ্ছ্যুৎ রোগী এবং তাদের পরিবারকে নিয়ে একধরনের স্টীগমা তৈরি করা হচ্ছে। আর এই কারণে যে সহানুভুতি রোগীর পাওয়া উচিত সবার কাছ থেকে, সেটা পাচ্ছে না। এমনকি অন্য রোগেও আক্রান্ত হয়ে সর্দি-কাশি হলেও সবাই মনে করছে করোনা রোগী। ফলে অন্য রোগে যারা আক্রান্ত হচ্ছে তাদেরকে নিয়ে চিকিৎসক, নার্স বা সাধারণ মানুষের মধ্যেও একধরনের ভীতি তৈরি হচ্ছে। তাই যে ধরনের সহানুভূতি ও সহযোগিতা পাওয়া উচিত সমাজ পর্যায় থেকে চিকিৎসক পর্যায় পর্যন্ত- সেটা তার জন্য পাওয়া মুশকিল বা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এক-দেড় মাস আগে এরকম অবস্থার প্রথম খেসারত দিয়েছে আমাদের কানাডা প্রবাসী এক তরুণ শিক্ষার্থী। তীব্র গ্যাস্ট্রিকের রোগী হওয়ার পরও চিকিৎসা না পেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মারা যায়!

কে করোনায় আক্রান্ত আর কে আক্রান্ত নয়, সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রতিদিন আমাদের যে বিপুল সংখ্যক টেস্ট  করা উচিত ছিলো সারাদেশব্যাপী, দুঃখজনক হলেও সত্য, এই টেস্টের দায়িত্বটা দেয়া হলো ঢাকায় অবস্থিত একটামাত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে। শুধু তাই নয়, রোগ সংক্রমণের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও দিয়ে দেয়া হলো আইইডিসিআর’কে। যারা আসলে শুধু গবেষণার কাজটা করবে। হাসপাতালগুলোতে টেস্টের ব্যবস্থা শুরুতে না রেখে কেন্দ্রীভুত করা হলো ল্যাব টেস্ট আর রোগ সংক্রমণের ব্যবস্থাপনাকে। আবার বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, রোগীর মৃত্যুর পর টেস্ট করা হচ্ছে, যা মুল্যহীন হয়ে পড়ছে এবং মোটা দাগে তা শ্রম ও সময়ের অপচয়। কেননা শুরুতেই রোগ চিহ্নিত হলে রোগীকে বাঁচানো চেষ্টা যেমনি আগেই করা যায় তেমনি অন্যকেও আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যায়।     

আর একটা দিক হচ্ছে, যে সকল চিকিৎসক-নার্সরা চিকিৎসা দেবেন, তাদের জন্য কোনো ধরনের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয় নি। তাই চিকিৎসক-নার্সরাও ভয় পাচ্ছেন। যদিও জানুয়ারি মাস থেকে সরকারি পর্যায় থেকে বলা হচ্ছিলো, আমাদের প্রস্তুতি আছে। চিকিৎসক-নার্সরা যে রোগীটা দেখছেন তারা জানেন না তিনি আসলে করোনায় অক্রান্ত কিনা। অনেক সময় দেখা যায় করোনায় আক্রান্ত রোগীর কোনো উপসর্গই নেই। তাই বুঝারও উপায় নেই। তার মানে হচ্ছে- অরক্ষিত ডাক্তার বা নার্স যে অন্যান্য রোগীদের দেখছেন, সেই ডাক্তারের মাধ্যমে অন্য রোগীরাও যারা করোনায় অক্রান্ত নন, তারাও আক্রান্ত হচ্ছেন। এই চিকিৎসক-নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী যখন তার পরিবারের কাছে ফিরে যাবেন ওই পরিবারের মানুষগুলোও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন। এরকম অবস্থায়, যতই মানবতার কথা বলি না কেন, যেখানে ঝুঁকির মধ্যে জীবন পড়ে যায়, এরকম অরক্ষিত থেকে চিকিৎসা সেবা কয়জন দিতে চাইবেন। যারা সমালোচনা করছেন চিকিৎসকদের, তাদের সবাই কি রাজি হতেন? ইতোমধ্যে ডাক্তারসহ দুজন ডিপ্লোমাধারী স্বাস্থ্যকর্মী মারা গেছেন।

আবার অনেক সমালোচনার পর পিপিই হাসপাতালগুলোতে বিতরণ করা হলো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সেগুলো মানসম্মত না। যেটাকে এন-৯৫ মাস্ক বলা হচ্ছে, সেটা ফুটপাতের কাপড়ের। পিপিই’র গাউনটা হচ্ছে রেইনকোর্ট। এগুলোর কারণ কিন্তু সামর্থ্যের অভাব না, এগুলো হলো স্রেফ দুর্নীতি। যারা এই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে আছেন, এ ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে আছেন তারা কীরকম লোভী হয়ে উঠেছেন যে, নিজের মুনাফাটা নিশ্চিত করার জন্য একজন ডাক্তার-নার্স, যারা আমাদেরকে রক্ষা করবে, তাদেরকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন। এর আরেকটা মানে হচ্ছে, আপনি আপনার মুনাফার জন্য আপনি নিজেও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে দ্বিধা করলেন না। এই পিপিই সরবরাহকারী ব্যবসায়ী কোনো কারণে অসুস্থ হয়ে, উপসর্গবিহীন কভিড-১৯’এ আক্রান্ত ডাক্তারের কাছে গেলে কি সুস্থ্ থাকতে পারবেন?

আমি কয়েকদিন আগে আমার ছোটকালের বন্ধু, এখন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক, তার সাথে কথা হলো। তার কাছে জানলাম- ওরা যে পিপিইগুলো পেয়েছে সেগুলো একেবারে মানসম্মত না। গাউনের সাথে সেলাই করা প্যান্ট থাকলেও হেড কাভার নাই, ফেস শিল্ড নাই, গগলস্ নাই, শুজকাভার নাই, মাস্ক নাই, অন্যান্য আর কিছুই নাই। সে আমাকে বলেছিল, তাদের গাউনের চেয়ে সবচাইতে বেশী জরুরি হচ্ছে এন-৯৫ মাস্ক, চশমা, ফেস শিল্ড (মুখের আবরণ)। অথচ দেখা যাচ্ছে, গাউনটাও নিম্নমানের। আমরা করোনা দুর্গত সহযোগিতার কেন্দ্রের পক্ষ থেকে তাদের জন্য অল্পসংখ্যক সার্জিক্যাল মাস্ক, গ্লাভস পাঠিয়েছি, দুটো পিপিই পাঠিয়েছি। ইন্টার্ন চিকিৎসক, শিক্ষানবীশ নার্সদের অবস্থা তো আরো অসহায়, আরো বিপদজনক। আর এভাবে অরক্ষিত রাখার মানে আমরা সবাই সামগ্রিকভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়ছি। অথচ আমাদের প্রথম পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিলো চিকিৎসক, নার্সসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর  সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

বাংলা : এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের আর কি কি করার আছে বলে আপনি মনে করেন?

ড. তানজীমউদ্দিন খান : আমি তো শুরুতেই বলেছি, মোটাদাগে চারটা ঝুঁকি আমাদের আছে। এগুলো সবই তাৎক্ষণিক, স্বল্প, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদী। সেজন্য প্রথমটাকে আমি বলেছি স্বাস্থ্যগত ও সংক্রমণগত সংকট, দ্বিতীয় হচ্ছে আনাহার ও দুর্ভিক্ষ, তৃতীয় হচ্ছে অর্থনৈতিক মন্দা আর চতুর্থটা হচ্ছে সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা।

আমরা সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর ক্ষেত্রে দেখলাম, আমাদের মনযোগটা অনেক বেশি অর্থনৈতিক মন্দার এবং অর্থনৈতিক মন্দা ঠেকাতে গিয়েও যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে সেটা মুলত রপ্তানিমুখীশিল্পের জন্য এবং এই দুর্যোগ উত্তর অর্থনীতির পুনরোদ্ধারের জন্য। অথচ আমাদের এই মুহূর্তের আশু দুইটা ঝুঁকি হচ্ছে স্বাস্থ্য ও সংক্রমণগত সংকট এবং আনাহার ও দুর্ভিক্ষ।

আগেই বলেছি এই চারটা ক্যাটাগরির ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নেয়া দরকার। যেমন- প্রথম ক্যাটাগরির ঝুঁকি মোকাবেলায় নেতৃত্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, দ্বিতীয়ত অনাহার-দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায়ব  ত্রাণ ও দুর্যোগ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ ও মন্ত্রণালয়। অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয়। আগেও বলেছি আবারো বলি, তাদেরকে পুরো স্বাধীনতা দিতে হবে তাৎক্ষণিক ও সৃষ্টিশীল সিদ্ধান্ত প্রণয়নে। প্রয়োজনে আমলাতন্ত্রের বাইরে থেকে দক্ষ, অভিজ্ঞ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগাতে হবে। আগ্রহী প্রবাসীদেরও কাজে লাগানো যেতে পারে।  আর মন্ত্রনালয়ভিত্তিক সমন্বয় কমিটিগুলোকে সমন্বয় করার জন্য থাকতে পারে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক প্রত্যেক সমন্বয় কমিটির প্রধান সমন্বয়কারীরা এই কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হতে পারেন।

এই কেন্দ্রীয় কমিটিতে শুধু চিকিৎসক, আমলা নয়। প্রয়োজন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী জীবাণুবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, পরিসংখ্যানবিদ, কৃষিবিদ, রসায়নবিদ, ফার্মাসিস্ট, চিকিৎসা-নৃবিজ্ঞানী, লোকপ্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ রাষ্ট্র বিজ্ঞানী, নিরাপত্তাবিশ্লেষক এমন কী প্রকৌশলীদেরও সময়ে সময়ে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। যে সব বিশেষজ্ঞ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেন তাদেরকেই এই কমিটিতে রাখতে হবে।

আমরা এখন যে সংকটের মধ্যে আছি এখানে আসলে সময় নষ্ট করার মতো অবস্থায় নেই। রাজনৈতিকভাবে অন্ধ, দলীয়ভাবে অন্ধ এই ধরনের মানুষদের নিয়ে কখনো সৃষ্টিশীল সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির কথা বললাম যার মাধ্যমে মন্ত্রণালয়গুলো এ ধরনের মানুষকে নিয়ে একটা মাল্টিফাংশনাল টিম তৈরি করতে পারে।
একইভাবে এই ধরনের চার ঝুঁকিকে মাথায় নিয়ে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ঝুঁকি ভিত্তিক সমন্বয়ক কমিটি করা যেতে পারে। আর বিভাগীয় পর্যায়ে জেলা-উপজেলার কমিটিগুলো দেখভালের জন্য পর্যায়ে করা যেতে পারে বিভাগীয় সমন্বয়ক কমিটি। এগুলোর বাইরে লকডাঊন আর ত্রাণ বিতরণের দুর্নীতির তদারকির জন্য ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে করা যেতে পারে একটি করে গণতদারকি কমিটি।  

বাংলা : করোনাকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব তৈরি হচ্ছে বা বিভিন্ন ধর্মীয় নেতারা বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করছেন। যা গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে, অনেকই এগুলোকে বিশ্বাসও করেছেন- এমনটা কেন হচ্ছে এবং এটা প্রতিরোধে করণীয় কী?

ড. তানজীমউদ্দিন খান : গুজব ফেসবুকে যেমন আছে, তার চেয়ে আমার কাছে মনে হয় ইউটিউবে গুজবটা বেশি ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে করোনাভাইরাস নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক, কল্পনাপ্রসূত এবং একই সঙ্গে স্বপ্নে পাওয়া ব্যাখ্যাও কিন্তু দিচ্ছেন এক শ্রেণির প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতারা। বিশেষ করে যে মানুষগুলো লেখাপাড়ার দিক থেকে একটু দুর্বল, পিছিয়ে পড়া, তাদের কাছে ফেসবুক কিন্তু খুব জনপ্রিয় নয়। তাদের শিক্ষণের সবচাইতে জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে ইউটিউব। আর এই ইউটিউবের মাধ্যমে গুজব বা ভুল এবং মনগড়া তথ্য সমাজের বিপুল সংখ্যক মানুষের ছড়াচ্ছে খুব সহজে। অথচ এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি ছিলো শুরুতেই। ইউটিউবে করোনাভাইরাস নিয়ে বিজ্ঞান সম্মত বিকল্প প্রচারণার দরকার ছিলো তা করা হয়নি।

অথচ দেখা গেছে যারা সরকারের বা রাষ্ট্রের দুর্বল ব্যবস্থাপনা বা সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা করছেন, সেগুলোকে গুজব হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, এখন পর্যন্ত তিনজন কলেজশিক্ষক গ্রেপ্তার হয়েছেন, মামলা হয়েছে দুজন সম্পাদকের বিরুদ্ধে। গুম, ক্রসফায়ার চলছে। অনেকে স্থানীয়ভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। যার ফলে আসলে কোনটা গুজব আর কোনটা গুজব না, সেটা নিয়ে মানুষ দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছে। তাই ইউটিউবের প্রচারিত গুজবগুলো মানুষের কাছে খুব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

আসলে গুজব বলতে কি বোঝায়, তার সংজ্ঞায়নটাও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা জরুরি। সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা থাকলে মানুষের জন্য খুব সহজ হতো উনি যেটা বলছেন সেটা গুজবের পর্যায়ে পড়ে কিনা, তা বুঝতে। তবে ইউটিউবে গুজবের যে ভিডিওগুলো আছে সেগুলো যত দ্রুত সরিয়ে ফেলা বা বন্ধ করা যায় ততই মঙ্গল। আর মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য যেসব আলেম ও ধর্মীয় নেতা আছেন। তাদের মাধ্যমে অপব্যাখ্যাগুলোর পাল্টা আলোকিত এবং যৌক্তিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করাও দরকার। আর সেটা করলে গুজবটা সহজে রোধ করা যেতো। মোট কথা, তথ্যের অবাধ এবং স্বাধীন, নির্ভরযোগ্য প্রবাহ নিশ্চিত থাকলে গুজবে এমনিতেই ধোপে টিকেনা। 

বাংলা : সবশেষে, আপনাদের কোন সুনির্দিষ্ট দাবিনামা আছে কি না, থাকলে সেগুলো সম্পর্কে একটু বলেন।

ড. তানজীমউদ্দিন খান : এখন আমার কাছে যেটা মনে হয়, আমাদের তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ খুব জরুরি। যদিও ইতোমধ্যে আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। ইতোমধ্যে যে পদক্ষেপগুলো নেয়ার কথা বলা হচ্ছে সেগুলোর আমরা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখছি না। যার জন্য সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনি দরকার। তার মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য নজর দেয়া উচিত যারা দিন আনে দিন খায়। বিশেষ করে শ্রমজীবী, দিনমজুর, কৃষক রয়েছেন যারা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভর করে তাদের দিকে। শুধু তাই নয় মধ্যবিত্তরাও এখন দারিদ্র সীমায় পৌঁছে গেছে। মধ্যবিত্ত যারা বিভিন্ন স্কুল-কলেজে চাকরি করেন তারা অনেকেই কিন্তু এখন বেতন পাচ্ছেন না। যার ফলে তাদের জন্য দুটো বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু আমরা এখন লকডাউনে গিয়েছি এবং সাধারণ ছুটি দেয়া হয়েছে। সেই ঘরে থাকাটা নিশ্চিত করার জন্য তাদের খাবারটা নিশ্চিত করা। খাবার শুধু নিশ্চিত করলেই হবে না সেটা তারদর বাসায় পৌঁছে দিতে হবে। এর সঙ্গে প্রয়োজন হচ্ছে নগদ অর্থের। নগদ অর্থের প্রয়োজন শুধুমাত্র খাবারের জন্য নয়। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যখাতে বিপর্যয় আগে থেকেই আছে এবং আমরা দেখি বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই যতবেশি খাবার খান তার চেয়ে ওষুধ কম খান না। তাই তাদের জন্য নগদ অর্থের প্রয়োজনটা অনেক বেশি।

দ্বিতীয়ত, চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা। এমনকি যারা পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন তাদেরও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সেই সুরক্ষা করতে গেলে তাদের মানসম্মত পিপিই এবং বিশেষ করে এন-৯৫ মাস্ক। এক্ষেত্রে এন-৯৫ মাস্ক নিয়ে যে দুর্নীতি তা বন্ধ করে, আসল এন-৯৫ মাস্ক সবার জন্য বিতরণ করতে হবে অতি দ্রুত। এই এন-৯৫ মাস্ক প্রতিদিন কতজন ব্যবহার করবে, এজন্য প্রতিদিন কতগুলো মাস্ক লাগবে, সেই ভিত্তিতে আগামী দুইমাসে এই মাস্ক কতগুলো লাগবে তার হিসাব করে সংগ্রহ করা এবং সেভাবেই প্রয়োজনানুযায়ী বিতরণ করতে হবে। একইভাবে গগলস, ফেস শিল্ড, গ্লাভসশ সু-কাভারসহ পূর্ণাঙ্গ পিপিই দিতে হবে। অবশ্যই এসব পিপিই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিত মান অনুযায়ী হতে হবে।

তার সঙ্গে আরেকটা দাবি হচ্ছে যারা এই পিপিই নিয়ে দুর্নীতি করলো তাদেরকে গ্রেপ্তার করে দুর্নীতির দায়ে অতিদ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করা।

আর তৃতীয়ত হচ্ছে কৃষক। তাদের সামনে এই মুহূর্তে খুব বড় সমস্যা হচ্ছে ফসল। কৃষকদের যে ফসল আছে, তারা সেগুলো বিক্রি করতে পাচ্ছে না, বাজারজাত করতে পারছে না। সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেগুলো বিক্রি ও বাজারজাত করার ব্যবস্থা করা। সেক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে যারা কৃষি কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের মাধ্যমে এটা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের নগদ অর্থ দিতে হবে যাতে করে তারা নতুন ফসল আবাদ করতে পারে। এছাড়াও মাঠে ফসল রয়েছে সেটা কাটা এখন একটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সেই ফসল কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে খুব দ্রুত কাটা এবং বাজারজাত করার ব্যবস্থা করা।

কৃষক আমাদের পেটের খাবার যোগান দেয় এবং কৃষকের যদি খাবার যোগান দিতে না পারে সামনে আমাদের মুদ্রাস্ফীতি আমাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে। বড় ধরনের খাদ্য সংকটও তৈরি হবে। খাদ্য আমদানি করার মতো অবস্থাও সামনে নেই। দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতিটা আরো কঠিন রূপ নিতে পারে। আমাদের এই মুহূর্তে মানুষ বাঁচাতে হলে কৃষক, চিকিৎসক-নার্সকে বাঁচানোকে সবচাইতে বেশী অগ্রাধিকার দিতে হবে নীতি নির্ধারণে।  

বাংলা :  আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0655 seconds.