• ২৩ এপ্রিল ২০২০ ২২:৩৪:৩৩
  • ২৩ এপ্রিল ২০২০ ২২:৩৬:৫৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নেপাল-ভুটান-ভিয়েতনাম পেরেছে, আমরা পারিনি কেন?

ভিয়েতনাম। ছবি : সংগৃহীত


আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি :


ইউরোপ-আমেরিকার মতো মহাশক্তিধর দেশগুলোই যেখানে করোনা মোকাবিলা করতে পারছে না সেখানে বাংলাদেশের মতো দেশ কিভাবে পরিস্থিতি সামাল দিবে? কিংবা যেখানে ইউরোপ আমেরিকা করোনা মোকাবিলার পরীক্ষায় ফেল করেছে সেখানে বাংলাদেশ কিভাবে পাশ করবে? মোটাদাগে এমন কথা বলতে শোনা যায় অনেককে। 

কিন্তু এই ধরনের কথা যারা বলে বেড়ায়, তাদের বলতে শোনা যায় না করোনা নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষায় নেপাল-ভুটান-ভিয়াতনাম পাশ করে গেলেও আমরা কেন পারলাম না? এই প্রশ্ন তারা রাখবে না। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই বেরিয়ে আসে প্রস্তুতির নামে আসলে আমরা কতটা অপ্রস্তুত ছিলাম, কতটা সমন্বয়হীন আমাদের ব্যবস্থাপনা, কতটা দুর্বল ছিলো আমাদের সুরক্ষা দেয়াল। আর তাই আমরা সবচেয়ে আক্রান্ত এবং মহাশক্তিধর দেশগুলোর করুণ পরিনতির ছবি দেখিয়ে নিজেদের দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা করছি।

যারা বলেন ইতালি আমেরিকা না পারলে বাংলাদেশ কিভাবে পারবে, তাদের জন্য উদাহরণ হতে পারে ভিয়েতনাম। অর্থনীতির দিক থেকে ভিয়েতনামের অর্থনীতি আমাদের কাছাকাছি। চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও খুব বেশি উন্নত না। কিন্তু তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সাথে আমাদের ব্যবস্থাপনার অনেক পার্থক্য আছে। আপাতত দেখা যাক পরিসংখ্যানটা। ভিয়েতনামে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ২৩ জানুয়ারি। এখন পর্যন্ত সেখানে মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা মাত্র ২৬৮ জন। এর ভেতর ২২৪ জনই সুস্থ হয়ে গেছেন। বাকিরাও সুস্থ হওয়ার পথে। এখন পর্যন্ত চীন সীমান্তবর্তী এই দেশটিতে করোনা আক্রান্ত হয়ে কারো মৃত্যু ঘটেনি। আমেরিকা ইতালির মতো দেশের দিকে তাকালে বলতে হবে তারা বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু যদি এর কারণ খুঁজতে যাওয়া হয় তাহলে বলতে হবে ইতালি-আমেরিকা প্রথম দিকে উদাসিনতা দেখিয়ে যে ভুল করেছে ভিয়েতনাম সেই ভুল করেনি। এটাই তাদের সফলতার কারণ। 

বাংলাদেশের মতো কাছাকাছি অর্থনীতির কিছু দেশের করোনা পরিস্থিতির ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত সর্বশেষ পরিসংখ্যানটা দেখা যাক। শ্রীলঙ্কায় ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৩৩০ জন এর ভেতর মারা গেছেন ৭ জন এবং সুস্থ হয়েছে ১০৫ জন। প্রতিবেশি দেশ নেপালে আক্রান্তের সংখ্যা ৫১ জন। সুস্থ হয়েছেন ৭ জন। কোন মৃত্যু নেই, ভুটানেও করোনা আক্রান্ত হয়ে কোন মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি এখন পর্যন্ত। ভুটানে করোনা আক্রান্তই হয়েছেন মাত্র ৭ জন। তার ভেতর সুস্থ হয়েছেন ৩ জন। ভুটান ও নেপাল এই দুই দেশই করোনার উৎপত্তিস্থল চীনের সীমান্তবর্তী দেশ।

ল্যাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ২৯৮ জন, মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের এবং সুস্থ্য হয়েছেন ১২২ জন। বলিভিয়ায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৭৩৫ এবং মৃতের সংখ্যা ৪৩ জন। সুস্থ হয়েছেন ৪৪ জন। কিউবায় ১ হাজার ১৮৯ জন আক্রান্তের ভেতর মারা গেছে ৪০ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ৩৪১ জন।

এইদেশগুলো সবই অর্থনীতিসহ নানা বাস্তবতার দিক থেকে বাংলাদেশের সাথে তুলনা করা যেতে পারে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে। কোন কোন দেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিকার হয়ে আমাদের চেয়েও প্রতিকূল অবস্থায় আছে। এই দেশগুলো প্রায় সবগুলো করোনা মহামারীর প্রকোপে বিধ্বস্ত বিভিন্ন দেশের হয় পার্শ্ববর্তী দেশ, না হয় প্রচুর পর্যটক যাতায়াত রয়েছে। কোন কোন দেশের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস্য পর্যটন খাত হওয়ায় প্রচুর বিদেশি পর্যটক আসেন। সবমিলিয়ে করোনা না পৌঁছানোর কোনো কারণ নেই এইসব দেশেও। কিন্তু দেখা গেছে তারা দারুনভাবে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের করোনা পরিস্তিতি নিয়ন্ত্রণের সাফল্যের ক্ষেত্রে রয়েছে পূর্ব প্রস্তুতি এবং মানবিকসব উদ্যোগ।

কোয়ারেন্টাইন হোম। নেপাল : ছবি সংগৃহিত

উল্লেখিত প্রায় প্রতিটি দেশই জানুয়ারি মাস থেকেই করোনা মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এই প্রস্তুতির ভেতর সবচেয়ে কার্যকর দিক ছিলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ রাখতে জনগণকে সতর্ক করা। কোন ‘কপিপেস্ট’ নীতিমালা নয়, স্ব স্ব দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা নীতিমালা প্রনোয়ন করেন। যেভাবে তার দেশের জনগণকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সম্পৃক্ত করা যায় তারা সেভাবেই পদক্ষেপ নিয়েছেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ভিয়েতনামের কথা। ভিয়েতনামকে দীর্ঘ বছর বহিঃশত্রুর সাথে লড়াই করতে হয়েছে। সেখানকার নাগরিকরা বিদেশি আগ্রাসনের শিকার হয়েছেন বারবার। ফলশ্রুতিতে তাদের ভেতর জাতীয়তাবোধ কাজ করে প্রচুর। আর করোনা মোকাবেলায় সেই দিকটি কাজে লাগিয়েছেন ভিয়েতনাম সরকার।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী এনগুয়েন জুয়ান ফুক বলেন, ‘খুব দ্রুতই এই ভাইরাস এখানে এসে পড়বে। এই সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করা মানে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা’। করোনার থেকে সর্তকতামূলক প্রচরণায় এই পদ্ধতি খুব কাজে দিয়েছে। সেইসাথে কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি জোড়দার করা, কড়া-নজরদারিসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়। অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের মাঝে খাদ্য সামগ্রীও তারা পৌঁছে দিতে পেরেছেন কোনো ধরনের সংক্রামণের ঝুঁকি না ঘটিয়েই।

ভুটান এবং নেপালের ক্ষেত্রে দেখা গেছে তারা করোনা প্রকোপ শুরু হওয়ার আগেই নানা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেয়। এবং প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পরপরই তার আশেপাশের সংস্পর্শে আসা লোকজনকে কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়। জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকেই নেপাল তাদের সকল সীমান্তে এবং বিমান বন্দরে কড়াকড়িভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করে। যেহেতু নেপালে প্রচুর পর্যটক আসে তারা সেই দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছেন। পর্যটন উন্নয়নের লক্ষে ঘোষিত ‘ভিজিট নেপাল বর্ষ ২০২০’ বাতিল করে দেয়। খুব নিরবেই তারা তাদের সীমিত সামর্থের ভেতর সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখে। 

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখন পর্যন্ত দেখা গেছে যেসব দেশ করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার আগেই তা ঠেকানোর প্রস্তুতি নিতে পেরেছে তারাই প্রতিরোধ করতে পেরেছে। নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেরেছে। যারা শুরুতে ভুল করেছে তারা প্রতি দিন প্রতি ঘণ্টায় সেই ভুলের মাশুল গুনছে। 

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১২৭ জনের। সুস্থ হয়েছে ১০৮ জন এবং সারাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ৪ হাজার ১৮৬ জন। শত শত চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছে, হচ্ছে। প্রতিদিনই এই সংখ্যা বেড়েই চলছে। এই পরিস্থিতিতে পেছনে ফিরে শুধু আমাদের শুরুর প্রস্তুতি কেমন ছিলো সেই ছবি দেখার চেষ্টা করি। কিন্তু প্রস্তুতি বলতে সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার কাছে যে ছবিটি ভেসে আসে তা হলো- ‘আমাদের সকল ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে’ এইটুকু বক্তব্যই, প্রস্তুতির আর যে কোন ছবি আমি দেখতে পাই না...। হয়তো দেখতে পারিনা। আপনারা যারা সকল প্রস্তুতির নমুনা ও চিত্র দেখতে পান তারা আমাদের মতো ‘অন্ধদের’ও দেখিয়ে দেন দয়া করে...।

লেখক: সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0640 seconds.